ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ১৬ জুন ২০২৪, ২ আষাঢ় ১৪৩১

পঞ্চগড়ে মুসল্লি-পুলিশ সংঘর্ষ

প্রকৌশলী একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ মা

নিজস্ব সংবাদদাতা, নাটোর 

প্রকাশিত: ১৮:৫১, ৪ মার্চ ২০২৩

প্রকৌশলী একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ মা

মুসল্লি-পুলিশ সংঘর্ষে নিহত প্রকৌশলী জাহিদ হাসান

পঞ্চগড়ে মুসল্লিদের সাথে পুলিশের সংঘর্ষে নাটোরের বড়াইগ্রামের নটাবাড়ীয়া গ্রামের বাসিন্দা প্রকৌশলী জাহিদ হাসান (২৬) নিহতের ঘটনায় নিজ বাড়ীতে চলছে শোকের মাতম। জাহিদ হাসানের মা জরিনা বেগম তার একমাত্র ছেলেকে হারানোর শোকে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন। ছেলের মৃত্যুতে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। কারো সাথে কথা বলতে পারছেন না। তার আহাজারিতে এলাকা জুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। 

শনিবার (৪ মার্চ) সন্ধ্যা ৭টা নাগাদ নিহত জাহিদের মরদেহ তার নিজ গ্রামের বাড়ীতে নিয়ে আসা হবে বলে জানা গেছে। বিএসসি প্রকৌশলী পাশ করার পরে মাত্র ৬ মাস হলো জাহিদ ঢাকাস্থ বায়োটেক ইন্টারন্যাশনাল নামক প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছিলো। অনেক ঋণ করে বাবা নৈশ প্রহরী আবু বক্কর ও মা জরিনা বেগম ছেলেকে লেখাপড়া শিখিয়েছিলেন। ঋণের টাকা এখনও পরিশোধ হয়নি। 

কিন্তু পঞ্চগড়ে আহমদিয়া মুসলিম জামাতের বার্ষিক জলসায় গিয়ে মুসল্লি ও পুলিশের সংঘর্ষে ইটের আঘাতে ঘটনাস্থলেই মারা যান জাহিদ। ওই জলসায় তার পিতা আবু বক্করসহ অন্যান্য চাচারাও অংশ নিতে উপস্থিত ছিলো। নিহত জাহিদ হাসান বগুড়া পুন্ড্র ইউনিভার্সিটি অফ সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি থেকে বিএসসি ইন ডিপার্টমেন্ট অফ ইলেক্ট্রিক্যাল এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) ডিগ্রী নেওয়ার পর প্রায় ছয় মাস আগে ঢাকার বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বায়োটেক ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড এ চাকরি নেন।

নিহত জাহিদ হাসানের বড় বোন শাকিলা খাতুন জানান, আমার ভাই ঢাকায় চাকরি করে। পঞ্চগড়ের এক বন্ধুর আমন্ত্রণে বৃহস্পতিবার জাহিদ ঢাকা থেকে এবং আমার বাবা ও চাচাও বাড়ি থেকে সেখানে জলসায় যান। শুক্রবার রাত ১০টার পর মোবাইলে আমার ভাইকে হত্যার খবর শুনতে পাই। এ সময় ওই বন্ধুর নাম পরিচয় বারবার জানতে চাইলেও তারা জানেন না বলে জানান। 

তিনি আরো জানান, আমাদের দুই বোনকে বিয়ে দেয়ার পর কষ্ট করেই বাবা-মা জাহিদকে লেখাপড়া শেখায়। বছর খানেক আগে চাকরি পেয়েছে সে। তার আয়েই বাবা-মার সংসার চলে। তাকে নিয়ে কত স্বপ্ন ছিলো পরিবারের। কিন্তু নিমেষেই শেষ হয়ে গেলো সব।  

স্থানীয় মসজিদের ইমাম হোসাইন আহমেদ জানান, তারা ওয়াক্তিয়া নামাজেও আসেন না। আর জুম্মার নামাজ উপজেলার মৌখাড়া এলাকার এক মসজিদে গিয়ে পড়েন। আমরা ভাবতাম তারা আহলে হাদিস হয়েছে। কিন্তু এখন শুনছি তারা নাকি কাদিয়ানী। 

নিহতের চাচাতো ভাই রেজাউল করিম জানান, নাটোর সরকারী টেকনিক্যাল স্কুল এন্ড কলেজ থেকে এসএসসি ও ডিপ্লোমা পাশ করেন জাহিদ। পরে তিনি বগুড়া পুন্ড্র ইউনিভার্সিটি অফ সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি থেকে বিএসসি ইন ডিপার্টমেন্ট অফ ইলেক্ট্রিক্যাল এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) ডিগ্রী নেন। এরপর জাহিদ ঢাকার বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বায়োটেক ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড এ চাকরি নেন। দরিদ্র কৃষক আবু বকর সিদ্দিকের একমাত্র ছেলে তিনি। তার উপার্জনেই সংসারটি চলতো। চাকরির পাশাপাশি স্কলারশীপ নিয়ে জাহিদ উচ্চ শিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন বলে তিনি জানান। 

মাঝগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের ওয়ার্ড সদস্য আব্দুর রউফ জানান, আমাদের এলাকায় কাদিয়ানী আছে বলে শুনিনি। তবে জাহিদ লেখাপড়া করতে গিয়ে কোনভাবে তাদের সাথে জড়িত হয়েছে কিনা জানি না। তবে ছেলেটির এমন মৃত্যু খুবই বেদনাদায়ক। 

বড়াইগ্রামের জোয়াড়ি ইউপি চেয়ারম্যান আলী আকবর জানান, অনেক কষ্টে একমাত্র ছেলেকে লেখাপড়া শিখিয়েছে আবু বক্কর। লেখাপড়া শেখাতে গিয়ে বিভিন্ন জায়গায় সুদে ৪ লক্ষ টাকা দেনা রয়েছে তার। ছেলেটাও ভালো চাকরী পেয়েছিলো। ভেবেছিলো বছর দু’য়েক এর মধ্যে দেনা শোধ হলে ছেলেকে বিয়ে দিবে। কিন্তু সে ম্বপ্ন তার নিমিষেই ধূলোয় মিশে গেলো। 

জানা যায়, ছেলে জাহিদ হাসান গত শুক্রবার সকাল ১০টায় পঞ্চগড়ে পৌঁছায়। আহমদিয়া অনুসারী হিসেবে পঞ্চগড় জেলার আহমেদ নগরে অনুষ্ঠিত তিনদিনের আহমদিয়া মুসলিম জামাতের বার্ষিক জলসায় অংশ নিতে তারা যায়। এ জলসা শুরু হয় বৃহস্পতিবার রাতে। সেখানে আহমদিয়া বিরোধীরা এ জলসা বন্ধের দাবিতে পঞ্চগড় শহরে শুক্রবার সকালে বিক্ষোভ করে ও দুপুরে তা সংঘর্ষে রুপ নেয়। প্রায় ৬ ঘণ্টা ধরে চলা এ সংঘর্ষে আরিফুর রহমান (২৮) ও জাহিদ হাসান (২৬) নামের দুইজন নিহত হন। সংঘর্ষে পুলিশের ৯ সদস্য ও ২ সাংবাদিকসহ অন্তত ৫০ জন আহত হয়। সংঘর্ষে জাহিদ হাসান মাথায় ও মুখে ইটের আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে ঘটনাস্থলেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে বলে জানায় পিতা আবু বক্কর। 
 

এমএস

×