২০ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট পূর্বের ঘন্টায়  
Login   Register        
ADS

কোটি কণ্ঠে জাতীয় সঙ্গীতে মুখরিত হলো স্বাধীনতার উদ্যান


স্টাফ রিপোর্টার ॥ ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। একের পর এক গাড়ি আসছে। তখন বিকেল চারটা ৩১ মিনিট। কোন গাড়িতে মিত্রবাহিনীর লোকজন। তবে বেশিরভাগ গাড়িতে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর সদস্য। উদ্দেশ্য, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আত্মসমর্পণের দলিলে সই। এর মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু হবে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের। তখন এর নাম ছিল রেসকোর্স ময়দান। বুধবার বিজয় দিবসের বিকেলে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের প্রতীকী চিত্র তুলে ধরার সেই মুহূর্তে উদ্যানে স্থাপিত ‘বিজয় উৎসব’ মঞ্চের সামনে সমবেত জনতা গাইল ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।’ যা উদ্যানের সীমানা ছাড়িয়ে উচ্চারিত হলো টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া ছাড়িয়ে বিশ্বের বাঙালীদের মুখে মুখে।

বাঙালীর ৪৪ তম বিজয়ের বার্ষিকীতে জঙ্গীবাদ প্রতিরোধের আহ্বান জানিয়ে ‘স্বাধীনতার উদ্যান’ মুখরিত হলো জাতীয় সঙ্গীতে; আর তাতে কণ্ঠ মেলাল দেশ-বিদেশের ‘কোটি নাগরিক’। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই গানটিই একাত্তরের রণাঙ্গনে বাঙালী জাতিকে প্রেরণা যুগিয়েছিল, যা পরে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে প্রহণ করা হয়। এর পর উগ্র মৌলবাদ, জঙ্গীবাদ,সাস্প্রদায়িকতা মুক্ত দেশ গড়ার শপথ নিলেন সমবেত জনতা। অপশক্তি প্রতিরোধের আহ্বানে সাড়া দিলেন প্রত্যেকে। মারণাস্ত্র মুক্ত বিশ্ব ও বিশ্ব মানবতাকে শক্তিশালী ও স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠার কথা উচ্চারিত হয় সবার মুখে মুখে।

বিজয় দিবস উদযাপন জাতীয় কমিটির পক্ষ থেকে দেশের প্রতিটি জেলা-উপজেলা-ইউনিয়ন-গ্রামসহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সারা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশীদের এ কর্মসূচীতে অংশ নেয়ার আহ্বান জানানো হয়েছিল আগেই। তাই যে যেখানে ছিলেন সেখানেই দাঁড়িয়ে শামিল হয়েছেন আয়োজনের সঙ্গে। অনুষ্ঠানে তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধিদের উপস্থিতি ছিল সবচেয়ে লক্ষণীয়। দুপুরের পর থেকে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল, কলেজ শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে সকল শ্রেণী-পেশার মানুষের স্রোত ছিল উদ্যানমুখী। লাল সবুজের রঙে খচিত পোশাক, কেউবা জাতীয় পতাকা, বাদ্য-বাজনা হাতে অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশ করে। কারো কপালে ছিল পতাকা খচিত ফিতা, রঙতুলির পতাকায় আঁকানো ছিল অনেকের মুখ। ঢাকার বাইরে থেকেও বিভিন্ন বয়সের মানুষ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে আসেন। উদ্যানজুড়ে বারবার ধ্বণিত হয় ‘জয় বাংলা’ সেøাগান। রাত দশটা পর্যন্ত চলে বিভিন্ন পরিবেশনা। এর আগে বিকেল ৪টা ৩১ মিনিটে বিজয় উৎসবের অংশ হিসেবে পাকিস্তানী বাহিনীর আত্মসমর্পণের দৃশ্য মঞ্চায়ন করা হয়। ঐতিহাসিক এ দৃশ্যটি মঞ্চে ফুটিয়ে তোলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার এ্যান্ড পারফরমেন্স স্টাডিজ বিভাগের ছাত্রছাত্রীরা।

অনুষ্ঠানে শপথবাক্য পড়ান বিজয় দিবস উদযাপন জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. আবুল বারকাত। শপথে বলা হয়, আমি শপথ করিতেছি যে... মুক্তিযুদ্ধে যারা আত্মাহুতি দিয়েছেন, বীর নারীর সম্ভ্রমহানি হয়েছে, তাদের আত্মাহুতি যেন ব্যর্থ না হয়, সেজন্য আজীবন সচেতন ও সক্রিয় থাকব। ...স্বাধীনতা অর্জনের দীর্ঘ ৪৪ বছর কেটে যাওয়ার পর তার মূল্যবোধ হারাতে বসেছি, তা আবার উদ্ধার ও পুনর্প্রতিষ্ঠায় অবিরাম চেষ্টা চালাব। ...দেশকে উগ্র মৌলবাদ-জঙ্গীবাদ-সাম্প্রদায়িকতা-জাতিগত বৈষম্যের কবল থেকে মুক্ত করার ঐক্যবদ্ধ লড়াই চালিয়ে যাব। ...’৭১-এর যুদ্ধাপরাধী, ঘাতক দালালদের বিচার ও শাস্তি প্রদান দ্রুত শেষ করা, জাতিকে শত্রুমুক্ত করার জন্য আন্দোলন চালিয়ে যাব। ...দেশের নব্য শোষকশ্রেণীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব। শোষিতের জন্য গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় লড়াই চালিয়ে যাব। ...দারিদ্র্যমুক্ত সুখী ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলব। ...সাম্রাজ্যবাদ,জঙ্গীবাদ ও আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের সকল আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাব। ...মারণাস্ত্রমুক্ত বিশ্ব গড়ব। ...বিশ্ব মানবতাকে শক্তিশালী ও স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠা করব।

ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মহান বিজয় দিবস উদযাপন কমিটি আয়োজিত দিনব্যাপী ‘বিজয় উৎসব’ শুরু হয় বেলা এগারোটা থেকে। ‘সন্ত্রাস, জঙ্গীবাদ ও দুর্নীতির সঙ্গে কোন আপোস নয়’ সেøাগানে উৎসবের উদ্বোধন করেন সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের বিচার দাবি করে সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক বলেন, পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে হবে। বিচার করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে বলেন, আইনের শাসন শুধু দেশের অভ্যন্তরে নিশ্চিত করলে হবে না। সারা পৃথিবীতেই আইনের শাসন থাকা প্রয়োজন। পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর যেসব সদস্য এদেশে যুদ্ধাপরাধ করেছে তাদের বিচার কেন হবে না? পাকিস্তানকে তাদের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ১৯৫ সেনা কর্মকর্তার বিচার করতে হবে।

বিচারপতি খায়রুল হক বলেন, এই উদ্যান থেকেই স্বাধীনতার ডাক এসেছিল। এখানেই নয়মাস পর শত্রুবাহিনী আত্মসমর্পণ করে গেছে। ঐতিহাসিক এসব স্থানের কথা দেশের কজন মানুষ জানে। এসব স্থাপনা সংরক্ষণ করতে হবে, যাতে পরবর্তী প্রজন্ম এসব দেখে গর্ব করে বলতে পারেÑ আমাদের পূর্বপুরুষরা যুদ্ধ করে বিজয় অর্জন করেছে। তিনি বলেন, আমরা ইতিহাসবিমুখ জাতি। ইতিহাস সংরক্ষণ না করলে ভবিষ্যত প্রজন্ম জানবে না- কি অসীম সাহসী যোদ্ধারা বিশ্বের অন্যতম সেরা সেনাবাহিনীকে হারিয়ে দেশকে স্বাধীন করেছিল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, একাত্তরে গণহত্যা ইতিহাসে বিরল। পাকিস্তানের সেই গণহত্যাকারীদের বিচার করার জন্য তথাকথিত নির্বাচিত পাকিস্তানী সরকার ১৯৫ যুদ্ধাপরাধীকে দেশে ফিরিয়ে নিয়েছিল। কিন্তু তারা সে বিচার করেনি। সে সময়কার গণহত্যাকারী পাকিস্তান ও বর্তমান রাষ্ট্র পাকিস্তানের কোন পার্থক্য নেই। এ সন্ত্রাসী রাষ্ট্রের সঙ্গে শিক্ষা-সংস্কৃতি-ক্রীড়া সম্পর্ক রাখা সম্ভব নয়। এ কারণেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিঃশর্ত ক্ষমা না চাওয়া পর্যন্ত পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক না রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরকারকে আহ্বান জানাব, পাকিস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছেদ করার।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: