১৪ ডিসেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

‘আমি এই ছেলেটিকে বিয়ে করতে চাই’


মোঃ মামুন রশীদ

ক্যারিয়ারের শুরুতে আহামরি তেমন কিছু করছিলেন বিষয়টা এমন নয়। ধারাবাহিকতাও সেভাবে ছিল না। তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পদার্পণের শুরুর কয়েকটা বছর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেশের বাইরে ক্রিকেট খেলতে হয়েছে শচীন টেন্ডুলকরকে। অভিষেক হওয়ার পর টানা এক বছরে পাকিস্তান, নিউজিল্যান্ড ও ইংল্যান্ড সফর করেছেন মাত্র ১৭ বছর বয়সী শচীন। চ্যালেঞ্জিং এই সিরিজগুলোয় ‘টিম ইন্ডিয়া’ সার্বিক নৈপুণ্যে বেশ বাজে সময়ের মধ্যে দিয়েই যাচ্ছিল। কিন্তু কিশোর শচীন মোটামুটি আলো ছড়িয়ে নিজের জাতটাকে চেনাচ্ছিলেন। পাকিস্তান ও নিউজিল্যান্ড সফরে তিনটি টেস্ট অর্ধশতকও পেয়ে গিয়েছিলেন। ১৯৯০ সালের জুলাইয়ে ভারতের হয়ে ক্যারিয়ারের তৃতীয় সিরিজে ইংল্যান্ড সফরে যান শচীন। ম্যানচেস্টারে ওই সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টেই ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরি পান লিটল মাস্টার। সে সময় ইংল্যান্ডে বাবা-মায়ের সঙ্গে অবস্থান করছিলেন অঞ্জলী (বর্তমানে শচীনের সহধর্মিণী)। অবশ্য সেখানে শচীনের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাত হয়নি। ইংল্যান্ড সফর শেষ করে ফেরার পর মুম্বাই বিমানবন্দরে দু’জনের প্রথম সাক্ষাত। শচীনকে সরাসরি দেখে বাসায় ফেরার পরই অঞ্জলী মজা করে তাঁর বাবা-মাকে বলেছিলেন ‘এই ছেলেটিকে আমি বিয়ে করতে চাই।’ সেই মজাটা শেষ পর্যন্ত সত্য হয়েছে। আর এই ঘটনাটিই নিজের আত্মজীবনী ‘প্লেয়িং ইট মাই ওয়ে’-তে বর্ণনা করেছেন শচীন।

প্রথমবার ইংল্যান্ড সফরে ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় উপহারটা পেয়েছেন শচীন। ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে অপরাজিত ১১৯ রানের ইনিংস উপহার দেন তিনি। আর সে কারণেই ম্যাচটি ড্র করতে সক্ষম হয় ভারত। অঞ্জলী সে সময় ইংল্যান্ডেই ছিলেন। তাঁর মা এ্যানাবেল ছিলেন ব্রিটিশ এবং বাবা জাতীয় ব্রিজ চ্যাম্পিয়ন আনন্দ মেহতা ছিলেন কঠিন ক্রিকেট ভক্ত। শচীন যেদিন শতক করছিলেন মেহতা ঘরে ফিরে অঞ্জলীকে বলেন, টিভিতে শতকটা দেখার জন্য। তবে অঞ্জলীর কোন প্রকার আগ্রহই ছিল না ক্রিকেটের প্রতি। কখনও ভুল করেও তিনি ক্রিকেট খেলা দেখতেন না। পরে অঞ্জলী ও তাঁর বাবা ভারতে ফিরে আসেন। এ্যানাবেল একজন সমাজকর্মী হিসেবে ভারতে অনেক কাজ করছিলেন সে সময়। যেদিন শচীন সিরিজ শেষে দেশে ফেরেন, একই দিনে মা এ্যানাবেলকে নিতে মুম্বাই বিমানবন্দরে এসেছিলেন অঞ্জলীও। আর সে সময়ই শচীনের সঙ্গে প্রথম দৃষ্টি বিনিময় ঘটে অঞ্জলীর। শচীন বিমানবন্দরে দাঁড়িয়ে ছিলেন তাঁর শৈশবের বন্ধু সুনীল হার্শের সঙ্গে। তখন অপূর্ব সুন্দরী অঞ্জলীকে দেখেন তাঁর মায়ের জন্য অপেক্ষায় থাকতে। অঞ্জলীও তাঁর বান্ধবীর সঙ্গে এসেছিলেন। শচীন দেখেন অত্যন্ত আকর্ষণীয়া এক মেয়ে গোলাপি রঙের টি-শার্ট এবং নীল জিন্স পরে দাঁড়িয়ে আছে। একই সময়ে অঞ্জলীও তাকান শচীনের দিকে, হয়ে যায় দৃষ্টি বিনিময়। পরে বিমানবন্দর ত্যাগের সময় আরেকবার অঞ্জলীকে দেখেন শচীন। আর অঞ্জলী তাঁর সঙ্গে কথা বলতে পেছন থেকে দৌড়ে আসছিলেন এবং নাম ধরে ডাকছিলেন। দারুণ লজ্জায় লাল হয়ে যাচ্ছিলেন শচীন, কারণ বিমানবন্দরের বাইরে তাঁকে নিতে অজিত টেন্ডুলকর ও নিতিন অপেক্ষায় ছিলেন। তবে হার্শে তাঁকে বলেন এক অপরূপা নারী তাঁর সঙ্গে কথা বলার জন্য ডাকছে। অঞ্জলী তখন বলছিলেন, ‘ওহ, এই ছেলেটি তো দারুণ সুন্দর!’ কিন্তু শচীন তখন হার্শেকে জানান তিনি এই মুুহূর্তে কারও সঙ্গেই কথা বলতে পারবেন না।

মুম্বাই বিমানবন্দরে শচীনকে দেখার পরদিনই অঞ্জলী তাঁর বন্ধু মুফি মুফাজ্জল লাকড়াওয়ালাকে শচীনের ফোন নাম্বার চেয়েছিলেন। মুফাজ্জল সে সময় ক্লাব ক্রিকেট খেলে বেশ জনপ্রিয় ছিলেন। কিন্তু ওই সময় বাড়ির ল্যান্ড ফোন ছাড়া কোন মোবাইল ছিল না। তাই শচীনের ব্যক্তিগত কোন নাম্বারও ছিল না। কিন্তু এয়ারপোর্ট থেকে ফিরেই হাসতে হাসতে অঞ্জলী তাঁর বাবা-মাকে বলেন, ‘এই ছেলেটিকেই আমি বিয়ে করব।’ অঞ্জলীর এ কৌতুকটা যে বাস্তব হয়ে যাবে সেটা তিনি নিজেও ঘুনাক্ষরে বুঝতে পারেননি। শচীনও বুঝতে পারেননি আর কখনও এয়ারপোর্টে দেখা সেই মোহনীয় সুন্দরী নারীর সঙ্গে তাঁর দেখা হবে। একদিন সত্যি সত্যি ফোন আসলো শচীনের বাড়িতে। ফোনও তুললেন শচীন। অপর প্রান্ত থেকে অঞ্জলী বললেন, ‘আমি সেই মেয়েটি যাকে মুম্বাই এয়ারপোর্টে দেখেছিলে এবং আমি তোমার পেছনে আসছিলাম। আমরা কি বাইরে কোনদিন কোথাও দেখা করতে পারি?’ তখন শচীন বলেন, ‘আমি তোমাকে চিনতে পেরেছি। তুমি সেদিন কি পোশাক পরে ছিলে সেটাও আমার মনে আছে। তোমার সঙ্গে আমি দেখা করতে পারি ক্রিকেট ক্লাব অব ইন্ডিয়াতে। সেখানেই আমি খেলি।’ অঞ্জলীর সেদিনের পরিহিত পরিচ্ছদের রং বলে দিয়ে চমকে দেন তাঁকে।

অঞ্জলী একদিন আসলেন ক্রিকেট ক্লাব অব ইন্ডিয়াতে। কিন্তু এত বেশি মানুষের ভিড় এবং খেলাধুলার ব্যস্ততা ছিল যে ঠিকভাবে আসলে দেখাই করা হলো না দু’জনের। শুধুমাত্র দু’জনের নাম্বার বিনিময় করেছেন সে সময়। এরপর ফোনে প্রায় নিয়মিতই অঞ্জলীর সঙ্গে কথা বলেছেন শচীন। তবে শচীনের ভাবী মিনা একদিন সন্দেহ করতে শুরু করেন যে শচীন আর অঞ্জলীর মধ্যে মনের রসায়নটা বেশ জমে উঠছে। মিনা তাঁকে প্রশ্ন করেন, ‘এই মেয়েটা কে তোমাকে নিয়মিত ফোন করে?’ কিন্তু শচীন তা কৌশলে এড়িয়ে যান এবং সাধারণত ব্যক্তিগত কোন ব্যাপার নিয়ে পরিবারের সঙ্গে কথা বলতে ভাল বোধ করতেন না শচীন। এভাবেই চলে যাচ্ছিল। কিন্তু আর দেখা হচ্ছিল না। অবশেষে আসলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। শচীনের বাড়িতে সরাসরি আসলেন অঞ্জলী। দু’জনের মধ্যে এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছিল যে অঞ্জলী একজন রিপোর্টার হিসেবে আসবেন এবং তিনি শচীনের সাক্ষাতকার নেবেন। সেটাই অঞ্জলীর একজন সাংবাদিক হিসেবে প্রথম ও শেষ দায়িত্ব পালন ছিল। ওই ঘটনার আগে আর কোন মহিলা সাংবাদিক শচীনের সাক্ষাতকার নিতে বাড়ি পর্যন্ত আসেননি। এ কারণে শচীনের ভাবী মিনা ঠিকই সন্দেহ করে বসেন যে এই বিশেষ মহিলা সাংবাদিকটা কে! কিন্তু সেই সাক্ষাতটাও দীর্ঘ হয়নি। অঞ্জলীকে ইংল্যান্ড থেকে আনা কিছু চকলেট খেতে দিয়েছিলেন শচীন। যদিও তিনি চকলেট বের করতে গিয়ে হতাশার সঙ্গে দেখেছিলেন মাত্র দুটি অবশিষ্ট আছে। (চলবে...)

তথ্যসূত্র : শচীন টেন্ডুলকরের আত্মজীবনী ‘প্লেয়িং ইট মাই ওয়ে’ অবলম্বনে।