১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২০, ৬ ফাল্গুন ১৪২৬, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 
সর্বশেষ

স্কুল মাদ্রাসায় ছোটদের মন্ত্রিসভা নির্বাচন

প্রকাশিত : ২৬ জানুয়ারী ২০২০
স্কুল মাদ্রাসায় ছোটদের মন্ত্রিসভা নির্বাচন
  • ২২ হাজার ৯২৬ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছিল বাঁধভাঙ্গা উচ্ছ্বাস

স্টাফ রিপোর্টার ॥ স্কুলে ব্যতিক্রমী কিছু যে হচ্ছে তা টের পাওয়া যাচ্ছিল বাইরে থেকেই। শিশুদের কোলাহল আর স্লোগান শোনা যাচ্ছিল দূর থেকেও। প্রবেশপথেই দেখা গেল দুই পাশে রশিতে ঝোলানো হাতে লেখা নানা রঙের পোস্টার। তাতে নিজেদের প্রার্থীর পক্ষে ভোট চেয়ে নানা আকুতি। ‘বন্ধু তোমার একটি ভোটে, যোগ্য প্রার্থী যাবে জিতে’, ‘মরিয়মের দুই নয়ন/ আমাদের স্কুলের উন্নয়ন’, ‘ভোটে এসেছি প্রথমবার/ পাশে চাই আমি সবার’ ইত্যাদি স্লোগানসংবলিত শত শত পোস্টারে রঙিন স্কুল প্রাঙ্গণ, যেন একটি উৎসব।

শনিবার এমন চিত্রই দেখা যায় রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরী স্কুল এ্যান্ড কলেজে গিয়ে। তবে এ চিত্র যে কেবল একটি প্রতিষ্ঠানেই, তা নয়। ঠিক এমন এক নির্বাচনী উৎসবের মধ্য দিয়েই দেশের ২২ হাজার ৯২৬ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাধ্যমিক স্কুল ও মাদ্রাসায় গঠন করা হয়েছে মন্ত্রিসভা। ভর্তির হার বৃদ্ধি, ঝরে পড়া রোধ, উন্নয়ন কর্মকা-ে সম্পৃক্ত করা আর শিশুদের মাঝে গণতন্ত্র চর্চার লক্ষ্য সামনে রেখে হয়েছে স্টুডেন্টস কেবিনেট নির্বাচন। কোন রকমের বিরোধ নয়, উৎসবের আমেজে বাঁধভাঙ্গা উচ্ছ্বাসে মেতেই শিক্ষার্থীরা ছাত্রসংসদের আদলে করে দেখাল স্টুডেন্টস কেবিনেট নির্বাচন। এক কোটি ১৫ লাখ ৫৩ হাজার ৯১৬ শিশু-কিশোর নির্বাচন করল তাদের পছন্দের ২২ হাজার ৯২৬ প্রধানমন্ত্রী আর এক লাখ ৮৩ হাজার ৪০৮ মন্ত্রী।

শনিবার সকালে মতিঝিল সরকারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও সিদ্ধেশ্বরী স্কুল এ্যান্ড কলেজে খুদে শিক্ষার্থীদের স্কুল কেবিনেট নির্বাচনের ভোটকেন্দ্র পরিদর্শন করেন শিক্ষামন্ত্রী ডাঃ দীপু মনি। সঙ্গে ছিলেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মাহবুব হোসেন, নির্বাচন পরিচালনায় দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠান জাতীয় শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) মহাপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ওসমান ভূঁইয়া প্রমুখ। শিক্ষামন্ত্রী ডাঃ দীপু মনি বলেন, শিক্ষার্থীদের মাঝে গণতন্ত্র চর্চা, নিজেদের অধিকার সম্পর্কে ধারণা, পরমত সহিষ্ণুতা ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে আন্তরিকতা তৈরি, শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার রোধসহ নিজেদের মূল্যবোধ ও দায়িত্ব সম্পর্কে শিক্ষা প্রদানে স্কুল কেবিনেট নির্বাচন আয়োজন করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, আজ শিক্ষার্থীরা নানা উন্নয়নমূলক কর্মকা-ে অংশগ্রহণের সুযোগ পাচ্ছে। নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করে নেতা নির্বাচন করছে। সেই নেতার নির্দেশ মেনে চলছে। লেখাপড়ার পাশাপাশি বিদ্যালয়ের নানা কর্মকা-ে যুক্ত হচ্ছে। এতে ওসব ছাত্রছাত্রী দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হচ্ছে নিজের মূল্যবোধ তৈরিসহ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেরও উন্নয়ন হচ্ছে। সব স্থানে দলনেতা মানতে হয়, শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে সেই জ্ঞানার্জনের সুযোগ পাচ্ছে। শিশুকাল থেকে গণতন্ত্রের চর্চা আর গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে পারছে। দীপু মনি বলেন, এ নির্বাচনে যারা নির্বাচিত হবে তারা নিজেদের দায়িত্ব যথাযথ পালন করবে, আর যারা নির্বাচিত হবে না তারা মন খারাপ না করে বিজয়ীদের সঙ্গে থেকে নিজেদের দায়িত্ব পালন করবে।

সকাল নয়টায় শুরু হয়ে বিরতিহীন ভোটগ্রহণ চলে দুপুর দুটো পর্যন্ত। বিকেলে বিজয়ীদের তালিকা প্রকাশ করা হয়। দুপুরে মতিঝিল সরকারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যালয় প্রাঙ্গণজুড়ে সাদাকালো ও রঙিন কাগজে হাতে লেখা পোস্টার ঝোলানো হয়েছে। সেসব পোস্টারে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা প্রার্থীদের পক্ষে ভোট চাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে এসব পোস্টারে প্রার্থীরা তাদের নির্বাচনী ইশতেহার তুলে ধরেছে।

স্কুল মাঠে লাইনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে একে একে ক্লাস রুমে গিয়ে বসানো ভোটবাক্সে ভোটাধিকার প্রয়োগ করে বেরিয়ে আসে শিক্ষার্থীরা। ভোট কক্ষে জাতীয় পর্যায়ের ভোটের মতোই পোলিং অফিসার, প্রার্থীদের এজেন্টরা উপস্থিত ছিল। তারা ভোটারদের সহায়তা করে। সুন্দর ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে খুদে শিক্ষার্থীরা তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করছে।

রাজধানীর লালবাগের আবদুর রাজ্জাক দাখিল মাদ্রাসার শিশুদের উৎসবে শামিল হয়েছিলেন শিক্ষা প্রশাসনের কর্মকর্তারা। ওখানে দেখা যায় পুরো এলাকা হাতে লেখা পোস্টার, লিফলেটে ঠাসা। প্রথমবারের মতো ভোট দিতে পেরে ষষ্ঠ শ্রেণীর শিশুদের আনন্দ ছিল একটু বেশিই। এ রকম অভিজ্ঞতা ওদের জীবনে যে আর আসেনি।

তাই বাঁধভাঙ্গা উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠে সবাই। ভোট দেয়ার অপেক্ষায় দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ছিল অনেকে। যাদের ভোট দেয়া শেষ, তারা মেতে ওঠে আনন্দে। কেউ কেউ নিজেদের প্রার্থীর পক্ষে স্লোগানে মাতিয়ে তোলে পুরো মাদ্রাসা প্রাঙ্গণ।

রাজধানীর তেজগাঁও মডেল স্কুলের সামনে দেখা যায় শিশুদের মিছিল। ভেতরে প্রতিটি বুথের মুখে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ লাইন। শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বেও তৎপর শিক্ষার্থীরাই। নবম শ্রেণীর বালিকা শাখার ভোটকক্ষে দেখা গেল প্রিসাইডিং অফিসারের দায়িত্ব পালন করছে একই শ্রেণীর ছাত্রী নাজমা। পোলিং অফিসার হিসেবেও আছে দুজন। তারা ভোটারদের হাতে নিরাপত্তা চিহ্ন হিসেবে অমোচনীয় কালি লাগিয়ে দিচ্ছে। নির্বাচনে এই ক্লাসের দুই প্রার্থী। তাই তাদের পক্ষে রয়েছে দুজন এজেন্ট। তারাও পাশাপাশি বসা। পোলিং এজেন্ট সুলতানা বলছিল, নিজেদের ভোট তাই সুশৃঙ্খলভাবে সবাই ভোট দিচ্ছে। কোন সমস্যা হচ্ছে না। এই সুযোগ করে দেয়ার জন্য শিশুরা সরকারকে ধন্যবাদ জানাল।

ব্যানবেইসের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ওসমান ভূঁইয়া সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, এই যে ছোট ছোট শিশু-কিশোররা সারাদেশে অত্যন্ত সুন্দর উৎসবের মধ্য দিয়ে নির্বাচন করে ফেলল। কোথাও কোন সমস্যা হয়নি। নির্বাচন পরিচালনা ও তদারককারী এ প্রতিষ্ঠানে পরিচালক আরও জানান, সারাদেশ থেকেই ভাল সাড়া মিলেছে। শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরা নিয়েছে অত্যন্ত সুন্দরভাবে বিষয়টি।

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতরের শিক্ষা কর্মকর্তা (মাধ্যমিক-১) চন্দ্র শেখর হালদার জনকণ্ঠকে বলছিলেন, শিক্ষা গ্রহণের পাশাপাশি শিশুকাল থেকেই গণতন্ত্রের চর্চা, সহনশীলতা ও মূল্যবোধ তৈরির উদ্দেশ্যেই সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে ‘স্টুডেন্টস কেবিনেট’ গঠন করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে তারাই এ দেশ গড়ে তুলবে, পরিচালনা করবে। তাই এখন থেকেই তাদের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, অন্যের মতের প্রতি সহনশীলতা চর্চার প্রয়োজন রয়েছে। পরস্পরের প্রতি বিদ্বেষ নয়, অন্যের কাছে নিজেকে গ্রহণযোগ্য করে তোলার লক্ষ্যেই তারা চেষ্টা করবে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, এ বছর দেশের আট বিভাগ ও আট মহানগরের মোট ৫৫৯ উপজেলা/থানার ২২ হাজার ৯২৬ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নির্বাচন হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ১৬ হাজার ৩৮৪ মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও ছয় হাজার ৫৪২ দাখিল মাদ্রাসা। মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এক লাখ ৩১ হাজার ৭২ আর মাদ্রাসায় ৫২ হাজার ৩৩৬ পদে নির্বাচন হয়েছে।

নির্বাচনে মোট ভোটার সংখ্যা ছিল এক কোটি ১৫ লাখ ৫৩ হাজার ৯১৬। এর মধ্যে ছাত্রী ৬২ লাখ ৫১ হাজার ৬৮৩, যা মোট শিক্ষার্থীর ৫৪ দশমিক ১০ শতাংশ। ছাত্রের সংখ্যা ৫৩ লাখ দুই হাজার ২৩৩। শিশুদের এই মন্ত্রিসভা এক বছর মেয়াদের প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে তারা কাজ করবে।

প্রকাশিত : ২৬ জানুয়ারী ২০২০

২৬/০১/২০২০ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



শীর্ষ সংবাদ: