১৯ জানুয়ারী ২০২০, ৬ মাঘ ১৪২৬, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 
সর্বশেষ

আরও গেল ১৩ প্রাণ ॥ কেরানীগঞ্জ ট্র্যাজেডি

প্রকাশিত : ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯
আরও গেল ১৩ প্রাণ ॥ কেরানীগঞ্জ ট্র্যাজেডি
  • চিকিৎসাধীন ১৮ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক
  • নিহত প্রত্যেকের পরিবারকে এক লাখ আর দগ্ধদের পরিবারকে ৫০ হাজার টাকা করে অনুদান দেয়া হচ্ছে
  • তদন্ত কমিটি

গাফফার খান চৌধুরী/ সালাহ উদ্দিন মিয়া ॥ ঢাকার কেরানীগঞ্জে একটি প্লাস্টিক কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকা-ে আরও ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে ১৪ জনের মৃত্যু হলো। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন আরও ১৮ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। নিহত প্রত্যেকের পরিবারকে এক লাখ টাকা আর দগ্ধদের পরিবারকে ৫০ হাজার টাকা করে অনুদান দেয়া হয়েছে। এ ঘটনায় শ্রম মন্ত্রণালয়ের তরফ থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। দগ্ধদের দেখতে গিয়েছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। ঘটনার দিন পুড়ে কয়লা হয়ে যাওয়া ছেলের হাতে থাকা ব্রেসলেট দেখে লাশ শনাক্ত করেছেন পিতা।

বুধবার বিকেল সাড়ে চারটার দিকে কেরানীগঞ্জের চুনকুটিয়ার হিজলতলা এলাকায় প্রাইম প্লেট এ্যান্ড প্লাস্টিক ইন্ডাস্ট্রিজ নামের ওয়ান টাইম থালা ও গ্লাস তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকা-ের ঘটনাটি ঘটেছে। ফায়ার সার্ভিসের ১৩টি ইউনিট দুই ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। কারখানার গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়ে অগ্নিকা-ের ঘটনাটি ঘটে বলে আহত ও স্থানীয়রা জানান। ঘটনার সময় কারখানায় পুরুষ ও নারী মিলে ৮৮ জন শ্রমিক কর্মরত ছিলেন।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের আবাসিক সার্জন ডাঃ আ ফ ম আরিফুল ইসলাম নবীন জনকণ্ঠকে জানান, দগ্ধদের মধ্যে ৩৩ জনকে হাসপাতালের আনা হয়েছিল। তাদের মধ্যে একজন আগেই চিকিৎসা নিয়ে চলে যান। বাকিদের মধ্যে দুর্জয় (২৫) নামের একজনকে তার পরিবার বাইরে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যায়। ভর্তি করা হয় ৩১ জনকে।

এই চিকিৎসক আরও জানান, বুধবার রাত আড়াইটা থেকে বৃহস্পতিবার দুপুর দেড়টা পর্যন্ত কেরানীগঞ্জ ট্র্যাজিডিতে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৩ জনের মৃত্যু হয়।

নিহতরা হচ্ছেন ॥ মেহেদী (২০), ওমর ফারুক (৪৫), পটুয়াখালীর ইমরান (১৮), নড়াইলের রায়হান (১৬), বরিশালের বাবলু (২৬), কেরানীগঞ্জের সুজন (১৯), ঢাকার তেজগাঁওয়ের সালাউদ্দিন (৩২), বরিশালের খালেক (৩৫), মাগুরার জিনারুল ইসলাম (৩২), ঢাকার বাসিন্দা আলম (৩২), কেরানীগঞ্জের জাহাঙ্গীর (৫৫), রাজ্জাক (৩৫), মুন্সীগঞ্জের ফয়সাল (২৫) ও মাহবুব (২৫)। এদের মধ্যে মাহবুব ছাড়া সবাই ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে মারা যান।

ঘটনার দিন নিহত যুবকের পরিচয় মিলেছে

কারখানায় লাগা আগুনে ঘটনাস্থলেই পুড়ে মারা যান যুবক মাহবুব। বৃহস্পতিবার ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে এসে ছেলের লাশ শনাক্ত করেন পিতা গুলজার হোসেন। ছেলের হাতে থাকা একটি ব্রেসলেট দেখে তিনি ছেলের লাশ শনাক্ত করেন। নিহত মাহবুবের বাড়ি রংপুর জেলার পীরগাছায়। মাহবুব পাঁচ বছর ধরে কারখানাটিতে মেশিন অপারেটর হিসেবে কাজ করছিলেন।

চিকিৎসাধীনরা হচ্ছেন

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের বার্ন ইউনিটের আবাসিক সার্জন ডাঃ পার্থ শংকর পাল জনকণ্ঠকে জানান, দগ্ধদের মধ্যে গুরুতর দশ জনকে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন এ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়েছে। তাদের প্রত্যেককেই আইসিইউতে রাখা হয়েছে। তারা লাইফ সাপোর্টে রয়েছেন। এরা হচ্ছেন, সোহাগ (২২), মফিজ (৪৫), সুমন (২২), মুস্তাকিম (২২), সাহাজুল (৩৯), রাজ্জাক (৪৫), মোহাম্মদ সোহাগ (২৫) ও আবু সাইদসহ (২৯) মোট দশ জন।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের বার্ন ইউনিটের এইচডিইউতে চিকিৎসাধীনরা হচ্ছেন লাল মিয়া (৪২), পিতার নাম রমজান, বাড়ি কেরানীগঞ্জ। শওকত (২৬), পিতার নাম আল নুমান, বাড়ি কেরানীগঞ্জ। বশির (১৮), পিতার নাম নাসির, বাড়ি কেরানীগঞ্জ। জিসান (১৬), পিতার নাম মাইনুল্লাহ, বাড়ি কেরানীগঞ্জ। সোহান (১৯), পিতার নাম সাজু মিয়া, বাড়ি কেরানীগঞ্জ। আসলাম (১৯), পিতার নাম আজহার, বাড়ি কেরানীগঞ্জ। আরও দুইজন এখানে চিকিৎসাধীন আছেন।

দগ্ধদের দেখে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, ঘটনাটি খুবই দুঃখজনক। কেরানীগঞ্জের ঘটনায় যে রোগীগুলো হাসপাতালে এসেছে, তাদের সবার অবস্থা খারাপ। হাসপাতালের চিকিৎসক-নার্সসহ স্টাফরা অনেক কষ্ট করছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সর্বক্ষণিক দগ্ধদের বিষয়ে খবর রাখছেন। সরকারী খরচে তাদের চিকিৎসার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

মন্ত্রী আরও বলেন, অনেক কারখানা আছে যারা নিয়ম কানুন মেনে কাজ করে না। অনেক জায়গায় ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঢুকতে পারে না। এ বিষয়ে মালিকদের সতর্ক থাকতে হবে। তাদের উদাসীনতায় এসব অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। যেখানে আগুন লেগেছে সেখানে আগুন নেভানোর সরঞ্জাম ছিল না।

দগ্ধদের বিষয়ে বার্ন ইউনিটের প্রধান সমন্বয়ক অধ্যাপক ডাঃ সামন্ত লাল সেন জনকণ্ঠকে বলেন, চিকিৎসাধীন সবার অবস্থাই গুরুতর। তাদের সর্বোচ্চ চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। দগ্ধদের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সকল চিকিৎসকসহ অন্যদের হাসপাতালেই রাখা হয়েছে। তারা সব ধরনের সহায়তা দিয়ে যাচ্ছেন। ঘটনার পর থেকে তারা সর্বক্ষণ হাসপাতালেই স্ট্যান্ডবাই রয়েছেন।

কেরানীগঞ্জে নিহতের প্রত্যেকের পরিবারকে এক লাখ টাকা করে আর্থিক অনুদান দেয়া হচ্ছে। আর দগ্ধদের প্রত্যেকের পরিবারকে ৫০ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেয়া হচ্ছে। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন তহবিল থেকে এই সহায়তা করা হবে বলে বৃহস্পতিবার শ্রম মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে। শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ান এ ঘোষণা দেন।

শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি গঠন

অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোল্লা জালাল উদ্দিনকে প্রধান করে গঠিত কমিটিকে আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান এবং দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে সুপারিশসহ প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে।

তদন্ত কমিটির অন্য সদস্যরা হচ্ছেন, যুগ্মসচিব (শ্রম) এ টি এম সাইফুল ইসলাম, শ্রম অধিদফতরের পরিচালক মোঃ আমিনুল ইসলাম, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদফতরের ঢাকার উপ-মহাপরিদর্শক আহমেদ বেলাল এবং উপ-মহাপরিচালক (সেইফটি) মোঃ কামরুল হাসান। কমিটির সদস্যরা ইতোমধ্যে কাজও শুরু করেছেন বলে শ্রম মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে।

কমিটিকে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদফতরের পরিদর্শকের মাধ্যমে ওই এলাকায় বিগত বছরে কতগুলো প্লাস্টিক কারখানা পরিদর্শন করা হয়েছে, এ সব পরিদর্শন প্রতিবেদনের সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়েছে কি না, না হয়ে থাকলে তার কারণ এবং ওই এলাকার প্লাস্টিক কারখানাগুলোর ঝুঁকি নির্ধারণ, ঝুঁকি নিরসনের সুপারিশ দিতে বলা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার সকালে শ্রম সচিব কে এম আলী আজম ঢাকা মেডিক্যালের বার্ন ইউনিটে যান এবং সেখানে চিকিৎসাধীন শ্রমিকদের চিকিৎসার খোঁজখবর নেন। পরে তিনি কেরানীগঞ্জে অগ্নি দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। ঘটনার আগেই মালিককে একাধিকবার নোটিস দেয়া হয়েছে। শ্রম আইনে মামলাও করা হয়েছে। এ দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে শ্রম আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। পরিদর্শক এসে কারখানা কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়ে সতর্ক করে নোটিস দিয়েছিলেন। কিন্তু সেটা উপেক্ষা করেই কারখানা চালু ছিল।

শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব ছাড়াও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতরের মহাপরিচালক মোঃ শাহাদাৎ হোসেন, ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক আবুল হোসেন, বিস্ফোরক অধিদফতরের সহকারী পরিদর্শক আবুল হাসেম।

অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানির ঘটনায় গভীর শোক, দুঃখ ও সমবেদনা প্রকাশ করেছেন শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ান। বৃহস্পতিবার এক শোক বার্তায় প্রতিমন্ত্রী এ শোক প্রকাশ করেন।

ওই কারখানায় তৃতীয় বারের মতো অগ্নিকা-ের ঘটনা ঘটেছে। এর আগে ২০১৬ সালের ২৮ নবেম্বর ও চলতি বছরের ২৫ নবেম্বর আগুন লাগে কারখানাটিতে। আগের দুটি অগ্নিকা-ে কারখানার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলেও কেউ হতাহত হয়নি। সর্বশেষ বুধবার ভয়াবহ অগ্নিকা-ের ঘটনাটি ঘটে। কেরানীগঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কামরুল হাসান সোহেল জানান, প্রাইম প্লেট এ্যান্ড প্লাস্টিক ইন্ডাস্ট্রিজ নামের কারখানাটিতে ওয়ানটাইম থালা ও গ্লাস তৈরি হতো। কোম্পানিটির কেরানীগঞ্জের উত্তর শুভাঢ্যা এলাকায় আরও একটি কারখানা আছে। অনুমোদন না থাকায় উত্তর শুভাঢ্যার কারখানাটি সিলগালা করে দেয়া হয়েছে। তবে অভিযানের সময় সেখানে কাউকে পাওয়া যায়নি।

প্রকাশিত : ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯

১৩/১২/২০১৯ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



শীর্ষ সংবাদ: