ছবি: দৈনিক জনকণ্ঠ।
ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য আনা প্রায় ১৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা মূল্যের অত্যাধুনিক লিনিয়ার এক্সিলারেটরসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি দীর্ঘ প্রায় এক দশক ধরে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। ২০১৭ সালে বিপুল ব্যয়ে এসব যন্ত্রপাতি হাসপাতালটিতে আনা হলেও এখন পর্যন্ত তা চালু করা সম্ভব হয়নি। ফলে কোটি কোটি টাকার সরকারি সম্পদ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে এবং একই সঙ্গে ক্যান্সার চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন হাজার হাজার রোগী।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ক্যান্সার রোগীদের আধুনিক চিকিৎসা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একটি ক্যান্সার পরীক্ষাগার ও রেডিয়েশন থেরাপি ইউনিট স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২০১৭ সালে এখানে আনা হয় অত্যাধুনিক লিনিয়ার এক্সিলারেটর (LINAC) মেশিনসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা সরঞ্জাম।
কিন্তু প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, জনবল এবং পর্যাপ্ত বাজেট না থাকায় দীর্ঘ সময় পার হলেও এই ক্যান্সার ইউনিটটি চালু করা যায়নি। অত্যন্ত সংবেদনশীল ও দামি এই যন্ত্রপাতিগুলো দীর্ঘদিন ধরে বাক্সবন্দি অবস্থায় পড়ে রয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে এসব যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, লিনিয়ার এক্সিলারেটর (LINAC) আধুনিক ক্যান্সার চিকিৎসার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্র। এটি মূলত রেডিয়েশন থেরাপি দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত হয়, যার মাধ্যমে উচ্চশক্তির রশ্মি ক্যান্সার কোষের ওপর প্রয়োগ করে সেগুলো ধ্বংস করা হয় বা তাদের বৃদ্ধি কমিয়ে আনা হয়।
এই মেশিনের মাধ্যমে অত্যন্ত নির্ভুলভাবে ক্যান্সার আক্রান্ত স্থানে রেডিয়েশন প্রয়োগ করা সম্ভব হয়। ফলে আশপাশের সুস্থ কোষ তুলনামূলক কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় সব উন্নত হাসপাতালেই ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এই মেশিনটি চালু করা গেলে ফরিদপুর, রাজবাড়ী, মাদারীপুর, শরীয়তপুর ও গোপালগঞ্জসহ অন্তত পাঁচ জেলার মানুষ সরাসরি উপকৃত হতেন। এতে ঢাকায় গিয়ে চিকিৎসা নেওয়ার চাপও অনেকটা কমে আসত।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ক্যান্সার ইউনিটটি চালু করার জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে একাধিকবার আবেদন জানিয়েছে।
২০২৫ সালের ২২ মে এবং একই বছরের ২৬ নভেম্বর দুই দফায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি পাঠানো হয়। সেই চিঠিতে প্রয়োজনীয় জনবল, অবকাঠামো এবং বাজেট বরাদ্দ দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়।
কিন্তু এতদিন পার হলেও এই বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি বলে জানিয়েছেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. হুমায়ূন কবির সাংবাদিকদের বলেন, “ক্যান্সার ইউনিটটি চালু করার জন্য আমরা দুই দফা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। জনবল এবং প্রয়োজনীয় বাজেট না থাকায় আমরা এই ইউনিটটি চালু করতে পারছি না।”
তিনি আরও বলেন, স্বাস্থ্য বিভাগে চিঠি দেওয়ার পর তারা বিষয়টি দেখার জন্য জাতীয় ক্যান্সার ইনস্টিটিউটকে অবহিত করেছে। কিন্তু সেখান থেকেও এখন পর্যন্ত কোনো অগ্রগতি হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে যন্ত্রপাতিগুলো বাক্সবন্দি অবস্থায় পড়ে রয়েছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে এগুলো নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
হাসপাতালের একাধিক চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, অত্যাধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম দীর্ঘদিন ব্যবহার না করলে সেগুলো কার্যক্ষমতা হারানোর ঝুঁকি থাকে। বিশেষ করে লিনিয়ার এক্সিলারেটরের মতো সংবেদনশীল যন্ত্র অনেকদিন বন্ধ অবস্থায় থাকলে এর বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তাদের মতে, যদি দ্রুত ইউনিটটি চালু করা না যায়, তাহলে বিপুল অর্থ ব্যয়ে কেনা এই মেশিনটি পুরোপুরি অকেজো হয়ে যেতে পারে। তখন সরকারের কোটি কোটি টাকার বিনিয়োগ কার্যত অপচয়ে পরিণত হবে।
ক্যান্সার রোগীদের জন্য চিকিৎসা একটি দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া। ফরিদপুর অঞ্চলের অধিকাংশ রোগীকেই বর্তমানে চিকিৎসার জন্য ঢাকায় যেতে হয়। এতে সময়, অর্থ এবং শারীরিক কষ্ট সবকিছুরই চাপ বেড়ে যায়।
স্থানীয়দের মতে, ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ক্যান্সার ইউনিট চালু হলে হাজার হাজার রোগী স্থানীয়ভাবেই চিকিৎসা পেতেন।
ফরিদপুরের সচেতন নাগরিকরা মনে করছেন, দ্রুত উদ্যোগ না নিলে এই প্রকল্পটি পুরোপুরি ব্যর্থ হয়ে যাবে। তারা দ্রুত ক্যান্সার ইউনিটটি চালুর জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।
স্থানীয়দের মতে, ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাকেন্দ্র। এখানে ক্যান্সার চিকিৎসা চালু করা গেলে শুধু ফরিদপুর নয়, আশপাশের কয়েকটি জেলার মানুষও উপকৃত হবেন।
এম.কে








