১৮ ডিসেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

প্রসঙ্গ ইসলাম ॥ রমাদানপূর্ব ভাবনা


আরবী চান্দ্র সনের নবম মাস হচ্ছে রমাদান। এই মাসকে আল্লাহ জাল্লা শানুহু সিয়াম পালন করার জন্য নির্ধারণ করে বিধান নাযিল করেন ৬২৪ খ্রিস্টাব্দের মধ্য শাবানে। এর আগে প্রিয়নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম এবং সাহাবায়ে কেরাম অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে মহরমের দশ তারিখে অর্থাৎ আশুরার দিনে সিয়াম পালন করেছেন। রমাদানের সিয়ামের বিধান নাযিল হলে আশুরার সিয়াম নফল সিয়াম হিসেবে বিবেচিত হয়। আশুরার সিয়াম নফল সিয়ামগুলোর মধ্যে উত্তম।

রমাদান মাসব্যাপী দৃঢ়প্রত্যয় গ্রহণ করে সুবিহ্্ সাদিকের পূর্বক্ষণ থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত যাবতীয় পানাহার, কামাচার ও পাপাচার থেকে বিরত থাকার নামই সওম বা সিয়াম। সওম শব্দের অর্থ বিরত থাকা। রিপুসমূহকে দমন করার এ এক অনন্য উপায়, যা আল্লাহ নির্ধারণ করে দিয়েছেন।

সিয়াম মূলত আল্লাহ জাল্লা শানুহু প্রদত্ত এমন এক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা যা গ্রহণ করার মাধ্যমে মানবিক মূল্যবোধে বলীয়ান হওয়া যায় এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি হাসিল করা যায়। এর দ্বারা আত্মশুদ্ধি লাভ হয়, নিজেকে সংযমী করে তোলা যায়, তা ছাড়াও মানুষের প্রতি মানুষের পারস্পরিক দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ জাগ্রত হয়, সহমর্মিতা, সমবেদনা ও সহানুভূতির মহাপ্রশিক্ষণে প্রশিক্ষিত হওয়া যায়। যারা এই মহা সুযোগকে গ্রহণ করতে ব্যর্থ হয় তাদের শুধু দুর্ভাগা বললে বোধহয় যথেষ্ট হবে না বরং তাদের মনুষ্য বলা যাবে কিনা সেটাও ভেবে দেখার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

প্রিয় নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেন : যে ব্যক্তি মিথ্যা বলা এবং সেই অনুযায়ী আমল করা ছেড়ে দিল না তার এই পানাহার ত্যাগ (সিয়াম) করার আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই। (বুখারী শরীফ)

৬২৪ খ্রিস্টাব্দের রমাদানের পূর্ব মাস শাবানের শেষ দিন বিকেল বেলায় রমাদানের আগমনী বার্তা ঘোষণা করে প্রিয়নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম উপস্থিত সকলের সামনে রমাদান ও সিয়ামের গুরুত্ব, মাহাত্ম্য এবং তাৎপর্য তুলে ধরেন। হযরত সালমান ফারসী রাদিআল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণিত আছে যে, কালা খাতাবানা হযরত রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম ফী আখেরি ইয়াওমিন্ মিন্ শাবানা ফাকালা আইয়্যুহান্নাস! কাদ আজল্লাকুম্ শাহ্রুন্ ‘আজীমুন্ মুবারাকুন্, শাহ্রুন্ ফীহি লায়লাতুন্ খায়রুম্ মিন্ আলফি শাহ্র, জা‘আলাল্লাহু সিয়ামাহু ফারীদাতান ওয়া কিয়ামা লায়লিহী তাতাওউ‘আন্ মান্ তার্কারাবা ফীহি বি খাসলাতিম্ মিনাল খায়রি কানা কামান আদদা ফারীদাতান ফীমা সিওয়াহু ওয়া মান্ আদ্দা ফারীদাতান ফীহি কানা কামান আদ্দা সাব‘ঈনা ফারীদাতান ফীমা সিওয়াহু, ওয়া হুয়া শাহ্রুস্ সব্রি ওয়াস সব্রু সাওয়াবুহুল জান্নাত, ওয়া শাহ্রুল্ মওয়াসাতি, ওয়া শাহ্রুন্ ইউযাদু ফীহি রিয্কুল মু’মিনি মান্ ফাত্তরা ফীহি সায়িমান কানা লাহু মাগফিরাতান্ লি যুনূবিহী ওয়া ইত্কা রকাবাতিহী মিনাননারি ওয়া কানা লাহু মিস্লু আজরিহী মিন গায়রি আন্ ইয়ান্তাকিসা মিন আজরিহী শায়উন, কুল্না ইয়া রসূলাল্লাহি লায়সা কুল্লুনা নাজিদু মা নুফাত্তিরু বিহিস সায়িমা ফাকালা রসূলুল্লাহি সাল্লাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়া সাল্লাম ইউ ‘তিল্লাহু হাযা সওয়াবা মান ফাত্তরা সায়িমান ‘আলা মাযকাহি লাবানিন্ আও তামরাতিন্ আওশুরবাতিন্ মিন মায়িন্ ওয়া মান আশবা’আ সায়িমান সাকাহুল্লাহু মিন্ হাওদী শারবাতান লা ইয়াযমাউ হাত্তা ইয়াদখুলাল জান্নাত, ওয়াহুয়া শাহ্রুন্ আউয়ালুহু রহমাতুন্ ওয়া আউসাতুহু মাগফিরাতুন্ ওয়া আখিরুহ ইত্কুম্ মিনান্নার, ওয়া মান্খাফ্ফাফা ‘আন মাম্লূকিহী ফীহি গাফারাল্লাহ লাহু ওয়া আ‘তাকাহু মিনান্নার- শাবান মাসের শেষ দিনে রসূলুল্লাহ্্ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম আমাদের উদ্দেশে এক খুতবায় বললেন, হে মানুষ! তোমাদের ছায়া দিতে আবির্ভূত হচ্ছে মহান মুবারক মাস। এই মাসে রয়েছে হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম রজনী। এ মাসের সিয়ামকে আল্লাহ্্ ফরজ করে দিয়েছেন, এর রাতে দ-ায়মান হওয়াতে (তারাবির সালাত আদায়ে) রয়েছে সওয়াব। যে ব্যক্তি এ মাসে আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে একটি নফল কাজ করবে, সে অন্য মাসে একটি ফরজ আদায় করার সমান সওয়াব পাবে, আর যে ব্যক্তি এ মাসে একটি ফরজ আদায় করবে, সে অন্য মাসের সত্তরটি ফরজ আদায়ের সমান সওয়াব লাভ করবে। এটা ধৈর্যের মাস আর ধৈর্যের প্রতিদান হচ্ছে জান্নাত। এটা সহমর্মিতার মাস। আর এটা হচ্ছে সেই মাস যাতে বৃদ্ধি করা হয় মুমিনের রিয্্ক। যে ব্যক্তি এ মাসে কোন সায়িমকে (রোজাদার) ইফতার করাবে সে ব্যক্তির জন্য তা গোনাহ্্ মাফ পাবার এবং দোজখের আগুন থেকে মুক্তি পাবার হেতু হয়ে যাবে। এ ছাড়া তার সওয়াব হবে সেই সায়িমের সমান কিন্তু সায়িমের সওয়াব একটু কমে যাবে না। আমরা (সাহাবায়ে কেরাম) জিজ্ঞাসা করলাম : হে আল্লাহর রসূল! আমাদের মধ্যে অনেকেরই সায়িমকে ইফতার করানোর মতো সামর্থ্য নেই। তখন হযরত রসূলুল্লাহ্্ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বললেন : পেট ভর্তি করে খাওয়াতে হবে এমনটা নয়, আল্লাহ তা’আলা তাকেই সওয়াব দান করবেন যে সায়িমকে এক চুমুক দুধ অথবা এক টুকরো খেজুর কিংবা এক ঢোক পানি দ্বারা ইফতার করাবে। আর যে ব্যক্তি কোন সায়িমকে তৃপ্তির সঙ্গে খাওয়াবে আল্লাহ্্ তা’আলা তাকে আমার দাউদ (হাউযে কওসার) থেকে পানি পান করাবেন, যার ফলে সে জান্নাতে দাখিল হওয়ার আগ পর্যন্ত তৃষ্ণার্ত হবে না। এ এমন এক মাস যার প্রথমাংশ রহমতের, মধ্যাংশ মাগফিরাতের আর শেষাংশ দোজখের আগুন থেকে মুক্তির। আর যে ব্যক্তি এ মাসে চাকরবাকরদের (অধীনস্থ) কাজের ভার (বোঝা) লাঘব করে দেবে আল্লাহ্্ তা’আলা তাকে ক্ষমা করে দেবেন এবং দোজখ থেকে তাকে নাযাত দান করবেন। (বায়হাকী, মিশকাত শরীফ)।

রমাদান মাসের প্রাক্কালে প্রিয় নবী রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম ওই খুতবায় রমাদান মাসের মাহাত্ম্য যেমন তুলে ধরেছেন তেমনি এই মাসে যে সব বরকত ও প্রাচুর্য রয়েছে তা বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করেছেন।

ওই খুতবায় সহিষ্ণুতা বা ধৈর্যের উল্লেখ করে তিনি বলেছেন : ধৈর্যের (সবর) প্রতিদান হচ্ছে জান্নাত। অন্য একখানি হাদিসে আছে যে, হযরত রসূলুল্লাহ্্ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : আস্ সিয়ামু জুন্নাতুন, ফালা ইয়ারফুস্ ওয়ালা ইয়াজ হাল্ ওয়া ইন আমরুউন্ ফা আতালাহু আও শাতামাহু ফালইয়াকুল ইন্নি সায়িমুন র্মারাতায়নÑ সিয়াম হচ্ছে ঢাল। সুতরাং অশ্লীলতা করবে না এবং মূর্খের মতো কাজ করবে না। যদি কেউ ঝগড়া করতে চায় কিংবা গালি দেয়, তাহলে দু’বার বলতে হবে আমি সায়িম। (বুখারী শরীফ)।

এর দ্বারা এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, ঝগড়া বিবাদ, পরনিন্দা, পরচর্চা, সন্ত্রাসী কর্মকা-, অশ্লীল কথাবার্তা ও কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকার একটা মহা প্রশিক্ষণ রমাদান মাসে সিয়াম পালন করার মধ্য দিয়ে লাভ হয়।

যদি কেউ লোক দেখানো সিয়াম রেখে বাজারে জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে অধিক মুনাফা অর্জনের পথ করে নেয়, যদি কেউ পণ্যসামগ্রীতে ভেজাল দিয়ে মোটা অঙ্কের লাভ আদায় করতে চায়, যদি কেউ ওজনে কম দিয়ে লোককে ঠকায় তাহলে সে আদতে মুবারক মাস রমাদানকে কেবল অবজ্ঞা করে না, সে নিজে নিজেকেই যেন হত্যা করে, তাকে কোন অবস্থাতেই মানুষ বলা যায় না।

মনে রাখতে হবে যে, রমাদান মাসকে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম শাহরুল মওয়াসাত অর্থাৎ সহমর্মিতার মাস বলেছেন। এই মাসে মানুষের প্রতি মানুষের দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধের প্রশিক্ষণ লাভ হয়। মানুষ মানুষের জন্যÑ এই যে কথা প্রায়ই বলা হয় সেটা সঠিকভাবে রপ্ত করে বাস্তবায়নের প্রত্যক্ষ প্রশিক্ষণ সিয়াম পালনের মধ্য দিয়ে অর্জিত হয়।

এই মাসেই প্রকৃতপক্ষে আত্মশুদ্ধি, আত্মসংযম, সহিষ্ণুতা, মানবপ্রীতি ইত্যাদি গুণ অর্জনের সুবর্ণ সুযোগ আসে। এ মাসেই কেবল একটি নফল অর্থাৎ ঐচ্ছিক কোন ইবাদত কিংবা ভাল কাজ করলে তার সেই ঐচ্ছিকটা অন্য মাসের বাধ্যতামূলক কাজের সওয়াব লাভের সমান হয়ে যায়।

রমাদানের সিয়াম সম্পর্কে একখানি অতি গুরুত্বপূর্ণ হাদিসে কুদসী রয়েছে। আল্লাহু তা’আলা ইরশাদ করেন : সে (সায়িম) আমার জন্য তার খাওয়া-দাওয়া, পানীয় পান, কামাচার প্রভৃতি পরিত্যাগ করে, সিয়াম আমারই জন্য এবং আমি নিজে তার প্রতিদান দেব। (বুখারী শরীফ)।

অন্য একখানি হাদিসে আছে যে, হযরত রসূলুল্লাহু সাল্লাল্লাহু আলাহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : যখন রমাদান মাসের প্রথম রাত আসে তখন এক আহ্বানকারী আহ্বান করেন; ইয়া বাগিইয়াল খায়রি আকবিল (হে কল্যাণকামী এগিয়ে যাও), ইয়া বাগিইয়াল র্শারি আকসির (হে মন্দান্বেষী স্তব্ধ হও)। (তিরমিযী শরীফ)।

রমাদান মাসের পবিত্রতা রক্ষা করার কথা মুখে বা ব্যানারে লিখে কিংবা মিছিলে সেøাগান তুলে বললে হবে নাÑ এটার জন্য সরকারী ও বেসরকারী সর্বস্তরের সম্মিলিত উদ্যোগ নিতে হবে।

রমাদানের বিধান যে সকল আয়াতে কারিমায় রয়েছে তার প্রথম আয়াতেই ইরশাদ হয়েছে : তোমাদের জন্য সিয়ামের বিধান দেয়া হলো, যেমন বিধান দেয়া হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের যাতে তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করতে পার। (সুরা বাকারা : আয়াত ১৮৩)। এই তাকওয়ার মধ্যেই তাবত পাপমুক্ত এবং অতিলোভমুক্ত সংযমী জীবনের মর্ম নিহিত রয়েছে। আর সেই তাকওয়া অর্জন করার জন্যই আল্লাহু জাল্লা শানুহু রমাদান মাসের সিয়ামকে ফরজ করে দিয়েছেন। এই একটি মাস কুরআন-হাদিসের নির্দেশ অনুযায়ী যথাযথভাবে অতিবাহিত করতে পারলে বছরের বাকি এগারোটা মাস সুন্দর হয়ে উঠবে ইন্শাআল্লাহ।

লেখক : পীর সাহেব, দ্বারিয়াপুর শরীফ

উপদেষ্টা, ইনস্টিটিউট অব হযরত মুহম্মদ (সা)