৩ এপ্রিল ২০২০, ২০ চৈত্র ১৪২৬, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 
সর্বশেষ

পদোন্নতি বঞ্চনায় শিক্ষা ক্যাডারে সঙ্কট, ক্ষোভ! দিনভর প্রতিবাদ

প্রকাশিত : ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২০
  • সরকারের ১০ বছরের অর্জন নষ্টের পথে
  • সাত শ’ সহযোগী অধ্যাপক পদোন্নতি বঞ্চিত হয়েই অবসরে যাচ্ছেন

বিভাষ বাড়ৈ ॥ বছরের পর বছর ধরে সঙ্কট থাকলেও ক্ষমতাসীন সরকার ১০ বছরের চেষ্টায় সরকারী কলেজ বা বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের শিক্ষকদের পদোন্নতিতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনেছিল। প্রায় প্রতি বছরই দুই থেকে তিনবার বিসিএস শিক্ষকদের পদোন্নতি দেয়ার মাধ্যমে শিক্ষকদের মাঝে সরকারের অত্যন্ত ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছিল। কিন্তু শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরের কর্তাব্যক্তিদের কারণে সরকারের সব অর্জন নষ্ট হতে চলেছে। গত দেড় বছরে সিভিল সার্ভিসের অন্যতম বড় শিক্ষা ক্যাডারের কোন স্তরেই কোন পদোন্নতি নেই। সঙ্কট এমন পর্যায়ে চলে গেছে, প্রায় সাতশ’ জন সহযোগী অধ্যাপক পদোন্নতি বঞ্চিত হয়েই অবসরে চলে যাচ্ছেন!

সঙ্কটের এখানেই শেষ নয়। শত শত শিক্ষক আছেন যারা পদোন্নতির সব যোগ্যতা অর্জন করলেও এক যুগেরও বেশি সময় ধরে কোন পদোন্নতি পাচ্ছেন না। নেই পদ সৃষ্টিরও কোন উদ্যোগ। প্রভাষক, সহকারী অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক ও অধ্যাপকের পদ সৃষ্টির প্রস্তাবও ঝুলে আছে দীর্ঘদিন ধরে। ফলে শিক্ষকদের মাঝে বাড়ছে অসন্তোষ। প্রায় প্রতিদিনই শিক্ষা প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের কাছে দাবি জানাচ্ছেন সরকারী কলেজ শিক্ষকরা। মন্ত্রণালয় ও মাউশি কর্মকর্তারা মাসের পর মাস ধরে কেবল ‘হবে হবে’ বলে সময় কাটাচ্ছেন। গত এক মাসে অন্তত তিনবার শিক্ষা ক্যাডারের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক-কর্মকর্তারা মাউশি অধিদফতরের মহাপরিচালক ও পরিচালকের (কলেজ) কাছে একযোগে পদোন্নতির সঙ্কটের চিত্র তুলে ধরেন, প্রতিবাদ জানান কর্মকর্তাদের কর্মকা-ের।

দীর্ঘদিন পদোন্নতি বঞ্চিত বিসিএস ক্যাডারের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক-কর্মকর্তারা বুধবারও দিনভর শিক্ষা অধিদফতরের কর্তাব্যক্তিদের কাছে একযোগে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তবে যথারীতি ‘কাজ চলছে’ ‘শীঘ্রই হয়ে যাবে’ বলে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছেন কর্তাব্যক্তিরা। এ পরিস্থিতিতে ক্ষুব্ধ সরকারসমর্থক হিসেবে পরিচিত শিক্ষা ক্যাডারের প্রগতিশীল শিক্ষক-কর্মকর্তারাও।

বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের প্রগতিশীল শিক্ষক-কর্মকর্তাদের সংগঠন স্বাধীনতা বিসিএস শিক্ষা সংসদের সদস্য সচিব ও মোহম্মদপুর কেন্দ্রীয় কলেজের অধ্যক্ষ সৈয়দ জাফর হতাশা প্রকাশ করে বলেন, প্রথমত, কয়েক বছর ধরে শিক্ষা ক্যাডারে নিয়মিত পদোন্নতিতে সরকারের যে ইতিবাচক একটা মর্যাদা তৈরি হয়েছিল সেখানে ছেদ পড়েছে। এটা আমাদের কারো জন্যই ভাল নয়।

দ্বিতীয়ত, আমরা বহুবার এমনকি আমি নিজেও সাবেক সচিব সোহরাব হোসেইনের সঙ্গে দেখা করে পদোন্নতির উদ্যোগ নিতে অনুরোধ করেছি। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ’১৮ সালের শেষদিকে তিনি বলেছিলেন নির্বাচনটা হলেই ব্যবস্থা নেবেন। কিন্তু আজো হয়নি। এতে শিক্ষা ক্যাডারসহ সংশ্লিষ্ট সকলের মাঝে ব্যাপক অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ছে। শিক্ষকরা ক্ষোভ প্রকাশ করছেন বিভিন্নভাবে।

এ শিক্ষক নেতা দ্রুত কার্যকর উদ্যোগের দাবি জানিয়ে বলেন, আমাদের বক্তব্য স্পষ্ট। পদোন্নতি ও পদ সৃজনের উদ্যোগ না নেয়ায় আজ সঙ্কট। যত তাড়াতাড়ি উদ্যোগ নেয়া হবে ততই মঙ্গল। কারণ শত শত শিক্ষক এক যুগেরও বেশি সময় ধরে পদোন্নতি বঞ্চিত। আমি ১৭তম ব্যাচের শিক্ষক। আমার পদোন্নতিও হয়েছে ৯ বছর হয়ে গেছে। শত শত শিক্ষক আছেন যারা সব যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও পদোন্নতি বঞ্চিত হয়ে অবসরের যাচ্ছেন। বিষয়টি উদ্বেগের।

এদিকে পদোন্নতির ক্ষেত্রে বৈষম্যের চিত্রও। ১৪তম বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ’৯৩ সালের নবেম্বরে বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারে যোগ দেয়া বহু শিক্ষক এক যুগেও পদোন্নতি পাননি। অথচ একই ব্যাচের অনেকেই অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পেয়েছেন। একই ব্যাচের কর্মকর্তাই এ ক্যাডারের সর্বোচ্চ পদ মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক ও দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদ পরিচালকসহ (কলেজ ও প্রশাসন) বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন রয়েছেন। মাউশি মহাপরিচালকের পদটি গ্রেড-১-এর পদ। একই ব্যাচের কেউ বেতন স্কেলের সর্বোচ্চ ধাপে, কেউ-বা পঞ্চম ধাপে চাকরি করছেন।

এই বৈষম্যমূলক অবস্থা সৃষ্টির কারণ একটি নিয়ম। এই নিয়মানুযায়ী বিসিএসের অন্যান্য ক্যাডারে ব্যাচভিত্তিক পদোন্নতি চালু থাকলেও শিক্ষা ক্যাডারে বিষয়ভিত্তিক পদোন্নতি ঘটে। এ নিয়মের ফলে ১৪তম বিসিএসের অনেক কর্মকর্তা এখনও অধ্যাপক হতে পারেননি। অথচ ১৫ ও ১৬তম বিসিএসের অনেক কর্মকর্তা অধ্যাপক হয়ে আগেই তাদের টপকে গেছেন। এতে সরকারী কলেজে সিনিয়র শিক্ষকদের কাজ করতে হচ্ছে জুনিয়রদের অধীনে, যা তাদের মনোবেদনা ও হতাশার অন্যতম কারণ। শিক্ষা ক্যাডারে পদোন্নতি বঞ্চনার মারাত্মক শিকার বিসিএসের ১৪তম ব্যাচ। এ ব্যাচের বহু শিক্ষক সহযোগী অধ্যাপক পদ থেকে পদোন্নতির সব শর্ত পূরণের পরও অধ্যাপক হওয়ার প্রহর গুনছেন বছরের পর বছর ধরে।

কেবল শিক্ষক নয়, খোদ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর জন্য শিক্ষা অধিদফতরের প্রস্তুত একটি প্রস্তাবনাতেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে পদোন্নতি বঞ্চনার উদ্বেগজনক চিত্র। যেখানে অধিদফতর বলেছে, ‘প্যাটার্ন অনুযায়ী অধ্যাপকের পদ সৃষ্টি না হওয়ায় অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেয়া যাচ্ছে না। ৬৮৬ সহযোগী অধ্যাপক ১০ থেকে ১২ বছর আগে পদোন্নতির সব যোগ্যতা অর্জন করেও পদোন্নতি পাচ্ছেন না। পদোন্নতি বঞ্চিত হয়েই অনেকে অবসরের পথে।’

অধিদফতর আরো বলেছে, ’১৪ সালে সমীক্ষার মাধ্যমে চাহিদা বিশ্লেষণ করে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের জন্য ১২ হাজার ৫১৯ (অধ্যাপক এক হাজার ৩৭৭, সহযোগী অধ্যাপক তিন হাজার ৩৪৮, সহকারী অধ্যাপক চার হাজার ৩২৬, প্রভাষক তিন হাজার ৪৬৮) পদ সৃষ্টির লক্ষ্যে সমন্বিত পদ সৃষ্টির প্রস্তাব দীর্ঘদিন ধরে মন্ত্রণালয়ে প্রক্রিয়াধীন।’

অধিদফতর মন্ত্রণালয়কে বলছে, ‘সিভিল সার্ভিসের বিভিন্ন ক্যাডারে পদ শন্য না থাকলেও নিয়মিত পদোন্নতি হচ্ছে। কিন্তু শিক্ষা ক্যাডারে সঙ্কট যাচ্ছে না। একে কর্মকর্তাদের মাঝে বাড়ছে হতাশা, কমে যাচ্ছে কর্মস্পৃহা। বাড়ছে আন্তঃক্যাডার বৈষম্য।’

বিসিএস ক্যাডারের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক-কর্মকর্তারা বুধবারও দিনভর শিক্ষা অধিদফতরের কর্তাব্যক্তিদের কাছে একযোগে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। মহাপরিচালক ও পরিচালকের কক্ষের সামনে অবস্থান নিয়েছিলেন বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের ১৪তম ব্যাচের কর্মকর্তারা। এ ব্যাচের কর্মকর্তা সাইমুল বশির জনকণ্ঠকে বলেন, আসলে সঙ্কট সমাধানে আমরা বছরের পর বছর ধরে দাবি জানিয়ে আসছি। বুধবারও আমরা মাউশিকে এসব বিষয় জানিয়ে সমাধানের দাবি করেছি। মহাপরিচালক ও পরিচালকও আমাদের একই ব্যাচের কর্মকর্তা। তারা কি বলেছেন- এমন প্রশ্নে সাইমুল বশির বলেন, মহাপরিচালক মহোদয় বলেছেন দ্রুত হবে। আগামী মার্চেই হবে বলে তিনি আশা করেন। কিন্তু এমন কথা তো ওরা আগেও বহুবার বলেছেন। হবে হবে। তাই আশ^স্ত হওয়ার মতো কিছু দেখছি। এ অবস্থায় ক্ষোভ হতাশায় নিমজ্জিত হচ্ছেন শিক্ষকরা। এটা জাতির জন্য ক্ষতিকর।

প্রকাশিত : ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২০

২৭/০২/২০২০ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



শীর্ষ সংবাদ: