১৯ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৩ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

প্রসার ঘটছে জিএমও প্রযুক্তির ॥ বিটি বেগুনের পর এবার তুলা আলু ধান নিয়েও গবেষণা


এমদাদুল হক তুহিন ॥ দেশে ধীরে ধীরে জেনেটিক্যালি মডিফায়েড অর্গানিজম (জিএমও) প্রযুক্তির প্রসার ঘটছে। জিএমও প্রযুক্তির মাধ্যমে উদ্ভাবিত বিটি বেগুনের পরÑ এবার তুলা, আলু ও ধান নিয়েও গবেষণা কার্যক্রম এগিয়ে চলছে। বিতর্ক আর সমালোচনা পেছনে ফেলে মাঠপর্যায়ে বেড়ে চলছে বিটি বেগুনের আবাদ কার্যক্রম। বছর ব্যবধানে বাড়ছে কৃষকের সংখ্যাও। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ২৫০ কৃষক বিটি বেগুন চাষের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকলেও ২০১৬-১৭ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫১২ জনে। একই সময়ে বেড়েছে উৎপাদনÑ বিটি বেগুনের কোন কোন জাতে সাধারণ বেগুনের চেয়ে উৎপাদন হয়েছে প্রায় দ্বিগুণ। আর কীটনাশকের ব্যবহার কমায় খরচ কমেছে কৃষকের। বিটি বেগুন তথা জিএমও প্রযুক্তির এই সফলতায় উদ্বুদ্ধ হয়ে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএআরআই) তুলা নিয়েও গবেষণা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির জীব প্রযুক্তি বিভাগের গ্রীন হাউসে সম্প্রতি বিটি কটনের ‘কনটেইন্ড ট্রায়াল’ও শেষ হয়েছে। আর লেট ব্লাইট প্রতিরোধী আরবি জিন সমৃদ্ধ আলুর ‘রেগুলেটরি ট্রায়ালের’ পর শীঘ্রই প্রস্তাব করা হবে জাত অবমুক্তির। সময়টিতে এগিয়ে চলছে গোল্ডেন রাইসের গবেষণা কার্যক্রমও।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএআরআই) মহাপরিচালক ড. আবুল কালাম আযাদ জনকণ্ঠকে বলেন, ‘বিটি বেগুন নিয়ে গবেষণার পর আমরা এটিকে মাঠপর্যায়ে নিয়ে গেছি। আমাদের এখানে আলু, তুলা ও গোল্ডেন রাইস নিয়েও কাজ চলছে। একেকটা একেক পর্যায়ে আছে। ভিন্ন ভিন্ন জিন বিভিন্ন সোর্স থেকে আনা হয়েছে। এটা কেবল বায়ো টেকনোলজির মাধ্যমেই সম্ভব।’ তিনি বলেন, ‘জিএমও প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশগত নিরাপত্তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর দেশে বায়ো টেকনোলজি সেফটি নীতিমালা ও কমিটি থাকায় জনস্বার্থের ব্যত্যয় ঘটছে না। আর বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করেই নতুন একটি জাতের অনুমতি দেয়া হয়। অর্থাৎ আমরা সবদিক থেকেই সঠিক অবস্থানে আছি।’

বিএআরআইয়ের তথ্যমতে, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে দেশের ১৯ জেলায় মাঠপর্যায়ে ফল ও ডগা ছিদ্রকারী পোকা প্রতিরোধী চারটি বিটি বেগুনের জাতের উপযোগিতা পরীক্ষা শুরু হয়। পরীক্ষা চলাকালে ওই সময়ে ১০৮ কৃষক বিটি বেগুন চাষের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ২৫ জেলায় ২৫০ কৃষক বিটি বেগুন চাষের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকলেও ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৩৬ জেলায় ৫১২ কৃষকের মাঠে তা সম্পন্ন হয়েছে। মাঠপর্যায়ে ওই তিন বছরের গবেষণালব্ধ ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বারি বিটি বেগুন-১’র ক্ষেত্রে ফল ও ডগা ছিদ্রকারী পোকার আক্রমণে প্রাদুর্ভাব ছিল শতকরা শূন্য থেকে শূন্য দশমিক ৩৩ শতাংশ। আর বারি বিটি বেগুন-২, বারি বিটি বেগুন-৩ ও বারি বিটি বেগুন-৪’র ক্ষেত্রে এই হার ছিল শূন্য থেকে ২ দশমিক ৫, শূন্য থেকে ১ দশমিক ৩ ও শূন্য থেকে ৩ দশমিক ২ শতাংশ। অন্যদিকে নন-বিটি বেগুন জাতসমূহে ফল ও ডগা ছিদ্রকারী পোকা আক্রমণের গড় প্রকোপ ছিল যথাক্রমে ৫০ থেকে ৫৮, ৪৯ থেকে ৫১, ৪৯ থেকে ৫৬ ও ৩৯ থেকে ৪৫ শতাংশ। আর ফলনের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে, নন বিটি বেগুনের ক্ষেত্রে হেক্টরপ্রতি ১৩ টন ফলন হলেও বিটি বেগুনের ক্ষেত্রে তা হয়েছে ২২ টন পর্যন্ত। এক্ষেত্রে বলা চলে, সাধারণ বেগুনের তুলনায় বিটি বেগুনের উৎপাদন হয়েছে প্রায় দ্বিগুণ।

প্রতিষ্ঠানটির তথ্যমতে, বিটি বেগুনের প্রচলিত চার জাত ছাড়াও নতুন তিন জাত উদ্ভাবিত হয়েছে। আর প্রস্তাবিত বারি বিটি বেগুন-৫, বারি বিটি বেগুন-৬ ও বারি বিটি বেগুন-৭ অবমুক্তির অপেক্ষায় রয়েছে। জানা গেছে, বারি বিটি বেগুন-৫ এমন একটি জাত, যা চট্টগ্রাম অঞ্চলে চাষের উপযোগী। আর অবমুক্তির অপেক্ষায় থাকা বারি বিটি বেগুন-৬ রংপুর ও বারি বিটি বেগুন-৭ বরিশাল অঞ্চলে চাষ করা যাবে।

জিএমও প্রযুক্তি

ফসলে অন্য প্রজাতির রোগ প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া বা কোন একটি জিন ঢুকিয়ে নতুন একটি জাত উদ্ভাবনের প্রক্রিয়াকেই জেনিটিক্যালি মডিফায়েড অর্গানিজম বা সংক্ষেপে জিএমও বলা হয়ে থাকে। কখনও কখনও এই প্রক্রিয়াকে জিন প্রকৌশল বা জেনেটিক্যালি ইঞ্জিনিয়ার্ড অর্গানিজমও বলা হয়। ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি, পোকামাকড় প্রতিরোধী জাত উদ্ভাবন, ফসলের গুণাগুণ ও স্বাদের পরিবর্তন ঘটাতে জিএমও টেকনোলজি ব্যবহার হয়ে আসছে। বিশ্বের ২৯ দেশে জিএমও ফুডের চাষাবাদ রয়েছে। তথ্যমতে, দেশের বাজারে জিএমও প্রযুক্তির বিটি বেগুন, গোল্ডেন রাইস ও সয়াবিন বিক্রি হচ্ছে। তবে সয়াবিন বিদেশ থেকে আমদানিকৃত। আর এর পুরোটাই আসছে আমেরিকা, ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা থেকে।

জিএমও সয়াবিন প্রসঙ্গে এক কৃষিবিদ জনকণ্ঠকে বলেন, দেশে উদ্ভাবিত বিটি বেগুন নিয়ে সমালোচনা থাকলেও সয়াবিন নিয়ে কোন সমালোচনা নেই। হয়ত এটি বিদেশ থেকে আসে বলেই। আর দেশে-বিদেশে জিএমও প্রযুক্তি নিয়ে বিতর্কের কারণ জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের এক বিজ্ঞানী বলেন, ‘জিএমও প্রযুক্তিতে ভিন্ন ভিন্ন জিন প্রবেশ করানো হয়। অন্য প্রজাতির জিন প্রবেশ করানোর কারণেই মূল বিতর্ক। যেমন বিটি বেগুনে প্রবেশ করানো ব্যাকটেরিয়াটি কিন্তু ভিন্ন প্রজাতির। হয়ত এ কারণেই দেশে এত বেশি সমালোচনা হয়েছে। তবে প্রমাণিতভাবে ব্যাকটেরিয়াটি কিন্তু ক্ষতিকর নয়। ক্ষতিকর হওয়ার জন্য যে উপাদান থাকার কথা তা এই ব্যাকটেরিয়াতে নেই।’

আর জিএমও নিয়ে বিতর্ক প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের উত্তরে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) ফেলো ও কৃষি বিশেষজ্ঞ ড. এম আসাদুজ্জামান জনকণ্ঠকে বলেন, ‘জিএমও প্রযুক্তির মাধ্যমে উদ্ভাবিত সব ফসল নিয়ে বিতর্ক নেই। বিটি বেগুনের বিষয়ে তর্ক-বিতর্ক বা সমালোচনা আছে। তবে যারা বিতর্কে অংশ নিচ্ছে তাদের কাছে কিন্তু কোন উপযুক্ত প্রমাণ নেই। যারা বায়ো টেকনোলজিকে খারাপ বলছে তারা এর স্বপক্ষে কোন প্রমাণ দিতে পারেনি। আবার যারা পক্ষে বলছে তারাও জনসম্মুখে তেমন কোন প্রমাণ তুলে ধরতে পারছে না। সরকারেরই উচিত হবে জিএমও প্রযুক্তি তথা বিটি বেগুনের স্বপক্ষে আরও বেশি বেশি প্রমাণ তুলে ধরা।’

বিটি বেগুন

বিটি বেগুন হলো ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকা প্রতিরোধী বেগুন, যা জিন প্রকৌশলের মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে। বিজ্ঞানীরা দীর্ঘ প্রচেষ্টায় বেগুনের মধ্যে ফল ও ডগা ছিদ্র প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া জিন ঢুকিয়ে বেগুনের নতুন একটি জাত উদ্ভাবন করেনÑ যা বিটি বেগুন নামে পরিচিত। বেগুন চাষাবাদের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, এই ফসলটির প্রধান শত্রু ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকা; যা এফএসবি নামে পরিচিত। একাধিক গবেষণায় উঠে এসেছে, বেগুন চাষাবাদের ক্ষেত্রে এই পোকা ফসলের প্রায় ৭০ শতাংশ নষ্ট করে ফেলে। আর এই পোকাটি আক্রান্ত বেগুনের ৯৫ শতাংশই নষ্ট হয়ে যায়। ফলে কৃষকরা পোকা দমনে ঘন ঘন কীটনাশক ব্যবহার করে থাকে, যা পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। মূলত কীটনাশকের অপব্যবহার কমাতেই বিটি বেগুনের উদ্ভাবন। আর বিটি বেগুন চাষে কীটনাশকের ব্যবহার নেই বললেই চলে। তথ্যমতে, দেশে এক শ’র অধিক বেগুনের জাত রয়েছে। আর ধীরে ধীরে অধিকাংশ জাতকেই জিএমও করার লক্ষ্য রয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় বিটি বেগুনের আরও ৩টি জাত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

চাষীদের কথা

বিটি বেগুন চাষ করেন এমন একজন সাইফুল ইসলাম। বগুড়া জেলার গাবতলী উপজেলার আমতলী পাড়া গ্রামের বাসিন্দা তিনি। নিজের ২৫ শতাংশ জমিতে ৩ বছর ধরে বিটি বেগুন চাষের সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছেন তিনি। জনকণ্ঠকে সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘শীতের মৌসুমে বিটি বেগুন-৪’র ফলন বেশি। তবে গরমের মৌসুমে ফলন কমে যায়। কিন্তু সাধারণ বেগুনের তুলনায় বিটি বেগুনের ফলন বেশি। পোকার কারণে অন্য বেগুনের ৮০ শতাংশই নষ্ট হলেও বিটি বেগুনে একটাও পোকা খোঁজে পাওয়া যায় না।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সারা বছরই বেগুন আবাদ করা যায়। এই এলাকায় আমিই প্রথম বিটি বেগুন আবাদ করেছি। এখন আমার দেখাদেখি অনেকেই বিটি চাষে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে। তবে বীজ দিতে পারছি না।’ বিটি বেগুনের স্বাদ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘বিটি বেগুন আমরা প্রায় প্রতিদিনই খাই। স্বাদের দিক থেকে এর স্বাদ অন্য যে কোন বেগুনের তুলনায় অনেক। আর এই বেগুন বিক্রি করতে বাজারে নিয়ে গেলে মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ে। কার আগে কে নেবেÑ শুরু হয় সেই প্রতিযোগিতা।’ আর গোপালগঞ্জের টঙ্গীপাড়া উপজেলার কৃষক মোঃ আরাফাত রহমান জনকণ্ঠকে বলেন, ‘অন্য বেগুনের তুলনায় বিটি বেগুনের উৎপাদন অনেক বেশি হয়। তবে বাজারে নিলে, একদিন পর, বিটি বেগুনের আকৃতি নষ্ট হয়ে যায়।’ পিরোজপুরের স্বরূপকাঠি উপজেলার কৃষক রিপন ম-ল জনকণ্ঠকে বলেন, ‘বিটি বেগুন চাষে খরচ কমেছে। উৎপাদন বেড়েছে। তবে বিক্রি করতে বাজারে বেগুন নিয়ে গেলে মানুষ তেমনভাবে আগ্রহ দেখাচ্ছে না।’

এক প্রশ্নের উত্তরে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএআরআই) সরেজমিন গবেষণা বিভাগের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আ স ম মাহবুবুর রহমান খান জনকণ্ঠকে বলেন, বিটি বেগুন নিয়ে যে সমালোচনা বা বিতর্ক ছিলÑ তা এখন আর নেই। আমরা শতভাগ সফল হয়েছি। গতবছর সাড়ে ৫০০ ট্রায়াল করেছি। সামনের বছর সংখ্যার দিক থেকে এটি আরও বেশি হবে। সমাগ্রিক প্রসঙ্গে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএআরআই) মহাপরিচালক ড. আবুল কালাম আযাদ বলেন, বিটি বেগুনের বীজগুলো কিন্তু হাইব্রিড নয়। যেসব কৃষকের মাঠে বিটি বেগুন চাষ হচ্ছেÑ অনেক সময় তাদের পার্শ্ববর্তী কৃষকও উৎসাহিত হয়ে বিটি বেগুন চাষে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে। আর তারা সহজেই ওই বীজ সংগ্রহ করতে পারছে। তবে বীজের উৎপাদন আমাদের হাতে রেখেছি। কারণ আমাদের বিজ্ঞানীরা তা মনিটরিং করছে। তিনি বলেন, বিটি বেগুন আবাদের ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে এটি কেবল একটি পোকা প্রতিরোধী। তাই চাষের ক্ষেত্রে আর কোন পোকা আক্রমণ করবে নাÑ তা এমন নয়। তবে ওইসব পোকার পরিমাণ একেবারেই নগণ্য। আর চাষাবাদের সময় কোন অঞ্চলে কোন সমস্যা দেখা দিলে তা আমরা সার্বক্ষণিক তদারকি করছি।

সর্বাধিক পঠিত:
পাতা থেকে: