ঢাকা, বাংলাদেশ   সোমবার ০৩ অক্টোবর ২০২২, ১৮ আশ্বিন ১৪২৯

মনিটরিং টিম আজ থেকে মাঠে নামছে

চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা

প্রকাশিত: ২২:২৭, ২৪ আগস্ট ২০২০

চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা

তপন বিশ্বাস ॥ চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে সরকার। খাদ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে পাঁচটি মনিটরিং টিম গঠন করা হয়েছে। বাজার মনিটরিংয়ের জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, ভোক্তা অধিকার এবং র‌্যাবকে চিঠি দিয়েছে খাদ্য মন্ত্রণালয়। রবিবার গঠিত এই কমিটি এবং ভোক্তা অধিকার ও র‌্যাব আজ সোমবার থেকে এক যোগে মনিটরিংয়ে মাঠে নামবে। সরকারের পক্ষ থেকে বার বার বলা হচ্ছে, দেশে চালের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। সঙ্কট হওয়া বা দাম বাড়ার কোন কারণ নেই। তারপরও বাজারে চালের দাম বাড়ছে। চালের মূল্যবৃদ্ধির কারণ সম্পর্কে খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার জনকণ্ঠকে বলেন, মোটা চালের দাম কিছুটা বেড়েছে। এর কারণ এবার বোরো মৌসুমে মোটা ধানের উৎপাদন কম ছিল। দাম বেশি হওয়ায় অনেকে সরু ধানের উৎপাদন বেশি করেন। তিনি বলেন, মোটা চালের উৎপাদন কম হওয়ার পাশাপাশি এবার করোনা প্রাদুর্ভাবের মধ্যে অনেকে ব্যক্তিগতভাবে ত্রাণ হিসেবে চাল বিতরণ করেছেন। এই ত্রাণ বিতরণে বেসরকারীভাবে বাজার থেকে বিপুল পরিমাণে মোটা চাল সংগ্রহ করেছেন। এছাড়া এই মোটা চাল দিয়ে পোল্ট্রি খামারের খাবার, মাছের খাবার এবং গরুর খামারের খাবার তৈরি করা হয়। সব মিলিয়ে মোটা চালের ওপর চাপ বেড়ে যাওয়ায় অসাধু ব্যবসায়ীরা মোটা চালের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। সরকারী হিসেব মতে রবিবার দেশে মোটা চাল বিক্রি হয় ৩৭ থেকে ৩৯ টাকা কেজি দরে। আর মাঝারি ধরনের চাল বিক্রি হয় ৪৪ থেকে ৪৫ টাকা কেজি। এছাড়া সরু চালের বাজার মূল্য ৫১ টাকা থেকে ৫৪ টাকা। এদিকে পর্যাপ্ত মজুদ থাকলেও চালের দাম বেড়েই চলেছে। চাল আমদানির সরকারী ঘোষণায়ও নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি চালের মূল্য। সরকারের কঠোর নির্দেশ উপক্ষো করে চাল সংগ্রহ অভিযানে সাড়া দেননি মিল মালিকরা। উপরন্তু বাজারে চালের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। এর প্রভাবে পাইকারি ও খুচরা বাজারে সরু, মাঝারি ও মোটা- সব চালের দাম কেজিতে দুই থেকে চার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। করোনার মধ্যে এমনিতেই অনেকের আয় কমেছে। এ অবস্থায় চালের দাম বেড়ে যাওয়ায় বেশি চাপে পড়েছেন দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষ। মিল মালিকরা বলছেন, ধানের দাম বেড়ে যাওয়ায় বাজারে চালের দাম বেড়েছে। তাই খরচ বেশি হওয়ায় সরকারকে চুক্তি অনুযায়ী চাল দেয়া সম্ভব হয়নি। কোন কোন মিল মালিক বলছেন, সরকার ও অনেক বেসরকারী প্রতিষ্ঠান ত্রাণ হিসেবে চাল বিতরণ করায় বাজারে মোটা চালের সরবরাহ কমেছে। এর প্রভাব পড়েছে গোটা চালের বাজারে। পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, মিল মালিকদের কারণে চালের দাম বেড়েছে। এখন মিলগুলোতে ধান ও চালের পর্যাপ্ত মজুদ আছে। এবার বোরো ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। মৌসুমের সময়ে কম দামে কেনা ধান থেকে তৈরি চাল এখন তারা দাম বাড়িয়ে বিক্রি করছেন। আর এখন ধানের দাম বৃদ্ধির অজুহাত দিচ্ছেন। এদিকে মিলগুলো চুক্তি অনুযায়ী সরকারকে চাল সরবরাহ না করায় মজুদ বাড়াতে দ্রুত আমদানির পরিকল্পনা করছে সরকার। পাশাপাশি সঙ্কটের এ সময়ে খোলাবাজারে চাল বিক্রি অব্যাহত রয়েছে। গত এক সপ্তাহ ধরে মিল মালিকরা চালের দাম কেজিতে দুই থেকে চার টাকা বাড়িয়েছেন বলে জানান আড়তদার ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা। মিরপুর-১নং বাজারের চাল ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন বলেন, মিলাররা ধানের দাম বৃদ্ধির কথা বলে চালের দাম বাড়িয়েছেন। তাদের কম দামে কেনা ধানের চাল এখন বাজারে। যদিও বাজারে চালের দাম বৃদ্ধির কারণে এখন ধানের দাম একটু বাড়ছে। ঈদের পর থেকে সরবরাহ সমস্যার কথা বলে মিল মালিকরা এক দফা দাম বাড়ান। কাওরান বাজারের চাল ব্যবসায়ী মাইনুদ্দিন মানিক বলেন, মিলগুলোর কারণে চালের দাম বাড়ছে। ধান ও চালের বাজার তারাই নিয়ন্ত্রণ করছে। বড় অটো রাইস মিলে হাজার হাজার টন ধান কিনে মজুদ রাখতে হয়। মৌসুমের সময় মিলগুলো প্রয়োজনমতো ধান কিনে রেখেছে। দু’চারদিন ধরে ধানের দাম বাড়লে তাতে চালের দাম বাড়ার কথা নয়। এদিকে রাজধানীর বাজার ঘুরে দেখা যায়, প্রতি কেজি গুটি বা স্বর্ণা চালের খুচরা মূল্য এখন ৪৫ থেকে ৪৮ টাকা। এক সপ্তাহ আগেও এই মোটা চাল ৪০ থেকে ৪২ টাকা ছিল। মাঝারি মানের বিআর-২৮ ও পাইজাম ৪৮ থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা গত সপ্তাহে ৪৪ থেকে ৪৬ টাকা ছিল। আর সরু চাল মিনিকেটের দামও একই হারে বেড়ে এখন ৫৪ থেকে ৫৫ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাবে মোটা চালের দর গত বছরের একই সময়ের চেয়ে বেড়েছে ২২ শতাংশ। এতে নিম্ন আয়ের মানুষের কষ্ট বেড়েছে। চুক্তি অনুযায়ী সরবরাহ না করায় বোরো মৌসুমে সরকারের লক্ষ্যমাত্রার মাত্র তিন ভাগের এক ভাগ ধান ও চাল সংগ্রহ হয়েছে। চলতি বছর সরকার সাড়ে ১৯ লাখ টন বোরো ধান-চাল কেনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে। ৩৬ টাকা কেজি দরে মিলারদের কাছ থেকে ১০ লাখ টন সিদ্ধ চাল ও ৩৫ টাকা কেজিতে দেড় লাখ টন আতপ চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল। কিন্তু মিল মালিকরা চুক্তিমূল্যে সরকারকে চাল সরবরাহ না করে গড়িমসি করছেন। তারা সরকারের চাল কেনার দর বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছেন। এ দাবি নাকচ করে প্রয়োজনে চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, এ পর্যন্ত সারাদেশে মোট ছয় লাখ ৫৯ হাজার ১৮৬ টন ধান ও চাল সংগ্রহ হয়েছে। এর মধ্যে ধানের পরিমাণ মাত্র এক লাখ ৮৩ হাজার ৮৪৩ টন। সিদ্ধ চাল সংগ্রহ হয়েছে চার লাখ ৭৪ হাজার ৭৬৬ টন। আতপ চাল সংগ্রহের পরিমাণ ৬৪ হাজার ৯২২ টন। গুদামে ধান-চাল না আসায় সরকারের বোরো সংগ্রহ লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হচ্ছে না। কারণ আগামী ৩১ আগস্ট সংগ্রহ অভিযান শেষ হচ্ছে। বর্তমানে প্রায় সাড়ে দশ লাখ টন চাল সরকারী গুদামে মজুদ আছে। পর্যাপ্ত উৎপাদন ও সরবরাহ থাকার পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের ২২ মে চালের শুল্ক দ্বিগুণ বাড়িয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। বর্তমানে চাল আমদানিতে মোট ৫৫ শতাংশ শুল্ক রয়েছে। এর মধ্যে আমদানি শুল্ক ২৫ শতাংশ, নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক ২৫ শতাংশ এবং অগ্রিম আয়কর ৫ শতাংশ। খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার ইতোমধ্যে বলেছেন, চালের বাজার অস্থিতিশীল করলে শুল্ক কমিয়ে বেসরকারীভাবে আমদানি উন্মুক্ত করা হতে পারে। এখন কেস টু কেস ভিত্তিতে বেসরকারী খাতে চাল আমদানির জন্য অনুমতি দেয়া হয়। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, চলতি মাসের মধ্যে কোন কোন দেশ থেকে কী পরিমাণ চাল আমদানি করা হবে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। এখন সার্বিক বিষয় পর্যালোচনা করা হচ্ছে। মিল ও বাজার পর্যায়ে পর্যাপ্ত চাল মজুদ আছে। আমন ওঠা পর্যন্ত চালের ঘাটতি হবে না। তবে আমনের আবাদে ক্ষতি হলে বাজারে চাল সরবরাহ ঠিক রাখতে আগাম প্রস্তুতি নেয়া হবে। এখন চালের বাজার স্বাভাবিক রাখতে মনিটরিং জোরদার করা হবে।