২৪ জানুয়ারী ২০২০, ১১ মাঘ ১৪২৬, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 

অঞ্চলভিত্তিক কৃষি সমবায় কেন্দ্র

প্রকাশিত : ৮ ডিসেম্বর ২০১৯
  • মোঃ শামসুল আলম

দেশের প্রায় আশি ভাগ মানুষ কৃষির সঙ্গে জড়িত। কৃষকই দেশের সমৃদ্ধির চাবিকাঠি। কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে। কৃষি কাজে আবহমানকালের ব্যবহৃত গরু, মহিষ, লাঙ্গল-জোয়ালের দিন এখন শেষ। কৃষক প্রয়োজনে আধুনিক যন্ত্রপাতি দিয়ে চাষাবাদ ছাড়াও শস্য কর্তন ও মাড়াই কাজও আরম্ভ করেছে। চাষাবাদে উন্নত বীজ, সার, সেচ, কীটনাশকসহ রোগ-বালাই ও আগাছা দমনে ওষুধ ব্যবহার করছে। ইদানীং কৃষি কাজে কৃষি শ্রমিকের অভাবে মজুরি অনেক হওয়ায় চাষাবাদে কৃষকের প্রচুর অর্থ ব্যয় হচ্ছে। প্রত্যেক মৌসুমে প্রতিটি প্রান্তিক কৃষককে অবস্থাভেদে বিশ থেকে পঞ্চাশ হাজার টাকা যোগাড় অথবা ধার-দেনা করে আবাদের কাজে হাত দিতে হয়। স্বল্প পরিমাণ বাদ দিলে বেশিরভাগ কৃষক অল্প জমির মালিক কিংবা বর্গাচাষী হওয়ায় কৃষকের এই টাকা যোগাড়ের উৎসই তার উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য বিক্রয়মূল্য। কিন্তু কৃষক উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না। কৃষকের এই কষ্টার্জিত ফসলে লাভবান হচ্ছে দালাল বা মধ্যস্বত্ব¡ভোগী অসাধু ব্যবসায়ী। কৃষকের ক্ষেতের উৎপাদিত পণ্য দালাল দশ টাকায় কিনে বিক্রি করে ত্রিশ থেকে পঁয়ত্রিশ টাকায়। অন্য দিকে বর্ষা মৌসুমের উৎপাদিত বোরো ধান নিয়ে চাষী পড়ছে বিপাকে। এই ভেজা ধান শুকানোর সুযোগ না পাওয়ায় এবং সংরক্ষণের জায়গা না থাকায় ধান কাটা মাত্রই মাড়াই করে বিক্রি করতেই হয়। এই ধান বিক্রি করেই শ্রমিকের মজুরিসহ ধারে কেনা, বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ, চাষের হাল ইত্যাদির পাওনা পরিশোধ করতে হয়। কৃষকের এই অসহায়ত্বের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে অসাধু রাইস মিল/ চাতাল মালিকরা ধান ক্রয়ে গড়িমসি বা সিন্ডিকেট তৈরি করে সরকার ঘোষিত ধানের নির্ধারিত মূল্যের কাছাকাছি তো দূরে থাক অর্ধেক মূল্যেও ক্রয় করে না। এ জন্য সরকারকেও বিব্রত অবস্থায় পড়তে হচ্ছে। অথচ সরকার তাদের ধান ক্রয় বাবদ প্রচুর ঋণ দিচ্ছে। কৃষক সমাজ আজ বৈষম্যের শিকার। ধানের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এক কেজি মাংস বা মাছ কিনতে এক মণ ধান বিক্রি করেও হয় না। আদরের মেয়ে-জামাইকে ইলিশ মাছ খাওয়ানোর সাধ থাকলেও সাধ্য নেই কারণ এ জন্য তিন মণ ধান বিক্রি করতে হয়। সন্তানদের লেখাপড়া কোন রকমে গ্রামের স্কুলে এসএসসি পর্যন্ত পড়াতেই হিমশিম খাচ্ছেন। উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে এক সন্তানের জন্য কমপক্ষে মাসে ১৫ মণ বছরে প্রায় ২০০ মণ ধান বিক্রি করার প্রয়োজন হয় যা প্রান্তিক কৃষকের পক্ষে কোন ভাবেই সম্ভব নয়। গত কয়েক বছর ধানের দামের অস্বাভাবিক হ্রাস এবং ক্রমবর্ধমান উৎপাদন ব্যয় কৃষককে নাকাল করে ফেলেছে। বোরো ধান আবাদে কৃষক সবচেয়ে বেশি ঋণগ্রস্ত হচ্ছে। আর তাই কৃষক ধান চাষে অনিচ্ছুক হয়ে পড়ছে। এমনকি কৃষি পেশাও পরিবর্তন করতে শুরু করেছে। দেশের মোট শ্রমশক্তির অর্ধেক প্রত্যক্ষ এবং ২০ শতাংশ পরোক্ষভাবে কৃষি খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যা যে কোন সরকারের জন্য বিরাট স্বস্তির বিষয়। এটাকে ধরে রাখতে নানামুখী পদক্ষেপ দরকার। অন্যথায় মানুষের জীবনে প্রয়োজনীয় খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে। সেটা জাতির জন্য বিপর্যয়কর। ধান চাষে অনীহা খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হুমকি। এ ছাড়া বিভিন্ন কারণে প্রতিবছর প্রায় এক লাখ একর চাষযোগ্য জমি কমে যাচ্ছে।

কৃষকের উৎপাদিত পণ্য ছাড়া সব কিছুরই মূল্য বাড়ে, এতে কারও কিছু যায় আসে না। তা হলে কৃষক কেন তাঁর পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাবে না। দেশের জিডিপিতে কৃষকের অবদান অনেক। মনে রাখতে হবে, কৃষিই হলো বাংলাদেশের জীবন-জীবিকা ও অর্থনীতির প্রাণশক্তি। দেশকে বাঁচাতে হলে অবশ্যই কৃষককে বাঁচাতে হবে যার কোন বিকল্প নেই। এবার বাজেটে কৃষির উন্নতির তিন হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এ ছাড়া সরকার ধান সংরক্ষণের জন্য দু’শ’ প্যাডিসাইলো নির্মাণ এবং কৃষি খাতে প্রণোদনা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা খুবই আশাব্যঞ্জক খবর। আমাদের প্রিয় প্রাজ্ঞ প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং বলেছেন গ্রামকে শহরায়ণ করা হবে গ্রামের নিসর্গ-প্রকৃতি ও সৌন্দর্য অক্ষুণ্ণ রেখেই। শহরের সব নাগরিক সুবিধা পৌঁছে দেয়া হবে গ্রামেও। এ ছাড়া হাাজর বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের লালিত স্বপ্ন ছিল দুঃখী মানুষ ও কৃষকের মুখে হাসি ফোটানো। মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে ধরে রেখে উন্নত আয়ের দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে তথা বর্তমান সরকারের অঙ্গীকার ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে দেশের শতকরা আশি ভাগ মানুষ কৃষক সমাজের সক্রিয় অংশীদারিত্ব ছাড়া সম্ভব নয়। তাই কৃষককে তথা দেশকে বাঁচাতে-খাদ্য শস্যের ভাণ্ডার দেশের উত্তরাঞ্চলে অঞ্চলভিত্তিক প্রতি ৫/৬ বর্গমাইলে একটি করে ‘কৃষি সমবায় কেন্দ্র’ (অন্য যে কোন নামেও হতে পারে) নির্মাণ করা খুবই জরুরী। কৃষিকে সার্বিক কৃষি ব্যবস্থাপনায় আনার জন্য সেখানে থাকবেÑ

* প্রয়োজনীয় ক্ষমতাসম্পন্ন অটো রাইস মিল *ধান শুকানোর যন্ত্র *গুদাম ঘর *শস্য কাটা ও মাড়াই কল * জমি চাষের ট্রাক্টর * পরিবহনের জন্য প্রয়োজনী ছোট ট্রাক *চারা রোপণের যন্ত্র *শস্য রোপণ যন্ত্র *কৃষি হাসপাতাল *কৃষিবান্ধব ব্যাংক ইত্যাদিসহ প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি। প্রাথমিক পর্যায়ে অটো রাইস মিলটি হলেই সত্তর ভাগ সমস্যার সমাধান হবে কারণ ওই অঞ্চলের বোরো মৌসুমের সব ধান থেকে সঙ্গে সঙ্গে চাল করা হলে সংরক্ষণের সমসা অনেকটাই মিটে যাবে। সরকারও সরাসরি প্রতিটি কৃষকের কাছ থেকে আনুপাতিক হারে ধান ক্রয় করতে পারবে। কৃষকও দালালের হাত থেকে রক্ষা পাবে।

কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধির লক্ষ্যে কৃষি সমবায় কেন্দ্রের অধীন অঞ্চলের সমস্ত আবাদযোগ্য জমির আইল তুলে দিয়ে (প্রয়োজনে আইন করে) খ- খ- জমির অপসারণ ঘটিয়ে জমির একত্রীকরণ করে আধুনিক যান্ত্রিক চাষ পদ্ধতির প্রসার ঘটিয়ে সার্বিক কৃষি ব্যবস্থাপনায় এনে পর্যায়ক্রমে সারাদেশে সমবায়ভিত্তিক চাষাবাদ শুরু করে কৃষি বিপ্লব ঘটানো সহজ হবে। সারাদেশে জমির আইল তুলে দিলে বৃহত্তর বগুড়া লেরার সমআয়তন পরিমাণ আবাদযোগ্য জমি এমনিতেই বেড়ে যাবে। রংপুর বিভাগের আবাদযোগ্য জমি সমতল হওয়ায় প্রাথমিক পর্যায়ে ওই অঞ্চলে কৃষি সমবায় কেন্দ্র স্থাপনে এখনই কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়া উচিত। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালী বঙ্গবন্ধু আজ আর আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তাঁর আদর্শ ও স্বপ্ন বেঁচে আছে। আর আছে সোনার বাংলাদেশ এবং তাঁর সাহসী কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা। বর্তমান সরকারের রূপকল্প ২০২১ এবং রূপকল্প ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশ গঠনের লক্ষ্যে গৃহীত পরিকল্পনা প্রণীত হয়েছে যা বাস্তবায়ন করতে হলে হার মানতে না জানা বাংলার সব্যসাচী কৃষককে উন্নয়নের মূল স্রোতধারায় সম্পৃক্ত করতেই হবে।

প্রকাশিত : ৮ ডিসেম্বর ২০১৯

০৮/১২/২০১৯ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: