দিনাজপুরে ঝড়োহাওয়া ও বৃষ্টিতে জমিতে লুটিয়ে পড়েছে পাকা ধান -জনকণ্ঠ
দিনাজপুর জেলার বিভিন্ন উপজেলায় কয়েকদিনের টানা বৃষ্টি ও ঝড়ো বাতাসের কারণে পাকা আমন ধান মাটিতে লুঠিয়ে পড়েছে। মাঠের পর মাঠ এখন পাকা ধান মাটিতে লুটিয়ে পড়ার দৃশ্য। এর ফলে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে জেলার আমন চাষিদের। ঘাম ঝরানো ফসলের এ অবস্থা দেখে হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন তারা। জেলা কৃষি কার্যালয়ের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে জেলায় ২ লাখ ৬০ হাজার ৮শ’ ৩৫ হেক্টর জমিতে আমন ধান আবাদ হয়েছে। কৃষকরা জানান, এ বছর অনুকূল আবহাওয়ার কারণে আমন ধানের ফলন ভালো হয়েছিল। হঠাৎ বৃষ্টি ও বাতাসের কারণে সেই ফসল এখন নষ্ট হওয়ার উপক্রম। বিশেষ করে নিচু জমির ধান সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যদি দ্রুত রোদ না ওঠে, তাহলে কেটে রাখা সামান্য পরিমাণ ধান শুকানো সম্ভব হবে না। ভেজা অবস্থায় ঘরে তুলতে গেলে ধান পচে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে।
কাহারোল উপজেলার কৃষক আব্দুল করিম মিয়া বলেন, ‘ধান কাটার কাজ শুরু হতেই এমন আবহাওয়া। বাতাসে ক্ষেতের ধান মাটিতে পড়ে গেছে, জমিতে পানি জমেছে। ফলে ধান কেটে ঘরে তোলাও কঠিন হয়ে পড়েছে। শ্রমিকের মজুরি বেড়েছে। রোদ নেই, যে কারণে যতটুকু ধান কাটতে পেরেছি, তাও শুকানো সম্ভব হচ্ছে না।’ বিরল উপজেলার কৃষক রমেশ মুরমু বলেন, ‘যদি দ্রুত রোদ না ওঠে, তাহলে কাটা ধান শুকানো সম্ভব হবে না। ভেজা অবস্থায় ধান ঘরে তুলতে গেলে পচে যাবে। সবদিক দিয়েই ক্ষতির মুখে পড়েছি আমরা। চিরিরবন্দর উপজেলার কৃষক সাদি সরকার বলেন, ‘মৌসুমের ধান বিক্রি করেই আমরা পরিবারের খরচ চালাই, ঋণ পরিশোধ করি। এবারের আবহাওয়ায় সব আশা ভঙ্গ হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।’ দিনাজপুর জেলা কৃষি অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আফজাল হোসেন বলেন, ‘গত কয়েকদিন বৃষ্টি ও ঝড়ো হাওয়ায় জেলার বিভিন্ন উপজেলার কিছু এলাকায় আমন ধানের ক্ষতি হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তারা ক্ষতিগ্রস্ত জমি পরিদর্শন করছেন। তারা প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছেন, যাতে কৃষকরা কিছুটা হলেও ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারেন।’
কুড়িগ্রামে ধান ও আলুর খেতে
ব্যাপক ক্ষতি
স্টাফ রিপোর্টার, কুড়িগ্রাম থেকে জানান, কুড়িগ্রাম ও তার আশপাশের এলাকায় টানা দুদিন থেকে বৃষ্টি আর বাতাসে উঠতি আমন খেতের ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে। সেই সঙ্গে এ অঞ্চলে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে। আগাম আলুর খেতগুলো তৈরি করেছিল কৃষকরা বৃষ্টির কারণে পানিতে তলিয়ে গেছে। এই সব খেত আবার নতুন করে তৈরি করতে হবে।
কুড়িগ্রাম জেলায় রয়েছে ১৬টি নদ-নদী। চর-দ্বীপচর রয়েছে ৪০৫টি। কৃষি বিভাগ জানিয়েছে চলতি মৌসুমে এবার আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা টার্গেট করা হয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার ৫শ’ হেক্টর জমিতে। চলতি মৌসুমে বন্যা না হওয়ায় কৃষকরা ১ লাখ ২১ হাজার ৬শ’ হেক্টর জমিতে আবাদ করেছে। গতবারের চেয়ে ১ হাজার ১শ’ হেক্টর জমিতে বেশি ধান আবাদ হয়েছে। কিন্তু শেষ সময় এসে টানা বৃষ্টি আর দমকা বাতাসে জেলার বিভিন্ন এলাকায় ধান খেতগুলো হেলে পড়েছে। প্রতিটি ধান খেতের শীষ বের হয়ে ছিল। হেলে পড়া ধান খেতগুলোর ধান চিটা হবে বলে জানিয়েছে কৃষকরা। আর মাত্র দুই সপ্তাহ পর থেকে কাটামাড়াই শুরু হবে এ অঞ্চলে। প্রাকৃতিক এই দুর্যোগে চরম দুর্ভোগে পড়েছে কৃষকরা। ধানের ফলন কম হবার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। অপর দিকে উলিপুর উপজেলায় বৃষ্টি আর ঝড় বাতাসে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। উলিপুর পৌরসভার রাজারাম ক্ষেত্রী এলাকার কৃষক সুভাষ চন্দ্র জানান, তার ২২ শতাংশ জমির আমন খেত ঝড় হাওয়ায় পানিতে হেলে পড়েছে। হেলেপড়া ধান খেত নষ্ট হয়ে যাবে। বজরা ইউনিয়নে দামারহাট এলাকার জোবাইদুল ইসলাম, আবুল হোসেনসহ অনেক কৃষক জানান, তাদের এক বিঘা করে জমির ফসল ঝড় হাওয়ায় পানিতে হেলে পড়েছে। গুনাইগাছ ইউনিয়নের মহিদেব এলাকার ধান চাষি রফিকুল ইসলাম জনান, তিনি ১০ বিঘা জমাতে আমন ধান লাগিয়েছে ফলন মোটামুটি ভালো হয়ে গত তিনদিনের ঝড় হাওয়ায় আধাপাকা ও থোরধানসহ তিন বিঘা জমির ধান পানিতে হেলে পড়েছে। একে ব্যাপক ক্ষতি হবে বলেন জানান তিনি।
সরিষাবাড়ীতে কৃষকের সর্বনাশ
নিজস্ব সংবাদদাতা, সরিষাবাড়ী, জামালপুর থেকে জানান, জামালপুরের সরিষাবাড়ীতে অসময়ে বৃষ্টির প্রভাবে উপজেলার বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠের কাঁচা-আধাপাকা শত শত বিঘার ধান পড়ে গেছে। কিছু কিছু জমি পানিতে তলিয়ে গেছে পানিতে ভাসছে সেই সকল জমির ধান। কৃষকদের কষ্টার্জিত ফসল এ ভাবে নষ্ট হওয়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছে কৃষক। উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, এবার উপজেলায় প্রায় ১৭ হাজার ৯৫০ হেক্টর জমিতে রোপা- আমন ধানের চাষ হয়েছিল। ফসলও ভালো হয়েছিল কিন্তু অসময়ে বৃষ্টি হওয়ার ফলে প্রায় ১২০ হেক্টর জমির ধান পড়ে গিয়ে নষ্ট হয়ে গেছে। উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, টানা বর্ষণের ফলে পোগলদিঘা, আওনা, পিংনা, ডোয়াইলসহ সবকটি ইউনিয়নের কৃষিজমি ব্যাপকভাবে জলাবদ্ধসহ ধান পড়ে গেছে। অনেক এলাকার পড়ে যাওয়া ধানগাছ পানির ওপরে ভাসছে। কাঁচা- অর্ধপাকা ধান পুরোপুরি পাকার মুহূর্তে হঠাৎ এই বৃষ্টিতে ধান গাছ পড়ে যাওয়ায় সময়মতো ফসল ঘরে তোলা নিয়ে কৃষকরা চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। তারাকান্দি গ্রামের কৃষক মাসুম মিয়া বলেন, ‘ধান পেকে গেছে, এখন কাটার সময়। কিন্তু ধানগাছ পড়ে গিয়ে মাঠে পানি জমে গেছে। ধান কাটা অসম্ভব তাই ধান পানিতে ডুবে পচে যাচ্ছে। জমির কোথাও কোথাও ধান হতে নতুন গাছ জন্মাচ্ছে। একই এলাকার কৃষক আব্দুল জলিল বলেন, ‘আমি গরিব মানুষ অন্যের জমি বর্গা নিয়ে পাঁচ বিঘা জমিতে ধান লাগাইছি ধান এখন কিছু পেকেছে কিছু কাঁচা আছে। এ বৃষ্টির কারণে সব ধান মাটিতে পড়ে গিয়ে পচে যাচ্ছে। আমাদের পুরো বছরের পরিশ্রম শেষ।’
এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি র্কমর্কতা অনুপ সিংহ জানান, অসময়ে বৃষ্টিপাতে কৃষকের প্রচুর ক্ষতি হয়েছে। উপজেলার প্রায় ১২০ হেক্টর জমির ধান পড়ে গেছে। ধানের পাশাপাশি ৪০ হেক্টর মরিচ, ২০ হেক্টর সবজি ও ৬ হেক্টর ভুট্টার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমরা চেষ্টা করব ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের অন্যভাবে প্রণোদনার মাধ্যমে কিছুটা সহযোগিতা করার।
গঙ্গাচড়ার কৃষকরা দুশ্চিন্তায়
সংবাদদাতা, গঙ্গাচড়া রংপুর থেকে জানান, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপের প্রভাবে টানা তিনদিনের ভারি বৃষ্টিতে রংপুরের গঙ্গাচড়ায় রোপা আমন ধান মাটিতে নুইয়ে পড়েছে। ঘরে তোলার আগমুহূর্তে আধাপাকা ধান শুয়ে পড়ায় দিশেহারা কৃষকরা আশঙ্কা করছেন বড় ধরনের ক্ষতির। উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে চলতি মৌসুমে গঙ্গাচড়ায় ১৯ হাজার ৩৫৫ হেক্টর জমিতে আমন চাষ হয়েছে। রবিবার সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ধানের খেত পানিতে ডুবছে, গাছ শুয়ে পড়ায় শীষ ভিজে যাচ্ছে। ফলে ফলন কমে যাওয়া এবং ধানের মান নষ্ট হওয়ার শঙ্কা বাড়ছে। সদর ইউনিয়নের চেংমারী গ্রামের কৃষক ইউনুস আলী বলেন, ‘বছরব্যাপী কষ্ট করে চাষাবাদ করি, এবার ফলন ভালো হবে ভেবেছিলাম। কিন্তু যে অবস্থায় ধান শুয়ে গেছে, তাতে অর্ধেক ফসলও ঘরে তোলা যাবে কি না সন্দেহ।’
নোহালী ইউনিয়নের বৈরাতী এলাকার কৃষক সুজা মিয়া জানান, ‘শুয়ে পড়া ধানে দ্রুত পোকা ধরে। পোকা ধরলে ধান চিটা হয়ে যায়। এখনই নানা দুশ্চিন্তা গ্রাস করছে।’
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সৈয়দ শাহিনুর ইসলাম বলেন, ‘নিম্নচাপের কারণে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, যেসব জমিতে ধান শুয়ে পড়েছে, সেগুলো গোছা করে বেঁধে দিতে। আর যেগুলো পেকে গেছে সেগুলো দ্রুত কেটে ফেলতে হবে। ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ চলছে।’
প্যানেল/মো.








