২৫ ফেব্রুয়ারী ২০১৮, ১৩ ফাল্গুন ১৪২৪, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 
সর্বশেষ

প্রথম শ্রেণী বন্দীর সকল সুযোগ পাচ্ছেন খালেদা

প্রকাশিত : ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০১৮

স্টাফ রিপোর্টার ॥ বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াকে গত ১১ ফেব্রুয়ারি রবিবার থেকেই কারাগারে প্রথম শ্রেণীর ডিভিশনপ্রাপ্ত বন্দীর প্রাপ্য সকল সুবিধা প্রদান করছে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার কেরানীগঞ্জ কর্তৃপক্ষ। একজন প্রথম শ্রেণীর বন্দী হিসেবে কারাগারে তিনি জেলকোড অনুযায়ী সাধারণ বন্দীদের চেয়ে প্রাপ্য অতিরিক্ত সকল সুযোগ-সুবিধা ইতোমধ্যেই ভোগ করছেন। একই সঙ্গে বুধবার থেকে তার সেবা শুশ্রƒষা করতে খালেদার পুরনো গৃহকর্মী ফাতেমাকে আদালতের নির্দেশে কারাবিধির আলোকে তার সঙ্গে রাখতে কারা কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছে। কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ ইফতেখার উদ্দীন জনকণ্ঠকে পরিচারিকার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

কারাবিধি অনুযায়ী যেসব সুবিধা ভোগ করবেন বা করছেন খালেদা জিয়া : কারা বিধিমালার ৬১৭ বিধি অনুযায়ী দ-প্রাপ্ত বন্দীকে রেজিস্টারের মাধ্যমে প্রথম শ্রেণীর বন্দী হিসেবে ভর্তি করতে হবে। বন্দীর আবাসনের জন্য যখন সম্ভব হবে তখন সেল বরাদ্দ করতে হবে। তবে অপরাধের জন্য আরোপিত শাস্তি ছাড়া বন্দীর কারাবাস কোন অবস্থাতেই পৃথক কারাবাসের ন্যায় কোন কিছুর সংশ্লিষ্টতা থাকবে না। প্রথম শ্রেণীর বন্দী হিসেবে প্রদত্ত সেলে সাধারণ সরঞ্জামাদি হিসেবে একটি চেয়ার, একটি টেবিল, রাত ১০টা পর্যন্ত ব্যবহারের জন্য একটি লাইট (টেবিল ল্যাম্প), খাবার জন্য মেলামাইনের বাসন, একটি আয়রন খাট, একটি ম্যাট্রেক্স বা তোশক, দুটি করে বালিশ ও দুটি বেডশিট, ৪টি বালিশের কভার, প্রয়োজন অনুযায়ী এক বা দুটি কভারসহ কম্বল, একটি মশারি এবং একটি ছোট হাত আয়না ও চিরুনি প্রদান করা হবে।

এছাড়া প্রত্যেক বন্দীর একটি টুথব্রাশ, টুথপেস্ট, সাবান, সেভিং ক্রিম, স্লিপারের ক্যাপ, প্রয়োজন হলে জায়নামাজ ও তোয়ালে থাকবে। এছাড়া নিজ খরচে বন্দী স্বাভাবিক অভ্যাস (বাইরের জীবনে অভ্যস্ত জীবনযাপন) ও কারাগারের আবাসনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হিসেবে সিনিয়র জেল সুপার বা সুপারের অনুমোদনক্রমে অন্যান্য আসবাবপত্র, বিছানা, বাসন কোসন, চুলের তেল ও টয়লেটে ব্যবহারের সামগ্রী ব্যবহার করতে পারবেন।

সূত্র জানায়, কারাবিধি অনুযায়ী আটক অবস্থায় যখন প্রথম শ্রেণীর বন্দীর ভ্রমণের (বিশেষ প্রয়োজনে চিকিৎসা বা বিভিন্ন কাজে দেশে বা বিদেশে অনুমতি সাপেক্ষে) প্রয়োজন হয় তখন তাকে দ্বিতীয় শ্রেণীর বন্দী সুবিধা দিতে হবে। এই ডিভিশনের বন্দীর যদি উচ্চতর শ্রেণীতে ভ্রমণের ইচ্ছা পোষণ করে তাহলে তাকে সে সুযোগ দেয়া হবে। তবে অতিরিক্ত ব্যয় বন্দী বহন করবে। রাতে ট্রেনে ভ্রমণ করলে বন্দী সঙ্গে করে ব্যক্তিগত বিছানা ও কীট নিতে পারবেন। বিপজ্জনক বন্দীর ক্ষেত্রে একটি রিজার্ভ কক্ষ রাখা যাবে। প্রথম শ্রেণীর দৈনিক ভাতা হবে মাথাপিছু ১০০ টাকা। পোশাকের ক্ষেত্রে প্রত্যেক বন্দী তার পছন্দের পোশাক পরতে পারবেন। যদি তা পর্যাপ্ত ও ব্যবহার উপযুক্ত এবং আপত্তিকর না হয়। এর বাইরে পোশাকের প্রয়োজন হলে সিনিয়র জেল সুপার বা সুপারের অনুমতিক্রমে বন্দীর নিজ খরচে সময়ে সময়ে অতিরিক্ত পোশাক বাইরে থেকে নেয়া যাবে। তবে এই সুযোগের আওতায় রাজনৈতিক প্রতীকযুক্ত কোন পোশাক পরিধান করা যাবে না। যদি কোন বন্দী সরকারের খরচে পোশাক পেতে চান তাহলে তাকে ১১৬৫ বিধিতে বর্ণিত দ্বিতীয় শ্রেণীর সাজাপ্রাপ্ত বন্দির নির্ধারিত পোশাক ও সরঞ্জাম দেয়া যাবে। বন্দীর শরীর ও পোশাক পরিষ্কারের জন্য ভাল সাবান দিতে হবে। তবে বন্দী নিজের কাপড় পরিষ্কারে অভ্যস্ত না হলে বিনা খরচে পোশাক নিয়মিত পরিষ্কারের জন্য সিনিয়র জেল সুপার বা সুপার ব্যবস্থা করবেন।

জেলকোড অনুযায়ী প্রথম শ্রেণীর বন্দী থাকা প্রত্যেক কারাগারের জন্য জেলা ম্যাজিস্ট্রেট অথবা মেট্রোপলিটন এলাকার ক্ষেত্রে পুলিশ কমিশনার এবং দুজন বেসরকারী পরিদর্শকের সমন্বয়ে সরকারের পক্ষ থেকে গঠিত একটি বিশেষ পরিদর্শক বোর্ড থাকবে। অন্যান্য বেসরকারী পরিদর্শক প্রথম বন্দী ওয়ার্ড বা সেল পরিদর্শন করতে পারবেন না। প্রথম শ্রেণীর বন্দীকে বিশেষ সুবিধা স্বরূপ ১০৭৪ কারাবিধিতে বর্ণিত বই, ম্যাগাজিন ও পত্রিকা ছাড়াও নোটবুক এবং পেন্সিল বা কলম ব্যবহার করতে দেয়া যাবে। অনুশীলন বই বিদ্যালয়ের সাধারণ নোটবুকের মতো হবে এবং পৃষ্ঠা নম্বর দিতে হবে। যাতে কোন পাতা ছিড়ে বন্দী চিঠি লিখে কারাগারের বাইরে পাঠাতে না পারে। কোন পৃষ্ঠা হারানো গেছে কিনা মাঝেমধ্যে পরিদর্শন করতে হবে। চিঠি লেখার কাজে কোন পাতা ব্যবহার করা যাবে না। প্রথম শ্রেণীর বন্দী চুল ছাটাই ও দাড়ি কামানোর জন্য কারা নাপিতের সুবিধা পাবেন। সিনিয়র জেল সুপার বা সুপারের বিবেচনায় বন্দীদের নিজ খরচে ব্যক্তিগত শেভের জিনিসপত্র রাখার অনুমতি দিতে পারেন। তবে বন্দীরা একই সময়ে একটির বেশি ব্লেড বা একবার ব্যবহার্য রেজার রাখার অনুমতি পাবেন না। বন্দীর বসবাসের এলাকার দায়িত্বরত প্রধান কারারক্ষীর কাছে ব্যবহৃত ব্লেড বা রেজার ফেরত না দেয়া পর্যন্ত নতুন কোন ব্লেড বা রেজার দেয়া যাবে না।

সূত্র জানায়, প্রথম শ্রেণীর বন্দী শ্রেণীপ্রাপ্ত বন্দীদের জন্য নির্ধারিত খাবার পাবেন। খাবারের ক্ষেত্রে জেল সুপারের অনুমতি সাপেক্ষে পরীক্ষাপূর্বক সিনিয়র সুপার বা সুপারের বিবেচনায় বন্দীরা নিজ খরচে একই ধরনের জিনিস প্রিজন্স ক্যাশের (পিসি) অর্থ থেকে গ্রহণ করতে পারবেন। সকাল-বিকেল দু’বেলা নাস্তা আর দুপুর এবং রাতের বেলার খাবার তাকে দেয়া হবে। সেক্ষেত্রে মাছ, মাংস, ভাত, ডাল সবজি বা কারাগারের তালিকা অনুযায়ী ইচ্ছেমতো খাবার তিনি গ্রহণ করতে পারেন। তবে এজন্য জেলার প্রতিদিন উক্ত বন্দীর খাবারের তালিকা বন্দীর কাছে তুলে ধরবেন। বন্দী তার পছন্দ মতো খাবারের কথা বলবেন। এছাড়া কোন প্রথম শ্রেণীর বন্দী যদি আগে থেকেই মাদক গ্রহণে অভ্যস্ত হন সেক্ষেত্রে মেডিক্যাল অফিসারের আদেশে এলকোহল বা মদ বা যে কোন ধরনের ওষুধ জাতীয় দ্রব্য নিজ খরচে সরবরাহ করবে কারা কর্তৃপক্ষ। বন্দীর খরচের যুক্তিসঙ্গত পরিমাণ সিগারেট এবং তামাকের অনুমতি দেয়া হবে। সিনিয়র সুপার বা সুপার বিধি ১১০০ তে বর্ণিত খাবারের পরিমাণকে নির্দেশনা হিসেবে বিবেচনা করবেন এবং অনুমোদিত পরিমাণের মধ্যে যতটুকু সম্ভব পরিবর্তন করতে পারবেন। জেলকোড অনুযায়ী কারাগারে ডিভিশনের সুবিধাকে বা কারা পাবেন বা পাবেন না তা সুনির্দিষ্ট রয়েছে। তবে সাজপ্রাপ্ত আসামিরা কে কোন সুবিধা পাবেন তা নিয়ে কিছুটা মতবিরোধ রয়েছে। আইনজীবীদের মতে, যদি কোন বন্দী ডিভিশন পাওয়ার যোগ্যতাগুলো অর্জন করেন তবে তিনি সেই সুবিধা ভোগ করতে পারবেন।

কারা পাবেন প্রথম শ্রেণীর বন্দীর মর্যাদা এ বিষয়ে জেলকোডের ৬১৭ বিধিতে বলা আছে, যারা ভাল চরিত্রের অধিকারী ও অনভ্যাসগত অপরাধী, সামাজিক মর্যাদা, শিক্ষা এবং অভ্যাসের কারণে যাদের জীবনযাপনের ধরন উচ্চমানের এবং যারা নৃশংসতা, নৈতিকস্খলন এবং ব্যক্তিগত প্রতিহিংসামূলক অপরাধ বা বিস্ফোরক আগ্নেয়াস্ত্র সঙ্গে রাখা, সম্পত্তি সংক্রান্ত মারাত্মক অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত নন বা অন্য কাউকে এসব অপরাধ করতে প্ররোচিত বা উত্তেজিত করেনি তারা ডিভিশন-১ প্রাপ্তির যোগ্য হবেন। এছাড়া বিধি ৬১৭ (২)-এ বলা হয়েছে, নাগরিকত্ব নির্বিশেষে সামাজিক মর্যাদা, শিক্ষা এবং অভ্যাসের কারণে জীবনযাপনের ধরন উচ্চমানের বন্দীগণ ডিভিশন-২ প্রাপ্তির যোগ্য হবেন। অভ্যাসগত বন্দীগণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে এই শ্রেণীর বহির্ভূত হবে না, সরকারের অনুমোদন বা পুনর্বিবেচনার শর্তে শ্রেণী বিভাজনকারী কর্তৃপক্ষকে বন্দীর চরিত্র এবং প্রাক পরিচিতির ভিত্তিতে এ শ্রেণীতে অন্তর্ভুক্তির জন্য ক্ষমতা দেয়া হবে। যেসব বন্দী ডিভিশন ১ ও ২-এর অন্তর্ভুক্ত নয় তারা তৃতীয়টির অন্তর্ভুক্ত হবেন, যেখানে বলা হচ্ছে, আদালত কোন বন্দীকে ডিভিশন ১ ও ডিভিশন ২ প্রদানের জন্য প্রাথমিক সুপারিশটি সরকারের অনুমোদন কিংবা পুনর্বিবেচনার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠাবেন এবং মন্ত্রণালয় সেটি অনুমোদন বা পুনর্বিবেচনা করবেন। আর অনুমোদনের এ সময়কালে সুপারিশকৃত যেসব সাজাপপ্রাপ্ত বন্দীর পূর্ববর্তী জীবনমান সাধারণের চেয়ে উন্নততর বলে ঘোষিত অথবা বিচারাধীন বন্দীকে ডিভিশন-১ বিচারাধীন বন্দীর শ্রেণীভুক্ত করা হয়েছে, যদি তারা ভাল চরিত্রের অনভ্যাসগত অপরাধী হয় এবং অপরাধের ধরন হিসেবে ও অন্যান্য ক্ষেত্রে দ্বিতীয় শ্রেণীর ডিভিশন সাজাপ্রাপ্ত বন্দী হিসেবে বিবেচিত ঘোষিত হয় তারা সে সময় দ্বিতীয় শ্রেণীর ডিভিশনপ্রাপ্ত বিবেচিত হবেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ ইফতেখার উদ্দীন জনকণ্ঠকে বলেন, একজন প্রথম শ্রেণীর বন্দী হিসেবে বেগম খালেদা জিয়াই শুধু নন জেলকোড অনুযায়ী যে কোন বন্দীকেই আমরা তার প্রাপ্য সকল সুবিধা প্রদান করে থাকি। তাই আদালতের নির্দেশনার আলোকে খালেদা জিয়াও প্রথম শ্রেণীর বন্দীর সকল সুবিধাই ভোগ করছেন। তবে প্রথম তিনদিন আদালতের কোন নির্দেশনা না থাকায় জেলকোড অনুযায়ী তিনি সাধারণ বন্দী হিসেবেই ছিলেন। এছাড়া আদালতের নির্দেশনার আলোকে আমরা বুধবার থেকে তার পুরনো গৃহকর্মী ফাতেমাকে তার সঙ্গে কারাগারে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছি। বর্তমানে ফাতেমা খালেদা জিয়ার সঙ্গেই আছেন। এছাড়া সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী ও একজন প্রথম শ্রেণীর বন্দী হিসেবে প্রাপ্য নিয়মিত সকল সুবিধাই নিশ্চিত করা হচ্ছে।

প্রকাশিত : ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০১৮

১৫/০২/২০১৮ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



শীর্ষ সংবাদ: