৭ এপ্রিল ২০২০, ২৪ চৈত্র ১৪২৬, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 
সর্বশেষ

নিমেষেই অঙ্গার ॥ রাজধানীর দিলু রোডে ভয়াবহ আগুন

প্রকাশিত : ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২০
নিমেষেই অঙ্গার ॥ রাজধানীর দিলু রোডে ভয়াবহ আগুন
  • শিশুসহ ৩ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু
  • ভবনের গ্যারেজে বিদ্যুতের শর্টসার্কিট

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ রাজধানীর ৪৫/এ নিউইস্কাটন দিলু রোডে একটি পাঁচতলা ভবনে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে মর্মান্তিকভাবে তিনজন অগ্নিদ্বগ্ধ হয়ে মারা গেছেন। পাঁচতলা ভবনটিতে দগ্ধ, ধোঁয়ায় অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন আরও পাঁচজন। এ ছাড়া হুড়াহুড়ি করে নামতে গিয়ে আরও অন্তত দশজন আহত হয়েছেন। অগ্নিকান্ডের সময়ে পাঁচতলা ভবনের ৭/৮ পরিবারের সবাই গভীর ঘুমে ছিল। বৃহস্পতিবার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে ওই ভবনের নিচতলায় গ্যারেজের বৈদ্যুাতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। অগ্নিকান্ডের খবর পয়ে দমকল বাহিনীর নয়টি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে ভোর সাড়ে ৫টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। নিহত তিন জনের মধ্যে দুই জনের পরিচয় পাওয়া গেছে। যে দুই জনের পরিচয় পাওয়া গেছে তারা হচ্ছেন,আবদুল কাদের লিটন (৪৫) ও একে এম রুশদী (৫)। অপরজনের পরিচয় পাওয়া যায়নি। আগুনে পুড়ে নিহত তিন জনের মধ্যে দুই জনের মৃতদেহ দেখে চেনার কোন উপায় নেই। অগ্নিকান্ডের সময়ে নিচতলার গ্যারেজে পাঁচটি প্রাইভেট কার ও দুইটি মোটরসাইকেল পুড়ে গেছে। নিহতদের মৃতদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে নেয়া হয়েছে। আহতদের ঢাকা মেডিক্যাল কলেজসহ বিভিন্ন চিকিৎসা কেন্দ্রে ভর্তি করা হয়েছে। আগুনের পর ভবনের নিচ তলায় কলাপসিবল গেট তালাবন্ধ করে রাখা হয়। ভোরে অগ্নিকা-ের ঘটনার পর থেকে দিন ভর কৌতূহলী শত শত নারী-পুরুষ আগুনে পোড়া ভবনের সামনে ভিড় করে।

দমকল বাহিনীর ডিউটি অফিসার মোঃ বাবুল মিয়া জানান, রাজধানীর ৪৫/এ নিউ ইস্কাটন মগবাজার দিলু রোডে পাঁচতলা ওই ভবনে ভোর সাড়ে ৪টার দিকে আগুনের সূত্রপাত হয়। নিচতলায় আগুন লাগে। নয়টি ইউনিট গিয়ে সাড়ে ৫টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। সেখান থেকে তিন জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে একজন পুরুষ, একজন নারী ও একটি শিশু। মরদেহগুলো ঢামেক মর্গে পাঠানো হয়েছে। তাদের পরিচয় জানা যায়নি। অগ্নিকান্ডের কারণ জানা যায়নি। এই বিষয়ে তদন্ত চলছে। তাদের ধারণা, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে অগ্নিকান্ডের সূত্রপাত ঘটে থাকতে পারে।

দমকল বাহিনীর কর্মকর্তা এরশাদ হোসাইন বলেন, বৃহস্পতিবার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে দিলু রোডের একটি পাঁচতলা ভবনের গ্যারেজে আগুনের সূচনা হয়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের নয়টি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আধা ঘণ্টার চেষ্টায় ভোর ৫টা ৬ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। আগুন নেভানোর পর উদ্ধারকর্মীরা ওই ভবন থেকে এক শিশুসহ তিনজনের মৃতদেহ উদ্ধার করেন। একজন পুরুষের মৃতদেহ পাওয়া যায় গ্যারেজে। নিচতলায় যার মৃতদেহ পাওয়া গেছে, তার নাম আব্দুল কাদের লিটন, বয়স ৪০ বছর।

দমকল বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ কক্ষে কর্মকর্তা রাসেল সিকদার বলেন, ভোর সাড়ে ৪টায় আগুনের খবর পেয়ে নয়টি ইউনিট গিয়ে এক ঘণ্টা চেষ্টার পর আগুন নিভিয়ে ফেলে। এরপর নিচতলার পার্কিং এলাকার এক ছোট কক্ষ থেকে একজন পুরুষের লাশ উদ্ধার করা হয়। এছাড়া দোতলা থেকে দুজনের লাশ উদ্ধার হয়। পার্কিং জোনে রাখা পাঁচটি গাড়ি পুড়ে যায়। ধারণা করা হচ্ছে, শর্ট সার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। তবে অগ্নিকা-ের কারণ এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বিষয়টি তদন্ত সাপেক্ষে বলা যাবে।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের একজন কর্মকর্তা জানান, রাজধানীর মগবাজারে দিলু রোডে একটি পাঁচতলা বাড়ির গ্যারেজে অগ্নিকান্ডের ঘটনায় তিনজন দগ্ধ হয়ে নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আরও চারজনকে দগ্ধ অবস্থায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। তারা বর্তমানে সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। বৃহস্পতিবার ভোর সাড়ে ৪টায় দিলু রোডের ৪৫/এ নম্বর বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে। নিহতদের মধ্যে এক পুরুষ, এক নারী ও এক শিশু রয়েছে।

পাঁচ তলা ভবনের কেয়ারটেকার লুৎফর রহমান জানান, ‘নিচ তলায় গাড়ির গ্যারেজ থেকে আগুন লাগে। পাঁচটা প্রাইভেটকার, দুইটা মোটরসাইকেল পুড়ে গেছে। তিনজন মারা গেছে শুনেছি। শর্টসার্কিট থেকে আগুন লাগতে পারে বলে ধারণা করছি। নিচতলায় আগুন লাগার পর আমি বাইরে বের হয়ে সবাইকে চিৎকার করে বের হতে বলছি। হু হু করে আগুন নিচ থেকে ওপরে উঠে গেছে।

অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যাওয়া তিনজনের মধ্যে একজন আবদুল কাদের লিটন। তার বাড়ি লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার পশ্চিম নন্দনপুর গ্রামে, তার বাবার নাম মোহাম্মদ উল্লাহ (মৃত)। লিটন ওই ভবনের নিচতলায় অবস্থিত ‘ক্লাসিক ফ্যাশন’ নামে একটি বায়িং হাউসের অফিস সহকারী ছিলেন। তার স্ত্রী মরিয়ম বেগম দুই সন্তান রনি (২০) ও সোনিয়াকে (২২) নিয়ে গ্রামের বাড়িতে থাকেন। কাদের তার কর্মস্থলেই থাকতেন। মর্গে এসে স্বজনেরা তার পরিচয় শনাক্ত করেন।

নিহতের শ্যালক জহির আলম জানিয়েছেন, পাঁচতলা ভবনটির দোতলায় ‘ক্লাসিক ফ্যাশন ইন্টারন্যাশনাল’ নামে একটা বায়িং হাউসে চাকরি করতেন লিটন। নিচতলায় গ্যারেজের পাশে একটি কক্ষে তিনি থাকতেন।

অপর নিহত রুশদীর বাবার নাম শহিদুল পিরা মানি ও মা জান্নাতুল ফেরদৌসি। তাদের বাড়ি নরসিংদী জেলার শিবপুর উপজেলার ইটনা গ্রামে। শিশুটির লাশ শনাক্ত করেন তার দাদা এ কে এম শহিদুল্লাহ। অগ্নিকান্ডের সময়ে রুশদী’র বাবা মা উভয়ই দগ্ধ হয়ে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

অগ্নিদগ্ধ রনির বাবা একেএম শহিদুল্লাহ বলেছেন, তার ছেলে পুলিশ প্লাজায় ভিআইভিপি এস্টেট ম্যানেজমেন্ট নামে একটি কোম্পানির ফাইন্যান্স ম্যানেজার। আর পুত্রবধূ জান্নাত বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের অর্থ বিভাগে চাকরি করেন। রনিদের গ্রামের বাড়ি নরসিংদীর শিবপুরের ইটনায়। তার বাবা দৈনিক কালেরকণ্ঠের সিনিয়র প্রোডাকশন ম্যানেজার। বাসায় আগুন লেগে ছেলে-ছেলের বউয়ের দগ্ধ হওয়ার খবর পেয়ে তিনি হাসপাতালে ছুটে আসেন।

জান্নাতুল ফেরদৌসের ভাই শাহাদাত হোসেন বিপ্লব বলেন, বাচ্চাটার শরীর এতটাই পুড়ে গেছে যে চেহারা বোঝা যাচ্ছে না। কিন্তু আমার ভাগ্নেকেও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

জান্নাতের ভাই বিপ্লব বলেন, আমি আহত অন্য একজনের সঙ্গে কথা বলতে পেরেছি। উনি বলেছেন, আগুন লাগার পর রনিরা তিনতলা থেকে বের হওয়ার সময় রুশদী ওদের হাত থেকে ছিটকে পড়ে গেছে। একটি শিশুসহ দুজনের মৃতদেহ ছিল তিনতলার সিঁড়িতে। শিশুটি ওই ভবনের তৃতীয় তলার বাসিন্দা শহিদুল কিরমানী রনি ও জান্নাতুল ফেরদৌস দম্পতির সন্তান। ৩৯ বছর বয়সী রনি এবং ৩৪ বছর বয়সী জান্নাতও এ ঘটনায় দগ্ধ হয়েছেন। তাদের ভর্তি করা হয়েছে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে।

ঢাকা মেডিক্যাল চিকিৎসকরা জানান, রনির শরীরের ৪৩ শতাংশ এবং জান্নাতের ৯৫ শতাংশ আগুনে পুড়ে গেছে। ধোঁয়ায় অসুস্থ হয়ে পড়া সুমাইয়া আক্তার (৩০), মাহাদি (৯) ও মাহমুদুল হাসান (৯ মাস) নামে তিনজনকে ঢাকা মেডিক্যালের জরুরী বিভাগে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। তারা ওই ভবনের পঞ্চম তলার বাসিন্দা। তারা শঙ্কামুক্ত বলে জানা গেছে।

নিহত অপর জনের পরিচয় সম্পর্কে ওই ভবনের ছাদের ঘরে বসবাসকারী একটি পরিবার দাবি করছে, এই লাশ তাদের মেয়ে ভিকারুন নিসা নূন স্কুল এ্যান্ড কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী আফরিন জান্নাত জুঁথির (১৭)। তার বাবা জাহাঙ্গীর আলম (৪২) পূর্ত ভবনের প্রশাসনিক সেকশনে চাকরি করেন। মা লাল বানু (৩৫) গৃহিণী, ভাই আশিক আপন (২৪) মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। চারজনের এই পরিবারটি ওই ভবনের ছাদের একটি রুমে থাকেন।

নিহত মেয়েটির চাচা মোঃ সুরুজ্জামান বলেছেন, আগুন লেগেছে সে আতঙ্কে দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছিল জুঁথি। আর ওপর থেকে বাবা, ভাই গ্রিল বেয়ে বাইরে দিয়ে নামেন। তারা দুজনেই সামান্য আহত হন। মাও নামার সময় পড়ে গিয়ে গুরুতর আহত হন। তার পা ও কোমরের হাড় ভেঙ্গে যায়। তিনি পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। আমরা ধারণা করছি, পোড়া এই মেয়েটি আমাদেরই মেয়ে।

বাবা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আমরা ছাদ থেকে পাশের ভবনে লাফিয়ে পড়ি। আমাদের আগেই মেয়েটি সিঁড়ি দিয়ে নিচের দিকে চলে গেছে। এটা আমারই মেয়ে।

হাতিরঝিল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) খন্দকার সেলিম শাহরিয়ার জীবন স্টালিন বলেন, মৃত তিনজনের মধ্যে শিশুসহ দুই জন পুরোপুরি পুড়ে গেছে, যা দেখে শনাক্ত করার মতো না। তাই পোড়া দুজনেরই ডিএনএ প্রোফাইলিংয়ের জন্য নমুনা সংগ্রহ করতে ফরেনসিক বিভাগকে বলা হয়েছে। একজনের শরীর পোড়েনি। সম্ভবত ধোঁয়ায় শ্বাস বন্ধ হয়ে তিনি মারা গেছেন। তার নাম আবদুল কাদের।

বাড়ির কেয়ারটেকার লুৎফর রহমান জানান, নিচতলায় গাড়ির গ্যারেজ থেকে আগুন লাগে। তিনজন মারা গেছে। শর্টসার্কিট থেকে আগুন লাগতে পারে বলে ধারণা করছি। পাঁচতলা ভবনটিতে অগ্নিকা-ের সময়ে ভবনের সবাই গভীর ঘুমে ছিল। নিচতলায় আগুন লাগার পর আমি বাইরে বের হয়ে সবাইকে চিৎকার করে বের হতে বলছি। নিচতলা থেকে ভবনের পাঁচতলায় হু হু করে আগুন নিচ থেকে ওপরে উঠে গেছে। অগ্নিকা-ের পোড়া ও ধোঁয়ায় কালো হয়ে যাওয়া ভবনের সামনে সারাদিনই ছিল অগণিত মানুষজনের ভিড়।

প্রকাশিত : ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২০

২৮/০২/২০২০ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



শীর্ষ সংবাদ: