১৭ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৮ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

ব্যয় করতে না পারায় ৪৩৩ কোটি টাকা ফেরতের প্রস্তাব


ব্যয় করতে না পারায় ৪৩৩ কোটি টাকা ফেরতের প্রস্তাব

হামিদ-উজ-জামান মামুন ॥ ব্যয় করতে না পারায় ৪৩৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা সমর্পণ করা হচ্ছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুতকেন্দ্রের। ফলে মোট বরাদ্দ কমে দাঁড়াচ্ছে ৫৮৫ কোটি ১২ লাখ টাকা। এ বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনকে লিখিতভাবে জানিয়েছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়। সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচীর (আরএডিপি) খসড়া ইতোমধ্যেই চূড়ান্ত হওয়ায় শেষ মুহূর্তে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুতকেন্দ্রের বরাদ্দ কমানোর প্রস্তাব আসায় কিছুটা সমস্যায় পড়েছে কমিশন। তবে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বলে জানা গেছে।

সূত্র জানায়, পারমাণবিক বিদ্যুতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে দেশ। বহুল আলোচিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুতকেন্দ্রের কার্যক্রম এগিয়ে চলছে। প্রথম পর্যায়ের কাজ শেষ করতে সময় লাগবে ২০১৭ সালের জুন পর্যন্ত। এ অংশ বাস্তবায়নে মোট ব্যয় হচ্ছে পাঁচ হাজার ৮৭ কোটি নয় হাজার টাকা। এর মধ্যে রাশিয়া দিচ্ছে চার হাজার কোটি এবং সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে এক হাজার ৮৭ কোটি নয় হাজার টাকা ব্যয় করা হবে।

প্রকল্পটির কার্যক্রম দ্রুত বাস্তবায়নে লক্ষ্যে চলতি (২০১৫-১৬) অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচীতে (এডিপি) বরাদ্দ দেয়া হয় মোট এক হাজার ২৮ কোটি ৯২ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারী নিজস্ব তহবিলের ছিল ৫৪৪ কোটি ৯২ লাখ টাকা এবং বৈদেশিক সহায়তা থেকে ৪৮৪ কোটি টাকা। কিন্তু অর্থবছরের মাঝামাঝি এসে পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বরাদ্দকৃত অর্থ পুরোপুরি ব্যয় করা সম্ভব নয়। এজন্য মোট ৪৩৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয় করা যাবে না বলে মার্চের শেষ সপ্তাহে এসে জানিয়ে দেয়া হয় পরিকল্পনা কমিশনকে। সমর্পণকৃত অর্থের মধ্যে সরকারী নিজস্ব তহবিল থেকে ২৭৩ কোটি ৮০ লাখ এবং বৈদেশিক সহায়তা থেকে ১৬০ কোটি টাকা। ইতোমধ্যেই পরিকল্পনা কমিশনের বর্ধিত সভার মাধ্যমে সংশোধিত এডিপির খসড়া চূড়ান্ত করায় শেষ সময়ে বরাদ্দ কমানোর এ প্রস্তাব পাওয়ায় বিপাকে পড়েছে পরিকল্পনা কমিশন।

পরিকল্পনা কমিশনের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জনকণ্ঠকে বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুতকেন্দ্র সরকারের একটি অন্যতম অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ফাস্টট্র্যাকভুক্ত প্রকল্প। তাই বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে এডিপিতে চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু কী কারণে তারা এ অর্থ ব্যয় করতে পারছে না সে বিষয়ে কোন ব্যাখ্যা দেয়নি মন্ত্রণালয়। তাছাড়া সংশোধিত এডিপি তৈরির শেষ সময়ে অর্থ সমর্পণ করায় কিছুটা ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে। এখন দেখা যাক কী করা যায়।

এর আগে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুতকেন্দ্র প্রকল্পের পরিচালক ড. শওকত আকবর জনকণ্ঠকে জানিয়েছিলেন, ইতোমধ্যেই যেসব কাজ সমাপ্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল তার সবগুলোই বাস্তবায়ন হয়েছে। কোন ক্ষেত্রে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি কাজ হয়েছে। আর্থিক অগ্রগতি ও ভৌত অগ্রগতি এই মুহূর্তে শতাংশে বলা না গেলেও এটুকু বলতে পারি, সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) যে মূল্যায়ন তার থেকে অনেক বেশি হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ প্রকল্পটির প্রাথমিক কাজ তিন পর্যায়ে করা হচ্ছে। একটি হচ্ছে প্রি-ডিজাইনের কাজ। এক্ষেত্রে সাইট মূল্যায়ন অর্থাৎ সাইটের সঙ্গে রাশিয়ার যে কারিগরি সহযোগিতা প্রযুক্তি নেয়া হচ্ছে তার বন্ধন বা সম্পর্ক নির্ণয় করা হচ্ছে। প্রি-ডিজাইনের সিংহভাগ কাজ শেষ হয়েছে। দ্বিতীয়টি হচ্ছে মূল ডিজাইনের মাঠপর্যায়ের কাজ। তৃতীয়টি হলো মূল বিদ্যুতকেন্দ্র নির্মাণের অপরিহার্য নির্মাণকার্যাদির যন্ত্রাংশ সংগ্রহের কাজ শেষ হয়েছে। এ অংশে মাটি-ভূমি উন্নয়নসহ মোট ৬৩টি কাজ যুক্ত রয়েছে।

সূত্র জানায়, দেশের পারমাণবিক বিদ্যুত উৎপাদনের জন্য ১৯৬১ সালে পাবনার রূপপুরে জমি অধিগ্রহণ করা হয় এবং পরবর্তীতে সেখানে আবাসিক ভবন, রেস্ট হাউস, সাইট অফিস, অভ্যন্তরীণ রাস্তা, বৈদ্যুতিক সাব-স্টেশন, পাম্প হাউস ইত্যাদি নির্মাণ করা হয়। স্বাধীনতার পর ১৯৭৮-৮৯ সালে সরকার বিদ্যুতের চাহিদা মেটানোর জন্য প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেয়। এজন্য একটি সম্ভাব্যতা জরিপ পরিচালনা করা হয়। জরিপে পারমাণবিক বিদ্যুত উৎপাদন বাংলাদেশের জন্য যথার্থ এবং অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হিসেবে চিহ্নিত হয়। ১৯৮০ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (একনেক) সভায় ১২৫ মেগাওয়াটের পারমাণবিক বিদ্যুতকেন্দ্র স্থাপন প্রকল্পটি অনুমোদন দেয়া হয়। কিন্তু অর্থায়নসহ নানা সমস্যার কারণে প্রকল্পটি আর এগোয়নি। পরবর্তীতে ১৯৮৬-৮৭ অর্থবছরে এ প্রকল্পের ফলোআপ স্টাডি করা হয়। এ স্টাডিতেও প্রকল্পটি কারিগরি এবং আর্থিক দিক থেকে গ্রহণযোগ্য বলে উল্লেখ করা হয়। তারপর থেকে ওই অবস্থায়ই পড়েছিল প্রকল্পটি।

আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৯ সালে দায়িত্ব নেয়ার পর নতুন করে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুতকেন্দ্র স্থাপনের পদক্ষেপ নেয় এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের সার্বিক দিকনির্দেশনা প্রদান ও বাস্তবায়ন কার্যাবলী মনিটরিংয়ের জন্য ২০১০ সালের ৯ জুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুতকেন্দ্র স্থাপনবিষয়ক একটি জাতীয় কমিটি গঠন করা হয়। এছাড়া রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুতকেন্দ্র স্থাপনের অর্থায়নের উৎসসমূহ চিহ্নিতকরণ, অর্থায়নে প্রয়োজনীয় শর্তাদি নির্ধারণ, সম্ভাব্য প্রযুক্তি ও সরবরাহকারী চিহ্নিতকরণের জন্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি কারিগরি কমিটি এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুতকেন্দ্র স্থাপনে ভৌত, কারিগরি ও অন্যান্য বিষয়ে প্রতিবেদন প্রণয়ন কার্যক্রম গ্রহণের জন্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিবের নেতৃত্বে একটি ওয়ার্কিং গ্রুপসহ কয়েকটি কমিটি গঠন করা হয়।

সূত্র জানায়, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুতকেন্দ্র স্থাপনে ইন্টারন্যাশনাল এ্যাটোমিক এ্যানার্জি এজেন্সি (আইএইএ) এবং প্রযুক্তি সরবরাহকারী দেশ রাশিয়ান ফেডারেশনের সহায়তার জন্য ইতোমধ্যেই প্রকল্প এলাকায় প্রাথমিক পর্যায়ের সেফটি সংক্রান্ত স্টাডি সম্পাদন করা হয়েছে। আইএইএ পারমাণবিক অবকাঠামো উন্নয়নে প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা প্রদান করছে এবং এ সংক্রান্ত ভবিষ্যত কর্মপরিকল্পনা চিহ্নিত করেছে। প্রযুক্তি সরবরাহকারী দেশ রাশিয়ান ফেডারেশন প্রকল্পটি বাস্তবায়নে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে। ইতোমধ্যেই সরকার এবং রাশিয়ান ফেডারেশন রূপপুর এলাকায় দুটি পারমাণবিক বিদ্যুতকেন্দ্র স্থাপনে কো-অপারেশন এ্যাগ্রিমেন্ট কন্সার্নিং দ্য কনস্ট্রাকশন অব নিউক্লিয়ার পাওয়া প্ল্যান্ট বিষয়ক চুক্তি করেছে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্র স্থাপন প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ের মূল কার্যক্রম হচ্ছেÑ বিদ্যুতকেন্দ্র স্থাপনের জন্য সাইট সংশ্লিষ্ট ডিজাইন প্যারামিটার ও টেকনো ইকোনমিক সলিউশন নির্ধারণ, পরিবেশগত ও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট বিষয়াবলী বিশ্লেষণ ও রিপোর্ট তৈরি, পারমাণবিক বিদ্যুতকেন্দ্র স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় সকল ডিজাইন-ডকুমেন্টেশন প্রণয়ন ও পারমাণবিক নিরাপত্তা সংক্রান্ত দলিলাদি প্রণয়ন, বিদ্যুতকেন্দ্র স্থাপনের জন্য প্রস্তুতিমূলক নির্মাণ কার্যক্রম সম্পাদন, পারমাণবিক বিদ্যুতকেন্দ্রের মূল নির্মাণকাজের জন্য রাশিয়ান ফেডারেশনের সঙ্গে প্রয়োজনীয় আর্থিক ও নির্মাণ চুক্তি সম্পাদন, আইএইএর সুপারিশ এবং প্রযুক্তি সরবরাহকারী দেশ রাশিয়ান ফেডারেশনসহ বাংলাদেশ এ্যাটোমিক এ্যানার্জি রেগুলেটরি অথরিটি এ্যাক্ট-২০১২ এর অধীন পারমাণবিক বিদ্যুতকেন্দ্র নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় লাইসেন্স গ্রহণের জন্য যাবতীয় কার্যক্রম সম্পাদন করা, প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পরমাণু প্রযুক্তি বিষয়ে যোগ্য ও দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন, প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়ক স্থাপনা ও ফ্যাসিলিটিজ ক্রয় ও নির্মাণ, বিদ্যমান প্রকল্প সাইট ও আবাসিক এলাকার ভৌত অবকাঠামোগত উন্নয়ন, আবাসিক ভবন ও প্রকল্প অফিসের জন্য যাবতীয় আসবাবপত্র ও অন্যান্য অত্যাবশ্যকীয় যন্ত্রপাতি সংগ্রহ, প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ২০টি যানবাহন ক্রয়, দুই হাজার ৭৮৫ সেট স্থানীয় যন্ত্রপাতি ও ২০ সেট বৈদেশিক যন্ত্রপাতি সংগ্রহ এবং প্রয়োজনীয় ইলেক্ট্রিক্যাল ইক্যুইপমেন্ট সংগ্রহ করা হচ্ছে।

সর্বাধিক পঠিত:
পাতা থেকে: