২৪ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই ঘন্টায়  
Login   Register        
ADS

দল ছাড়তে পারেন বিএনপির এক শ’ নেতা


শরীফুল ইসলাম ॥ শমসের মবিন চৌধুরীর পর কারা কারা দল ছাড়তে পারেন সে বিষয়ে কঠোর নজরদারি রাখছে বিএনপি। শমসের মবিনের পথ ধরে আরও কেউ দল ছাড়তে পারেনÑ এমন গুঞ্জন থাকায় অন্তত ১০০ নেতাকে পর্যবেক্ষণে রেখেছে দলীয় হাইকমান্ড। লন্ডন থেকে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের নির্দেশ পেয়ে কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা সন্দেহভাজন নেতাদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছেন। এদিকে শমসের মবিন চৌধুরীর পদত্যাগের বিষয়ে বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া হয়েছে। সূত্রমতে, বিএনপির যেসব কেন্দ্রীয় নেতার গতিবিধি পর্যবেক্ষণে রাখা হচ্ছে তার মধ্যে রয়েছেনÑ স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, লে. জেনারেল (অব) মাহবুবুর রহমান, ভাইস চেয়ারম্যান মোর্শেদ খান, সাদেক হোসেন খোকা, বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা রিয়াজ রহমান, সাবিহউদ্দিন আহমেদ, মঞ্জুর আলম, কারাবন্দী যুগ্মমহাসচিব আমানউল্লাহ আমান প্রমুখ। পদত্যাগী বিএনপি নেতা শমসের মবিন চৌধুরী একটি গণমাধ্যমে দেয়া সাক্ষাতকারে বলেছেন, বর্তমানে যারা দলে নিষ্ক্রিয় তাদের সরে যাওয়া উচিত। তার এ বক্তব্যের পর বিএনপির নিষ্ক্রিয় নেতাদের প্রতি বিএনপির নজরদারি জোরদার করা হয়েছে বলে জানা গেছে। টানা আন্দোলন কর্মসূচী ব্যর্থ হওয়ার পর দলের নাজুক পরিস্থিতি মোকাবেলায় যে সময় সর্বস্তরে কমিটি পুনর্গঠন করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি চলে, ঠিক সে সময় শমসের মবিন চৌধুরীর পদত্যাগে দলটিকে আরও কঠিন পরিস্থিতির মুখে ঠেলে দেয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন মহল থেকে দলটি ভাঙ্গনের মুখে পড়তে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে। তবে দলটি যাতে ভাঙ্গনের কবলে না পড়ে এবং প্রভাবশালী আর কেউ যেন পদত্যাগ করে বিএনপিকে বেকায়দায় ফেলতে না পারে সেজন্য দলীয় হাইকমান্ড তৎপর রয়েছে।

এদিকে শমসের মবিন চৌধুরীর পদত্যাগ ঘিরে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে কেউ কেউ বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে তার পদত্যাগে দল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আবার কেউ কেউ বলছেন দলে থেকে ক্ষতি করার চেয়ে তিনি চলে গিয়ে ভালই করেছেন। তবে দলের অধিকাংশ কেন্দ্রীয় নেতাই এ বিষয়ে নীরব রয়েছেন। যদিও একদিন পর শুক্রবার বিকেলে সিলেটে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মির্জা ফখরুল বলেছেন শমসের মবিন চৌধুরীর পদত্যাগে দলে কোন প্রভাব পড়বে না। কারণ বিএনপিতে অনেক পেশাদার কূটনীতিক আছেন। বিএনপি জিয়াউর রহমানের আদর্শ থেকে সরে গেছে বলে যে মন্তব্য শমসের মবিন করেছেন, তা একান্তই তার ব্যক্তিগত ভাবনা। তিনি বলেন, বিএনপিতে কোন ভাঙ্গন নেই। বিএনপি ঐক্যবদ্ধ আছে। তবে প্রতিপক্ষ হিসেবে আওয়ামী লীগ নেতারা এ ধরনের কথা বলতেই পারে। বিএনপি একটি বড় রাজনৈতিক দল। বিএনপি মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে। বড় দল থেকে একজন চলে গেলে তেমন ক্ষতি হয় না। আর সিলেট ছাত্রদলের সিনিয়র যুগ্মসাধারণ সম্পাদক মকসুদ আহমদ বলেছেন, শমসের মবিনের পদত্যাগ একটি নাটক।

বিএনপির কঠিন সময়ে হঠাৎ করেই দল থেকে পদত্যাগ করেন শমসের মবিন। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় আওয়ামী লীগের যুগ্মসাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ বলেন, আরও অনেকেই এখন বিএনপি থেকে বেরিয়ে আসবেন। অচিরেই বিএনপি ভেঙ্গে খান খান হয়ে যাবে। সেই পরিণতির জন্য বিএনপিকে অপেক্ষা করতে হবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির এক কেন্দ্রীয় নেতা জনকণ্ঠকে বলেন, খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা শমসের মবিন চৌধুরী বিএনপির একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন। দলের কূটনৈতিক কার্যক্রম মূলত তিনিই দেখভাল করতেন। তাই তার পদত্যাগে বিএনপি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিএনপির আরেক কেন্দ্রীয় নেতা জানান, শমসের মবিন চৌধুরীর পদত্যাগের পর দলীয় হাইকমান্ড তৎপর হয়েছে। আর যেন কেউ এভাবে পদত্যাগ করতে না পারে সে ব্যাপারে খোঁজখবর রাখা হচ্ছে। অন্তত ১০০ নেতাকে পর্যবেক্ষণে রেখেছে বিএনপির হাইকমান্ড।

এ বছরের শুরুতে বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন টানা অবরোধ-হরতাল চলাকালে বিভিন্ন নাশকতামূলক কর্মকা- নিয়ে সারাবিশ্বে ব্যাপক সমালোচনা হয়। বিশেষ করে পেট্রোল বোমার আঘাতে শতাধিক মানুষ পুড়িয়ে হত্যার ঘটনা দেশ-বিদেশে বিএনপির বিরুদ্ধে সমালোচনার ঝড় উঠে। ৯২ দিনের টানা আন্দোলন শেষে দেশের অবস্থা স্বাভাবিক হলেও বিএনপি আর রাজনৈতিক কর্মসূচী নিয়ে এগিয়ে যেতে পারেনি। দলের নেতাকর্মীরাই রাজনীতি থেকে নিজেদের গুঁটিয়ে নেয়। এ পরিস্থিতিতে সর্বস্তরে দল গুছিয়ে আবার সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নেয় বিএনপি। ১৫ সেপ্টেম্বর লন্ডন যাওয়ার আগে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া দলের নেতাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম চাঙ্গা করার নির্দেশ দিয়ে যান। কিন্তু সম্প্রতি ২ বিদেশী হত্যার ঘটনায় বিএনপি নেতাদের জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠায় আরেক দফা বেকায়দায় পড়ে দলটি। এ ছাড়া বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ছোট ভাই আহমেদ কামাল খালেদা জিয়াসহ বিএনপির কোন নেতাকে না জানিয়ে জিয়া পরিবারের মৃত ব্যক্তিদের জন্য ঘটা করে দোয়া মাহফিল আয়োজনের ঘোষণা দেয়ার বিষয়টি নিয়ে দলীয় হাইকমান্ড চিন্তায় পড়ে যায়। এ পরিস্থিতিতে শমসের মবিন চৌধুরীর পদত্যাগ বিএনপির দৈন্যদশায় নতুন মাত্রা যোগ করে।

টানা আন্দোলন চলাকালে তারেক রহমানের সঙ্গে শমসের মবিন চৌধুরীর ফোনালাপে মির্জা ফখরুলের ব্যর্থতাসহ দলের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা হয়। ওই ফোনালাপ ফাঁস হওয়ার পর শমসের মবিন চৌধুরীর সঙ্গে মির্জা ফখরুল ও তারেক রহমানের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। এছাড়া টানা আন্দোলন চলাকালে গ্রেফতার হয়ে কারাগারে যাওয়া ও মুক্তি পাওয়ার পর শমসের মবিন চৌধুরী দলের কাছ থেকে কোন সহায়তা পাননি বলে কিছুটা মনোক্ষুণœ ছিলেন। অপরদিকে টানা আন্দোলনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থতার অভিযোগ এনে পদত্যাগের জন্য তার ওপর ক্রমাগত চাপ ছিল বলে জানা যায়। আবার কেউ কেউ মনে করছেন একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে জামায়াতকে নিয়ে বিএনপির রাজনীতি নিয়ে তার আপত্তি ছিল। তার মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের কিছু কূটনীতিক বিএনপির হাইকমান্ডকে জামায়াত ছাড়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু এ প্রস্তাব গ্রহণ না করায় শমসের মবিন চৌধুরী দলীয় হাইকমান্ডের প্রতি ক্ষুব্ধ ছিলেন। তাই পদত্যাগ করে তার ক্ষোভের অবসান ঘটালেন। এভাবে দলের আরও কতিপয় নেতা পদত্যাগ করতে পারেন বলে গুঞ্জন রয়েছে। এমনকি বিএনপির কিছু নেতা যে কোন সময় দল ভাঙ্গনে অংশ নিতে পারেন বলেও বিভিন্ন মহল থেকে বলা হচ্ছে।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও খালেদা জিয়ার এক সময়ের আস্থাভাজন শমসের মবিন চৌধুরী এমন এক সময় দল ছাড়ার ঘোষণা দিলেন, যখন সরকারবিরোধী আন্দোলন চাঙ্গা করতে ব্যর্থ হয়ে কঠিন এক সময় পার করছে বিএনপি। দলের চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া ১৫ সেপ্টেম্বর লন্ডনে যাওয়ার পর থেকে সেখানে বড় ছেলে তারেক রহমানের বাসায় অবস্থান করছেন। আর দলের অন্য সিনিয়র নেতারাও দলীয় কার্যক্রম থেকে কার্যত নিজেদের গুটিয়ে রেখেছেন। এছাড়া কিছু নেতা জেলে ও আরও কিছু নেতা গ্রেফতার এড়াতে বিদেশে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। কিছু নেতা বিভিন্ন মহলে দলের বর্তমান অবস্থান নিয়ে কঠোর সমালোচনা করছেন। এ পরিস্থিতিতে বিএনপি যে এক কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন, তা দলের সাধারণ নেতাকর্মীরাও মনে করছেন।

প্রসঙ্গত, ওয়ান ইলেভেনের সময় বিএনপির শতাধিক কেন্দ্রীয় নেতা খালেদা জিয়ার নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করে সংস্কারপন্থী বিএনপি নামে নতুন দল গঠন করে। তবে একপর্যায়ে সংস্কারপন্থী বিএনপির অনেক নেতা খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে থাকা মূল দলে প্রবেশ করে। আবার খালেদা জিয়ার প্রতি ক্ষুব্ধ অনেক নেতা দল থেকে সরে গিয়ে রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় হয়ে যান। দলের নাজুক পরিস্থিতিতে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির ভরাডুবি হয়। এরপর গত ৭ বছর ধরে দলটিকে এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে বার বার বাধাগ্রস্ত হয় দলীয় হাইকমান্ড। শমসের মবিনের পদত্যাগ নতুন করে দলটিকে আরও নাজুক পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিয়েছে বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করছেন।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: