১৮ ডিসেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

জোড়া শিশু অস্ত্রোপচার-এযাবত মারা গেছে একটি, অন্যরা সুস্থ


নিখিল মানখিন ॥ একের পর এক জোড়া শিশুর সফল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করে চলেছেন বাংলাদেশী চিকিৎসকরা। এতে এদেশের চিকিৎসা সেক্টর বিশেষ করে চিকিৎসকদের দক্ষতা আজ দেশে-বিদেশে প্রশংসিত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জোড়া শিশু বলতে আমরা সে সকল শিশুকে বুঝি যারা মাতৃগর্ভ হতে শারীরিকভাবে যুক্ত অবস্থায় জন্মগ্রহণ করে। এ ধরনের শিশুর জন্মগ্রহণের ঘটনা অত্যন্ত বিরল। এ পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী এ ধরনের শিশুদের অর্ধেকই সাধারণত মাতৃগর্ভেই মারা যায়। আর জীবিত জন্মের এক-তৃতীয়াংশ বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় জন্মের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই মৃত্যুবরণ করে। বেঁচে থাকা শিশুর মধ্যে মেয়ে শিশুর সংখ্যা সাধারণত এক-তৃতীয়াংশ। এ পর্যন্ত বাংলাদেশী চিকিৎসকদের অস্ত্রোপচারে পৃথক হওয়া শিশুদের ৯০ শতাংশই জীবিত ও সুস্থ রয়েছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা।

বিভিন্ন হাসপাতালের শিশু সার্জারি বিভাগের চিকিৎসকরা জানান, বাংলাদেশে এ পর্যন্ত মোট তিনটি জোড়া শিশুর অপারেশন হয়েছে। এর মধ্যে ২০০৮ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে বহুল আলোচিত জোড়া শিশু বন্যা ও বর্ষা এবং ২০১৬ সালে অপূর্ণাঙ্গ জোড়া শিশু মোঃ আলীর সফল অস্ত্রোপচার করানো হয়। এই দুটি কেসের মধ্যে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে জীবিত থাকার ৮ ঘণ্টা পর শিশু বর্ষা মারা যায়। জীবিত রয়েছে বন্যা। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে আর একটি জোড়া শিশু অস্ত্রোপচারের জন্য প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। সম্প্রতি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকরা সফল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে জোড়া শিশু তোফা ও তহুরাকে পৃথক করেছেন। জীবিত রয়েছে দুটি শিশুই।

বিভিন্ন সময়ে পৃথক করা জোড়া শিশুদের অবস্থা

২০১৬ সালের ২০ জুন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিশু সার্জারি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডাঃ রুহুল আমীনের নেতৃত্বে ১৮ সদস্যের মেডিক্যাল টিম সফল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ শিশু থেকে অপূর্ণাঙ্গ শিশুটিকে আলাদা করেন। এতে সহায়তা করেন এই বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডাঃ সফিকুল হক। আরেকটি শিশুর শরীরের প্রায় অর্ধেক অংশ নিয়ে জন্মানো মোহাম্মদ আলী নামের এই পূর্ণাঙ্গ শিশুটি জন্মায় ২০১৬ সালের ৭ মার্চ। সে একটি পূর্ণাঙ্গ শিশু কিন্তু তার ওপর ভর করে আছে আর একটি শিশুর পেটের নিচের অর্ধেকসহ শরীরের নিম্নঙ্গ। উর্ধাঙ্গর মাথা, বুক ও দু’ হাত নেই অর্থাৎ আংশিক বা অপূর্ণাঙ্গ শিশুটি তার আংশিক অস্তিত্ব নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ শিশুর ওপর ভর করে বেঁচে আছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয়, প্যারাসাইটিক টুইন বা অপূর্ণাঙ্গ যমজ। প্যারাসাইটিক টুইন সমস্যা নিয়ে জন্মানো এ ঐতিহাসিক শিশুটির স্বাভাবিক জন্ম দেন বাগেরহাটের হীরামনি। শিশুটির পিতার নাম মোঃ জাকারিয়া। গত মঙ্গলবার শিশুটির মা হীরামনি জনকণ্ঠকে জানান, তাদের শিশুটি সুস্থ ও ভাল রয়েছে। স্বাভাবিকভাবে জন্ম নেয়া একটি শিশুর মতোই স্বাভাবিক জীবন যাপন করছে। বাড়তি কোন চিকিৎসা দিতে হচ্ছে না। এই চিকিৎসার সঙ্গে জড়িত সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন হীরামনি। তিনি জানান, তিনি তিনটি সুস্থ স্বাভাবিক কন্যা সন্তানের জন্ম দিয়েছেন। মোহাম্মদ আলী হলো তাঁর চতুর্থ সন্তান।

জোড়া শিশু বন্যা ও বর্ষা

সফল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে আরেকটি জোড়া শিশু বন্যা ও বর্ষাকে পৃথক করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিজ্ঞ চিকিৎসকরা। গত ২০০৮ সালে বহুল আলোচিত বন্যা ও বর্ষাকে মাত্র তিন মাস বয়সে শিশু সার্জারি বিভাগের তৎকালীন চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডাঃ মোঃ শফিকুল হকের নেতৃত্বে দীর্ঘ ৮ ঘণ্টা সফল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে আলাদা করা হয়েছিল। তবে বর্ষার হৃদযন্ত্র বন্যার ওপর নির্ভরশীল থাকায় আলাদা করার পর বর্ষাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। আলাদা করার মাত্র ৮ ঘণ্টার মাথায় বন্যাকে ফেলে রেখে চলে যায় বর্ষা। বন্যার বাবা গোলাম কিবরিয়া একজন স্কুল শিক্ষক। মা শাহনাজ বেগম নার্স। গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের বাসিন্দা গোলাম কিবরিয়া বুধবার জনকণ্ঠকে জানান, তাদের কন্যাশিশু বন্যার বয়স এখন ৯ বছর ৪ মাস। সে পুরোপুরি সুস্থ রয়েছে। গোবিন্দগঞ্জের কুটিবাড়ী শিশু নিকেতন স্কুলে নার্সারিতে পড়ছে সে। স্বল্প মূল্যের একটি ওষুধ ছাড়া বাড়তি কোন চিকিৎসা দিতে হচ্ছে না। বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় এবং সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি তারা কৃতজ্ঞ বলে জানান গোলাম কিবরিয়া। তিনি আরও জানান, আপ্রাণ চেষ্টা করে বন্যা ও বর্ষাকে পৃথক করেছিলেন চিকিৎসকরা। আলাদা করার পর রাতে অনেক বলে-কয়ে একবারের জন্য ওয়ার্ডে শিশু দুটিকে দেখতে গিয়েছিলাম আমি। তখন দুই শিশুই ঘুমুচ্ছিল। চলে যাওয়া শিশুর স্মৃতি বর্ণনা করতে গিয়ে গোলাম কিবরিয়া জানান, একবার ওর মা বর্ষাকে ডাকে। বর্ষা চোখ মেলে। মনে হলো, হাসল। আর আলাদা করার আগে বন্যার চেয়ে বর্ষাই ছিল বেশি চঞ্চল। নাম ধরে ডাকলেই তাকাত, হাত-পা নাড়ত। কথা বলতে চাইত কত, যেন বড় মানুষ। বলতে বলতে কেঁদে ফেললেন গোলাম কিবরিয়া।

জোড়া শিশু তোফা-তহুরা

গত ১ আগস্ট সফল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে জোড়া শিশু তোফা ও তহুরাকে আলাদা করেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। ওইদিন সকাল ৮টা থেকে জরুরী বিভাগের তৃতীয় তলার অপারেশন থিয়েটারে টানা নয় ঘণ্টা জটিল অস্ত্রোপচারের মধ্য দিয়ে ওদের আলাদা করে পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। বাংলাদেশে চিকিৎসা বিজ্ঞানে এটি বিরল ঘটনা। শিশু সার্জারি বিভাগের চিকিৎসকরা জানান, বাংলাদেশের ইতিহাসে ‘পাইগোপেগাস’ শিশু আলাদা করার ঘটনা এটি প্রথম। এর আগে অন্যান্য হাসপাতালে তিন জোড়া শিশুকে অস্ত্রোপচার করে আলাদা করা হয়েছে। তাদের ধরন ছিল আলাদা। ওরা দু’জন এখন আলাদা। দু’জনের অবস্থাই স্থিতিশীল। বর্তমানে তারা সুস্থ ও স্বাভাবিক রয়েছে। দুই শিশুর স্পাইনাল কর্ড, মেরুদ-, পায়খানার রাস্তা ও প্রস্রাবের রাস্তা আলাদা করা হয়েছে। জন্মের পর থেকে ১০ মাস তোফা ও তহুরা একসঙ্গে বড় হয়েছে। পিঠের কাছ থেকে কোমরের নিচ পর্যন্ত তারা পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। দু’জনের পায়খানার রাস্তা ছিল একটি। তবে মাথা-হাত-পা ছিল আলাদা। ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মিজানুর রহমান, চীফ এ্যাডভাইজার ও বার্ন ইউনিটের সমন্বয়ক ডাঃ সামন্ত লাল সেন, শিশু সার্জারি বিভাগের প্রধান আশরাফুল হক কাজল, অধ্যাপক কানিজ হাসিনা, মেডিক্যাল বোর্ডের প্রধান ও শিশু দুটির তত্ত্বাবধায়ক ডাঃ সাহনূর ইসলামসহ বিভিন্ন বিভাগের ৩০ জনের মতো চিকিৎসক দুটি দলে ভাগ হয়ে দীর্ঘ এই অস্ত্রোপচারে অংশ নেন।

বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছে জোড়া শিশু

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বছরের বেশি সময় ধরে চিকিৎসাধীন রয়েছে মাথা জোড়া শিশু রাবেয়া ও রোকাইয়া। এ বিষয়ে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিশু সার্জারি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডাঃ রুহুল আমিন বলেন, আমরা এর আগেও জোড়া শিশু পেয়েছি, কিন্তু এভাবে মাথা জোড়া লাগানো যমজ শিশু এই প্রথম। এ কারণে ওদের চিকিৎসার জন্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে গিয়েও বিভিন্ন সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছি। বাংলাদেশে এ ধরনের কোন অপারেশন এর আগে হয়নি। যদি জানা যায়, শিশু দুটির একটা মাথা ও একটা ব্রেইন; তাহলে আমরা কী করব সেটা আমাদের কাছেই বড় প্রশ্ন। মাথা জোড়া লাগানো যমজের চিকিৎসা আমাদের জন্য সম্পূর্ণ নতুন। যার কারণে চ্যালেঞ্জটাও বেশি।

এদিকে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ওই শিশুদের চিকিৎসার জন্য একটা মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করা হয়েছে। তারপর বোর্ডের সবাই মিলে তাদের ভবিষ্যতের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবেন বলে জানান। বোর্ডে থাকবেন বিএসএমএমইউর শিশু সার্জারি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডাঃ মোঃ রুহুল আমিন, নিউরো সার্জারি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডাঃ কনক কান্তি বড়ুয়া, রেডিওলজি এ্যান্ড ইমেজিং বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডাঃ দেবব্রত বণিক, শিশু বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডাঃ সাহানা আক্তার রহমান, শিশু সার্জারি বিভাগের অধ্যাপক ডাঃ মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম, ইনস্টিটিউট অব পেডিয়াট্রিক নিউরো ডিজঅর্ডার এ্যান্ড অটিজম (ইপনা) বিভাগের অধ্যাপক ডাঃ মোঃ মিজানুর রহমান এবং বিএসএমএমইউ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোঃ আব্দুল্লাহ আল হারুন প্রমুখ।

বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিশু সার্জারি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডাঃ মোঃ রুহুল আমিন জোড়া শিশুদের বিষয়ে জনকণ্ঠকে জানান, যুক্ত যমজ শিশুর জন্মের ইতিহাস প্রাচীনকালের। প্রাচীন সভ্যতার ভাস্কর্যের অংকনে যুক্ত যমজ শিশুর প্রমাণ পাওয়া যায়। খ্রিস্টের জন্মের পর ৯৪৫ সালে আর্মেনিয়ার কনস্টানটিপোল শহরে যুক্ত যমজ শিশুর মধ্যে একজন মৃত্যুবরণ করলে সর্বপ্রথম শল্য চিকিৎসার মাধ্যমে অপরকে পৃথক করার উদ্যোগ নেয়া হয়, যদিও অপরজন তিনদিন পর মারা যায়। এ ধরনের শিশুদের মধ্যে শারীরিক, মানসিক ও চারিত্রিক বৈশিষ্টের পার্থক্য লক্ষ্যণীয়। অর্থাৎ এ ধরনের শিশুদের মধ্যে শরীরের একই অংশে জোড়া থাকে। বিশেষ করে বুকের সঙ্গে বুক, মাথার সঙ্গে মাথা, পেটের সঙ্গে পেট, পিঠের সঙ্গে পিঠ এবং এরা সর্বদাই একই লিঙ্গের হয়ে থাকে। এ ধরনের রোগ নির্ণয়ের বিষয়ে তিনি বলেন, গর্ভধারনের ১২ সপ্তাহের মধ্যেই আল্ট্রাসনোগ্রামের মাধ্যমে এ ধরনের যুক্ত যমজ শিশু নির্ধারণ করা সম্ভব। শল্য চিকিৎসার মাধ্যমে পৃথকীকরণ এ ক্ষেত্রে একমাত্র চিকিৎসা। তবে অপারেশনের পূর্বে পর্যাপ্ত পরীক্ষার মাধ্যমে সংযুক্ত অংশের বিস্তৃতি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া অত্যন্ত জরুরী এবং সফল অস্ত্রোপচারের পূর্বশর্ত। তবে কোন কোন ক্ষেত্রে অপারেশনের সময় শল্যবিদের অভিজ্ঞতা ও তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ অপারেশনগুলো সাধারণত সময়সাপেক্ষ, জটিল ও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। যা একটি অথবা কখনও উভয় শিশুর মৃত্যু ঘটতে পারে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে একের অধিক অপারেশনের প্রয়োজন হতে পারে, যা সম্পর্কে পূর্বেই অভিভাবকদের অবহিত করা প্রয়োজন। তারপরও অপারেশনের পরবর্তী সময়ে সামগ্রিক সম্মিলিত প্রচেষ্টা যুক্ত যমজ শিশুর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: