১৮ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

‘ভারতে যাব না, শেখের বেটির দেশের নাগরিক হয়েই থাকতে চাই’


‘ভারতে যাব না, শেখের বেটির দেশের নাগরিক হয়েই থাকতে চাই’

তাহমিন হক ববি ও রাজু মোস্তাফিজ, ছিটমহল থেকে ॥ কোন দেশের নাগরিক হতে পারাটা জীবন সংগ্রামের পরিচয়ের জন্য একটা বড় চাওয়া-পাওয়া। যে চাওয়া-পাওয়াটা আমার পিতা আজ দেখে যেতে পারলেন না। এখন বাকি জীবনটা আমি স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে যতদিন বেঁচে থাকব ততদিন বাংলাদেশের নাগরিক হয়ে থাকতে চাই। কথাগুলো বললেন নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার অভ্যন্তরে থাকা ভারতীয় ছিটমহল নগর জিগাবাড়ী ছিটমহলের বাসিন্দা মৃত রমজান আলীর পুত্র ৬৫ বছরের বৃদ্ধ শুকুর আলী। সোমবার সকাল থেকে শুরু হওয়া ভারত-বাংলাদেশের অভ্যন্তরে থাকা ১৬২টি ছিটমহলে জনগণনা জরিপে নিজের পরিবারের নাম-ঠিকানা লিপিবদ্ধ করার পর প্রচ-ভাবে আনন্দে আত্মহারা হয়ে শুকুর আলী এসব কথা বলেন। সেই সঙ্গে তিনি জানান, ছিটমহল অনুযায়ী আমি ও আমার পরিবার ভারতীয়। কিন্তু ছিটমহল বিনিময়ে দেশ বেছে নেয়ার প্রশ্নে আমি ফরমে লিখিয়েছি ভারতে যাব না। যতদিন বাঁচব ততদিন পরিবার-পরিজন নিয়ে শেখের বেটির দেশের নাগরিক হয়েই থাকব। থাকতে চাই শেখের বেটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বাংলাদেশে। এইখানে আমার জন্ম। তাই জন্মস্থান ছেড়ে আমি ভারতে যাব না। আমার পিতা-মাতা বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর পরই মারা যান। তাদের কবর আঁকড়ে ধরে রেখেছি। তাই যদি মরতে হয় তাহলে এখানেই (বাংলাদেশে) মরব। শুধু শুকুর আলী নয়, প্রথম দিন যে ৩১টি পরিবার জনগণনায় অংশ নেয় তারা সকলেই বাংলাদেশের নাগরিক হতে নির্দিষ্ট ফরমে উল্লেখ করেছেন। এদের মধ্যে রয়েছেনÑ বড়খানকা ছিটমহলের বাসিন্দা মৃত ফরমান আলীর পুত্র আব্দুল হাই (৪৫) ও তার ছোট ভাই ইনতাজ আলী (৪০), আবু তালেব (৭০) ও তার পুত্র জিন্নু (৪৮), নগর জিগাবাড়ি ছিটমহলের মৃত আব্দুল করিমের পুত্র জয়নাল (৫৫), মৃত আবু রায়হানের পুত্র রফিকুল ইসলাম (৪৮), মৃত আগমেদ হোসেনের পুত্র হজরত আলী (৪৫) ও মৃত নুর হোসেনের পুত্র মজনু (৪০)।

এদিকে, অত্যন্ত আনন্দ-উৎসবের মধ্য দিয়ে সোমবার সকাল ৯টা থেকে শুরু হয় নীলফামারীর ডিমলা উপজেলা চারটিসহ বাংলাদেশ ও ভারতের অভ্যন্তরে থাকা ১৬২টি ছিটমহলে একযোগে যৌথ জনগণনা। সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত যৌথ জনগণনার কাজ শুরু করা হয়। চলবে আগামী ১৬ জুলাই পর্যন্ত। জনগণনায় মোট ৭৫টি প্রতিনিধি দল কাজ করছে।

অপরদিকে, ভারতের অভ্যন্তরে থাকা বাংলাদেশের কোচবিহারে ৪৭টি ও জলপাইগুড়ির চারটিসহ ৫১টি ছিটমহলে জরিপের কাজে অংশ নিয়েছে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া ২৫টি জরিপকারী প্রতিনিধি দল। সরেজমিন দেখা যায়, জনগণনার প্রথম দিন নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার অভ্যন্তরে ভারতীয় চারটি ছিটমহলের মধ্যে দুটি ছিটমহল যথাক্রমে ২৮ নম্বর বড়খানকি ও ৩১ নম্বর ছিটমহল নগর জিগাবাড়ীর বাসিন্দাদের জনগণনা করা হয়। ২৮ নম্বর ছিটমহলের বাসিন্দারা ডিমলা শহীদ স্মৃতি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় ক্যাম্পে ও ৩১ নম্বর নগর জিগাবাড়ীর বাসিন্দারা জয়নালের বাড়ির আঙিনা সংলগ্ন ক্যাম্পে জনগণনায় অংশ নেয়। ২৮ নম্বর ছিটমহলে জনগণনাকারী হিসেবে ভারতের জয়দেব কুমারকে সহযোগিতা করছেন বাংলাদেশের প্রতিনিধি আজিজুল ইসলাম। ৩১ নম্বর নগর জিগাবাড়ী ছিটমহলে ভারতের সনজিব বসাককে সহযোগিতা করছেন বাংলাদেশের প্রতিনিধি আসাদুজ্জামান জুয়েল। সুপারভাইজার হিসেবে ভারতের পক্ষে মেকলিগঞ্জ পৌরসভার ভূমি সংস্কার দফতরের কর্মকর্তা অমরেশ পাল ও বাংলাদেশের ডিমলা উপজেলা পরিসংখ্যান কর্মকর্তা এমদাদুল হক দায়িত্ব পালন করছেন। জনগণনার প্রথম দিন দুই ছিটমহলের মধ্যে ২৮ নম্বর ছিটমহলের ১৪টি পরিবার ও ৩১ নম্বর ছিটমহলের ১৭টি পরিবার জনগণনায় নাম নিবন্ধন করে। এদের মধ্যে কোন পরিবার ভারতে যাওয়ার ইচ্ছাপোষণ করেনি। এই দুই ছিটমহলের অন্য পরিবারগুলো বাকি সময়ের মধ্যে জনগণনায় অংশ নেবে বলে জানায়। এছাড়া বাকি দুটো ছিটমহলের বাসিন্দাদের জনগণনা মঙ্গলবার থেকে শুরু করা হবে বলে জানান ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাউল করিম।

বিশেষ বিজ্ঞপ্তি ॥ বাংলাদেশ এবং ভারতের মধ্যে ১৯৭৪ সালের স্বাক্ষরিত স্থলসীমানা চুক্তি এবং ২০১১ সালের প্রটোকলটি কার্যকরের প্রেক্ষিতে ছিটমহলবাসীদের অবগতির জন্য উভয় দেশের প্রশাসন একটি বিশেষ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে।

কুড়িগ্রাম ॥ সোমবার সকাল পৌনে এগারোটায় কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার অভ্যন্তরে অবস্থিত দেশের সবচেয়ে বড় ছিটমহল দাশিয়ারছড়ার কালীরহাট বাজারে হেড কাউন্টিংয়ের উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক খান মোহাম্মদ নুরুল আমিন। দাশিয়ারছড়া ছিটমহলের বাসিন্দা আব্দুর রাজ্জাক ও শহিদা বেগমের জরিপ তালিকায় নাম অর্ন্তভুক্তির মাধ্যমে মতামত সংগ্রহের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসক খান মোহাম্মদ নুরুল আমিন প্রধান অতিথির বক্তব্যে বলেন, বর্তমান সরকারের বড় সাফল্য দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সমস্যা সীমান্তচুক্তি বাস্তবায়ন। আর বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অবস্থিত ১১১টি ছিটমহলের উন্নয়নের জন্য চলতি অর্থবছরে সরকার ২শ’ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছে। কাজেই আপনারা কারও প্ররোচনায় না ভুলে প্রশাসন ও সরকারকে সহযোগিতা করুন। আমরা সবাই আপনাদের পাশে রয়েছি এবং থাকব।

কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী ও ভুরুঙ্গামারী এই দুটি উপজেলায় ভারতীয় ১২টি ছিটমহল জরিপের জন্য ভারত থেকে ১৫ সদস্যের একটি জরিপ দল এসেছে। এরমধ্যে ১১ জন গণনাকারী এবং চারজন সুপারভাইজার রয়েছেন। অনুরূপ বাংলাদেশ থেকে একটি টিম ভারতের ৫১টি ছিটমহলে হেড কাউটিং করার জন্য এখন ভারতে অবস্থান করছেন। এর আগে রোববার ছিটমহল জরিপকাজের জন্য নিয়োজিত ভারতীয় গণনাকারী এবং সুপারভাইজারদের নিয়ে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা হলরুমে তিন ঘণ্টাব্যাপী এক কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে ছিটমহলবাসীর জমি বিষয়ক জরিপ, নিরাপত্তা বিষয়সহ বিভিন্ন বিষয়ক কাজের জন্য একটি কন্ট্রোলরুম খোলা হয়েছে।

কন্ট্রোলরুমের দায়িত্বপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেট সোহেল মারুফ জানান, ১৬২টি ছিটমহলে উভয় দেশের ৭৫ জন করে প্রতিনিধি কাজ করছেন। এরা গণনাকারী এবং সুপারভাইজার হিসেবে কাজ করছেন। বাংলাদেশ এবং ভারতের বিভিন্ন ছিটমহলে যে হেড কাউটিং হবে তাতে ২০১১ সালের জরিপ অনুযায়ী অনুষ্ঠিত হবে। শুধুমাত্র যারা ২০১১ সালের পর ছিটমহলে জন্মগ্রহণ এবং যারা বিয়ে করেছে ওই সব বধূদের নামও অন্তর্ভুক্ত করা হবে। ভারতীয় ছিটমহলগুলোতে ভারতের গণনাকারী এবং সুপারভাইজাররা ছিটমহলবাসীদের কাছে জানতে চাইবেন তারা ভারতীয় নাগরিক হয়েও কেন বাংলাদেশী নাগরিক হতে চান। হেড কাউটিং শেষেও তাদের সুযোগ থাকবে দেশের নাগরিকত্ব পরিবর্তনের। আগামী ৩১ জুলাই মধ্যরাত হতে দুই দেশের ভেতরে থাকা ছিটমহলগুলো হস্তান্তর করা হবে। ছিটমহল হস্তান্তর প্রক্রিয়ায় জটিলতা এড়াতেই ৬ জুলাই থেকে ১৬ জুলাই পর্যন্ত প্রতিটি ছিটমহলের খানা জরিপ করা হবে। এই জরিপ হতে ছিটমহলের প্রকৃত জনসংখ্যা, ঘরবাড়ি, ভোগদখলকৃত জমি, অর্থসম্পদ এবং আর্থসামাজিক অবস্থা জানা যাবে। এছাড়াও প্রসাশনের পক্ষ থেকে বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে ২২ জুন হতে ৩১ জুলাই-১৫ এর মধ্যে ছিটমহলে কোন প্রকার জমি বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। এ সময়ের পর ১ আগস্ট থেকে ৩০ নভেম্বর-১৫ পর্যন্ত স্ব স্ব স্থানীয় প্রশাসনের অনুমতিক্রমে জমি বিক্রি করা যাবে।

কন্ট্রোলরুম ॥ ছিটমহলবাসীর জমি বিষয়ক জরিপ, হেড কাউন্টিং, নিরাপত্তা বিষয়সহ বিভিন্ন বিষয়ে কাজের জন্য একটি কন্ট্রোলরুম খোলা হয়েছে। কন্ট্রোলরুমের দায়িত্বে রয়েছেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সোহেল মারুফ। এ কন্ট্রোলরুমের মাধ্যমে মনিটরিং করা হচ্ছে যৌথ জরিপকাজ, ছিটমহলবাসীর নিরাপত্তা, ভূমি ব্যবস্থাপনা, নাগরিকত্ব এবং আগামী দিনের উন্নয়ন পরিকল্পনা ও কার্যক্রম।

জেলা প্রশাসকের বিজ্ঞপ্তি ॥ এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ২২ জুন হতে ৩১ জুলাই-১৫ এর মধ্যে ছিটমহলে কোন প্রকার জমি বিক্রি করা যাবে না। এ নিষেধাজ্ঞা ৩১ জুলাই পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। এ সময়ের পর আগামী ১ আগস্ট থেকে ৩০ নভেম্বর-১৫ পর্যন্ত স্ব স্ব স্থানীয় প্রশাসনের অনুমতিক্রমে জমি ক্রয় কিংবা বিক্রি করা যাবে। অন্যদিকে কোন ব্যক্তি ভারতের নাগরিকত্ব বহাল রাখার ইচ্ছা প্রকাশ করলে তাকে ১ আগস্ট থেকে ৩০ নভেম্বর-২০১৫ তারিখের মধ্যে সকল আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে ভারতের মূল ভূখ-ে যেতে হবে বলে জানা যায়।

পঞ্চগড় ॥ স্টাফ রিপোর্টার পঞ্চগড় থেকে জানান, জেলার বিভিন্ন ছিটমহলে আবারও বাংলাদেশ-ভারতের যৌথ হেড কাউন্টিং বা জনগণনা শুরু হয়েছে। সোমবার সকালে সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার লায়লা মুনতাজেরি দিনা পঞ্চগড়ের গারাতি ছিটমহলে হেড কাউন্টিং কাজের উদ্বোধন করেন। জনগণনায় অংশ নিতে শনিবার ভারতের ১৩ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল পঞ্চগড়ে আসে।

বাংলাদেশে ভারতীয় ১১১টি ছিটমহলে ১০৫ জন ভারতীয় এবং ভারতের অভ্যন্তরে বাংলাদেশী ৫১টি ছিটমহলে ৩৯ জন বাংলাদেশী গণনাকারী কাজ করছেন। ১৬ জুলাই পর্যন্ত এই গণনা চলবে এবং ২০ জুলাই চূড়ান্ত তালিকা দুই দেশের প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের কাছে হস্তান্তর করা হবে বলে জানা গেছে।

সর্বাধিক পঠিত:
পাতা থেকে: