২৪ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

বুড়িগঙ্গাসহ ঢাকার চার নদী বাঁচানো যাচ্ছে না ॥ পয়ঃবর্জ্য ও শিল্পবর্জ্যে ভয়াবহ দূষণ


বুড়িগঙ্গাসহ ঢাকার চার নদী বাঁচানো যাচ্ছে না ॥ পয়ঃবর্জ্য ও শিল্পবর্জ্যে ভয়াবহ দূষণ

শাহীন রহমান ॥ শত উদ্যোগ সত্ত্বেও বুড়িগঙ্গাসহ ঢাকার চার নদী বাঁচানো সম্ভব হচ্ছে না। এমনকি ইসিএ বা পরিবেশগত সঙ্কটাপূর্ণ এলাকা (ইকোলজিক্যাল ক্রিটিক্যাল এরিয়া) ঘোষণা করেও রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না ঢাকার চার নদী। ঢাকার প্রাণ বুড়িগঙ্গা দখল দূষণে নিঃশেষ হচ্ছে দিনে দিনে এটা দিবালোকের মতোই পরিষ্কার অথচ ২০০৯ সালে হাইকোর্টের এক আদেশে রাজধানী ঢাকার চার নদী রক্ষা করতে পরিবেশ অধিদফতরের পক্ষ থেকে তীরবর্তী এলাকাকে ইসিএ হিসেবে ঘোষণা করে পরিবেশের ক্ষতিকারক সব ধরনের কর্মকা- নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

পরিবেশ অধিদফতর জানিয়েছে, সম্প্রতি ঢাকা মহানগরের চারপাশে চারটি নদী ইসিএ-র প্রতিবেশ ব্যবস্থা পুনরুজ্জীবনের লক্ষ্যে প্রকল্প গ্রহণের জন্য একটি সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। তাদের মতে, পরিবেশগত ক্ষতির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দেশের অন্যান্য এলাকার মতো চার নদীতে দখল দূষণের হাত থেকে রক্ষা করতেই এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কিন্তু সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, ইসিএ ঘোষণা করার পর পরিবেশের ক্ষতি করে এমন সব ধরনের কর্মকা- নদী তীরবর্তী এলাকায় নিষিদ্ধ করা হলেও চার নদীর ক্ষেত্রে এসব নিয়ম মানাতে বাধ্য করতে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। ইসিএ ঘোষণার পর ৬ বছর পেরিয়ে গেলেও নদীর দখল দূষণ পরিস্থিতির কোন উন্নয়নই হয়নি।

সরকার পরিবেশের ক্ষতিকর বিবেচনায় ১৯৯৯ সালে দেশে প্রথমবারের মতো সাতটি এলাকাকে পরিবেশ সঙ্কটাপূর্ণ বা ইসিএভুক্ত হিসেবে ঘোষণা করে। এরপর ২০০১ সালে ঢাকা মহানগর এলাকায় গুলশান বারিধারা লেককে পরিবেশগত সঙ্কটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করা হয়। ২০০৯ সালে ঢাকার চারদিক দিয়ে বয়ে যাওয়া চারটি নদী বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীতে এ ঘোষণার আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে।

সরকার ঘোষিত ইসিএ তালিকাভুক্ত এলাকার মধ্যে আরও রয়েছে সুন্দরবন রিজার্ভ ফরেস্টের চারদিকে ১০ কিলোমিটার বিস্তৃত এলাকা, কক্সবাজার টেকনাফের সমুদ্র সৈকত, সেন্টমার্টিন দ্বীপ, সোনাদিয়া দ্বীপ, সিলেট-মৌলবীবাজারের হাকালুকি হাওড়, সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়া হাওড়, ঝিনাইদহ-যশোরের মারজাত বাঁওড়। সর্বশেষ এ বছরই সিলেটের জাফলং ডাউকি নদীতে ইসিএ হিসেবে ঘোষণা করে এসব এলাকায় পরিবেশবিরোধী কর্মকা- সম্পূর্ণ নিষেধ করা হয়েছে।

তবে ইসিএ বা পরিবেশ সঙ্কটাপন্ন এলাকায় পরিবেশ বিধ্বংসী এসব কর্মকা- নিষিদ্ধ হলেও চার নদীর ক্ষেত্রে এসবের কিছুই নিষেধ নেই। নদী ধ্বংসের সব ধরনের কর্মকা-ই বিরাজমান। রাজধানী ঢাকা ও শহরকেন্দ্র থেকে বহির্মুখী পয়ঃবর্জ্য এবং ঢাকার চারপাশের শিল্পবর্জ্যরে সরাসরি প্রবাহে নদী জলাশয়গুলো প্রতিনিয়ত ভয়াবহ দূষণের শিকার। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নয়টি চিহ্নিত অঞ্চল থেকে শিল্প বর্জ্যে নির্বিচারে নদী দূষণ চলছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে টঙ্গী, হাজারীবাগ, তেজগাঁও, তারাবো, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, ডিইপিজেড, গাজীপুর ও ঘোড়াশাল।

এছাড়া নদীতে চলাচল করা শত শত জাহাজ নদীর পানি দূষণের অন্যতম উৎস। প্রতিদিন ঢাকার চারদিকের নদীতে ৩শ’টি নির্গত মুখ দিয়ে মিলিয়ন টন কাঁচা পায়খানা, ধোলাইখালসহ ৪১টি নির্গত মুখের মাধ্যমে সিটি কর্পোরেশন এলাকার তরল বর্জ্য নদীতে পড়ছে। ২০৭টি ট্যানারি শিল্পের মধ্যে ঢাকার ১৮৩টি ট্যানারি প্রতিদিন ৮৮ টন কঠিন বর্জ্য ও ৭.৭ মিলিয়ন লিটার তরল বর্জ্য উৎপন্ন করে। এসব বিষাক্ত রাসায়নিক বর্জ্য ঢাকা বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ৭নং সøুইস গেটের মাধ্যমে সরাসরি বুড়িগঙ্গায় পতিত হচ্ছে। ট্যানারি, সিমেন্ট কাগজ ম-, টেক্সটাইল, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, ইঞ্জিনিয়ারিং, ব্যাটারি, রং, ধোলাই কারখানা, গার্মেন্টশিল্প, মনুষ্যবর্জ্য, শিল্পবর্জ্য, গৃহস্থালি অপরিশোধিত বর্জ্যে হজম করতে পারছে না নদীগুলো। ফলে নদীর রূপ কালো কুচকুচে আলকাতরার ন্যায় এবং পুঁতিময় দুর্গন্ধ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কঠিন বর্জ্যসহ গৃহস্থালি বর্জ্য, শিল্প বর্জ্য, হাসপাতাল বর্জ্য সবই কোন না কোনভাবে পয়ঃ ও স্ট্রম ড্রেনেজে নিষ্কাশন ব্যবস্থার সঙ্গে মিশে নদীতে যাচ্ছে।

পরিবেশ অধিদফতরের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক ও পরিবেশ সংগঠন পবার নির্বাহী সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী আব্দুস সোবহান বলেন, মূলত পাঁচ কারণে ঢাকার চার নদীর দূষণ রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। ইসিএ ঘোষণার পরও এসব দূষণ রোধে কোন পদক্ষেপও নেয়া হয়নি। ফলে দিন দিন আরও বেশি দূষিত হয়ে পড়ছে নদীগুলো। নদী দূষণের অন্যতম কারণের মধ্যে রয়েছে পয়ঃবর্জ্য, ট্যানারি বর্জ্য, শিল্পকারখানার দূষিত বর্জ্য, নৌযান বর্জ্য ও সিটি কর্পোরেশনের কঠিন বর্জ্য। এ সব রোধে আজ পর্যন্ত কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি অথচ ইসিএ ঘোষণার পর এসব কর্মকা- সবই নিষিদ্ধ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পয়ঃবর্জ্যরে দূষণ রোধ করতে হলে এখনই শোধনাগার (ইটিপি) স্থাপন করতে হবে। যদি এখন থেকেই বর্জ্য শোধনাগার প্রকল্প হাতে নেয়া হয় তাহলেও তা বাস্তবায়ন করতে সময় লাগবে প্রায় দশ বছর। তাদের মতে, ইটিপি স্থাপন করা ছাড়া পয়ঃবর্জ্য দূষণ রোধ করা যাবে না।

এরপরও বিশেষজ্ঞরা বলছেন এখনও যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া হলে চার নদীতে রক্ষা করা সম্ভব হবে। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)’র সভাপতি প্রফেসর গোলাম রহমানের দেয়া তথ্যমতে, ঢাকার চারদিকে ১১০ কিলোমিটার নদী ও পার্শ¦বর্তী এলাকা মারাত্মক পরিবেশ দূষণের শিকার হচ্ছে। কিন্তু ৩৪৫কিঃমিঃ/২১৫ মাইল দৈর্ঘ্যরে টেমস নদীও একসময় লন্ডন ও ওয়েস্ট মিনিস্টার এলাকার বর্জ্য দ্বারা কালো কুচকুচে রূপ ধারণ করে। রোমান সাম্রাজ্যের শাসনামল থেকে খোলা উন্মুক্তভাবে কাঁচা পায়খানা নির্বিচারে নির্গত হতো এতে। লন্ডন ব্রিজের ওপর পাবলিক টয়লেট অবস্থিত ছিল। তৎকালীন লন্ডন শহরে ৩ বিলিয়ন নাগরিকের বর্জ্য নিক্ষিপ্ত হওয়ায় টেমস খোলা নর্দমায় পরিণত হয়। বিশ্বের বৃহত্তম শহরের সকল মলমূত্র টেমসে প্রবাহিত হতো। ১৫৩৫ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে আইন পাস করে টেমসের মধ্যে মলমূত্র আবর্জনা, বর্জ্য নিক্ষেপ ও নিঃসরণ নিষিদ্ধ করা হয়। কিন্তু ১৯ শতকের মাঝামাঝি সময়ে পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করে চরম অবনতিশীল অবস্থায় উপনীত হয় টেমস। বর্জ্য ভাসতে থাকে পানির ওপরে। নগরে মহামারী ছড়ানোর আশঙ্কা সৃষ্টি হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু টেমস নদী নয়, পশ্চিম ইউরোপে সুইজারল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, অস্ট্রিয়া ও নেদারল্যান্ডসের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত রাইন নদী এক সময় মারাত্মক দূষণের শিকার হয়। ৫৭ প্রজাতির মাছ ধ্বংস হয়। বিষাক্ত হয়েছিল পানি। জার্মান সরকার ও ইউরোপীয় কর্তৃপক্ষ রাইনকে জাগিয়ে তুলেছেন বিশাল প্রকল্প গ্রহণ করে। এই প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে রাইন জীবন ফিরে পায়। বর্তমানের বুড়িগঙ্গার জীর্ণশীর্ণ নোংরা ও দূষণকে মধ্য ইউরোপের রাইন ও লন্ডনের টেমস নদীর দূষণকালীন কৃষ্ণবর্ণ ও মলিনতার সঙ্গে তুলনা করা হয়ে থাকে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নদী রক্ষায় দেশে অনেক আইন থাকলেও বুড়িগঙ্গাসহ চার নদীর ক্ষেত্রে তার কোনটাই বাস্তবায়ন করা যায়নি।

পরিবেশ অধিদফতরের কর্মকর্তারা বলছেন, মানুষের অপরিণামদর্শিতার কারণে দেশের পরিবেশ, প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ব্যাপক ক্ষতির শিকার হচ্ছে। ইতোমধ্যে দেশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশের ব্যাপক ক্ষতি হয়ে গেছে। এর ফলে প্রতিবেশের উৎপাদনশীলতা কমে গেছে। এমতাবস্থায় দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষা এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণ ও পরিবেশগত মানোন্নয়নের লক্ষ্যে সরকার পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী দেশের মোট ১৩টি এলাকাকে ইসিএ হিসেবে ঘোষণা করেছে।

ইসিএ ঘোষিত দেশের ১৩ এলাকায় পরিবেশের যাতে কোন ক্ষতি না হয় এমন কর্মকা- সম্পূর্ণ নিষেধ করা হয়েছে। বিশেষ করে এসব এলাকায় প্রাকৃতিক বন কাটা বা এসব আহরণ করা নিষিদ্ধ। এছাড়াও যেসব কর্মকা- এসব এলাকায় নিষিদ্ধ করা হয়েছে তার মধ্যে সকল প্রকার শিকার ও বন্য প্রাণী হত্যা, ঝিনুক কোরাস, কচ্ছপ ও অন্যান্য বন্য প্রাণী ধরা বা সংগ্রহ করা, প্রাণী ও উদ্ভিদের আবাসস্থল ধ্বংসকারী সব ধরনের কার্যকলাপ, ভূমি এবং পানির প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য নষ্ট/পরিবর্তন করতে পারে এমন ধরনের কর্মকা-, মাটি, পানি, বায়ু এবং শব্দ দূষণকারী শিল্প বা কোন ধরনের প্রতিষ্ঠান স্থাপন, মাছ এবং অন্যান্য জলজ প্রাণীর ক্ষতিকারক যে কোন কার্যাবলী, নদী জলাশয় লেক জলাভূমিতে বসতবাড়ি, শিল্প প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের পয়ঃপ্রণালী সৃষ্ট বর্জ্য ও তরল বর্জ্য নির্গমন এবং কঠিন বর্জ্য অপসারণ এবং যান্ত্রিক বা ম্যানুয়াল বা অন্য কোন পদ্ধতিতে পাথরসহ যে কোন খনিজ সম্পদ আহরণ এসব এলাকায় নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার চার নদী ও গুলশান লেক এলাকায় কোন পদক্ষেপই চোখে পড়ে না।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: