শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার ১নং পোড়াগাঁও ইউনিয়নের পশ্চিম সমশ্চুড়া এলাকার গহিন পাহাড়ে অভিনব কৌশলে সিসি ব্লক নির্মাণ কারখানা খুলেছেন স্থানীয় দুই ইউপি সদস্য। ওই কারখানা থেকে জেলাসহ নালিতাবাড়ী ও পাশ^বর্তী ঝিনাইগাতী উপজেলার বিভিন্নস্থানে এসব সিসি ব্লক বিক্রি করছেন তারা। এই কারখানায় পাশের পাহাড়ি রঞ্জনা ঝর্ণা থেকে অবৈধভাবে বালু, পাথর ও নুড়ি পাথর উত্তোলন করে এই কারখানায় তা ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বন ও প্রকৃতি। এমনকি পাশের শাল বনের টিলা ধ্বসে পড়ছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, নালিতাবাড়ী উপজেলার গারো পাহাড়ের গহিনে বন্যহাতির অভয়ারণ্য এলাকায় গড়ে তোলা হয়েছে ওই সিসি ব্লক কারখানা। অবৈধভাবে পাহাড়ি ঝর্ণার বালু, নুড়ি ও সিঙ্গেল পাথর ব্যবহার করে এখানে তৈরি করা হয় এসব সিসি ব্লক। স্থানীয় বাসিন্দাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী উপজেলার ১নং পোড়াগাঁও ইউনিয়নের পশ্চিম সমশ্চুড়া গ্রামের সর্ব উত্তরে ভারতঘেঁষা অংশ কোনাবাড়ী বড়খোল নামক স্থানে ওই কারখানা গড়ে তোলা হয়েছে। গারো পাহাড়ের গহিনের এই অংশটি বন্যহাতির অবাধ বিচরণক্ষেত্র। ফলে গরু চড়াতে আসা রাখাল আর লাকড়ি সংগ্রহ করতে যাওয়া কাঠুরে ছাড়া মানুষের আনাগোনা খুব একটা নেই এখানে। এ কারণে স্থানটি বন্যপ্রাণী ও চোরাকারবারিদের অভয়ারণ্য বললেই চলে এই জায়গাটি। চলতি রমজান মাসের শুরুর দিকে এই স্থানে থাকা রঞ্জনা ঝর্ণা নামে পাহাড়ি ঝিরি থেকে উত্তোলিত বালু, নুড়ি আর সিঙ্গেল পাথর দিয়ে এখানে অগনিত সিসি ব্লক তৈরি করা হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নালিতাবাড়ী উপজেলার পোড়াগাঁও ইউনিয়নের স্থানীয় দুই ইউপি সদস্য উমর ফারুক ও নবী হোসেন গহিন পাহাড়ি এলাকায় ব্লক তৈরির কারখানা চালু করে তা থেকে বিভিন্ন এলাকায় এসব ব্লক বিক্রি করছেন। অন্যদিকে, বন বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, কারখানা সংলগ্ন এলাকায় বন বিভাগের লোকজনের যাতায়াত না থাকায় সেখানে পাহাড়ি ঝর্ণার বালু, নুড়ি ও সিঙ্গেল পাথর ব্যবহার করে সিসি ব্লক তৈরির বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ছিলেন না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
বন কর্মকর্তরা জানান, নালিতাবাড়ী উপজেলার সহকারী কমিশনারের (ভূমি) নির্দেশে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা হয়েছে। এ সময় সিসি ব্লক তৈরির সব কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সিসি ব্লক তৈরির সব ধরনের সরঞ্জামও জব্দ করা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বন বিভাগের মধুটিলা ফরেস্ট রেঞ্জের বনবিট কর্মকর্তা মো. কাউসার আহম্মেদ বলেন, কারখানাটি যে স্থানে স্থাপন করা হয়েছে সেখানে আমাদের লোকজনের খুব একটা যাতায়াত নেই। এ কারণে আগে বিষয়টি সম্পর্কে আমরা অবগত ছিলাম না। তিনি আরও বলেন, তবে কয়েক দিন আগে এসি ল্যান্ড স্যারের নির্দেশে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা হয়েছে। এ সময় সিসি ব্লক তৈরির সব কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সিসি ব্লক তৈরির সব ধরনের সরঞ্জামও জব্দ করা হয়েছে।
নালিতাবাড়ী ইউএনও রেজওয়ানা আফরিন এই বিষয়টি সম্পর্কে জানান, আগে থেকে উত্তোলন করে রাখা বালু এবং পাথর দিয়ে নিজেদের জায়গায় তারা ব্লক তৈরি করছেন বলে প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছি। এটি আইনসিদ্ধ নাকি অবৈধ সে বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া হবে। এরপর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সিসি ব্লক তৈরিকারী ইউপি সদস্য মো. উমর ফারুক বলেন, নিজের পুকুরপাড়ে ব্লক বসিয়ে মেরামতের জন্য এসব সিসি ব্লক তৈরি করেছি। এখন এসব বেআইনি হলে তো কিছুই করার নেই। যা হওয়ার হবে। পুকুরের পাড় মেরামতের জন্য এতো বেশি পরিমাণ ব্লক তৈরি করা হচ্ছে কেন নাকি এসব ব্যবসায়িক কাজের জন্য তৈরি করা হয়েছে? এমন প্রশ্নের সদোত্তর দিতে পারেননি তিনি।
নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে নালিতাবাড়ী উপজেলার উপর দিয়ে প্রবাহিত দুটি নদীর বালু মহালগুলো বন্ধ থাকায় স্থানীয়ভাবে বালু উত্তোলন ও পরিবহন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ রয়েছে। এর ফলে পাহাড়ের গহিনে থাকা রঞ্জনা ঝর্ণার বালু, নুড়ি ও সিঙ্গেল পাথর বিক্রি এবং পরিবহন করতে পারছে না উত্তোলনকারীরা। তবে ওই ঝর্ণার বালু, পাথর, নুড়ি পাথর কিংবা যে কোনো ধরনের খণিজ সম্পদ উত্তোলণ করার সরকারিভাবে কোনো প্রকার অনুমোদন নেই।
প্যানেল / জোবায়ের








