১৮ ডিসেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

ফার্মের আবির্ভাব কেন এবং কিভাবে


এক সকালে একজন অর্থনীতিবিদ শার্ট কিনতে গেলেন। পছন্দ করে যে শার্টটি তিনি বেছে নিলেন তা গ্লোবাল বা বৈশ্বিক উৎপাদনের এক চমৎকার নমুনা। শার্টটি জার্মান মেশিন ব্যবহার করে মালয়েশিয়ায় তৈরি, শার্টের কাপড় বানানো হয়েছে আমেরিকায় উদ্ভাবিত তুলাবীজ থেকে ভারতে উৎপাদিত তুলা দিয়ে। কলারের লাইনিং এসেছে ব্রাজিল থেকে। কৃত্রিম আঁশ এসেছে পর্তুগাল থেকে। শার্ট কিনতে যাওয়া সেই অর্থনীতিবিদ পল সিব্রাইট তাঁর ২০০৪ সালের গ্রন্থ ‘দি কোম্পানি অব স্ট্রেঞ্জার্স’ এ লিখেছেন, প্রতিদিন নানা সাইজ ও রঙের লাখ লাখ শার্ট বিক্রি হচ্ছে। কোন কর্তৃপক্ষ এর দায়িত্বে নেই। একটা প্রবাহ বা ধারার মধ্য দিয়ে তার এই শার্টটি চলে এসেছে। আর সেই প্রবাহের জন্য অসংখ্য যোগাযোগ রচনাকারী ফার্মগুলো নিহায়ত বাজারের দরদাম মেনে চলেছে।

অর্থনীতিবিদদের কাছে দীর্ঘদিন ধরেই একটা প্রশ্ন বেশ বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। তাহলো ফার্ম কেন আছে? কেন সবকিছু বাজারের দ্বারা সম্পাদিত হয় না? বিশিষ্ট ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ প্রয়াত অধ্যাপক রোনাল্ডও কোস এই প্রশ্নের সহজ জবাব দিয়েছেন। তিনি বলেছেন যে বাজার ব্যবহারের উঁচু ব্যয় বা খরচের কারণেই ফার্মের আবির্ভাব। প্রতিটি লেনদেনের জন্য পৃথক পৃথক চুক্তি নিয়ে আলোচনা করা এবং চুক্তি সম্পাদন করে তা বলবৎ করার পিছনে যে খরচ পড়ে সে তুলনায় ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোন প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে কাজ পরিচালনা করার খরচ অপেক্ষাকৃত কম। কোস বলেছেন যে আদর্শ পণ্য সামগ্রীর বাজারে এ ধরনের বিনিময় খরচ কম। একটি সুনির্দিষ্ট কাজের দায়িত্ব সহজেই বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়া যায়। সেখানে একজন ঠিকাদারকে সেই নির্দিষ্ট কাজটি করার জন্য একটা নির্ধারিত অঙ্কের অর্থ দেয়া হয়। এ ধরনের সহজ চুক্তি যখন যথেষ্ট হয় না বা কাজে লাগে না তখন আপনা থেকেই ফার্ম এগিয়ে আসে। সেক্ষেত্রে একজন কর্মী নির্ধারিত বেতনে একটা কাজ করতে পরস্পর সম্মত সীমারেখা পর্যন্ত নানা ধরনের ও পরিবর্তনশীল নির্দেশাবলী অনুসরণ করতে সম্মত হয়।

অধ্যাপক কোস ব্যাখ্যা করে বলেছেন যে, নীতিগতভাবে একটা ফার্মের উচিত সবচেয়ে সস্তা ও সবচেয়ে উৎপাদনশীল পণ্য ও সার্ভিস খুঁজে বের করতে সক্ষম হওয়া এবং তার জন্য সেগুলো একটা দক্ষ ও উন্মুক্ত বাজারে চুক্তিতে দেয়া। ফার্মের বাইরে পণ্য ও সার্ভিস লাভ করতে গিয়ে লেনদেন খরচ পোহাতে হয়, যেমন সঠিক ব্যক্তিদের খুঁজে বের করা, আলাপ আলোচনার মাধ্যমে চুক্তি সম্পাদন করা, কাজের সমন্বয় সাধন করা, বুদ্ধিবৃত্তি সম্পত্তির ব্যবস্থাপনা করা ইত্যাদি। এই কাজগুলোই সহজতর করা এবং কার্যসম্পাদনের ব্যয় কমিয়ে আনার জন্যই ফার্মের আবির্ভাব ঘটেছে।

একটা ফার্ম ততক্ষণ অবধি প্রসারিত হতে থাকবে এবং আরও বাড়তি লোককে নিতে থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত বাজারে বাড়তি সার্ভিস সংগ্রহ করা কম ব্যয়বহুল হবে।

তবে ফার্মের অভ্যন্তরে দক্ষতার সঙ্গে কি উৎপাদন করা যায়, একটা ফার্ম কতটা বড় হতে পারে এবং তারপরও দ্রুত এগিয়ে চলা কোম্পানিগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতাপূর্ণ থাকতে পারে তারও একটা সীমা আছে। বাজারের নানা ধরনের ঘাত প্রতিঘাত ও লেনদেনের খরচই ফার্মের অস্তিত্বের একমাত্র কারণ নয়। প্রকৃতপক্ষে ফার্মগুলোর সাংগঠনিক সুবিধাও আছে যেমন অতি জটিল সমস্যাবলী মোকাবিলায় নানা ধরনের সম্পদের সমাবেশ ঘটাতে পারার ক্ষমতা। এটা সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ এমন একটা সময়ে যখন নতুন নতুন প্রযুক্তি উৎপাদন ক্ষমতা ও রাজস্ব বাড়ানোর সব ধরনের সুযোগ উন্মোচন করে দিচ্ছে।

সফল কোম্পানিগুলো যতই পরিপক্বতা লাভ করে কর্মচারীরাও ক্রমশ ধারণাপ্রাপ্ত হয় যে তারা যেসব অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয় গ্রহণ করতে শিখেছে এবং কাজ করার যেসব পদ্ধতি এবং সিদ্ধান্ত নির্ধারণের যেসব প্রক্রিয়া তারা এত সাফল্যের সঙ্গে কাজে লাগিয়েছে সেগুলোই হলো কাজের সঠিক পদ্ধতি। তখন এই প্রক্রিয়া, পদ্ধতি ও মূল্যবোধগুলোই সংগঠনের সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়ায়। কোম্পানিগুলোর প্রসার ঘটে যখন সেগুলোর কর্মচারীদের সংখ্যা কয়েকশ’ থেকে কয়েক হাজারে দাঁড়ায় তখন সঠিকভাবে কার্যসম্পাদনের জন্য কি করা প্রয়োজন ও কিভাবে করা দরকার সে সম্পর্কে সকল কর্মচারীকে ঐকমত্যে আনা সেরা সেরা ম্যানেজারদের পক্ষেও অতি কঠিন চ্যালেঞ্জের হয়ে দাঁড়ায়। এমন পরিস্থিতিতে কালচার বা সংস্কৃতি ব্যবস্থাপনার একটা শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায়। কালচার কর্মচারীদের আপনা আপনি কাজ করতে সমর্থ করে তোলে। এইভাবে একটা ফার্ম লোকলস্কর ও সম্পদের সমষ্টির চাইতেও বেশি কিছু হয়ে দাঁড়ায়। সফল ফার্মগুলো শক্তিশালী ক্ষমতা বা সামর্থ্য বিশেষ করে কার্যকর প্রক্রিয়া, মূল্যবোধ ও সংস্কৃতি গড়ে তোলে যা এর সাংগঠনিক মূলধনের মর্মবস্তুতে পরিণত হয়। এসব ক্ষমতা ও সামর্থ্য বড় বড় বৈশ্বিক কোম্পানিগুলোকে জটিল প্রকল্পগুলো সাফল্যের সঙ্গে পরিচালনায় সমর্থ করে তোলে যেগুলো উন্মুক্ত বাজারে সমন্বয় সাধন করা অনেক বেশি কঠিন।

ফার্ম সম্পর্কে রোনাল্ড কোসের এই ব্যাখ্যা ‘নেচার অব দ্য ফার্ম’ নামে একটি গ্রন্থাগারে প্রকাশিত হয়। তাঁর এই শেখার জন্য তিনি ১৯৯১ সালেও অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পান। পরবর্তীকালে ফার্মের অস্তিত্ব ও উপযোগিতা নিয়ে আরও অনেক গবেষণা হয়েছে। এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন কোর্সের মতবাদের অনুসারী ২০০৯ সালে অর্থনীতি নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অলিভার উইলিয়ামসন এবং ২০১৬ সালে অর্থনীতিতে যুগ্মভাবে নোবেল বিজয়ী অলিভার হার্ট ও বেঙ্গট হলমস্ট্রম। এরা এবং অন্যরা স্পট ট্রানজিকশন ও ব্যবসায় সম্পর্কের মধ্যে পার্থক্য টানার চেষ্টা করেন সে ব্যবসায় সম্পর্কে দীর্ঘতর মেয়াদের ও নমনীয় ধরনের চুক্তির প্রণয়ন।

বেশিরভাগ লেনদেনের কাজটা হয় স্পট মার্কেটে। পণ্যের জন্য অর্থ একবার পরিশোধ করা হলে সেই কারবারটা সম্পূর্ণ হয়ে যায়। লেনদেনের ব্যাপারটাও সহজ : একপক্ষ চায় আর অন্য পক্ষ যোগান দেয়। এখানে বিরোধের সুযোগটা তেমন নেই বললেই চলে। কাজই একটা লিখিত চুক্তির আর দরকার হয় না। এক পক্ষ অসুখী হলে সে পরের বার অন্য জায়গায় ব্যবসা করবে। স্পট মার্কেটগুলো এ জন্য সহজ ও স্বল্প মূল্যের লেনদেনের জন্য উপযোগীও যেমন একটা সংবাদপত্র কেনা কিংবা ট্যাক্সি ভাড়া করা।

অবস্থাটা কঠিনতর ও জটিলতর হয় যখন সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো এমন এক কারাগারে যুক্ত হয়ে পড়ে যা সম্পাদন করা ব্যয়বহুল। যেমন সম্পত্তি লিজ নেয়া বা দেয়ার ব্যাপারটি। এখানে ফার্মের প্রয়োজন হয় যার মাধ্যমে দুই পক্ষের স্বার্থ সংরক্ষিত হয় এবং দু’পক্ষই খুশি থাকে। ১৯৭২ সালে আরমেন আলচেইন ও হ্যারল্ড ডেমসেজের রচিত ও প্রকাশিত এক নিবন্ধে ফার্মকে দলগত উৎপাদন প্রক্রিয়ায় প্রধান কন্টাক্টর বা ঠিকাদার বলে সংজ্ঞায়িত করা হয়। বলা হয় যে, উৎপাদন যখন দলগত চেষ্টার ফল তখন প্রয়োজনীয় দায়িত্বটা বাজারের কাছে ছেড়ে দেয়া কঠিন হয়ে পড়ে। সেটা এই কারণে যে তৈরি পণ্যটির ক্ষেত্রে প্রত্যেক সদস্যের অবসান পরিমাপ করা এবং তদনুযায়ী যার যা প্রাপ্য সমন্বয়কারী ও তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে কাজ করার জন্য ফার্মের প্রয়োজন হয়।

তবে ফার্ম সম্পর্কে অধ্যাপক কোস যে তত্ত্ব হাজির করেছিলেন তা থেকে বোঝা যায় যে, প্রযুক্তির কারণে লেনদেন খরচ কমে যাওয়ায় এই মুহূর্তে ফার্মগুলোর পিছু হটার কথা। ইন্টারনেটের বদৌলতে যখন বাজারে যাওয়ার খরচ কমে আসছে তখন একই ছাদের নিচে সবকিছু সংগঠিত করার ঝামেলা নেওয়ার কি প্রয়োজন। আর এটাও সত্য যে, কোম্পানিগুলোর উত্থান পতন আগের যে কোন সময়ের তুলনায় অনেক দ্রুতগতিতে হচ্ছে। ১৯৫৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের এসএ্যান্ডপি ৫০০ তে অন্তর্ভুক্ত কোম্পানিগুলো ৬১ বছর সাক্ষাত সূচকে থেকে যেতে পেরেছে। আজ সেই গড়টা মাত্র ১৮ বছরের।

কিন্তু বড় কোম্পানিগুলোর অবসান ঘটানো তো দূরের কথা বরং ইন্টারনেট তার নিজস্ব গতিপথ তৈরি করছে। বিশ্বে ইন্টারনেট ট্রাফিকের প্রায় ৪০ শতাংশ গুগলের। সেটা হতে পারে এই কারণে যে লেনদেনের খরচ এখনও ব্যবসা করার একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অথবা এমনও হতে পারে যে ফার্মগুলো অন্যান্য কাজও করছে যা অধ্যাপক ফোস স্বীকার করেননি। তবে যাই হোক, কোসের তত্ত্ব যে কোন মানুষের হৃদয়ের কাছাকাছি থাকা উচিত, যারা পুঁজিবাদ নিয়ে মাথা ঘামায়।

সূত্র : দি ইকোনমিস্ট