ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ০৯ জুন ২০২৩, ২৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩০

সিলেটে বিএনপি নেতা কামাল খুন

নেপথ্যে ব্যবসায়িক না রাজনৈতিক বিরোধ

স্টাফ রিপোর্টার, সিলেট অফিস

প্রকাশিত: ২৩:৩৮, ৭ নভেম্বর ২০২২

নেপথ্যে ব্যবসায়িক না রাজনৈতিক বিরোধ

আফম কামাল

সিলেটে বিএনপি নেতা আফম কামাল খুনের ঘটনা নিয়ে রবিবার রাতে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে নগরীর রাজপথ। রাতে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ মিছিল বের করে। এ সময় বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার ছবিসংবলিত ব্যানার-ফেস্টুন ও বিলবোর্ড ভাংচুর করা হয়। ব্যবসায়িক না রাজনৈতিক বিরোধ থেকে হত্যাকা- সংঘটিত হয়েছে সেটা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।

রাতে উত্তেজনার পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সোমবার নগরীতে বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার করতে পুলিশ সিসিটিভির ফুটেজ সংগ্রহ করেছে। সিসিটিভির ফুটেজ দেখে হত্যাকা-ে অংশ নেয়া যুবকদের গ্রেপ্তারে চেষ্টা চালাচ্ছে পুলিশ। তবে এ ব্যাপারে কোনো মামলা দায়ের হয়নি। সোমবার ময়নাতদন্ত শেষে লাশ পরিবারের কাছে হস্থান্তর করা হয়েছে।
রবিবার রাত ৯টার দিকে নগরীরর আম্বরখানা বড় বাজার এলাকায় দুর্বৃত্তদের ছুরিকাঘাতে খুন হন বিএনপি নেতা আফম কামাল। তিনি সিলেট জেলা বিএনপির সাবেক স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক এবং সিলেট জেলা ছাত্রদলের সাবেক প্রচার সম্পাদক। তার বাসা নগরীর সুবিদবাজার এলাকায়। বিএনপি নেতাকে হত্যার প্রতিবাদে রাত ১১টার দিকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল এলাকা থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা।

লাঠিসোঁটা নিয়ে এই মিছিলে অংশ নেন অনেকে। মিছিল থেকে সিলেট ও জেলা ও আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি সভা উপলক্ষে মহানগরের বিভিন্ন স্থানে নির্মিত তোরণ ও ব্যানার-ফেস্টুন ভাঙচুর করা হয়। এছাড়া সিলেট জেলা ও আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি সভার স্থান রিকাবীবাজার এলাকার কবি নজরুল অডিটরিয়ামে নির্মিত বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রীর ছবিসংবলিত বিলবোর্ড ভাঙচুর করা হয়।

এখানে রবিবার সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। সোমবার সেখানে জেলা আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেজন্য রিকাবিবাজার পয়েন্টসহ আশপাশে বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার ছবিসংবলিত ব্যানার-ফেস্টুন ও বিলবোর্ড টানিয়েছেন জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ।
এদিকে, বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার ছবি ভাঙচুরের প্রতিবাদে তাৎক্ষণিক বিক্ষোভ মিছিল করে আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগ ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। এ সময় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ছাত্রদলকে ধাওয়া করে। দুপক্ষের মাঝে বেশ কয়েকবার ধাওয়া পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এছাড়াও এ সময় কয়েকটি দোকানের শাটার ও একটি প্রাইভেটকার ভাঙচুর করা হয়। একটি মোটরসাইকলেও অগ্নিসংযোগ করা হয়।

পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে দুপক্ষকে সরিয়ে দিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করে। মিছিল পরবর্তী সমাবেশে আওয়ামী লীগ নেতারা বলেন, রাতের মধ্যে ছবি ভাঙচুরকারীদের গ্রেপ্তার করা না হলে ১৯ নভেম্বর অনুষ্ঠিতব্য বিএনপির সিলেট বিভাগীয় গণসমাবেশ প্রতিহত করা হবে। সোমবার দুপুরে সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে নিহত বিএনপি নেতা আফম কামালের মরদেহের ময়নাতদন্ত করা হয়। ময়নাতদন্তকালে বিএনপি নেতা আফম কামালের শরীরে ২৩টি আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়।

এর মধ্যে প্রায় সবক’টি আঘাতের চিহ্নই গুরুতর। ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক ও সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. শামসুল ইসলাম জানান, ধারালো অস্ত্রের আঘাতে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণেই মারা গেছেন আফম কামাল। তার শরীরের বাম পাশেই সব আঘাতের চিহ্ন। তিনি জানান, বাম হাত, বুকের বাম পাশ, বামপাশের কাঁধের নিচ, পায়ের উরুতে এসব আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।
 কামাল কিলিং মিশনে অংশ নেন পাঁচ যুবক।

বিষয়টি নিশ্চিত করে সিলেট মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার (উত্তর) আজবাহার আলী শেখ বলেন, নিহত বিএনপি নেতার সঙ্গে ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বের কারণে হত্যাকা-ের ঘটনাটি ঘটতে পারে। দ্বন্দ্ব নিয়ে কোতোয়ালি থানায় মামলাও হয়েছিল। এই মামলার ৪ নম্বর আসামি ছিলেন আফম কামাল। ধারণা করা হচ্ছে, ব্যবসায়িক বিরোধের জেরে হত্যাকা-ের ঘটনা ঘটতে পারে। প্রত্যক্ষদর্শীর বরাত দিয়ে তিনি বলেন, আফম কামাল প্রাইভেটকারে চালকের আসনে ছিলেন।

তাকে পেছন থেকে একটি মোটরসাইকেল অনুসরণ করছিল। তাতে ছিলেন তিন যুবক। এদিকে ঘটনাস্থলে আসামাত্র আরেকটি মোটরসাইকেলে করে দুই যুবক সামনে থেকে কামালের গাড়ির গতিরোধ করেন। পরে তার বুকে ও হাতে ছুরিকাঘাত করে দুর্বৃত্তরা সটকে পড়ে। এরপর গিয়ারে পা পড়া অবস্থায় সিটে পড়েছিলেন কামাল। ফলে গাড়িটি সামনের চাকা মোটরসাইকেলের ওপরে উঠে যায়।

প্রথমে লোকজন এটিকে দুর্ঘটনা মনে করলেও পরে বুঝতে পারে যে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এরপর স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। হত্যাকা-ের ঘটনায় এরইমধ্যে সন্দেহভাজন হিসেবে একজনকে আটক করা হয়েছে।
জানা গেছে, গত কয়দিন আগে বিএনপির গণসমাবেশ নিয়ে নেতাকর্মীরা সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) ৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ফরহাদ চৌধুরী শামীমের বাসায় বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে আফম কামালও ছিলেন। বৈঠক থেকে বিএনপির গণসমাবেশের বিষয় নিয়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিলে বৈঠক অসমাপ্ত রেখে উঠে আসেন আফম কামালসহ কয়েকজন নেতাকর্মী। এ ঘটনার কারণে হত্যাকা- ঘটেছে কি না তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
এছাড়া আফম কামাল লাহিন এয়ার ইন্টারন্যাশনাল নামের রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে লোকজনকে বিদেশে পাঠানোর কাজেও জড়িত ছিলেন। সেখানে টাকা নিয়ে সৃষ্ট বিরোধে এক ব্যক্তির ওপর হামলার ঘটনায় জড়িত ছিলেন কামালও। এ ঘটনায় গত ২১ অক্টোবর আজিজুর রহমান সম্রাট নামে লামাকাজির এক ব্যক্তি কোতোয়ালি থানায় মামলা দায়ের করেন। ওই মামলার এজাহার নামীয় ৪ নম্বর আসামি ছিলেন আফম কামাল। মামলায় এজাহারনামীয় ১০ জনসহ অজ্ঞাত আরও ৫/৬ জনকে অভিযুক্ত করা হয়। এই ঘটনার জেরে হত্যাকা- হয়েছে কি না তাও খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
নিজেদের অবস্থান থেকে সরে এসেছে বিএনপি ॥ সিলেটে আফম কামাল হত্যাকা-ের ঘটনায় নিজেদের অবস্থান থেকে সরে এসেছে বিএনপি। বিএনপি নেতারা এই হত্যাকা-কে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত দাবি করলেও এখন মত পাল্টেছেন তারা। একই সঙ্গে কঠোর কর্মসূচী দেওয়ার হুমকি দিয়েও তা থেকে সরে এসেছেন। হত্যাকাণ্ডের পরপরই বিএনপির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে সরকারি দল এই হত্যাকা- ঘটিয়েছে।

রাতেই নগরে বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের বিক্ষোভ মিছিল থেকে আওয়ামী লীগের প্রতিনিধ সভা উপলক্ষে নির্মিত তোরণ, বিলবোর্ড ও ফেস্টুন ভাঙচুর করা হয়। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে প্রথম থেকেই ধারণা করা হচ্ছে, ব্যবসায়িক বিরোধ থেকে কামাল খুন হতে পারেন। এতে তার দলেরই কয়েকজন জড়িত থাকতে পারেন বলে সন্দেহ করছে পুলিশ। এ অবস্থায় আগের রাতের নিজের বক্তব্য থেকে সরে এসে সোমবার দুপুরে সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, কামাল হত্যাকা-ের ঘটনায় আমরা সবাই মর্মাহত।

এই হত্যাকা-কে রাজনৈতিক লেবাস দিতে চাই না। যে বা যারা জড়িত তাদের যেনো দ্রুত গ্রেপ্তার করা হয়। তবে নিরীহ কাউকে যেন হয়রানি করা না হয়। তিনি বলেন, কামাল হত্যার কারণে সিলেট বিএনপি মঙ্গলবার সকল সাংগঠনিক কার্যক্রম স্থগিত করেছে। আমরা সবাই তার জানাযায় অংশ নেব। মঙ্গলবার থেকে জেলা বিএনপির ৩ দিনের শোক পালন করবে। সবাই কালোব্যাজ পরিধান করবে। কাইয়ুম বলেন, ১৯ নভেম্বর আমাদের বিভাগীয় সমাবেশ।

এই সময়ের মধ্যে আসামিরা গ্রেপ্তার না হলে ২০ নভেম্বর থেকে কঠোর আন্দোলনে যাবে বিএনপি। যদিও রবিবার রাতে কামাল হত্যার পর ওসমানী মেডিক্যাল কলেজের সামনে তাৎক্ষণিক বিক্ষোভ সভায় কাইয়ুম চৌধুরী বলেছিলেন, আফম কামাল হত্যার সঙ্গে সরকার দলের সন্ত্রাসীরা জড়িত। যুবলীগ-ছাত্রলীগের ক্যাডাররাই এ হত্যাকা- ঘটিয়েছে। রবিবার রাতের মধ্যে কামালের খুনিরা গ্রেপ্তার না হলে সোমবার সকালে কঠোর কর্মসূচী দেওয়া হবে বলেও সেসময় ঘোষণা দিয়েছিলেন কাইয়ুম।