২৯ জানুয়ারী ২০২০, ১৬ মাঘ ১৪২৬, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 
সর্বশেষ

আইএস জঙ্গী বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত শামীমাকে ঢুকতে দেয়া হবে না

প্রকাশিত : ৯ ডিসেম্বর ২০১৯
  • সতর্ক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা

শংকর কুমার দে ॥ বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত যুক্তরাজ্যের নাগরিক শামীমা বেগম জঙ্গীগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস) থেকে ফিরে যুক্তরাজ্যে যেতে ব্যর্থ হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারে- এই আশঙ্কায় সতর্ক দৃষ্টি রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাকে। শামীমার জন্ম যুক্তরাজ্যে হলেও তার মা বাংলাদেশী। বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত যুক্তরাজ্যের নাগরিক আইএস জঙ্গী হিসেবে শামীমার মতো যারাই আইএস জঙ্গীর মতাদর্শী হয়ে নিখোঁজ হয়েছেন তাদের বাংলাদেশ প্রবেশ করতে দিবে না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। গোয়েন্দা সংস্থার সূত্রে এ খবর জানা গেছে।

গোয়েন্দা সংস্থার সূত্রে জানা গেছে, শামীমার মতো ব্রিটিশ-বাংলাদেশী পরিবার থেকে আসা দুই সন্ত্রাসীকে যুক্তরাজ্যের পাসপোর্ট দেয়া উচিত হবে না বলে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন দেশটির উচ্চ আদালতের বিচারকরা। এর ফলে জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে এই জিহাদী বধূর যুক্তরাজ্যে প্রবেশের সুযোগ আইনগতভাবে বন্ধ করার পথ প্রশস্ত হলো। তবে আপীলে এই রায় বাতিলও হতে পারে। বাংলাদেশ থেকে ব্রিটেনে যাওয়া দম্পতির পরিবারে জন্ম নেয়া শামীমা ইস্ট লন্ডনে বড় হয়েছিলেন। ২০১৫ সালে ১৫ বছর বয়সে আইএসের ‘খিলাফতে’ বসবাসের জন্য দুই কিশোরী বন্ধুর সঙ্গে বাড়ি থেকে পালিয়ে যান বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত শামীমা। সিরিয়ার উদ্দেশে তুরস্ক যাওয়ার পথে গ্যাটউইক বিমানবন্দরে ব্রিটিশ কিশোরী আমিরা আবাসি, খাদিজা সুলতানা ও শামীমা বেগমের সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ পায়।

গোয়েন্দা সংস্থার একজন কর্মকর্তা বলেন, কোন ব্যক্তিকে রাষ্ট্রহীন করা অবৈধ হলেও মা-বাবার মাধ্যমে শামীমা বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পাওয়ার যোগ্য- এই যুক্তিতে এ সিদ্ধান্ত নেয় যুক্তরাজ্য সরকার। জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ‘হুমকিস্বরূপ’ বিবেচনায় শামীমার নাগরিকত্ব বাতিল করেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাজিদ জাভিদ। ‘স্পেশাল ইমিগ্রেশন আপীল কমিশনে’ শুনানিতে শামীমার আইনজীবীরা যুক্তি দেন যে, বাংলাদেশ সরকার তাকে নাগরিকত্বের অধিকার দিতে অস্বীকার করায় শামীমা এখন রাষ্ট্রহীন। শুনানিতে তারা নজির হিসেবে বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত দুই ব্যক্তির বিষয়ে কমিশনের আগের সিদ্ধান্ত তুলে ধরেন, যে ক্ষেত্রে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি বিবেচনায় তাদের নাগরিত্ব বাতিল করেছিল যুক্তরাজ্য সরকার। শামীমার মতো ব্রিটিশ-বাংলাদেশী পরিবার থেকে আসা দুই সন্ত্রাসীকে যুক্তরাজ্যের পাসপোর্ট দেয়া উচিত হবে না বলে দেশটির উচ্চ আদালতের বিচারকরা সিদ্ধান্ত দেয়ার ফলে সিরিয়ার আশ্রয় শিবিরে অবস্থানরত ইসলামিক স্টেট (আইএস) যোদ্ধাপতœী বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত শামীমা বেগমের ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ফিরে পাওয়ার আশা হাইকোর্টে মারাত্মক ধাক্কা খেয়েছে।

গোয়েন্দা সংস্থার সূত্রে জানা গেছে, চার বছর আগে লন্ডন থেকে সিরিয়ায় পাড়ি দেয়ার পর গত ফেব্রুয়ারি মাসে এক সন্তানের জন্ম হলে এই নারী আইএস জঙ্গী সন্তানের ভবিষ্যত চিন্তার দাবি করে যুক্তরাজ্যে ফিরে যাওয়ার জন্য আইনী লড়াইয়ের মধ্যেই তার ব্রিটিশ নাগরিকত্ব কেড়ে নেয় যুক্তরাজ্য সরকার। তখন শামীমা বাংলাদেশের নাগরিক নন বলে জানিয়ে দেয় বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। কিন্তু ঘরে ফিরতে চায় ব্রিটিশ-বাংলাদেশী আইএস যোদ্ধাপতœী। ইরাক ও সিরিয়ায় আইএস ঘাঁটি পতনের মুখে অনেকেই হতাহত হয়েছেন। যারা বেঁচে আছেন তারা রয়েছেন সেখানকার শরণার্থী শিবিরে। শরণার্থী শিবিরে থাকাদের মধ্যেই একজন বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত যুক্তরাজ্যের নাগরিক শামীমা বেগম। শামীমার মাকে পাঠানো স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নোটিসে বলা হয়েছে, তার সঙ্গে যদি মেয়ের যোগাযোগ থাকে অথবা শীঘ্রই যোগাযোগ করার সুযোগ হয়, তাহলে যেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের বিষয়টি জানিয়ে দেয়া হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাজিদ জাভেদ পার্লামেন্টকে বলেছে, এ পর্যন্ত নয় শ’র বেশি ব্রিটিশ নাগরিক যুক্তরাজ্য ছেড়ে আইএসে যোগ দিতে সিরিয়া ও ইরাকে গেছে। তাদের ব্রিটেনে ফেরা ঠেকাতে কোন সিদ্ধান্ত নিতে তিনি দ্বিধা করবেন না। ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে আরও দুই ব্রিটিশ কিশোরীর সঙ্গে যখন যুক্তরাজ্য ছাড়েন শামীমা, তার বয়স তখন ১৫ বছর। সিরিয়ায় আইএস উৎখাত অভিযানে আশ্রয় হারিয়ে এখন তার ঠাঁই হয়েছে শরণার্থী শিবিরে। সেখানেই গত বছর একটি ছেলে সন্তানের জন্ম দিয়েছেন ১৯ বছরের এই তরুণী শামীমা। ব্রিটিশ দৈনিক টাইমসকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে তিনি বলেছেন, সন্তানের জন্য তিনি লন্ডনে পরিবারের কাছে ফিরতে চান। যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাজিদ জাভেদ স্পষ্ট করেই বলেছেন, জঙ্গীদের সমর্থন দিয়ে যারা দেশ ছেড়েছে, তাদের ফিরতে দিতে তিনি আগ্রহী নন। গত সোমবার ব্রিটিশ পার্লামেন্টে তিনি বলেছেন, তার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো ব্রিটেন এবং ব্রিটিশ নাগরিকদের নিরাপত্তা বিধান করা। তিনি বলেন, ব্রিটিশ সরকার মনে করছে ১৯ বছর বয়সী শামীমার বাবা-মা যেহেতু বাংলাদেশী, সেহেতু যুক্তরাজ্য ছাড়া অন্য দেশের নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ ওই তরুণীর আছে।

বিবিসিকে দেয়া সাক্ষাতকারে শামীমা বলেছেন, তিনি কখনও বাংলাদেশে যাননি এবং বাংলাদেশী পাসপোর্টও তার নেই। শামীমা বেড়ে উঠেছেন লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটসের বেথনাল গ্রীন এলাকায়। তিনি যুক্তরাজ্য থেকে সিরিয়া গিয়েছিলেন ব্রিটিশ পাসপোর্ট নিয়ে। কিন্তু সীমান্ত পার হওয়ার পরপরই তার কাছ থেকে সেটা কেড়ে নেয়া হয়। বিবিসি লিখেছে, কোন ব্রিটিশ নাগরিকের নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়ার আগে যদি তার সন্তানের জন্ম হয়, তাহলে আইন অনুযায়ী শিশুটি ব্রিটিশ নাগরিক হিসেবে গণ্য হবে। চার বছর আগে সিরিয়ার উদ্দেশে তুরস্ক যায় কিশোরী আমিরা আবাসি, খাদিজা সুলতানা ও শামীমা বেগম তিন নারী জঙ্গী। শরণার্থী শিবিরে থাকা ১৯ বছরের শামীমার সর্বশেষ জন্ম দেয়া এটা তৃতীয় সন্তান। তার আগের দুটি সন্তানই অপুষ্টি এবং বিনা চিকিৎসায় মারা গেছে। সিরিয়ায় গিয়ে এই তরুণী নেদারল্যান্ডস থেকে আসা একজন আইএস যোদ্ধাকে বিয়ে করেছিলেন। মাত্র ১৫ বছর বয়সে বাংলাদেশী অধ্যুষিত পূর্ব লন্ডনের বেথনাল গ্রীন এলাকা থেকে আরও দুজন বান্ধবীসহ আইএসে যোগ দিতে সিরিয়ায় পালিয়ে গিয়েছিলেন শামীমা বেগম। গত বছর লন্ডনের দৈনিক দ্য টাইমসের একজন সাংবাদিক সিরিয়ার একটি শরণার্থী শিবিরে শামীমা বেগমের খোঁজ পান। তার বয়স এখন ১৯ এবং তিনি তখন অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। ওই সাংবাদিকের মাধ্যমে তিনি ব্রিটিশ সরকারের কাছে আবেদন করেন যে, তার আগত শিশু সন্তানের কথা বিবেচনা করে তাকে যেন ব্রিটেনে ফেরত আসতে দেয়া হয়। এরপর থেকে ব্রিটেনে ব্যাপক বিতর্ক শুরু হয়েছে যে, নিষিদ্ধ একটি জঙ্গী সংগঠনের যোগ দিতে যাওয়া এই তরুণীকে ফেরত আসতে দেয়া উচিত কিনা।

ব্রিটিশ সরকারের একজন মন্ত্রী জেরেমি রাইট বিবিসিকে বলেন, শামীমা বেগমের সন্তানের নাগরিকত্ব সোজা-সাপটা কোন বিষয় নয়। তিনি বলেন, তাকে (শামীমাকে) তার কর্মকা-ের জবাবদিহি করতে হবে। সে যদি এ দেশে ফিরে আসতে পারেও, তাকে বুঝতে হবে সে যা করেছে তার জন্য তাকে জবাব দিতে হবে। ব্রিটেন থেকে যে কয়েক শ’ মুসলিম ছেলেমেয়ে আইএসে যোগ দিতে সিরিয়া ও ইরাকে গিয়েছিল, তাদের ফিরে আসতে দেয়া উচিত কি উচিত নয় তা নিয়ে তুমুল বিতর্ক চলছে।

ঢাকার গোয়েন্দা সংস্থার একজন কর্মকর্তা বলেন, সর্বশেষ ফাঁস হওয়া মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গী সংগঠন ইসলামিক স্টেট বা আইএসের ১৭৫০ বিদেশী জঙ্গীর তথ্যসংবলিত গোপন নথিতে দেখা যায় সাত বাংলাদেশী সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিয়ে নিহত হয়েছে। এরাও গোপনে দেশ ছেড়ে সিরিয়ায় আইএসে যোগ দিয়েছিল। এখন পর্যন্ত অর্ধশতাধিক বাংলাদেশী ও বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত বিভিন্ন দেশের নাগরিকের সরাসরি ইরাক বা সিরিয়ায় গিয়ে আইএসের হয়ে লড়াই করার তথ্য পেয়েছেন গোয়েন্দারা। এই দলে আছেন বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত একাধিক নারী। ২০১৩ সালের এপ্রিলে ইরাক, সিরিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যের বড় একটি এলাকা নিজেদের দখলে নিয়ে খিলাফত কায়েমের ঘোষণা দেয় আইএস। বাংলাদেশে একের পর এক ভিন্ন মতাবলম্বী ও সংখ্যালঘু হত্যাসহ গুলশান ও শোলাকিয়ার জঙ্গী হামলা, কল্যাণপুরে জঙ্গীবিরোধী অভিযানের সাম্প্রতিক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশে আইএস রয়েছেÑ পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো এমন প্রচার চালালেও সরকার আইএসের অস্তিত্ব বরাবরই অস্বীকার করে বলছে, দেশীয় জঙ্গীগোষ্ঠীরাই এসব হামলা করছে বলে সরকারের দাবি। তবে আইএসে যোগদানের উদ্দেশে নিখোঁজ বাংলাদেশী কিংবা বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত আইএস জঙ্গী বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারে এমন আশঙ্কা থেকে বিমানবন্দর, সীমান্তে সতর্কবার্তা পাঠানোসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে বলে গোয়েন্দা সংস্থার দাবি।

প্রকাশিত : ৯ ডিসেম্বর ২০১৯

০৯/১২/২০১৯ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

শেষের পাতা



শীর্ষ সংবাদ: