মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ৯ আশ্বিন ১৪২৪, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

রামপাল নিয়ে সরকার পরিবেশবাদীদের সঙ্গে রাখতে চায়

প্রকাশিত : ৪ নভেম্বর ২০১৫
  • সুন্দরবন ও প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখাতে ৯ নেতাকে আমন্ত্রণ
  • এভাবে গিয়ে পিকনিক ছাড়া কিছুই হবে না- আনু মুহম্মদ

রশিদ মামুন ॥ রামপাল নিয়ে পরিবেশবাদীদের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করছে সরকার। প্রকল্পের প্রকৃত অবস্থান, পশুর নদী এবং সুন্দরবন ঘুরে দেখানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। রামপাল প্রকল্পের প্রকৃত অবস্থান পরিবেশগত প্রভাব মোকাবেলায় কি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে তা বোঝানোর চেষ্টা করা হবে। একই সঙ্গে পরিবেশবাদীদের মতামত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে পরামর্শ গ্রহণ করা হবে।

রামপাল দেশের প্রথম কয়লাচালিত বড় বিদ্যুত প্রকল্প। বিদ্যুত প্রকল্প নির্মাণের ঘোষণা দেয়ার পরপরই পরিবেশবাদীরা প্রকল্পের বিরোধিতা করে আসছে। শুরুতে তেল-গ্যাস-বন্দর বিদ্যুত রক্ষা জাতীয় কমিটি রামপালের বিরোধিতা শুরু করে। পরবর্তীতে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক অব্দুস সাত্তার এবং খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ হারুন চৌধুরী সুন্দরবনের ওপর করা দুটি গবেষণাপত্র উপস্থান করে বলছেন, প্রকল্পটি হলে সুন্দরবন ধ্বংস হয়ে যাবে। এরপর বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) এবং ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই)-এর বাংলাদেশ শাখা একই আন্দোলনে যোগ দেয়। সম্প্রতি টিআইবি তাদের দুজন ব্যবস্থাপক দিয়ে তৈরি করা একটি গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেছে। গবেষণাপত্রের পরিবেশ অংশে রামপাল প্রকল্পের পরিবেশগত সমীক্ষাপ্রতিবেদনের সমালোচনা ছাড়া নতুন কিছু নেই। একই সঙ্গে টিআইবির গবেষণাপত্রটি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আব্দুল্লার হারুন চৌধুরীর মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। এখনও রামপাল নিয়ে আন্দোলনকারী তাদের সকল বক্তব্যে আব্দুল্লাহ হারুন চৌধুরীর তথাকথিত গবেষণাপত্রকে মূল ভিত্তি হিসেবে ধরে থাকেন।

বিদ্যুত বিভাগ সূত্র জানায় এখন পর্যন্ত ৯ জন পরিবেশবাদীকে রামপাল ভ্রমণের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এরা হচ্ছেন তেল-গ্যাস জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক প্রকৌশলী মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ, সদস্য সচিব অধ্যাপক আনু মহম্মদ, বাপার সাধারণ সম্পাদক ড. মোঃ আব্দুল মতিন, টিআইবির ট্রাস্টবোর্ডের চেয়ারম্যান সুলতানা কামাল, টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল আলম, অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন, বেলার নির্বাহী পরিচালক সৈয়দা রিজয়ানা হাসান এবং প্রকৌশলী কল্লোল মুস্তফা।

আগামী ১৯ নবেম্বর পরিবেশবাদীদের রামপাল নিয়ে যেতে চায় সরকার। ইতোমধ্যে সকলকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। আমন্ত্রণপত্রে লেখা হয়েছে সরকার রামপাল বিদ্যুত প্রকল্পে পরিবেশবাদীদের পরামর্শ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে। এর প্রেক্ষিতে রামপালের মৈত্রী সুপার থার্মাল বিদ্যুত প্রকল্প, পশুর নদী এবং সুন্দরবন পরিদর্শনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। চিঠিতে আশা প্রকাশ করা হয় এতে অংশ নিয়ে প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষায় সরকারকে পরামর্শ দেবেন।

সরকারের এই উদ্যোগকে কিভাবে দেখছেন জানতে চাইলে অধ্যাপক আনু মহম্মদ গতকাল বিকেলে জনকণ্ঠকে বলেন, আমাদের কাছে রামপাল নতুন কিছু নয়। এখানে এভাবে গিয়ে পিকনিক ছাড়া আর কিছু হবে না। তবে ১০ তারিখের পর বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে তারা যাবেন কি না? তিনি বলেন, এভাবে না গিয়ে সরকার তিন মাসের গবেষণা মূলক কার্যক্রম চালালে ভাল করত আমরা সহায়তা করতে পারতাম। তিনি বলেন, একদিনের এই রকম পরিদর্শনে প্রকৃত অবস্থা বোঝা যাবে না। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি ভারতে এ ধরনের প্রকল্পর উদাহরণ দিয়ে বলেন, সেখানে আমি দেখেছি পরিবেশের ওপর কি মারাত্মক প্রভাব পড়ে কয়লা পুড়িয়ে বিদ্যুতকেন্দ্র নির্মাণ করলে। ভারতের শক্তিনগরিতে তিনি তিন দিন ছিলেন বলে উল্লেখ করেন। সম্প্রতি সরকারের পক্ষ থেকে রামপাল প্রকল্প নিয়ে যে ব্যাখ্যা দিয়েছে তাতে বলা হয়েছে, দেশের উন্নয়নের নতুন দিগন্তের দ্বার উন্মোচনকারী এ প্রকল্প নিয়ে একটি মহল ও কতিপয় ব্যক্তি বা সংগঠন বিভ্রান্তিমূলক তথ্য প্রচার ও কর্মকা- পরিচালনা করছে যা ভিত্তিহীন, দেশের স্বার্থ বিরোধী ও উন্নয়নের ধারাবাহিকতাকে বাধাগ্রস্ত করার অপপ্রয়াস ছাড়া আর কিছুই নয়। বিদ্যুতকেন্দ্র হতে সুন্দরবন নিরাপদ দূরত্বে অবস্থিত। সুন্দরবনের ইউনেস্কো হেরিটেজ থেকে বিদ্যুত কেন্দ্রটি ৬৯ কিলোমিটার দূরে এবং সুন্দরবনের প্রান্ত সীমা থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এ ব্যাপারে কোন প্রকার বিভ্রান্তির অবকাশ নেই। প্রসঙ্গত: সুন্দরবনের ওপর স্থানীয় জনগোষ্ঠীর নির্ভরশীলতার কারণে নতুন নতুন বসতি স্থাপন, বন কেটে কৃষি জমির আবাদ, মৎস্য আহরণ ও অন্যান্য অর্থনৈতিক কর্মকা- পরিচালনার মাধ্যমে শতাধিক বছর ধরেই সুন্দরবন সংকুচিত হয়ে আসছিল। বরং বিদ্যুতকেন্দ্রটি স্থাপিত হলে বিদ্যুতকেন্দ্র ভিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকা- সম্প্রসারণের কারণে সুন্দরবনের ওপর স্থানীয় অধিবাসীদের নির্ভরশীলতা কমবে, বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, ফলে সুন্দরবন সংরক্ষণে এটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

সরকারের উদ্যোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে ডাঃ মোঃ আব্দুল মতিন বলেন, আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি সরকার ডাকলে সাড়া দেয়া উচিত। তবে আমরা এ বিষয়ে বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নেব। তিনি বলেন, সুন্দরবনের পাশে হাজার হাজার টন কয়লা পুড়িয়ে বিদ্যুতকেন্দ্র হবে আর দেশের কোন ক্ষতি হবে না এটা আমি মানতে চাই না। ক্ষতি হবে না বলে সরকারের প্রচারণাকে মিথ্যা চাপাবাজি উল্লেখ করেন।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বিদ্যুতকেন্দ্র হতে এলাকার মানুষ, সুন্দরবন বা এর প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীব বৈচিত্র্য, পশুর নদী, স্থানীয় এলাকা সম্পূর্ণ নিরাপদ। এ ব্যাপারে পরিচালিত গবেষণাসমূহ তাই প্রমাণ করে। কয়লাভিত্তিক এ বিদ্যুতকেন্দ্রটি বাংলাদেশ পরিবেশ অধিদফতর-এর এবং আন্তর্জাতিক পরিবেশ সংরক্ষণকারী সংস্থাসমূহের সকল প্রকার নিয়ম-কানুন মেনেই নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে পরিবেশগত বিষয়সমূহে বাংলাদেশের স্ট্যান্ডার্ড-এর চেয়েও অধিক সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও হবে। আন্তর্জাতিক নির্ধারিত মান অনুযায়ী এই বিদ্যুতকেন্দ্র স্থাপনা করার ও পরিচালনা করার কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে বলে বাংলাদেশ ভারত ফ্রেন্ডশীপ কোম্পানির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। বর্তমানে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ বিদ্যুত উৎপাদনে প্রাথমিক জ্বালানি হিসেবে কয়লাকে গুরুত্ব দিচ্ছে। মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের মধ্যে যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ৪০ ভাগ, জার্মানি ৪১ ভাগ, জাপান ২৭ ভাগ, ভারত ৬৮ ভাগ, দক্ষিণ আফ্রিকা ৯৩ ভাগ, অস্ট্রেলিয়া ৭৮ ভাগ, মালয়েশিয়া ৩৩ ভাগ এবং চীন ৭৯ ভাগ বিদ্যুত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতকেন্দ্র থেকে উৎপন্ন করে থাকে। সেখানে বাংলাদেশে মাত্র ২ দশমিক ২৬ ভাগ কয়লা থেকে উৎপন্ন হয়।

প্রকাশিত : ৪ নভেম্বর ২০১৫

০৪/১১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

শেষের পাতা



শীর্ষ সংবাদ: