ঢাকা, বাংলাদেশ   মঙ্গলবার ০৪ অক্টোবর ২০২২, ১৯ আশ্বিন ১৪২৯

জ্ঞানেশ মণ্ডল

গল্প ॥ একটি ফুলের জন্য

প্রকাশিত: ০৮:০৪, ২৫ মে ২০১৮

গল্প ॥ একটি ফুলের জন্য

তীব্র ঝংকারে বাঁশি বেজে ওঠে ‘লাইনে দাঁড়াও লাইনে দাঁড়াও’ হাবিলদার খান বাহাদুর চিৎকার করে যায়। মেয়েগুলোকে জড়ো করে একবার শেষ গোনাগুন্তির পরে দেখে বিশটির কাফেলা এখনও অটুট রয়েছে। মাঝ রাত থেকে মেয়েগুলো সেই একইভাবে বসে। রাতের অন্ধকারে পালিয়ে যেতে চাইলে সহজেই যেতে পারত। কেউ কোন ধরাবাঁধা ছিল না। কিন্তু ওরা কেউ পালাতে সাহস করেনি। কিংবা ইচ্ছা করে পালাতে চায়নি, সেটি হাবিলদার খান বাহাদুরের মাথা ব্যথার কারন। তখনও নিয়ম রক্ষার পাহারা ছিল। অবশ্য এখন সে পাহারার সচল দৃষ্টি। কেউ কেটে পড়লে এখন হাবিলদার বাহাদুরের জবাব দিহি করতে হবে। ভোরের আলো সবে মাত্র আইল্যান্ডের ওপর দাঁড়িয়ে। রোদ মিঠা যায়গা টুকুর উজ্জ্বল উপস্থিতি খুবই দৃশ্যমান। খড়তপ্ত গ্রীস্মের রোদ্দুর বলে কথা, দেখতে দেখতে চড় চড় করে বেড়ে ওঠে আইল্যান্ডের ওপর। রাস্তার দুধারেই রোদের দৌরাত্ম্য। দুধারের লেনজুড়ে রোদ গড়াচ্ছে রাস্তার শেষ প্রান্তে। মেয়েগুলো আগের মতো এখন আর গুটি গুটিশুটি মেরে বসে নেই। ওদের মধ্যে ব্যতিক্রম শুধু একটি মেয়ে। সে খুবই সুন্দরী লাবণ্যময়ী। রাজ হংসীর মতো গ্রীবা বাঁকিয়ে শুধু নিশ্চুপ কেঁদে যাচ্ছে। ওর চোখের অশ্রু বিগলিত ধারায় বয়ে যাচ্ছে অবিরত। অবশ্য হাবিলদার খান বাহাদুর রাইফেল উঁচিয়ে ভোর থেকে একটানা পাহারা দিয়েই যাচ্ছে। চোখে তার সমবেদনার কালোছায়া। বয়সের কারণে বা অন্য কোন কারণে হোক ওদের জন্য বুকের নিভৃতে একটা অসম্ভব মমতা কাজ করছে। বিশেষ করে লাবণ্যময়ী মেয়েটির অপার বেদনায়। নিশ্চয় এ লাইনে মেয়েটি প্রথম। এক সময় তার নিজেরও একটি মেয়ে ছিল। দ্বাদশ বর্ষবয়সী। বেঁচে থাকলে সে এখন ওই মেয়েটির মতোই দেখতে সুন্দরী হতো। সে মেয়েটিকে বার বার প্রশ্ন করছে, কে তুমি? কোথায় তোমার বাড়ি? মেয়েটি নিরুত্তর থেকেছে। অবশেষে খান বাহাদুর জানতে চেয়েছে, কেউ কী তোমাকে জোর করে ধরে এনেছে? না, তুমি স্বইচ্ছায় এসেছ? নিশ্চুপ মেয়েটি। নিঃশব্দে শুধু কেঁদেই যাচ্ছিল। কান্নার দমকে বেতস লতার মতো নুইয়ে পড়ে তার তনুমন। একবার চাকরির সূত্র ধরে তার সঙ্গে নিষিদ্ধ পল্লীর একটি মেয়ের পরিচয় হয়। মেয়েটি যদি সত্যি বলে থাকে; তবে সে শিক্ষিত। অবশ্য তার আলাপ চারিতায় হাবিলদার খান বাহাদুর ভেবে নিয়েছিল। গ্রামের বাড়ি বৃদ্ধ বাবা-মা ছোট ভাই। চাকরি পাইয়ে দেবে বলে এক পরিচিত আত্মীয়ের কাছে প্রত্যাক্ষিত হয়ে এরপর সহজ লাইনটি যে কোনভাবে পেয়ে যায়। তারপর থেকে নিয়মিত বাবা-মায়ের কাছে টাকা পাঠাতে শুরু করে। বাবা-মা জানে তাদের মেয়েটি ঢাকা শহরে ভাল মাইনে সরকারী চাকরি করে। এ কথা সত্য যে, ওরা কেউ ইচ্ছা করে এ নরক ঘাটতে আসে না কখনও। এসব আগেও দেখেছে খান বাহাদুর। কেউ পেটের যন্ত্রণায় কেউ বা কারও প্ররোচনায় বাধ্য হয়ে নোংরা ঘাটতে আসা। সে লক্ষ্য করে, মেয়েগুলো দেখতে আগুন পেটানো লোহার পাতের মতো। ভাঙবে তবু মচকাবে না। ওরা দেখেছে বাড়িওয়ালির ভাড়াটে উকিল বাবুরা বেকসুর জামিন পাইয়ে দিয়ে আবার রাখনাওয়ালিদের হাতে পৌঁছে দিয়েছে। সেই রাতেই নতুন করে আবার সাপ্লাই হয়ে গিয়েছে রাজধানীর রেষ্ট হাউসগুলোতে। এ ধারকার মাল ওধার, এই ছোড়াছুড়ি ওদের জীবন। ইতোমধ্যে রাজপথ ব্যস্ত হয়ে ওঠে। রাস্তায় কর্মমুখী মানুষের প্রবল ¯্রােত। আবার এরমধ্যে অনেক কৌতূহলি পথচলা মানুষ, অর্ধ উলঙ্গ মেয়েদের জটলা দেখছে খানিক। কেউ কেউ উৎসুক দৃষ্টি হেনেই চলে যাচ্ছে চলার পথ ধরে। আয়েসি রোদ বিকিরণ করে ক্রমান্বে আরও প্রক্ষর উত্তাপ। এর মাঝে রমনা থানা থেকে পুলিশ ভ্যান এসে মেয়েগুলোকে থানার লকআপে একফাঁকে চালান করে যায়। দুপুরের দিকে দৈনিক গণমন পত্রিকার রিপোর্টার হাসান তার দু’জন সতীর্থ সঙ্গে নিয়ে উপস্থিত। এই বৃন্তচ্যুত মেয়েদের নিয়ে সে একটি ফিচার করবে বলে। কিন্তু দারোগা বাবুর কোন ইচ্ছাই নেই, ওদের কাছে ভিড়তে দিচ্ছে না। নাছোড় বান্দা সাংবাদিকরা মেয়েগুলোর সাক্ষাৎ না নিয়ে যাবে না কখনও। এই নিয়ে ধনুক ভাঙ্গা পণ। অনেক দর কষাকষি দেন দরবার। অবশেষে সাংবাদিকদেরই জয় হয়। ওসমান দারোগা পনেরো মিনিটের রফা করে ছিলেন তাদের সঙ্গে। তাতেই সব তালগোল পাঁকিয়ে যায়। সেই আনকোড়া লাবণ্যময়ী মেয়েটির দাম উঠেছিল পঞ্চাশ হাজার টাকা। রাখনাওয়ালিদের দালালের দেয়া লোভনীয় টোপ ইতোমধ্যেই ওসমান দারোগা গিলে ফেলেছেন। কিন্তু সময় মতো ডেলিভারি দিতে না পারায় খুবই বিব্রত ওসমান দারোগা। কারন সাংবাদিক দলটি এ সময় না পৌঁছলেই সব হাপিস হয়ে যেত। তারা পনেরো মিনিটের জায়গায় প্রায় একঘণ্টা কাবার করে; নানা প্রশ্নবানে মেয়েগুলোকে আক্রান্ত করে ছিল। এতে করে ওদের নানা রকম তথ্য বেরিয়ে আসে। এরা মানব সভ্যতার সবচেয়ে নিকৃষ্টতম পেশাজীবী। ওদের শ্রমের তিনের দু’অংশ যায় দালাল বাটপার ও রাখনাওয়ালিদের হাতে, বাকি একাংশ দিয়ে কোনভাবে কায়ক্লেশে বেঁচে থাকে। কেউ আবার নিজ পারিশ্রম হাতে তুলতেও পারে না। এই সব বৃন্তচ্যুত নিষিদ্ধ পল্লীবালার শেষ বয়সের আশ্রয় মানবেতর জীবনযাপন। বড়ই পীড়াদায়ক। ক্ষুণিœবৃত্তির জন্য রাস্তা ঘাটে হাতপাতা ব্যতীত কোন গত্যন্তর থাকে না। কেউ কেউ বলেছে, পিতৃ নাম গোত্রহীন তাদের ছেলে-মেয়ে বস্তির আস্তাকুড়ে জন্ম নিয়ে আগাছার মতো বেড়ে ওঠে। তাদের শিক্ষাদীক্ষা আহার বাসস্থানের কোন সুব্যবস্থা নেই। এভাবেই এক সময় এই ছেলে-মেয়েরা অন্ধকার জগতের ঘৃণ্য সরীসৃপের ন্যায় জীবন যাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। এর মাঝে সেই বিগোত্রিও লাবণ্যময়ী মেয়েটির জীবন বৃত্তান্ত একেবারে অন্যরকম। সে দেখতে সুন্দরী বলে বাবা-মা সখ করে নাম রেখেছে লাইজু। লাইজু এদের মতো জীবনাচারে অভ্যস্ত নয়। গত নিশিতে সবেমাত্র নাম উঠেছে। মুক্তিযুদ্ধে দেশের জন্য তার অবদান অনস্বীকার্য। নারীর পরম বস্তু সেই নারীত্ব যৌবনের প্রারম্ভে বিসর্জন দিয়ে একজন মুক্তিযোদ্ধার পুনর্জীবন দিয়েছিল। ভাগ্যক্রমে সে এখন নিশিকলি। প্রাইমারি স্কুল শিক্ষক মফেজ মিয়ার মেয়ে লাইজু। তিনি সাধারণ শিক্ষক বটে তবু দেশের জন্য তার ছিল অপার ভালবাসা। দুর্যোগ রাতের মর্মান্তিক ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে বার বার লাইজুর কণ্ঠ রুদ্র হয়ে এসেছে। দু’চোখে তার তপ্ত অশ্রু ধারা প্রবাহমান। মাদারীপুর অদূরে খাকদী বাসষ্ট্যান্ড মহাসড়কের কাছে ভয়ার্ত জনপদ। সন্ধ্যার পরেই চারদিক নিস্তব্ধ হয়ে আসে। রাতের আঁধার আতঙ্ক ছড়ায়। সেদিন সন্ধ্যা থেকে অঝর ধারায় বৃষ্টি ছিল, রাত বাড়ায় সঙ্গে সঙ্গে বৃষ্টির দমকে আরও হাওয়া ওঠে। এ সময় খুব কাছের থেকে একসঙ্গে অনেক সময় গোলগুলোর শব্দ বাপ-বেটিকে বাকরুদ্ধ করে দেয়। তারা দুরু দুরু বক্ষে মাহেন্দ্রক্ষণের প্রতিক্ষায় জেগে থাকেন ব্যাকুল হয়ে। তখনি দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ তাদের আরও ভিতুসন্ত্রস্ত করে তোলে। আবার কে এল এই দুর্যোগে। সঙ্গে সঙ্গে চাপা কণ্ঠের আর্তনাদ, ‘দয়া করে দরজা খুলুন, আমি একজন আহত মুক্তিযোদ্ধা। শত্রু সৈন্যরা আমাকে ধাওয়া করছে।’ এর আগে কখনও মফেজ মাস্টার মুক্তিযোদ্ধা দেখেননি। অনেক বীরত্বের গল্প শুনেছে তাদের। এবার সামনে সেই বীরযোদ্ধা, দরজা খোলা মাত্র দৃশ্যমান হবে তার চোখের সামনে উজ্জ্বল ধ্রুব তারার মতো। এ প্রাপ্তি চোখে দেখা মানে অনাদি কালের সাক্ষী হয়ে থাকা। এ প্রাপ্তি হারাতে চাননি মফেজ মাস্টার। শোনা মাত্র সটান উঠে দাঁড়ান। চৌচালা টিনসেট ঘর। ঘরবারান্দা সমেত দুটো কামড়া। মাঝখানে পার্টিশন। মফেজ মাস্টার মেয়ের মুখ পানে তাকালেন। হেরিকেনের নিভু নিভু আলোয় লাইজুর মুখখানা আঁধার মাখা, যেন কতকালের মায়ার আঁধার জুড়ে আছে। তিনি বললেন, ‘ভয়পাস না মা, দেখনা কত করে মিনতি করছে। বড় বিপদ মুক্তিযোদ্ধার, আসুক ঘরে, তুই ভেতরে যা আমি দেখছি। লাইজু নিশ্চুপ, তার চোখেও হাজার জিজ্ঞাসা, কে এলো এই দুর্যোগে? একটু হাত না বাড়ালে হয়ত বাঁচবে না মুক্তিযোদ্ধা। মফেজ মাস্টার দরজা খুলে দিলেই সে আর্তনাদ করে ওঠে। তার বাম হাতের বাহুতে জখম গড়িয়ে রক্ত ঝরছে। তখন হাতের কাছে চটজলদি কোন কিছু না পেয়ে লাইজু নিজের পরিহিত কাপড়ের আঁচল ছিড়ে শক্ত করে ক্ষতটা বেঁধে দিলে রক্ত থেমে যায়। সে জানায় সম্মুখ যুদ্ধে তার সহযোদ্ধারা হারিয়ে গেছে, জানিয়ে সঙ্গে সঙ্গে সে বৃষ্টির মধ্যে উল্কার মতো ছুটে বেরিয়ে যায়। নারী হৃদয় ব্যাকুল হয়ে ওঠে। এ পর্যন্ত এসে থেমে যায় লাইজু। তার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসে। ভাষাহীনের মতো যেন মুখ থুবড়ে পড়ে লাইজু। যেন কত কালের অসহায় প্রাণী। আর শুনতে হয় না হাসানকে। সে বুঝে যায়, এরপরই সেই পৈচাশিক নারকীয় ঘটনা; হায়নার দল ঘরে ঢুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে লাইজুর ওপর। হাসান লাইজুর দিকে তাকাতে পারে না। ¤্রয়িমাণ হয়ে পড়ে হাসান। তার হৃদয়টা বেদনার্ত। কিছুক্ষণ স্থানুর মতো দাঁড়িয়ে থেকে সদলে লকআপের কাছ থেকে সরে এসে থানা সুপারের কক্ষে প্রবেশ করে। দারোগা ওসমান নির্মগ্ন ক্রাইম ফাইল ঘাটছিলেন। ফাইলের ভেতর ডুবে থেকে বললেন, ‘ভারী ব্যস্ত আছি পরে আসুন।’ ‘আমরা বেশি সময় নেব না। দুমিনিট কথা বলেই চলে যাব’ বলল হাসান। ‘মেয়েগুলোকে যেভাবে শাসালেন, এখন দুমিনিট বলছেন। শুরু করলে ঘণ্টাও পেরিয়ে যাবে’। খুবই রুষ্ট কণ্ঠে বললেন ওসমান সাহেব। ‘আপনাকে যে বিষয়টি জানাবো, ওই বিশটি মেয়ের মধ্যে একটি মেয়ে একেবারে নিষ্পাপ। সে মুক্তিযুদ্ধের ফুল।’ ওসমান দারোগা চমকে ওঠেন। বলে চলে সাংবাদিক হাসান, ‘সে এখনও পেশাজীবী হয়ে ওঠেনি। মুক্তিযুদ্ধে তার অপরিসীম অবদান। এ জন্য স্যার আপনাকে বিশেষভাবে অনুরোধ করছি। একজন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাকে বাঁচাতে গিয়ে ওই মফস্বলের মেয়েটি ঘাতক সেনাদের আগ্রাসী লালসার শিকার হয়। বাবা মেয়েটির পৈচাশিক পরিণতির শেষ দৃশ্য দেখে হার্ড এ্যাটাকে মারা যান। সেই ভয়াল রাতের নির্যাতনের মর্মান্তিক কাহিনী মেয়েটি আমাকে অকপটে বর্ণনা করেছে। এবং সে তার খালাতো ভাইয়ের দ্বারা প্রতারিত হয়ে এক রাখনাওয়ালির কাছে বিক্রি হয়ে যায়।’ ‘তাতো বুঝলাম’ এতক্ষণ পর বিমর্শ মুখে মাথা তোলেন দারোগা ওসমান। হাসানের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘এখন আমাকে কী করতে হবে?’ ‘আমরা লাইজুর ভবিষ্যত কথা ভেবে, ওকে নারী পুনর্বাসন কেন্দ্রে তুলে দিতে চাই।’ ‘লাইজু সত্যিাকারার্থে একজন পণ্যজীবী নারী শরীর বেচাবিক্রি ওর নেশা এবং পেশা। ‘না স্যার; আমি প্রথমেই বলেছি মেয়েটি সম্পূর্ণ নিষ্পাপ। সে একজন বীরনারী সবেমাত্র কালই রাজধানী পৌঁছেছে। এখনও সে দেহজীবী হয়ে ওঠেনি। যদি উঠত তবু আমি তাকে একইভাবে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আনার আপনাকে অনুরোধ জানাতাম। কারণ সেও একজন বীরযোদ্ধা। স্বাধীনতা যুদ্ধকালে সে তার প্রাণপ্রিয় বাবাকে হারিয়েছে, তার ইজ্জতের বিনিময়ে দেশ শত্রুমুক্ত হয়েছে। আজ দেশের প্রধানরা যে চেয়ারে বসে দ-মু-ের কর্তা সেজেছেন, লাইজুর মতো বীর নারীদের ত্যাগের বিনিময়ে তা সম্ভব হয়েছে। লাইজু হাতে অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ করেনি সত্যি তার থেকেও বড় কাজের প্রমাণ, সে ইজ্জত দিয়ে দেশ ও মাতৃকার স্বাধীনতা ত্বরান্বিত করেছে। অথচ সেই বীরনারী ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে দেহজীবী সেজেছে, নয়, কেউ তাকে সাজিয়েছে।’ ‘অনেক লম্বা বক্তৃতা ঝেরেছেন সাংবাদিক সাহেব, এবার আসল কথায় আসুন, আমি কী করতে পারি?’ ‘ক্রাইম ডাইরী থেকে লাইজুর নামটা আপনার ছেটে দিতে হবে।’ ‘হুকুম না আদেশ?’ ‘দুটোর কোনটাই নয় স্যার। শ্রেফ দায়বদ্ধতা। যাতে আমরা লাইজুকে সসম্মানে নারী মুক্তি পুনর্বাসন কেন্দ্রে তুলে দিতে পারি।’ ‘আপনি জানেন এ সরকারী অফিস। থানার একটা নিয়ম-কানুন আছে। আইন বাহক হয়ে কখনও আইন অমান্য করা যায় না।’ ‘কেন স্যার? যারা সম্মান বিকিয়ে দেশ মুক্ত করেছে তাদের পক্ষে একটু কথা বললেই আইন অমান্য হয়ে যাবে?’ ‘আমি এখন ব্যস্ত আছি আপনারা আসতে পারেন।’ ‘তর্কের কথা নয় স্যার, দেশ প্রেমের কথা।’ ‘এখানে ঢোকা খুব সহজ। বেরনো সহজ নয় মোটেও। এই কথাটা আপনার নিশ্চই জানা আছে। থানা ক্রাইম ডাইরিতে কারও নাম ওঠা মানে ব্লাক লিস্টে চলে যাওয়া।’ ‘তারমানে আপনি লাইজুকে জেলহাজতে পাঠাবেনই।’ ‘প্রথমেই বলেছি আইনের বাইরে কোন কাজ করতে পারব না। সকালে কোর্টে পাঠাব, যদি পারেন জামিন নিয়ে ফিরে আসবে।’ এবার হাত তুলে উঠে দাঁড়ালেন ওসমান দারোগা, ‘বললেন দুঃখিত, আর নয়। আপনারা আসুন এবার। আমার টেবিলে অনেক কাজ জমে আছে।’ অগত্যা সাংবাদিক হাসান নিরাশ হয়ে সদলবলে বেরিয়ে এলেও তা ছিল ক্ষণস্থায়ী। মনে ছিল তার অদমনীয় সততা। এমন একটা ন্যায় নিষ্ঠ কাজে সে কখনও ব্যর্থ হতে পারে না। দৃঢ় বিশ্বাস হাসানের। এই বিশ্বাসই তাকে আবার নতুন করে অনুপ্রেরণা জোগায় শুধু এই জন্য যে সাংবাদিক হাসানের অপরিমেয় শ্রদ্ধাবোধ লাইজুর প্রতি। তার বিশ্বাস, যে নারী নিজের কৌমর্য বিসর্জন দিয়ে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ একজন মুক্তিযোদ্ধাকে বাঁচাতে পেরেছে সে কখনও সাধারণ মেয়ে হতে পারে না। পৃথিবীর যে পঙ্কেই তার অবস্থান থাক না কেন, তাকে উদ্ধার করা প্রতিটি দেশপ্রেমী নাগরিকের পবিত্র দায়িত্ব। সকাল দশটায় আগেই হাসান কোর্ট চত্বরে পৌঁছে দেখে, জেল খানার জিপগাড়ি দাঁড়িয়ে। রমনা থানার কনেস্টবল গার্ড মেয়েগুলোকে এক জায়গায় জড় করে। হাসান অদূরে দাঁড়িয়ে বার বার গুনে দেখে সেই বিশটি মেয়ের কাফেলায় একটি অনুপস্থিত। উনিশটি মেয়ে এখন বর্তমান। এরপর আরও সন্দিগ্ধ দৃষ্টি মেলে দেখে সেই লাবণ্যময়ী মেয়েটি নিরুদ্দেশ। উনিশটির কাফেলা এখন। খুবই হতাশ হয়ে পড়ে হাসান। দারোগা ওসমানকে দেখে প্রথমেই তার সন্দেহ হয়েছিল। সে পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছে, লোকটির মুক্তিযুদ্ধের কর্মকা- মোটেও ভালছিল না। ঘাতক সেনাদলের পক্ষ নিয়ে অনেক নিরীহ মানুষের জান-মালের বিনষ্ট করেছে। সে যখন সাংবাদিক বন্ধুদের নিয়ে অফিস রুমে ঢোকে তখন সেখানে রাখনাওয়ালির দালাল দেখে তার সন্দেহ হয়েছিল। তারা সদলবলে ঢুকতেই লোকটা কেমন নিশ্চুপ বেরিয়ে যায়। মেয়েগুলোকে কোর্টের লকআপে নিয়ে গেলে হাসানের মাথায় নতুন করে ভাবনার জট খুলতে শুরু করে। কোর্ট চত্বর অদূরে এসডিপিওর সরকারী দফতর। এসডিপিও আকরাম সাহেব মুক্তিযোদ্ধা কোরের একজন তরুণ অফিসার। হাসানের সঙ্গে খুব ভাল জানাশোনা না থাকলেও পরিচয় আছে। সে কী ভেবে অফিসের ফটক পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতে গেলে দারোয়ান সামনে এসে দাঁড়ায়। পকেট থেকে আইডি কার্ড তুলে ধরলে সে ফটক ছেড়ে সরে যায়। অনুমতি চেয়ে ভেতরে ঢোকে হাসান। রিভলভিং চেয়ারে বসে আছেন এসডিপিও আকরাম। সামনে বিশাল সেক্রেটারিয়েট টেবিল। তাঁর সামনে একটি দর্শনার্থীর চেয়ারে বসে পড়ে বলল, ‘আমি দৈনিক গণমন পত্রিকার সাংবাদিক। এই মুহূর্তে আপনার সাহায্য আমার একান্ত প্রয়োজন।’ এরপর বীরঙ্গনা লাইজুর জীবন বৃত্তান্ত খুলে ধরলে সঙ্গে সঙ্গে কী ভেবে এসডিপিও আকরাম উঠে দাঁড়ালেন। হাসানকে সঙ্গে নিয়ে জিপে উঠে নিজেই ড্রাইভিং আসনে বসে এক্সিলেটরে পা রাখলেন। রমনা থানা চত্বরে গাড়ি দাঁড় করে দিপ্তপদভারে আকরাম চত্বর অতিক্রম মাত্র দারোগা ওসমান, থানা বক্সি, হাবিলদার সবাই চারদিকে ছোটাছুটি শুরু করে। তিনি পেছনে তাকালেন না। সোজা মহিলা লকআপের সামনে দাঁড়িয়ে গার্ডকে লকআপের তালা খোলার নির্দেশ দেন। ভেতরে অন্তরিণ কক্ষের একটেরে জড়সড়ো অবস্থায় তেইশ চব্বিশ বছরের একটি মেয়ে সংজ্ঞাহীন পড়ে আছে। সে একেবারে নিষ্পন্দ হলেও তার অবয়ব জুড়ে এখনও আভিজাত্যের ছাপ স্পষ্ট। তার শরীর জুড়ে অসম্ভব ক্লান্তি বিরাজমান। মনে হয় এ ক’দিন তার ওপর দিয়ে অসম্ভব ঝড় বয়ে গেছে। কপালে হাত রেখে তিনি দেখেন সারা শরীর জ্বরে পোড়া। তিনি সক্ষোভে বললেন, ‘হাজতি লকআপে ক’দিন আছে? ‘জ্বি, স্যার তিন দিন হয় এখানে।’ ‘চালান দেননি যে?’ ‘মানে স্যার অসুস্থ কিনা।’ ‘পার্টির হাতে তুলে দিতে পারেননি, তাই না?, আকমানের ঠোঁটে বিদ্রুপের হাসি ঝিলিক মারে। ওসমান দারোগা এর পর আর কোন সদুত্তর খুঁজে না পেয়ে বিব্রত বোধ করেন। সঙ্গে সঙ্গে জানতে চান আকরাম, কেস হিস্ট্রি লিখেছেন তো? ‘জ্বি না স্যার, এখনও লেখা হয়নি?’ অসুস্থ কয়েদি হসপিটালে পাঠালে না?’ আবার বলছেন ডায়েরি লেখেননি, তা করছেন কী থানায় বসে?’ ওসমান দারোগা খেই হারিয়ে একেবারে নাস্তানাবুদ। আকরামের কণ্ঠস্বর তখন সপ্তমে চড়ে বসেছে।; ‘আপনার ফাইলপত্র সমেত সবাইকে নিয়ে অফিসে আসুন!’ এ্যাম্বুলেন্স ইতোমধ্যে থানা চত্বরে পৌঁছেছে। ওয়ার্ড বয় লাইজুকে এ্যাম্বুলেন্সে তুললে হাসপাতালের উদ্দেশে গাড়ি বেরিয়ে যায়। অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে ডাঃ এস কে রয় রিপোর্ট করেন। লাইজুর শরীরে গুটি বসন্তের উৎভাব দেখা দিয়েছে। বেড রেস্ট নিতে হবে কিছুদিন। আকরাম শত ব্যস্ততার মধ্যেও সকাল বিকেল দু’বেলা নিয়মিত লাইজুকে দেখতে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা শয্যাপাশে বসে যান। সাংবাদিক হাসানও আসে তার সতীর্থদের সঙ্গে নিয়ে। সেও দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত করে খোঁজখবর নিয়ে যায়। যতরকম উন্নত চিকিৎসা হয় ডাঃ রয়কে দিয়ে আকরাম করেছেন। লাইজু এখন সেরে উঠেছে। আজ হাসপাতালের শেষ দিন। শরীর ক্রমশ সুস্থ হয়ে উঠছে লাইজুর। বিকেলে আকরাম আসেন। হাতে একগুচ্ছ ফুলের তোড়া। লাইজুর হাতে তুলে দিয়ে বললেন, ‘এখন ভাল আছেন?’ ফিরে তাকায় লাইজু, ‘হ্যাঁ, ভাল এখন। আর ভাল না থাকার কী কারন আছে বলুন?, একী প্রতিদান?’ বিছানায় উঠে বসে লাইজু। আকরামের মুখপানে তাকায়। ‘না, ওসব কিছু নয়।’ ‘তবে?’ ‘আপনি শফিকের কথা ভাবছেন তো? আমি শফিক নই। আমি আকরাম, শফিকের সহযোদ্ধা।’ ‘শফিক কোথায়?’ ‘আপনি জানতে চান শফিক কোথায়?’ আকরাম হাত তুলে ওপরে দেখালেন, ‘ওই মহাশূন্যে হারিয়ে গেছে শফিক।’ ‘আপনি যদি শফিক না হোন তবে এতকিছু করছেন কেন আমার জন্য?’ ‘শ্রেফ দায়বদ্ধতা। শফিক এখন থাকলে সেও করত।’ সেই দুর্যোগ রাতের ভয়ার্ত কাহিনী আকরামকে আজও তাড়া করে ফিরছে। ’আমরা দশজন টিমে ছিলাম, চরমুগুরিয়া হাওলাদার পাটগুদাম, পুলিশ ফাঁড়ি ছত্রভঙ্গ করে ফিরছিলাম। সে সময় কোন বাধার সম্মুখীন হইনি। কিন্তু কে জানত ঝড় জলের রাতে ওরা মহাসড়কে এ্যাম্বুস করে আছে। হায়নাদের ফায়ারিং রেঞ্জের মধ্যে পড়ে আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই। শফিক এ সময় আহত হয়। এই ঘটনার অনেক পরে, এখন বুঝতে পারি আপনার আশ্রয় থেকে শফিক বেরুলে রাস্তায় ওর সঙ্গে আমার আবার দেখা হয়ে যায়। আমরা দু’জন তখন মহাসড়ক ধরে আমাদের নৌকা ঘাটের দিকে প্রাণপণে ছুটছি। গুলিবিদ্ধ শফিক ব্যথায় তখনো কাতরাচ্ছে। ক্লান্তির অবগাহে হুমরি খেয়ে রাজপথে লুটিয়ে পড়ছে বার বার। আমি বার বার তাড়া দিলেও শফিক সেভাবে ছুটতে পারছে না। এভাবেই এক সময় শফিক হায়না টহল গাড়ির সামনে পড়ে যায়। ওরা ধরে ক্যাম্পে নিয়ে গেলে, সেই রাতেই ফ্লাটঘাটে ঘাতক সেনার গুলিতে শফিক প্রাণ হারায়। আর আমি ভাগ্যক্রমে কোনভাবে নৌকা ঘাটে পৌঁছতে পেরেছিলাম বলে প্রাণে বেঁচে যাই।’ লাইজুর মনে আর কোন সংশয় থাকে না। সে ভাবত এমন একজন মানুষের জন্য নারীর যা কিছু অমূল্য সম্পদ নষ্ট করে দিয়েছি। আজ দেশ স্বাধীন হয়েছে। হয়ত ভালই আছে সেই মানুষটি ও। অথচ আজ অবদি একবার জানতে এলো না আমি কেমন ছিলাম সেই রাতে, কী হয়েছিল আমার শেষ পরিনতি? এত অকৃতজ্ঞ মানুষ ও হতে পারে কখনও? অথচ কী আশ্চার্য! সেই মানুষটি তো পৃথিবী থেকে হারিয়ে গেছে সে দিন, কী করে তাকে দেখতে আসবে? লাইজুর দুচোখ বেয়ে বৃন্তচুত্য ফোটা ফোটা তপ্ত অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। এসডিপিও আকরাম বার বার তাড়া দিচ্ছেন, ‘আসুন—- গাড়ি দাঁড়িয়ে।’ কিন্তু লাইজুর পায়ে কে যেন শিকল বেঁধে দিয়েছে। কিছুতে সে পা বাড়াতে পারছে না। তার দু’চোখ আবার সজল হয়ে আসে।