ঢাকা, বাংলাদেশ   মঙ্গলবার ১৭ মার্চ ২০২৬, ৩ চৈত্র ১৪৩২

তরুণ-তরুণীরা খুঁজে নেন জীবনসঙ্গী

বাঁশের বাঁশি, ঢোল মাদলে উতলা মন, মাঠজুড়ে হস্তশিল্পের পসরা

স্টাফ রিপোর্টার, দিনাজপুর

প্রকাশিত: ২৩:৫৯, ৪ অক্টোবর ২০২৫

বাঁশের বাঁশি, ঢোল মাদলে উতলা মন, মাঠজুড়ে হস্তশিল্পের পসরা

দিনাজপুরের বীরগঞ্জে আদিবাসীদের মিলনমেলায় বসেছে নানা পণ্যের পসরা। এ মেলা থেকে জীবনসঙ্গী খুঁজে নেন তরুণ-তরুণীরা

কেউ বলেন ‘আদিবাসী মিলনমেলা’, কেউ বলেন ‘জীবনসঙ্গী খোঁজার মেলা’। নাম যাই হোক ঐতিহ্যবাহী অভিনব এই অনুষ্ঠান শুধু আদিবাসীদেরই নয় সমতলের মানুষকেও করেছে মুগ্ধ। এই মেলা থেকে তরুণ-তরুণীরা তাদের পছন্দের মানুষকে খুঁজে নিতে পারেন। করতে পারেন বন্ধুত্বও। এমন অভিজ্ঞতালব্ধ জেলার বীরগঞ্জের আদিবাসী প্রবীণ নেতা রবার্ট বাস্কে। তিনি বলেন, আমাদের সময়ও এই মেলা ছিল সবচেয়ে বড় উৎসব।

তখনো তরুণ-তরুণীরা এখানে পরিচিত হতো, বিয়ের সিদ্ধান্ত নিত। আজও সেই ধারাবাহিকতা বজায় আছে দেখে আমরা গর্বিত। একইভাবে আদিবাসী তরুণী এলিনা সরেন বলেন, এই মেলায় আসা মানেই আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করা। নাচ, গান আর আনন্দে ভরপুর সময় কাটানো। 
দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলায় উৎসবমুখর পরিবেশে শুক্রবার বিকেল তিনটা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত গোলাপগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে আয়োজন করা হয় এই মিলনমেলার।
ফিবছর দুর্গাপূজার বিজয়া দশমীর পরদিন আদিবাসীদের এই মিলনমেলার আয়োজন করা হয়ে থাকে। এতে আদিবাসী তরুণ-তরুণীরা নিজেদের সংস্কৃতি তুলে ধরার পাশাপাশি, একে অপরকে পছন্দ করে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ার সুযোগ পান বলেই মেলাটি ‘জীবনসঙ্গী খোঁজার মেলা’ হিসেবে সমধিক পরিচিতি লাভ করেছে। 
ঐতিহ্যবাহী বাঁশের বাঁশি, ঢোল, মাদলসহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের সুরে মেলার পরিবেশ আনন্দমুখর হয়ে ওঠে। আদিবাসী তরুণ-তরুণীদের নাচ-গানে মাতোয়ারা হন দর্শনার্থীরা। পাশাপাশি হস্তশিল্প, খেলনা ও খাদ্যপণ্যের দোকান মেলাকে আরও রঙিন করে তোলে। আশপাশের বিভিন্ন উপজেলা থেকে আসা শত শত আদিবাসী নারী-পুরুষের উপস্থিতিতে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে এই মেলা। ঐতিহাসিক নৃত্য, গান আর বাদ্যযন্ত্রের মাধ্যমে তারা নিজেদের সংস্কৃতি তুলে ধরেন। মাঠজুড়ে বসে পোশাক, খেলনা, খাবার এবং হস্তশিল্পের পসরা। 
মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন আদিবাসী সমাজ উন্নয়ন সম্মতির আহ্বায়ক জোসেফ হেমব্রম। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বীরগঞ্জ উপজেলা বিএনপি সভাপতি মঞ্জুরুল ইসলাম মঞ্জু।
দিনাজপুর সদর উপজেলার নশিপুর গ্রামের তরুণী মারিয়া সরেন বলেন, মেলায় এসে আমরা আমাদের নাচ-গান পরিবেশন করতে পারিÑ যা আমাদের সংস্কৃতির প্রাণ। সেই সঙ্গে নতুন বন্ধু পাওয়া যায়। কেউ কেউ জীবনসঙ্গীও খুঁজে নেয়। এ জন্য আমাদের সমাজে এই মেলা গুরুত্বপূর্ণ। 
নবাবগঞ্জ উপজেলার আফতাবগঞ্জ গ্রামের তরুণ গণেশ হেমব্রম বলেন, আমরা সারা বছর কঠোর পরিশ্রম করি। এই মেলাই আমাদের আনন্দের সবচেয়ে বড় উপলক্ষ। এখানে এসে আমরা শুধু আনন্দই করি না, বরং আমাদের সংস্কৃতির ঐতিহ্য অন্যদের কাছে তুলে ধরতে পারি।
দিনাজপুর সদরের গোপালগঞ্জ গ্রামের আদিবাসী গৃহবধূ বাতাসী মুর্মু বলেন, আমি চাই আমাদের ছেলেমেয়েরা এই মেলার মাধ্যমে নিজেদের সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত থাকুক। এখনো আমাদের সমাজে এই মিলনমেলা পারিবারিক বন্ধন ও বিবাহের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। 
প্রধান অতিথি মনজুরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, আদিবাসী সমাজের এই ঐতিহ্যবাহী মিলনমেলা শুধু বিনোদন নয়, বরং সংস্কৃতি সংরক্ষণের একটি জীবন্ত মাধ্যম। এখানে তরুণ-তরুণীরা নিজেদের সংস্কৃতির শেকড়ের সঙ্গে পরিচিত হয়। এর মধ্য দিয়ে পারস্পরিক পরিচয় ও বিবাহ বন্ধনের সুযোগ তৈরি হয়। আমি চাই, এই মেলা ভবিষ্যতেও একইভাবে অনুষ্ঠিত হোক এবং সরকারসহ সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে সহযোগিতা বাড়ানো হোক। এ ধরনের আয়োজন আদিবাসী সমাজকে একত্রিত করে এবং নতুন প্রজন্মকে নিজেদের ঐতিহ্য লালন করতে উৎসাহিত করে।
মেলায় উপজেলা প্রশাসন ও উপজেলা পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

প্যানেল হু

×