ঢাকা, বাংলাদেশ   সোমবার ২২ এপ্রিল ২০২৪, ৯ বৈশাখ ১৪৩১

কুসিক নির্বাচন

তরুণ ও নারী ভোটাররা হতে পারে হার-জিতের নিয়ামক

নিজস্ব সংবাদদাতা, কুমিল্লা

প্রকাশিত: ০০:১৮, ১ মার্চ ২০২৪

তরুণ ও নারী ভোটাররা হতে পারে হার-জিতের নিয়ামক

কুমিল্লা সিটি করপোরেশন

কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের আওতাধীন দক্ষিণাংশের সদর দক্ষিণ উপজেলার ৯টি ওয়ার্ড নতুন প্রজন্মের তরুণ ভোটার ও বেশিরভাগ অংশের নারী ভোটাররাই সিটি নির্বাচনে হতে পারেন জয়-পরাজয়ের নিয়ামক শক্তি। এ বিষয়গুলোকে মাথায় রেখে ৪ মেয়র প্রার্থীর চোখ এখন এসব ভোটারদের দিকে। তাই ভোটারদের কাছে টানতে প্রার্থীরা ছুটছেন বাড়ি বাড়ি, দিচ্ছেন নানান প্রতিশ্রুতিও।

এছাড়া বৃহস্পতিবারও নগরজুড়ে প্রার্থী ও তাদের নেতাকর্মীদের ব্যাপক গণসংযোগ, উঠান বৈঠক, লিফলেট বিতরণে ভোটের মাঠ ছিল বেশ সরগরম। এদিকে বৃহস্পতিবার দুপুরে নির্বাচন কমিশনার আনিছুর রহমান কুমিল্লা সার্কিট হাউসের কনফারেন্স রুমে সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রথমে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। পরে তিনি নির্বাচনে মেয়র পদে ৪ প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ও তাদের এজেন্টদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় মিলিত হন।

পরে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, কেন্দ্রে ভোটারের উপস্থিতি বাড়াতে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে প্রচার-প্রচারণা চালানো হবে। ভোট কেন্দ্রে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা থাকবে। তাই ম্যাসালম্যান প্রবেশ করতে পারবে না। ইভিএমের মাধ্যমে কাউকে হারানোর সুযোগ নেই, তাই ইভিএমকে বিতর্কিত করারও সুযোগ নেই।
জানা গেছে, দেশের প্রাচীন জেলা কুমিল্লা পৌরসভাকে সিটি করপোরেশন ঘোষণার পর গত প্রায় ১৩ বছরে জনসংখ্যা দ্রুত বেড়ে অন্তত ১০ লাখে ঠেকেছে। নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে এ সিটির ভোটার সংখ্যা ২ লাখ ২৯ হাজার ৯২০ জন। এদের মধ্যে নারী ভোটার ১ লাখ ১৭ হাজার ৯২ জন, পুরুষ ভোটার ১ লাখ ১২ হাজার ৮২৬ জন। ভিন্ন লিঙ্গের হিজরা ভোটার ২ জন।

এক্ষেত্রে পুরুষ ভোটারের চেয়ে নারী ভোটার ৪ হাজার ২৬৬ জন বেশি। এদিকে বিগত সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পর এ দেড় বছরে নতুন প্রজন্মের অন্তত সাড়ে ১২ হাজার ভোটার বেড়েছে। অপরদিকে সিটি করপোরেশনের মোট ২৭টি ওয়ার্ডের মধ্যে দক্ষিণাঞ্চলের ৯টি ওয়ার্ড সদর দক্ষিণ উপজেলায় অবস্থিত। এই ৯টি ওয়ার্ডের ৩২টি ভোট কেন্দ্রে ভোটার সংখ্যা ৬৭ হাজার ২০ জন। সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে নির্বাচনে অংশ নেওয়া চার প্রার্থীর সকলের বাড়ি নগরীর কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত।

তাদের কেউই ওই দক্ষিণাঞ্চলে বসবাস করেন না। এসব কারণে তরুণ প্রজন্ম ও নারী ভোটারসহ দক্ষিণাঞ্চলের ৯টি ওয়ার্ডের ভোটাররাই হতে পারেন প্রার্থীদের জয়-পরাজয়ের ফ্যাক্টর। ইতোমধ্যে তরুণ প্রজন্মকে কাছে টানতে ও তাদের মন জয় করতে প্রার্থীরা উৎসাহ সৃষ্টির পাশাপাশি দিচ্ছেন নানান প্রতিশ্রুতিও। আইটি সেক্টরের উন্নয়নের মাধ্যমে তরুণদের দক্ষতা বৃদ্ধি, স্মার্ট সিটি গঠনসহ কর্মসংস্থানের ঘোষণা দিচ্ছেন কোনো কোনো প্রার্থী। এবারের নির্বাচনে ৪ জন প্রার্থীর মধ্যে একজন মাত্র নারী প্রার্থী।

তিনি নিজে নারী হয়ে নারীদের উন্নয়নে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থানের ঘোষণা দিয়ে নারী ভোটারদের মাঝে জাগরণ সৃষ্টি করেছেন বলে দাবি করেন। এদিকে সিটি করপোরেশনের দক্ষিণাঞ্চলের ৯টি ওয়ার্ডের ভোটারদেরও কাছে টানতে প্রার্থীরা দিচ্ছেন নানান প্রতিশ্রুতি। তবে কুমিল্লা মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সদর দক্ষিণ উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাবলু জানান, ওই ৯টি ওয়ার্ডের কাক্সিক্ষত উন্নয়ন না হওয়ায় সাবেক অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের পরামর্শে ওয়ার্ড ৯টিকে কুমিল্লা সদর আসনের সঙ্গে সংযুক্ত করে সিটি করপোরেশনের আওতায় আনা হয়।

তিনি বলেন, বিগত সময়ে ওই এলাকায় সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধানে কোনো উন্নয়ন না হলেও সদর আসনের সংসদ সদস্য আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহার ওই ৯টি ওয়ার্ডের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে প্রায় ৪শ কোটি টাকা বরাদ্দ দেন। এছাড়া ওই এলাকার বয়োঃবৃদ্ধ ও তরুণ-যুবক ভোটারদের বড় একটি অংশ আওয়ামী ঘরানার। ফলে এ উন্নয়নের কথা মনে রেখে তারা এবার একমাত্র নারী প্রার্থী আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহারের কন্যা ডা. তাহসিন বাহার সূচনার বাস প্রতীকে ভোট দেবেন। স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, এতদাঞ্চলের ভোটের বৃহৎ অংশটি যারাই টানতে পারবেন সেই জয়ের বন্দরে পৌঁছতে পারবেন।
নির্বাচন কমিশনারের মতবিনিময় ॥ বৃহস্পতিবার দুপুরে কুমিল্লা সার্কিট হাউসের হল রুমে নির্বাচন কমিশনার আনিছুর রহমান আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। পরে তিনি ৪ মেয়র প্রার্থী ও তাদের এজেন্টদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় মিলিত হন। এ সময় প্রার্থীদের মধ্যে বাস প্রতীকের প্রার্থী ডা. তাহসিন বাহার সূচনা বলেন, নির্বাচন সকলে মিলে সুন্দরভাবে সম্পন্ন করতে হবে। কুমিল্লা শান্তির শহর, কেউ অভিযোগ করলে তার প্রমাণ রাখতে হবে।

ভুল ও মিথ্যা অভিযোগ করে অন্য প্রার্থীকে হয়রানি করা হচ্ছে। টেবিল ঘড়ি প্রতীকের মনিরুল হক সাক্কু বলেন, ভোটারদের একটাই শঙ্কা, তারা নির্বাচনের কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে পারবে কি-না। আপনারা পর্যাপ্ত পুলিশ দেন, কেন্দ্রগুলোতে তাহলে ভোটাররা আসতে পারবে। ঘোড়া প্রতীকের নিজাম উদ্দিন কায়সার বলেন, নির্বাচন পরিচালনার জন্য একজন নির্বাচন কমিশনারকে আমরা এখানে চাই। এছাড়া বর্তমান সাংসদ যদি নির্বাচন আচরণবিধির আওতায় পড়েন, তাহলে ওনাকেও এই আওতায় আনতে হবে। হাতি প্রতীকের নূর-উর-রহমান তানিম বলেন, আমার পোস্টার ছিঁড়া হচ্ছে প্রকাশ্যে, এগুলো বন্ধ করতে হবে। 
ইভিএমকে বিতর্কিত করার সুযোগ নেই- নির্বাচন কমিশনার আনিছুর রহমান ॥ মতবিনিময় সভা শেষে নির্বাচন কমিশনার আনিছুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটের থেকে ভালো জাতীয় নির্বাচন দেওয়া সম্ভব না। আপনারা আমার জায়গায় আসুন, তাহলে বুঝবেন। অন্য জায়গায় থেকে তো অনেক কথা বলা যায়। পরিস্থিতিটা তো বুঝতে হবে।

তিনি বলেন, সিটি নির্বাচনে সিসি ক্যামেরা থাকবে না, তবে যেসব প্রতিষ্ঠানে সিসি ক্যামেরা রয়েছে, সেগুলো বেসরকারিভাবে রাখা হবে। কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচন এবারও সুষ্ঠু-সুন্দরভাবে হবে। কোনো অপশক্তিকে ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করার সুযোগ দেওয়া হবে না। ইভিএম প্রসঙ্গে নির্বাচন কমিশনার আনিছুর রহমান বলেন, ইভিএম নিয়ে একটি রাজনৈতিক দল মিথ্যাচার করছে, সত্য বলতে ইভিএমে ভোট চুরির সুযোগ নেই।

যারা এসব কথা বলে তারাই মিথ্যাচার করছেন। ইভিএমকে বিতর্কিত করার সুযোগ নেই। তিনি আরও বলেন, এ নির্বাচনে ভোটের আগের দিন থেকে ভোটের পরদিন রাত ৮টা পর্যন্ত সিটি এলাকায় মোটরসাইকেল চলাচল বন্ধ থাকবে। বিগত নির্বাচনে ভোট কারচুপি হয়নি, তবে অভিযোগ করছেন দুই প্রার্থী, এবারও ফলাফল বিড়ম্বনার কোনো সুযোগ নেই, লাগাতার ফলাফল ঘোষণা করা হবে। ফলাফল ঘোষণার কেন্দ্রে কোনো সাধারণ মানুষ ঢুকতে পারবে না।

প্রার্থীদের তেমন কোনো অভিযোগ নেই, আমাদের পাশাপাশি প্রার্থীদের এগিয়ে আসতে হবে। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটা স্থানীয় সংসদ সদস্যের নিজ এলাকা। এখানে তিনি থাকবেন, এখানকার ভোটার তিনি, এটাই তো স্বাভাবিক, তবে নির্বাচনে আচরণবিধি লঙ্ঘন করা যাবে না। 
প্রসঙ্গত, ২০২২ সালের কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের তৃতীয় নির্বাচনে মেয়র নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকা প্রতীকের আরফানুল হক রিফাত। ২০২৩ সালের ১৩ ডিসেম্বর চিকিৎসা চলাকালে তার মৃত্যু হয়। এরপর কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের মেয়র পদটি শূন্য ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন উপনির্বাচনে তারিখ ঘোষণা করে। আগামী ৯ মার্চ ১০৫টি ভোট কেন্দ্রের ৬৪০টি কক্ষে ভোট নেওয়া হবে। নির্বাচন ইভিএমে অনুষ্ঠিত হবে।

×