শনিবার ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯, ২১ মে ২০২২ ঢাকা, বাংলাদেশ
প্রচ্ছদ
অনলাইন
আজকের পত্রিকা

ভূগর্ভে লুকিয়ে থাকা ইতিহাস- আজও অনাবিষ্কৃত

ভূগর্ভে লুকিয়ে থাকা ইতিহাস- আজও অনাবিষ্কৃত
  • বগুড়ায় ‘ভীমের জাঙ্গাল’- প্রজন্মের অজানা

সমুদ্র হক ॥ করতোয়া নদীর পশ্চিম পাড়ে- বগুড়া শহর থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার পশ্চিমে উঁচু-নিচু গভীর জঙ্গলে আবৃত বিস্তৃত গড়ের ভেতরে ইতিহাসের কোন প্রেক্ষাপট লুকিয়ে আছে তা সহস্র বছর পরও অনাবিষ্কৃত। প্রাচীন নাম ‘ভীমের জাঙ্গাল’। প্রবীণদের মুখে মুখে এখন ফেরে। প্রজন্মের অজানা বিরাট এই বন এলাকা ঘিরে জনশ্রুতি অনেক। কোনটি পৌরাণিক। কোনটি কল্প কাহিনী। কোনটি প্রাচীন ইতিহাস।

এলাকাটি বগুড়ার বাইপাস সড়কের কাছে। মৌজা এরুলিয়া পালপাড়া। সেখান থেকে উত্তরে দেশের প্রাচীন পু-্রবর্ধনের রাজধানী পু-্রনগরখ্যাত মহাস্থানগড় প্রায় ১১ কিলোমিটার। পৌঁছবার আগে প্রাচীন স্থাপনা বৌদ্ধ বিহার। অধিক পরিচিত কথিত বেহুলার বাসর ঘর। সাইনবোর্ডে লখিন্দরের মেধ। সেখান থেকে দশ কিলোমিটার দূরে বৌদ্ধকালে নির্মিত উচ্চতর শিক্ষায়তন ভাসু বিহার। প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর চারপাশের এই এলাকা ঘিরে অধিকতর গুরুত্ব দিয়ে ইতিহাস উদ্ঘাটনে খনন কাজ করেছে ১৯৩৪ সালে। দেশ স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের পর বিচ্ছিন্নভাবে খনন করা হয়। তারপর ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশ ও ফ্রান্স প্রতœতাত্ত্বিকগণ যৌথভাবে খনন কাজ করছে প্রতিবছর।

বগুড়ার পশ্চিম পাড়ের এরুলিয়া পালপাড়া এলাকার দিকে কখনও দৃষ্টি পড়েনি প্রতœতত্ত্ব অধিদফতরের। ঘুরেও দেখেনি কি আছে সেখানে। স্থানভেদে ৩০ থেকে ৪০ ফুট উঁচু-নিচু সবুজের বেস্টনির ভেতর কী লুকিয়ে আছে। অন্তত ১৪টি কালের (মৌর্য সুঙ্গ, গুপ্ত, পাল সেন, শশাঙ্ক ইত্যাদি) সাক্ষী নিয়ে মহাস্থানগড়কে দেশের প্রাচীন নগরী বলা হলে এর চারপাশে বিশাল এলাকাজুড়ে তো বহু কিছু থাকার কথা। যেখানে পর্যটক হিউয়েন সাং প্রতœতত্ত্ববিদ আলেকজান্ডার কানিংহামের মতো ব্যক্তিত্ব পু-্র ইতিহাস উদ্ঘাটন ও গবেষণা করেছেন। সেখানে একবিংশ শতকের সমৃদ্ধ প্রতœতাত্ত্বিকগণ নতুন কিছু আবিষ্কার করবেন এটাই স্বাভাবিক। তারা গতানুগতিক ধারার বৃত্তের বাইরে আসছেন না।

বৃহস্পতিবার দুপুরে প্রতœতত্ত্ব অধিদফতরের রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক নাহিদ সুলতানাকে এরুলিয়া পালপাড়ার বিষয় সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি অবগত নন বলে জানান। বলেন কাজের চাপ কমলে দেখে আসবেন। বগুড়ার ইতিহাস কৌতূহলী। জিল্লুর রহমান শামীম ও এই প্রতিবেদক বলেন, দিনের বেলায় পালপাড়ার ভেতরে গেলে জঙ্গলের ঘুটঘুটে অন্ধকারে গা ছমছম করে ওঠে। টর্চ জ্বালিয়ে ভেতরে ঢুকতে হয়। কিছুটা হাঁটার পর সূর্যালোকে দেখা যায়-কংক্রিটের সিঁড়িগুলো ভেঙ্গে টুকরো হয়ে ওপরের দিকে উঠছে। কোথাও লোকজন সেগুলো একেবারে তুলে সমতল করেছে। এখনও কিছু ঢিবির মতো আছে সেগুলো কেটে নিয়ে জঙ্গল পরিষ্কার করে দখল করা হচ্ছে। এরই মধ্যে বড় আকৃতির চৌকোনা সাদা পাথর দেখা যায় কয়েকটি। যা মহাস্থানগড়ে পাওয়া সাদা পাথরের সাদৃশ্য। এগুলো একজন মানুষের পক্ষে টানা সম্ভব নয়। লোকজন এই পাথর বাড়িতে নিয়ে গেছে। একটি পাত কুয়ার সন্ধান মিলল। যা অনেকটাই গভীর। স্থানীয়রা বললেন এই কুয়া ভরাট করা হয়েছে। সেখান থেকে অল্প দূরে প্রাচীন ইটের অবকাঠামো ভগ্নদশা। যা প্রমাণ দেয় কোন জমিদার বাড়ির অস্তিত্ব। এমনই অনেক নিদর্শন মেলে ওই এলাকায়।

পালপাড়ার প্রবীণ ব্যক্তি হায়দার আলী ও অসীম উদ্দিন জানালেন, বংশ পরম্পরায় শুনেছেন, সেখানে লখিন্দরের বাবা চাঁদ সওদাগরের বাড়ি ছিল। তিনি ছয়টি পুকুর ঘাট বানান। যার একটির অস্তিত্ব আছে। লোকজন বলে লখিন্দরের বাণিজ্য তরী মধুকর সপ্তডিঙ্গা পাবনার বিনসারা ঘাটে পৌঁছে সাঁই সওদাগরের কন্যা বেহুলার সঙ্গে প্রণয় হয়। সেখানে ওই ঘাটের নাম বেহুলার খাড়ি। লখিন্দর-বেহুলার পরিণয়ের পর বাসর ঘরে সর্পদেবী মনসার দংশন। তার পরের ঘটনা পৌরাণিক উপাখ্যান। বাস্তবতার সঙ্গে কোন মিল নেই।

এলাকার লোকের কথা বহু আগে ছয় ঘাটের এক ঘাটে বড় একটি নৌকা ডুবে গেছে। খননে তা বের হবে। কিছুদিন আগে নৌকার ভগ্নাংশ তারা পেয়েছিলেন। হায়দার আলী জানালেন, তার বাবা ও দাদা সরকারী জমি দখলের বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন। তারপরও দখল থামেনি। তাদের কথা- এখনও এই এলাকা খুঁড়লে অনেক কিছুই পাওয়া যাবে। চাঁদ সওদাগরের বাড়ি চম্পক নগরে। এই এলাকার একটি নামের সঙ্গে মিল আছে। প্রাচীন ভারতে উল্লেখ আছে চম্পকনগরে ধনী বণিক শ্রেণীর বাস। যা বঙ্গদেশে।

প্রতিবছর মহাস্থানগড়ের খনন কাজে গুরুত্বপূর্ণ পুরাকীর্তি উদ্ঘাটিত হচ্ছে। বেলে পাথরের সাদা পাথর বড় সাদা পাথর উদ্ধার হয়েছে। ২০০৯ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি একটি এ্যাঙ্কর পাওয়া গেছে। যা বানারসি বিল থেকে করতোয়া নদীর সংযোগ ছিল বলে মনে করেন প্রতœতাত্ত্বিকগণ। ব্লাক স্টেন সূর্য মূর্তির অংশসহ কষ্টি পাথরের মূর্তি পাওয়া গেছে। এখন টেরাকোটা ও প্রাচীন অলঙ্কৃত ইট প্রদীপ কলসসহ নানা কিছু মিলছে। এরুলিয়া পালপাড়ায় যে বড় নৌকার কথা বলা হচ্ছে (যা মাটির গভীরে আছে) তার সঙ্গেও মহাস্থানগড়ে পাওয়া কোন পুরার্কীতির লিঙ্ক থাকতে পারে।

এই অঞ্চল যে কতটা প্রাচীন তার হাজারো উপাখ্যান রচিত হয়েছে। বগুড়ার ভীমের জাঙ্গাল বর্ণিত হয়েছে মহাভারতের উপাখ্যানে। মহাভারতে পৌরবদের সঙ্গে পা-বদের যুদ্ধে পা-বরা বনভূমি থেকে পালিয়ে বিভিন্ন জায়গায় গোপনে আশ্রয় নেয়। শক্তিধর ভীম বরেন্দ্র অঞ্চলের জঙ্গলে আত্মগোপন করেছিল। সেই থেকে এই স্থানের নাম ‘ভীমের জাঙ্গাল’। ইতিহাসের সঙ্গে এই উপাখ্যানের সংঘাত নিয়ে কালক্ষেপণ অর্থহীন। এতে কল্পকাহিনীর বিস্তৃতি বাড়বে। এই পথে না গিয়ে ইতিহাসের পথ ধরে দেখা যাবে ভীমের জাঙ্গালের বিস্তৃতি ছিল ৬০ থেকে ৭০ কিলোমিটার। বর্তমানে ঠেকেছে ৩০ কিলোমিটারে। বিবর্তনে সবই দখল। প্রয়োজন শুধু ইতিহাস উদ্ঘাটন। যে প্রাচীন নিদর্শন লুকিয়ে আছে মাটির নিচে।

শীর্ষ সংবাদ: