ঢাকা, বাংলাদেশ   মঙ্গলবার ০৪ অক্টোবর ২০২২, ১৯ আশ্বিন ১৪২৯

সন্তাপে প্রাণ যায় যে পুড়ে...

প্রকাশিত: ১১:০৭, ২৪ এপ্রিল ২০১৯

সন্তাপে প্রাণ যায় যে পুড়ে...

মোরসালিন মিজান ॥ হঠাৎই গরমাগরম অবস্থা। উত্তপ্ত প্রকৃতি। গ্রীষ্ম যে এসেছে, বোঝা যায়। এখন সকাল থেকেই রেগে মেগে অস্থির সূর্য। ঘর থেকে বের হতে রীতিমতো ভয় হয়। ঘরে থেকে বিরাট শান্তি, না, এমনও নয়। মাথার ওপর ঘুরতে থাকা ফ্যান গরম বাতাস দিচ্ছে। এভাবে ঘরে এবং বাইরে অস্বস্তি। হাঁসফাঁস। দেখে কবিগুরুর সেই বর্ণনার কথা মনে পড়ে যায়, যেখানে তিনি লিখেছেন, ‘দারুণ অগ্নিবাণে রে হৃদয় তৃষায় হানে রে।/রজনী নিদ্রাহীন, দীর্ঘ দগ্ধ দিন/ আরাম নাহি যে জানে রে...। আরাম কেড়ে নিয়েছে গ্রীষ্মের দাবদাহ। বৈশাখ এবং জ্যৈষ্ঠ দুই মাস গ্রীষ্মকাল। গত কয়েকদিন আগে নতুন এই ঋতুর শুরু হলো। সময়টা খরার। বেশ শুষ্ক হয়। তা-ই চলছে এখন। আবহাওয়া অফিস জানাচ্ছে, মঙ্গলবার দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল রাঙ্গামাটিতে, ৩৭.২ ডিগ্রী সেলসিয়াস। ঢাকায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৫.২ ডিগ্রী। ভোগান্তিটা তাই বেড়ে চলেছে। সকাল থেকেই মাথার ওপর ঝুঁকে পড়ছে সূর্য। একটু আগে স্থান করেও শরীর শীতল রাখা যাচ্ছে না। ঘামছে কেবল। দুপুরের দিকে তো লু হাওয়া বইছে। চোখ তুলে তাকানো যায় না। রোদে কিছু সময় দাঁড়ালে গা জ্বলতে থাকে। মেয়েরা অনেকে ছাতা নিয়ে ঘর থেকে বের হচ্ছেন। ছেলেরা জলের ঝাপটা দিচ্ছেন চোখে মুখে। খুব প্রয়োজন না হলে অফিস ছেড়ে কেউ বাইরে আসতে চাইছেন না। বৈশাখের এমন গরমে অল্পতেই ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন নগরবাসী। সামান্য ছায়া পাওয়া গেলে সেখানে দাঁড়িয়ে বিশ্রাম নিচ্ছেন। কিছুক্ষণ পর আবার ছুটছেন গন্তব্যে। ঘন ঘন পানি পান করছেন। ভেতরটা জুড়াতে পান করছেন নানা রকমের শরবত। ফলের জুস। ঢাকার প্রায় সব মার্কেটের সামনে ফুটপাথে এখন লেবুর শরবত তৈরি হচ্ছে। বরফ কল থেকে বরফ কিনে এনে কুচি কুচি করে গ্লাস ভর্তি করছে দোকানিরা। তা-ই চুমুক দিয়ে শান্ত হওয়ার চেষ্টা করছেন পথচারীরা। কাঁচা আম, পেঁপে, আনারস পাওয়া যাচ্ছে। নুন মরিচগুঁড়ো কাসুন্দি দিয়ে মেখে দেয়া হচ্ছে মৌসুমি ফল। শহরের অলিতে গলিতে ফেরি করে বিক্রি হচ্ছে তরমুজ। ফালি ফালি করে বিক্রি হচ্ছে। বিভিন্ন ফাস্টফুডের দোকান ঘুরে দেখা যায়, জুস করে শেষ করতে পারছে না কর্মচারীরা। দৃশ্য দেখে মনে পড়ে যায় কবিগুরুর সেই চরণÑ ‘চক্ষে আমার তৃষ্ণা ওগো, তৃষ্ণা আমার বক্ষ জুড়ে।/ আমি বৃষ্টিবিহীন বৈশাখী দিন, সন্তাপে প্রাণ যায় যে পুড়ে...।’ অবশ্য গরমে বেশি বিপাকে পড়েছে ঢাকার হতদরিদ্র মানুষ। ছিন্নমূল ছেলে মেয়েরা আশপাশের ডোবা নালায় ঝাঁপিয়ে পড়ছে। মঙ্গলবার হাতির ঝিলের পাশ দিয়ে আসার সময় দেখা গেল, দল বেঁধে সাঁতরাচ্ছে একদল দুরন্ত কিশোর। গায়ে সুতোটি পর্যন্ত নেই। জামা কাপড় পাড়ে রেখে নেমে পড়েছে। একে অন্যের দিকে পানি ছিটাতে ব্যস্ত তারা। এরই এক ফাঁকে কথা হচ্ছিল মোঃ আমিনুলের সঙ্গে। সে বলছিল, ‘গরম পড়ছে। দিনে দুই থাইকা তিনবার গোসল করি। বাপে নাই। মায়ে এইসব জানে না।’ আর জানলেও বারণ করে না বলে জানায় সে। খেটে খাওয়া মানুষের অবস্থাও করুণ। রোদে চামড়া পুড়ে কেমন তামাটে রং ধারণ করছে। রোদের মধ্যে নির্মাণাধীন ভবনে কাজ করছেন শ্রমিকরা। কারও মাথায় ইটের বোঝা। কেউ বিভিন্ন মালামাল ভর্তি ভ্যান ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে। কাওরান বাজারের কথা হচ্ছিল ভ্যানচালক মুসলেমের সঙ্গে। গরমের কথা তুলতেই বললেন, ‘গরমের সময় গরম পড়বেই। এখন অভ্যাস হয়ে গেছে।’ আরও কিছু সময় কথা বলে বোঝা যায়, তিনি নিয়তি মেনে নিয়েছেন আসলে। কিন্তু সবাই মেনে নিতে পারবেন না। পারার প্রশ্নও আসে না। তবু গ্রীষ্ম গ্রীষ্মের চরিত্র নিয়েই বহাল থাকবে। আবহাওয়া অফিস বলছে, বৃষ্টি হলে গরম কিছুটা কমে আসবে। কিন্তু বৃষ্টি হবে কি? এমন প্রশ্নে তারা বলছেন, হতেও পারে। অর্থাৎ গরমটাই সত্য। এই সত্য মেনে দুই মাস কাটাতে হবে বাঙালীকে।