ঢাকা, বাংলাদেশ   মঙ্গলবার ১৭ মার্চ ২০২৬, ৩ চৈত্র ১৪৩২

দিনাজপুর

বিএনপির লক্ষ্য সব পুনরুদ্ধার ভাগ বসাতে চায় জামায়াত

সাজেদুর রহমান শিলু, দিনাজপুর

প্রকাশিত: ২৩:৫৭, ১৩ অক্টোবর ২০২৫

বিএনপির লক্ষ্য সব পুনরুদ্ধার ভাগ বসাতে চায় জামায়াত

দিনাজপুরের ছয় আসনেই নির্বাচনের গরম হাওয়া বইছে

শীতের হাল্কা আবহাওয়ার মাঝে দিনাজপুরের ছয় আসনেই নির্বাচনের গরম হাওয়া বইছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে উত্তরবঙ্গের এই জেলার পথে প্রান্তরে বিরাজ করছে নির্বাচনী আমেজ। বড় সব দল এখন নিজেদের ঘর গোছাতে ব্যস্ত। দলগুলোর সম্ভাব্য প্রার্থীরা নিজ নিজ এলাকায় ঘন ঘন যাতায়াত শুরু করেছেন। উঠান বৈঠক, গণসংযোগ, কর্মিসভাসহ নানাভাবে ভোটারদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছেন নেতারা। এলাকার মানুষের সঙ্গে প্রার্থীরা সম্পর্ক নবায়নের পাশাপাশি ভোটারদের মন জয় করতে সম্ভাব্য সবকিছুই করে যাচ্ছেন।
আগে দিনাজপুরের ছয় আসনেই কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া আওয়ামী লীগ এবং জাতীয় পার্টির একটা বড় প্রভাব ছিল। কিন্তু সরকার পতনের পর পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল- বিএনপির টার্গেট ছয় আসনই পুনরুদ্ধার। বসে নেই অপর বড় দল জামায়াতে ইসলামী। তাদেরও টার্গেট প্রতিটি আসনেই প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তোলা এবং দু’তিনটি আসনে বিজয়ী হওয়া। 
এদিকে জাতীয় পার্টি নির্বাচনে অংশ নিলে ‘লাঙ্গল মার্কা’ কিছুটা ফ্যাক্টর হয়ে দেখা দিতে পারে। এনসিপি, ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন মাঠে থাকলেও তাদের তেমন জোরালো ভূমিকা এখনো দেখা যাচ্ছে না। সবার ধারণা, দিনাজপুরের ছয়টি আসনে যে দল যাকেই মনোনয়ন দিক না কেন, মূল লড়াই হবে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে। 
দিনাজপুর-১ (বীরগঞ্জ-কাহারোল) ॥ এ আসন বেশির ভাগ সময় আওয়ামী লীগের দখলে ছিল। কিন্তু এবারের প্রেক্ষাপটে চিত্র ভিন্ন। প্রকাশ্যে এবং গোপনে সম্ভাব্য প্রার্থী অনেক। প্রার্থীরা সভা-সমাবেশ ছাড়াও এলাকায় বিভিন্ন দলের নেতাকর্মী, জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও সখ্য তৈরিতে তৎপর। এই আসনে যে দল যাকেই মনোনয়ন দিক না কেন, লড়াইটা হবে বিএনপি এবং জামায়াতের মধ্যে। তবে বিএনপির একাধিক প্রার্থী ও নিজেদের মধ্যে অন্তর্কোন্দলের কারণে বিকল্প প্রার্থী হিসেবে বহিরাগত প্রার্থীর নামও শোনা যাচ্ছে। থাকবে স্বতন্ত্র প্রার্থীও। 
এ আসনে এবার নতুন ভোটার হয়েছে ২০ হাজার ৬শ’ ১১ জন। ১৯৮৬ সাল থেকে এ আসনটিতে আওয়ামী লীগ ছয়বার, বিএনপি একবার এবং জামায়াত ও জাতীয় পার্টি একবার করে এবং সর্বশেষ আওয়ামী লীগ (স্বতন্ত্র) প্রার্থী একবার জয়লাভ করেন।
নির্বাচন যতই এগিয়ে আসছে প্রার্থী দেওয়া নিয়েও মেরুকরণে পরিবর্তনের তথ্য বেরিয়ে আসছে। তৃণমূলের অনেকেই মনে করেন, বিএনপির দলীয় কোন্দলের কারণে যেই মনোনয়ন পাক না কেন, একজনের অনুসারী আরেক জনের বিরোধিতা করবে। সে কারণে বিএনপি প্রার্থীর জয় পাওয়া কিছুটা হলেও কষ্টকর হবে। আবার এ এলাকায় সংখ্যালঘু ভোটার একটা বড় ফ্যাক্টর। তাই প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে এ বিষয়টিও মাথায় রাখছে বিএনপি। সে ক্ষেত্রে বহিরাগত প্রার্থীরও নাম শোনা যাচ্ছে।

সেদিক থেকে প্রার্থী নির্বাচন নিয়ে জামায়াতে ইসলামী রয়েছে এগিয়ে। তাদের একক প্রার্থী মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। জাতীয় পার্টি নির্বাচনে অংশ নিলে তাদের প্রার্থী রয়েছে। বাম ও ইসলামি এবং নতুন নতুন দলগুলোর প্রার্থী কিংবা নেতাকর্মীদের কোনো সাড়াশব্দ শোনা যাচ্ছে না। তবে এখানে লড়াই হবে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যেই। 
আসনটিতে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে রয়েছেন- বীরগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি মনজুরুল ইসলাম মঞ্জু, সাধারণ সম্পাদক আলহাজ জাকির হোসেন ধলু, বিএনপি নেতা কাহারোল উপজেলার সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মামুনুর রশিদ চৌধুরী। এ ছাড়া সেখানে বিএনপির অন্তর্কোন্দল ও সংখ্যালঘু ভোটারদের একটি বড় অংশ থাকায়, দলীয়ভাবে হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ট্রাস্টি ঠাকুরগাঁওয়ের সত্যজিত কুমার কু-ুর নামও মনোনয়নের বিবেচনায় রয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসন আবারও পেতে চায় জামায়াত। নির্বাচনে দলের সম্ভাব্য প্রার্থী ঢাকা মহানগর উত্তরের শূরা সদস্য, তুরাগ থানার সাবেক আমির, দিনাজপুর শহর শিবিরের সাবেক সভাপতি মতিউর রহমান। গত ৪ ফেব্রুয়ারি জামায়াতের রোকনদের এক আলোচনা সভায় তার নাম ঘোষণা করা হয়। একক প্রার্থী হওয়ায় নেতাকর্মীদের নিয়ে তিনি প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন।
এ ছাড়াও এখানে অন্য দলের প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন- বীরগঞ্জ উপজেলা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক মো. শাহিনুর ইসলাম। দলীয় সিদ্ধান্ত হলে, তিনি এবারও প্রার্থী হবেন বলে জানা গেছে। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নাম শোনা যাচ্ছে একজন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের। যিনি বিভিন্ন এলাকায় ভোটার, জনপ্রতিনিধি, সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিসহ সামাজিক সংগঠনগুলোর প্রধানদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলছেন। 
এই আসনের ভোটাররা বরাবরই বহিরাগত প্রার্থীর ক্ষেত্রে বিপ্লবী। এই সুযোগ কাজে লাগান মনোনয়ন বঞ্চিতরা। এর একাধিক নজির রয়েছে এই আসনে। মনোনয়ন দিতে ভুল করলেই বিশেষ করে বিএনপিকে মাশুল গুনতে হবে চরম ভাবে। এ ছাড়া সংখ্যালঘু ভোটার একটা বড় ফ্যাক্টর। তাদের দিকেও নজর রাখতে হবে রাজনৈতিক দলগুলোকে।
একটি সূত্রের দাবি, ১৭টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত দিনাজপুর-১ আসনের চিত্র একটু আলাদা। এই আসনে ৪২ শতাংশ ভোটার সনাতন ধর্মাবলম্বী বা সংখ্যালঘু। অপরদিকে এই আসনে ময়মনসিংহ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, গাইবান্ধা, রংপুর, নোয়াখালী, ঢাকা ও বগুড়া জেলার মানুষের বসবাস রয়েছে উল্লেখযোগ্যহারে। তাদের জেলার সঙ্গে মিলিয়ে রয়েছে পাড়ার নামও। তাই এই আসনে প্রার্থী নির্বাচনে সব দল বিশেষ সাবধানতা অবলম্বন করে। এবার আওয়ামী লীগের নির্বাচনে থাকার সম্ভাবনা নেই। তাই ৪২ শতাংশ সনাতন ধর্মাবলম্বী ভোটারের ভোটকেন্দ্রে উপস্থিতি এবং তারা কোন দলকে ভোট দেবে, তার ওপরই নির্ভর করবে জয়-পরাজয়। 
দিনাজপুর-২ (বোচাগঞ্জ-বিরল) ॥ আসনটি আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টি তিন দলের দখলেই এক সময় থেকেছে। তবে সংখ্যার দিক থেকে পতিত আওয়ামী লীগের দখলেই ছিল বেশিরভাগ সময়। কিন্তু এবারের প্রেক্ষাপট অন্য রকম। এবার আওয়ামী লীগ মাঠ ছাড়া, তাই লড়াইটা হবে মূলত বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে। তবে এ আসনে জাতীয় পার্টির সম্ভাব্য প্রার্থীর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তাও বিশেষ কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। অন্যদিকে জেলা জামায়াতের আমির আনিসুর রহমানের বাড়ি এই আসনে হওয়ায় নির্বাচন হবে হাড্ডা-হাড্ডি।
এ আসনে জাতীয় পার্টি ছাড়া সব দলের প্রার্থী প্রকাশ্যে ভোট চাইছেন। জাতীয় পার্টি নির্বাচনে অংশ নিতে পারলে, এ আসনে লড়াই হবে ত্রিমুখী। এ আসনে প্রার্থীরা মাঠ থেকে তৃণমূল পর্যায়ে সভা-সমাবেশ ছাড়াও এলাকায় আলাপচারিতা অব্যাহত রেখেছেন। এ ছাড়াও কেন্দ্রীয় নির্দেশে প্রার্থীরা ব্যক্তিগত সখ্যতা তৈরিতে তৎপর রয়েছেন। ১৯৭৩ সাল থেকে এই আসনটিতে আওয়ামী লীগ সাতবার, বিএনপি দু’বার এবং জাতীয় পার্টি একবার করে জয়লাভ করে।
এ আসনে প্রার্থী নির্বাচন নিয়ে জামায়াত এগিয়ে। তাদের প্রার্থী মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। জাতীয় পার্টির কোনো কাঠামো না থাকলেও, তাদের প্রার্থী ব্যক্তিগতভাবে বেশ জনপ্রিয়। তিনি বোচাগঞ্জ উপজেলার চেয়ারম্যান ছিলেন। বাম ও ইসলামি এবং নতুন নতুন দলগুলোর প্রার্থী কিংবা নেতাকর্মীদের কোনো সাড়াশব্দ শোনা যাচ্ছে না। তবে এখানে লড়াই হবে বিএনপি-জামায়াত ও জাতীয় পার্টি তিনটি দলের মধ্যেই।
এই আসনে বিএনপির একাধিক প্রার্থী ও নিজেদের মধ্যে অন্তর্কোন্দলের কারণে তারা কিছুটা বেকায়দায়। পতিত স্বৈরাচারের দোসর হওয়ায় জাপার প্রার্থীও প্রকাশ্যে আসতে পারছেন না। একক প্রার্থী ও আমিরের বাড়ি এ আসনে হওয়ায় সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে জামায়াত। খবর নেই অন্যান্য ইসলামি দল, বামদল, নতুন গঠিত দল ও ছোট দলের প্রার্থীদের। তবে এনসিপি তাদের প্রার্থী চূড়ান্ত করলেও, কৌশলগত কারণে প্রার্থীর নাম ঘোষণা করছে না। 
এ আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে রয়েছেন- জেলা বিএনপির সদস্য সাদিক রিয়াজ চৌধুরী পিনাক, জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি মোজাহারুল ইসলাম, জেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আ ন ম বজলুর রশিদ কালু ও কলেজ শিক্ষক সমিতির (বাকশিস) কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সম্পাদক বিএনপি নেতা অধ্যাপক মো. মঞ্জুরুল ইসলাম।
প্রথমবারের মতো এ আসন পেতে চায় জামায়াতের সম্ভাব্য প্রার্থী জেলা কর্মপরিষদ সদস্য অধ্যক্ষ আ ন ম আফজালুল আনাম। তিনি দিনাজপুর জেলা জামায়াতের কর্মপরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এ ছাড়াও তিনি দিনাজপুর-২ আসনের বিরল উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। একক প্রার্থী হওয়ায় নেতাকর্মীদের নিয়ে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। পাশাপাশি জেলা আমির আনিসুর রহমানের বাড়ি এই আসনে হওয়ায়, জামায়াত প্রার্থী কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছেন।
এখানে জাতীয় পার্টির প্রার্থী কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ও নব গঠিত দিনাজপুর জেলা কমিটির সদস্য সচিব ও বোচাগঞ্জ উপজেলার সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট জুলফিকার আলী এলাকায় তরুণ নেতা হিসেবে বেশ জনপ্রিয়। বিরল- বোচাগঞ্জ উপজেলাতে জনগণের পাশে সর্বদা তাকে দেখা গেছে। তাই এই আসনে নির্বাচনে ত্রিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।
দিনাজপুর-৩ (সদর) ॥ জেলার ছয়টি আসনের মধ্যে দিনাজপুর-৩ সদর আসনটি বিএনপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। যদিও আসনটি বেশিরভাগ সময় দখলে থেকেছে আওয়ামী লীগের। এই আসনটিতে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বড় বোন প্রয়াত খুরশীদ জাহান হক (চকলেট) তিনবার নির্বাচিত হয়েছিলেন। এবারও তাদের পরিবারের কেউ নির্বাচন করবেন এমন গুঞ্জন রয়েছে। এই আসনে বিএনপি এখনো প্রার্থী নির্বাচন না করলেও, জামায়াত তাদের প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে। জাতীয় পার্টির প্রার্থীও সুনির্দিষ্ট হয়ে রয়েছে। তবে জাতীয় পার্টি শেষ পর্যন্ত ভোটের মাঠে থাকতে পারবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ আছে।
বেগম খালেদা জিয়ার বড় বোন খুরশীদ জাহান হক সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী থাকাকালীন এই এলাকার ব্যাপক উন্নয়ন করেছেন, যা এখনো মানুষের মুখে মুখে রয়েছে। তাই সেই পরিবার থেকে কেউ প্রার্থী হলে জয় পাওয়া কঠিন হবে না বলে অনেকে মনে করছেন। জাপার যে প্রার্থী রয়েছে তিনি জাতীয় পার্টি নির্বাচনে যাবে কি না তার কোনো সবুজ সংকেত পাননি। একক প্রার্থী হওয়ায় সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে জামায়াত। তা ছাড়া জামায়াতের প্রার্থী উপজেলা নির্বাচন করায় তিনি রয়েছেন এগিয়ে। 
এবার এই আসন থেকে মনোনয়ন চাইবেন বিএনপি চেয়ারপারসনের বড় বোন খুরশীদ জাহান হকের ছেলে খালেদা জিয়ার ভাগনে শাহরিয়ার আক্তার হক ডন, রংপুর বিভাগীয় সাবেক যুগ্ম সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক পৌর মেয়র সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম, দিনাজপুর জেলা বিএনপির সভাপতি সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মোফাজ্জল হোসন দুলাল, সাধারণ সম্পাদক (পদ স্থগিত) বখতিয়ার আহম্মেদ কচি, জেলা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি মোকাররম হোসেন, জেলা বিএনপির সদস্য শিল্পপতি হাফিজুর রহমান প্রমুখ। 
তবে এ আসনে তারেক রহমানও প্রার্থী হতে পারেন বলে গুঞ্জন রয়েছে। কারণ এখানে আছে তার শৈশবের অনেক স্মৃতি। মায়ের জন্মস্থান ও নানির বাড়ি হওয়ার সুবাদে তারেক রহমানকেই দলের অনেকেই প্রার্থী হিসেবে দেখতে চায়। তিনি প্রার্থী হলে আর বিএনপির কোনো নেতা মনোনয়ন চাইবেন না।
জামায়াতের একক প্রার্থী হিসাবে অ্যাডভোকেট ময়নুল আলমের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। তিনি এ আসনে সদর উপজেলায় ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচন করেছিলেন। তার অমায়িক ব্যবহারের কথা মানুষের মুখে মুখে। এরইমধ্যে তিনি গ্রাম থেকে গ্রাম পাড়া-মহল্লা চষে বেড়াচ্ছেন। জানান দিচ্ছেন সংসদ নির্বাচনে তার প্রার্থী হওয়ার কথা।
জাতীয় পার্টি নির্বাচন করলে এ আসনে বরাবরের মতো প্রার্থী হবেন জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি আহম্মেদ শফি রুবেল। তিনি জানিয়েছেন, কেবল দলীয় সিদ্ধান্ত হলেই তিনি নির্বাচন করবেন। এ আসনে অন্য দলগুলোকে নির্বাচনী কথাবার্তা বলতে শোনা না গেলেও কিছু ইসলামি দল তাদের প্রার্থী দেবে বলে জানা গেছে। নতুন গঠিত এনসিপিও তাদের প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে বলে জানা গেছে। তবে তারা কৌশলগত কারণে প্রকাশ্যে আসছে না। গুঞ্জন রয়েছে, বিএনপির মনোনয়ন চাইবেন এমন একজন নেতা মনোনয়ন না পেলে এনসিপি থেকে নির্বাচন করতে পারেন। 
দিনাজপুর-৪ (খানসামা-চিরিরবন্দর) ॥ আসনটি বরাবরই আওয়ামী লীগের দখলে থেকেছে। তবে দু’বার বিএনপি ও একবার করে ওয়ার্কার্স পার্টি এবং জাতীয় পার্টি এ আসনে জয়লাভ করে। কিন্তু এবার আওয়ামী লীগ নির্বাচনের বাইরে থাকলে লড়াই হবে বিএনপি-জামায়াত সমানে সমান। বিএনপি নেতা সাবেক সংসদ সদস্য আকতারুজ্জামান মিয়া ও জামায়াত নেতা সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আফতাব উদ্দিন মোল্লার জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। জামায়াত তাকে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছে।

অপরদিকে বিএনপির আকতারুজ্জামান মিয়ার মনোনয়ন প্রায় নিশ্চিত। এই দুই প্রার্থীর বাড়ি একই উপজেলায়। তাদের দুজনের প্রার্থিতা প্রায় নিশ্চিত হওয়ায় প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন ধুমছে। তারা পাড়া-মহল্লায় ছুটে বেড়াচ্ছেন। সভা-সমাবেশ, উঠান বৈঠক, চায়ের আড্ডা শুরু করেছেন। 
কর্নেল (অব.) মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী এই আসনে বিএনপির অপর মনোনয়নপ্রত্যাশী। তিনি খানসামা উপজেলার বাসিন্দা। তিনিও বিভিন্ন জায়গায় সভা, সমাবেশ ও জনসংযোগ করছেন। এ আসনটিতে বিএনপি চায় পুনরুদ্ধার করতে, আর জামায়াত চায় প্রথমবারের মতো জয়ের স্বাদ নিতে। অন্য দলের প্রার্থীদের কোনো তৎপরতা দেখা যায়নি। 
এ আসনে এবার নতুন ভোটার ১৪ হাজার ১শ’ ৬৪। যার মধ্যে খানসামায় ৩ হাজার ৯শ’ ৯৭ ও ফুলবাড়ীতে ৮ হাজার ১শ’ ৩৫ জন। মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ২৭ হাজার ৬শ’ ১০ জন। এর মধ্যে খানসামায় ১ লাখ ৫৩ হাজার ৭শ’ ৪৪ ও চিরিরবন্দরে ২ লাখ ৭৩ হাজার ৮শ’ ২৬ জন। এই আসনে খানসামা উপজেলায় ২ হাজার ৪শ’ ৬৩ ও চিরিরবন্দর উপজেলায় ৬ হাজার ৪শ’ ২২ জন ভোটার কর্তন করা হয়েছে।

এই আসনে বিএনপির মনোনয়ন চাইবেন আকতারুজ্জামান মিয়া ও সাবেক সেনা কর্মকর্তা কর্নেল (অব.) মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী। জামায়াতের চূড়ান্ত প্রার্থী সাবেক জেলা আমির, রংপুরের টিম সদস্য জামায়াত নেতা সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আফতাব উদ্দিন মোল্লা। আর কোন্ দল থেকে কে প্রার্থী হবেন তা জানা যায়নি। এনসিপি তাদের প্রার্থী চূড়ান্ত করলেও, প্রার্থীর নাম ঘোষণা করে নাই। 
দিনাজপুর-৫ (ফুলবাড়ি-পার্বতীপুর) ॥ রাজনৈতিক বিভাজনের কারণে ১৯৮৬ সালের পর থেকে এই আসন আওয়ামী লীগের দখলে চলে যায়। ২০২৪ সালে ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এখন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা ঘরছাড়া হয়ে পড়েছে। ফলে এই আসনটি বিএনপির দখলে ফিরে আসা প্রায় নিশ্চিত। এ সম্ভাবনাকে সামনে রেখে বিএনপির একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থী মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। একাধিক প্রার্থীর মনোনয়ন যুদ্ধে বিভাজন হয়ে পড়েছেন দলীয় নেতা-কর্মীরাও। তবে বসে নেই বর্তমান সময়ের একমাত্র প্রতিপক্ষ জামায়াত ও এনসিপি। বিএনপির বিভাজনের রাজনীতিকে কাজে লাগাতে চায় বিরোধীপক্ষ।
বিএনপির কেন্দ্রীয় একাধিক সূত্রে জানা গেছে, দলীয় প্রয়োজনে নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টির লক্ষ্যে এবার তরুণ ও শিক্ষিতদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। দলের এই সিদ্ধান্তকে সামনে রেখে একাধিক তরুণ প্রার্থী মাঠে নেমেছেন। বিএনপির মনোনয়ন যুদ্ধে মাঠে নেমেছেন বিগত ১৯৯৬ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত বিএনপির মনোনয়নে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দিনাজপুর জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক, পার্বতীপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি এজেডএম রেজওয়ানুল হক, যুক্তরাজ্য বিএনপির সহ-সভাপতি ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ব্যক্তিগত আইন উপদেষ্টা ব্যরিস্টার একেএম কামরুজ্জামান, সাবেক ছাত্রনেতা ও হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালযের অধ্যাপক নওশের ওয়ান, ফুলবাড়ী উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাবেক ভিপি মোস্তাক আহম্মেদ চৌধুরী খোকন, পার্বতীপুর উপজেলা যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া বাচ্চু, জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় নেতা নুরুল হুদা দুলাল, ফুলবাড়ী উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ খুরশিদ আলম মতি, ফুলবাড়ি পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শাহাদৎ আলী সাহাজুলও।
অন্যদিকে, মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন জামায়াতে একক প্রার্থী দিনাজপুর শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের নেতা মাওলানা আনারুল হক। তিনি পার্বতীপুর সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান। জামায়াত নেতারা বলছেন, তাদের প্রার্থী এলাকায় জনপ্রিয়। বিএনপির ভেতরে যে বিভাজন সৃষ্টি হয়েছে, তাতে তাদের জয়লাভ করা সহজ হয়ে যাবে। এনসিপির নেতা ডাক্তার আহাদ প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা দিলেও, এলাকায় তেমন কোন গণসংযোগ করতে তাকে দেখা যাচ্ছে না।
দিনাজপুর-৬ (বিরামপুর, হাকিমপুর, নবাবগঞ্জ ও ঘোড়াঘাট) ॥ চার উপজেলা নিয়ে গঠিত জেলার বৃহত্তম এ আসন। এবার এই আসনে বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী থাকায় ভোটের সমীকরণ উল্টে যেতে পারে। তবে দিনাজপুর-৬ আসনে দু’বার নির্বাচিত হওয়া জামায়াত আসনটি উদ্ধারে জোরালো ভূমিকা পালন করছে। এ আসনে বিএনপি থেকে মনোনয়ন পাওয়ার আশা করছেন এই এলাকায় বেশ জনপ্রিয় নেতা ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন। তিনি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য। সেই সঙ্গে দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও আস্থাভাজন। ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন এরই মধ্যে দলকে সংগঠিত রাখতে এ আসনের চার উপজেলার নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করছেন। 
অন্যদিকে, আসন পুনরুদ্ধারে একক প্রার্থী হিসেবে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন জেলা জামায়াতের সাবেক আমির ও বর্তমানে কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য আনোয়ারুল ইসলাম। এ আসনে প্রার্থী দিয়েছে অন্য ইসলামি দলও। তাদের মধ্যে ইসলামী আন্দোলনের দিনাজপুর দক্ষিণ জেলা সভাপতি ডা. নুর আলম সিদ্দিক, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস জেলা শাখার সহ-সভাপতি মুফতি নুরুল করিম ও এবি পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার সানী আবদুল হক উল্লেখযোগ্য।
এ আসনে এবার নতুন ভোটার ২৭ হাজার ২শ’ ২৬ জন। ভোটের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ১৯৯১ সাল থেকে জামায়াত দুবার, বিএনপি একবার ও আওয়ামী লীগ প্রার্থী পাঁচবার এই আসনে নির্বাচিত হন। 
নির্বাচন যতই এগিয়ে আসছে প্রার্থী দেওয়া নিয়েও মেরুকরণে পরিবর্তনের তথ্যও বেরিয়ে আসছে। তৃণমূলের অনেকেই মনে করেন, বিএনপি থেকে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য চিকিৎসক নেতা ও বিএনপি চেয়ারপারসনের ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন এই আসন থেকে নির্বাচন না করলে বিএনপি প্রার্থীর জয় পাওয়া কষ্টকর হবে।

জামায়াত তাদের মনোনীত প্রার্থীর নাম অনেক আগেই ঘোষণা করেছে। জাতীয় পার্টি, এনসিপির কোনো সাংগঠনিক কাঠামো নেই বললেই চলে। বাম ও ইসলামি এবং নতুন নতুন দলের প্রার্থী কিংবা নেতাকর্মীদের কোনো সাড়াশব্দ শোনা যাচ্ছে না। তবে এখানে লড়াই হবে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যেই।

প্যানেল হু

×