ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ০২ অক্টোবর ২০২২, ১৭ আশ্বিন ১৪২৯

মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ অবস্থা

নাগরিক সাংবাদিকদের হত্যা-গুম

প্রকাশিত: ০৩:৪৭, ২৮ নভেম্বর ২০১৭

নাগরিক সাংবাদিকদের হত্যা-গুম

রাখাইন রাজ্যে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্বিচার নৃশংসতার তথ্য সংগ্রহ করতে যাওয়া প্রতিবেদকরা নিখোঁজ রয়েছেন। তারা দেশটির সেনাবাহিনীর সুনির্দিষ্ট টার্গেটে পরিণত হয়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ২০১২ সাল থেকে রোহিঙ্গা তরুণরা স্বেচ্ছায় নিপীড়নের খবর সংগ্রহ করতেন। ছবি, ভিডিও ও অডিও ক্লিপ স্মার্টফোনের মাধ্যমে তারা দেশে বাইরে পাঠাতেন। খবর গার্ডিয়ান অনলাইনের। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা জানায়, মিয়ানমার সেনাবাহিনী এই নেটওয়ার্ক ধ্বংস করে দিতে বহু প্রতিবেদককে হত্যা ও অপহরণ করেছে। বাইরের জগতের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন রাখাইনে বর্তমানে কী ঘটছে, বর্তমানে তা নিয়ে তেমন তথ্য সংগ্রহ করা যাচ্ছে না। রোহিঙ্গা বিষয়ক অনলাইন নিউজ পোর্টাল দ্য স্টেটলেসের সম্পাদনা করেন ে মাহাম্মদ রফিক। তিনি নিজেও একজন শরণার্থী। মোহাম্মদ রফিক বলেন, নিজেদের ফোন ব্যবহার করে যারা সেনাবাহিনীর নির্যাতনের খবর সংগ্রহ করতেন, ধরপাকড় শুরু হওয়ার পর তাদের পঁচানব্বই শতাংশ এখন নিখোঁজ রয়েছেন। তিনি বলেন, মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী ও রাখাইন মিলিশিয়ারা এখনও রোহিঙ্গা নারীদের ধর্ষণ ও হত্যা করছে। তাদের বাড়িঘরে আগুনে পুড়িয়ে দিচ্ছে। কিন্তু মোবাইল-নির্ভর প্রতিবেদকদের নেটওয়ার্ক অকার্যকর করে দেয়ায় সহিংসতার বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ গণমাধ্যমে বিশ্বাসযোগ্য প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হলে সে সব তথ্য অপরিহার্য ছিল। মোহাম্মদ রফিক আরও বলেন, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সংস্থা ওই সব মোবাইল রিপোর্টারদের কাছ থেকেই সেনাবাহিনীর নির্যাতনের তথ্য পেত। কিন্তু তাদের অধিকাংশ হত্যা ও গুমের শিকার হওয়ায় রাখাইন থেকে আমরা কোন তথ্য পাচ্ছি না। ২০১২ সালে যখন বৌদ্ধ সম্প্রদায় ও রাখাইনদের মধ্যে দাঙ্গা বাধে, তখন কর্তৃপক্ষ সেখানে সেনাবাহিনী মোতায়েন করে। ওই সময় রোহিঙ্গা গ্রামগুলোতে সেনাবাহিনীর মানবাধিকার লঙ্ঘনের খবর প্রকাশ্যে চলে আসে। মিয়ানমারের গণমাধ্যম সেই সহিংসতার বিষয়ে একেবারে নীরব ছিল। তারা এ সম্পর্কিত কোন খবর ছাপাত না। তখন রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের নেতৃত্বাস্থানীয় লোকজন গোপনীয়তা বজায় রেখে নাগরিক সাংবাদিকদের একটা নেটওয়ার্ক গঠন করেন। তারা রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন ও নিপীড়নের খবর সংগ্রহ করে দেশের বাইরে পাঠাত। বাংলাদেশভিত্তিক রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের মুখপাত্র কো কো লিন বলেন, ২০১৬ সালে দুই হাজার নাগরিক সাংবাদিক তৎপর ছিলেন। গত বছর সামরিক বাহিনীর ধরপাকড়ের সময় তারা গ্রামের ভেতরের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করেছেন। তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বিশ্ব জানতে পারে গ্রামগুলোতে রোহিঙ্গাদের ওপর কী ধরনের নির্যাতন চালানো হয়েছে। সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন পঁচিশ বছর বয়সী মোবাইল রিপোর্টার নুর হোসেন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিনি তথ্য সংগ্রহ করতেন। তিনি জানান, নিরাপত্তা বাহিনী যখন আমাদের গ্রামে ঢুকত, তখন আমরা আড়ালে চলে যেতাম। অভিযান শেষে তারা চলে গেলে আমরা ঘটনাস্থলে আসতাম, সেখান থেকে মোবাইলে সরেজমিন তথ্য সংগ্রহ করে বিদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সংস্থায় পাঠিয়ে দিতাম। তিনি বলেন, স্মার্টফোনসহ কোন রোহিঙ্গা নাগরিককে দেখলে নিরাপত্তা বাহিনী তাকে হত্যা করত। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ফিল রবার্টসন বলেন, ঘটনাস্থলে রোহিঙ্গা নাগরিক সাংবাদিকদের অনুপস্থিতির কারণে বিভিন্ন প্রত্যক্ষ ভিডিওসহ বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। তারা নিখোঁজ হয়ে যাওয়ায় সেখানে কী ঘটছে, তা আমরা জানতে পারছি না। কারণ, মানবাধিকার সংস্থা, সাংবাদিক ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের রাখাইন রাজ্যে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তার মতে, এটা খুবই পরিষ্কার যে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মিয়ানমার সেনাবাহিনী পরিকল্পিত হত্যাকা- চালাচ্ছে। কিন্তু নাগরিক সাংবাদিকরা সেখানে অনুপস্থিত থাকায়, আমরা সেই তথ্য পাচ্ছি না।