ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১০ আশ্বিন ১৪২৯

অগ্নিগর্ভ লাতিন আমেরিকা

প্রকাশিত: ১২:২১, ২৯ মে ২০১৯

অগ্নিগর্ভ লাতিন আমেরিকা

লাতিন আমেরিকা একসময় যুক্তরাষ্ট্রের বাড়ির পেছনের উঠোন হিসেবে পরিচিত ছিল। লাতিন আমেরিকার বেশিরভাগ দেশে ছিল মার্কিন অনুগত সরকার। প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্র এসব দেশে সামরিক একনায়কদেরও বসিয়ে দিত। ১৯৮০ এর দশকে লাতিন আমেরিকা একনায়ক ও জান্তাদের ভূমি থেকে বিশ্বে গণতন্ত্রের তৃতীয় বিশাল অঞ্চলে পরিণত হয়। তখন থেকে গণতন্ত্র সেখানে শিকড় গাড়ে। লাতিন আমেরিকার বেশিরভাগ দেশের মানুষ আজ আগের যে কোন সময়ের চেয়ে অধিকতর অধিকার ও স্বাধীনতা ভোগ করে। তার পরও লাতিন আমেরিকার বহু মানুষ তাদের গণতন্ত্র নিয়ে সন্তুষ্ট নয়। এ অঞ্চলের অর্থনীতি স্থবির। দারিদ্র্য অনেক বেশি ব্যাপক। তেমনি বিরাজ করছে চরম অর্থনৈতিক অসাম্য। সরকারগুলো ক্রমবর্ধমান হিংসাত্মক অপরাধের মুখে নাগরিকদের নিরাপত্তা যোগাতে পারে না। দুর্নীতির বিস্তার ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। গণমানুষের অসন্তোষ সামাজিক মাধ্যমগুলোতে অহরহই ফুটে উঠেছে। এ অবস্থায় অনেক দেশের নেতৃবৃন্দের মধ্যে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস করার অসুস্থ প্রবণতা পেয়ে বসেছে। লাতিন আমেরিকার এই পতন ও অবক্ষয় সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান ভেনিজুয়েলা ও নিকারাগুয়ায়। দেশ দুটি একনায়কত্বের দিকে ধাবিত হচ্ছে। এই দুটি দেশের শাসকগোষ্ঠীর পেছনে দাঁড়িয়ে আছে কিউবার কমিউনিস্ট শাসকরা। তাদের সংস্কারের উদ্যোগ ভেস্তে গেছে। তবে এই তিনটি দেশ ছাড়াও মহাদেশজুড়ে গণতন্ত্রের প্রতি হুমকি ক্রমাগত বাড়ছে। লাতিন আমেরিকার অনেক ভোটার মধ্যপন্থীদের পরিত্যাগ করে জনতুষ্টিবাদী বা পপুলিস্টদের পক্ষে ভোট দিচ্ছে। ওইভাবেই ক্ষমতায় এসেছেন ব্রাজিলের জায়ের বোলসোনারো ও মেক্সিকোর আঁন্দ্রে ম্যানুয়েল লোপেজ ওব্রাভর। গণতন্ত্রের মূলকথা হলো ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও বিরোধী মতের প্রতি সহনশীলতা। এই দুই নেতাই এই দুই বিষয়ের প্রতি দোদুল্যমানতার পরিচয় দিচ্ছেন। বোলসোনারো সামরিক শাসনের প্রতি দুর্বলতা ও স্মৃতিকাতরায় ভোগেন। তার ২২ সদস্যের মন্ত্রিসভায় ৮ জন জেনারেল আছেন। ও ওব্রাভর ক্ষমতায় প্রতিযোগী কেন্দ্রগুলোকে যেমন নির্বাচিত রাজ্যের গবর্নরদের দুর্বল করে ফেলছেন। মধ্য আমেরিকার দেশগুলোতে দুর্বল ও দুর্নীতিবাজ সরকারগুলোর প্রাধান্য। যেমন হন্ডুরাসে রক্ষণশীল প্রেসিডেন্ট ও মার্কিন মিত্র জুয়ান অল্যান্ডের হার্নান্দেজ জালিয়াতির নির্বাচনের বদৌলতে এখন ক্ষমতায় আছেন। গুয়েতেমালায় দুই পূর্ববর্তী প্রেসিডেন্টকে দুর্নীতির কথিত অভিযোগে জেল দেয়া হয়েছে। জাতিসংঘের একটি সংস্থা বিষয়টির তদন্ত করছিল। মাঝপথে সে দেশের প্রেসিডেন্ট সংস্থাটিকে দেশ থেকে বের করে দিয়েছেন। আগামী অক্টোবরে আর্জেটিনায় নির্বাচনে আরেকজন পপুলিস্টের ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা আছে। তিনি ক্রিশ্চিনা কার্চনার লাতিন আমেরিকার মানুষ এই পপুলিস্টদের ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করছেন এই জন্য নয় যে তারা গণতন্ত্রের জায়গায় একনায়কত্ব কায়েম করে বসবেন। বরং ভোটাররা আশা করেছেন যে এই রাজনীতিবিদরা আগের সরকারগুলোর তুলনায় ভাল করবেন। কিন্তু কথা হচ্ছে একবিংশ শতাব্দীতে গণতন্ত্র ধ্বংস করার জন্য রাস্তায় ট্যাঙ্ক নামানোর প্রয়োজন হয় না। বরং পপুলিস্ট হিসেবে নির্বাচিত স্বৈরাচারীরা আদালতকে বশে নিয়ে আসে, মিডিয়াকে ভয়ভীতি দেখিয়ে নতজানু করে এবং জবাবদিহিতার জন্য সোচ্চার কণ্ঠে সুশীল সমাজের একাংশকে দুর্বল করে ফেলে। জনগণ যখন প্রতিবাদী হতে শুরু করে তখন বড্ড বেশি দেরি হয়ে গেছে। হুগো শ্যাভেজের অধীনে ভেনিজুয়েলায় যা ঘটেছিল তা আজ তুরস্কে ঘটছে। লাতিন আমেরিকার জনগণ আজ বিক্ষুব্ধ। এর সঙ্গত কারণও আছে। দুর্নীতি এ সরকার পরিচালনায় অযোগ্যতার কারণে সেখানে অপরাধ, দুর্নীতি, জনসেবা সংস্থার চরম শোচনীয় অবস্থা ও অর্থনৈতিক স্থবিরতার এক বিষচক্র গড়ে উঠেছে। বিশ্ব জনসংখ্যার মাত্র ৮ শতাংশের বাস লাতিন আমেরিকায়। বিশ্বব্যাপী খুন খারাবির যত ঘটনা ঘটে তার এক-তৃতীয়াংশই লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে হয়। চলমান ডেস্ক সূত্র : দি ইকোনমিস্ট