ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২ ফাল্গুন ১৪৩০

বাংলাদেশ-নিউজিল্যান্ড

সিলেট টেস্টে চালকের আসনে বাংলাদেশ

মো. মামুন রশীদ

প্রকাশিত: ২৩:৪৭, ৩০ নভেম্বর ২০২৩

সিলেট টেস্টে চালকের আসনে বাংলাদেশ

সেঞ্চুরি উদ্যাপন করছেন নাজমুল হোসেন শান্ত

আইনটা হয়তো জানাই নেই গ্লেন ফিলিপসের। সদ্য সমাপ্ত বিশ^কাপ থেকে পুরোদস্তুর নিয়মিত বোলার হয়ে উঠেছেন এই অনিয়মিত অফস্পিনার। চলমান সিলেট টেস্টে বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসে তিনিই ধস নামিয়েছেন ৪ উইকেট শিকার করে। তৃতীয় দিন বাংলাদেশের দ্বিতীয় ইনিংসে বোলিং করতে এসে আইসিসির আইনবিরুদ্ধ কাজ করেছেন বলের ঔজ্জ্বল্য ফেরাতে লালা লাগিয়ে। সেজন্য পেনাল্টি হতে পারে নিউজিল্যান্ডের ৫ রান। সেই শাস্তি থেকে ৫ রান বাংলাদেশ যদি না পায়, তবুও এখন ২০৫ রানে এগিয়ে থেকে ম্যাচে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে বাংলাদেশ। সিরিজের প্রথম টেস্টের তৃতীয় দিন সকালে নিউজিল্যান্ডের প্রথম ইনিংস ৩১৭ রানে থেমে যায় মুমিনুল হকের দুর্দান্ত বোলিংয়ে।

সেই মুমিনুল দিনশেষে বলে লালা ব্যবহারের নিয়ম বিষয়ে অজ্ঞতাই প্রকাশ করেছেন। তাই ফিলিপসও যে জেনেশুনে করেছেন তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছেনা। ম্যাচ রেফারির সিদ্ধান্ত হয়তো আজই জানা যাবে কারণ বাংলাদেশের টিম ম্যানেজমেন্ট বিষয়টি চতুর্থ আম্পায়ারকে জানিয়েছে। দিনশেষে অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর রেকর্ড গড়া সেঞ্চুরিতে ৩ উইকেটে ২১২ রান নিয়ে স্বস্তিতে মাঠ ছেড়েছে স্বাগতিক বাংলাদেশ। 
দারুণ কিছুর ইঙ্গিত দ্বিতীয় দিনেই পাওয়া গেছে। বাংলাদেশী বোলারদের দুর্দান্ত বোলিংয়ে ৮ উইকেটে ২৬৬ রান নিয়ে দিনশেষ করে নিউজিল্যান্ড। ফলে ৪৪ রানে এগিয়ে থাকে বাংলাদেশ। তবে তৃতীয় দিন কাইল জেমিসন ও টিম সাউদি দারুণ ব্যাটিং করেছেন। তারা নিউজিল্যান্ডকে লিড এনে দেন। এরপর মুমিনুল বোলিংয়ে এসে তাদের ৫২ রানের জুটি ভেঙে স্বস্তি ফিরিয়েছেন। একই ওভারে জোড়া আঘাতে প্রথমে জেমিসনকে (৭০ বলে ২৩) এলবিডব্লিউ করেন তিনি এবং পঞ্চম বলে বোল্ড করে দেন সাউদিকে। অধিনায়ক সাউদি ৬২ বলে ৩ চারে করেছেন ৩৫। শেষ পর্যন্ত আগের দিনের সঙ্গে আরও ৫১ রান যোগ করে ৩১৭ রানেই থেমে যায় নিউজিল্যান্ডের প্রথম ইনিংস।

মুমিনুল ক্যারিয়ারসেরা বোলিং করে ৪ রানেই নেন ৩ উইকেট। ৭ রানে পিছিয়ে থেকে শুরু করে বিনা উইকেটে ১৯ রান নিয়ে লাঞ্চ বিরতিতে যায় বাংলাদেশ। কিন্তু বিরতির পর জাকির হাসান (১৭) ও মাহমুুদুল হাসান জয় (৮) সাজঘরে ফিরেছেন দ্রুতই। ফলে ২৬ রানে ২ উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে বাংলাদেশ। সেখান থেকে তৃতীয় উইকেটে শান্ত ও মুমিনুল দারুণ প্রতিরোধ গড়েন এবং দলের অবস্থানও শক্ত করতে থাকেন। ২ উইকেটে ১১১ রানে চা বিরতিতে যায় বাংলাদেশ। ততক্ষণে বাংলাদেশের লিড শতরান পেরিয়ে গেছে। ফিফটি পেয়ে যান ধৈর্যশীল শান্ত। কিন্তু চা বিরতির পরেই ভুলটা করেছেন মুমিনুল। ৬৮ বলে ৪ বাউন্ডারিতে ৪০ রানে বিদায় নেন তিনি রানআউট হয়ে। ফলে ৯০ রানের জুটি ভেঙে যায়। 
মুমিনুল ফিরে যাওয়ার পর শান্ত ও মুশফিক ভুল করেননি। তারা দিনের শেষ পর্যন্ত অপরাজিত থেকেছেন। বাংলাদেশের লিডকেও দুইশ’ পেরিয়ে নিয়ে যান দুজন মিলে। শান্ত ক্যারিয়ারের পঞ্চম সেঞ্চুরি করেন মাত্র ৪৬তম ইনিংস ব্যাট করতে নেমে। গত জুনে বাংলাদেশ দল সর্বশেষ টেস্ট খেলেছে আফগানিস্তানের বিপক্ষে। সেই ম্যাচের উভয় ইনিংসে সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছেন শান্ত। এবারও সেঞ্চুরি করলেন। তবে এবারেরটি আরও স্পেশাল। কারণ টেস্টে বাংলাদেশের প্রথম অধিনায়ক হিসেবে নেতৃত্বের অভিষেকে সেঞ্চুরি হাঁকালেন তিনি। ২০০৯ সালে গ্রানাডায় স্বাগতিক ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে নেতৃত্বের অভিষেকে অপরাজিত ৯৬ রান করেন সাকিব আল হাসান। সেই রেকর্ড ভেঙে দিয়েছেন শান্ত।

যদিও টেস্ট ইতিহাসে নেতৃত্বের অভিষেকে এটি সবমিলিয়ে ৩২টি সেঞ্চুরির ঘটনা। মুশফিক আছেন তার ফিফটির দ্বারপ্রান্তে। ৭১ বলে ৫ চারে ৪৩ রানে অপরাজিত আছেন তিনি। আর শান্ত ব্যাট করছেন ১৯৩ বলে ১০ চারে ১০৪ রানে। দুজনের মধ্যে ইতোমধ্যেই ৯৬ রানের জুটি হয়েছে। এখন সেটিকে আরও বড় করার পাশাপাশি দলের লিডকেও বাড়িয়ে নেওয়ার মোক্ষম সুযোগ। ৭টি উইকেট আছে বাংলাদেশের হাতে। ২০৫ রানে এগিয়ে বেশ স্বস্তিদায়ক অবস্থানেই আছে স্বাগতিকরা। সিলেটের উইকেটও এখন পর্যন্ত ব্যাটারদের জন্য বেশ সহায়ক ভূমিকা রাখছে। কিউইদের রানের চাপে ফেলার এটাই মোক্ষম সুযোগ এবং পরিবেশ। সেটি কতখানি করতে পারবে স্বাগতিকরা।

তরুণ শাহাদাত হোসেন দিপু, নুরুল হাসান সোহান ও মেহেদি হাসান মিরাজের মতো ৩ জন এখনো আছেন ব্যাট হাতে দারুণ কিছু উপহার দেওয়ার জন্য। ৩ উইকেটে ২১২ রান নিয়ে তৃতীয় দিনশেষ করা বাংলাদেশ দলের সামনে তাই অবিস্মরণীয় কিছু করার সুবর্ণ সুযোগ। তা করতে হলে আজ চতুর্থ দিন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দুইজন রান আউট হয়েছেন, বোলাররা কোনো প্রভাব ফেলতে পারেননি। তাই সতর্ক হয়ে খেললে সংগ্রহটাকে আরও বড় করা খুব কঠিন হবে না।
অবশ্য আজ দিনের শুরুতেই ৫ রান পেয়ে যেতে পারে বাংলাদেশ। কারণ বাংলাদেশের ইনিংসে ৩৪তম ওভারে দুইবার বলে লালা ব্যবহার করেছেন অফস্পিনার ফিলিপস। আইসিসির নতুন নিয়ম অনুসারে ৪৩.১ ধারায় বলা আছে ক্রিকেট বলে লালা ব্যবহার করা নিষিদ্ধ। গত বছরের ১ অক্টোবর থেকে এ আইন কার্যকর হয়েছে।

আম্পায়ার চাইলে শাস্তি হিসেবে ফিল্ডিং দলকে ৫ রান জরিমানা করতে পারেন। এ ছাড়া আম্পায়ার বল পাল্টে ফেলতে পারেন। কিন্তু মাঠের দুই আম্পায়ার আহসান রাজা ও পল রেইফেল এ নিয়ে নিউজিল্যান্ড দলকে কোনো শাস্তিই দেননি। যেহেতু বল পাল্টানো হয়নি এবং শাস্তি এখনো বাকি রয়েছে, তাই দ্বিতীয়টিই কার্যকর হতে পারে। অর্থাৎ ৫ রান পেয়ে যেতে পারে বাংলাদেশ। মাঠে কেউ কেউ লালা ব্যবহার করলে সেটির মাত্রা বা পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে ব্যবস্থা নেওয়া বা শাস্তির ব্যাপারটি নির্ভর করে পুরোপুরি আম্পায়ারদের ওপর। সবশেষ গত বছরের নভেম্বরে নেপালের বিপক্ষে ওয়ানডে ম্যাচে সংযুক্ত আরব আমিরাতের পেসার আলিশান শারাফু লালা ব্যবহার করায় ৫ রান পেনাল্টি দেওয়া হয় তার দলকে।

এদিন ৬৮ ওভার বোলিং করে কোনো অতিরিক্ত রান দেয়নি কিউই বোলাররা। এখান থেকেই পরিষ্কার যে তারা কতটা সুশৃঙ্খল বোলিং ও ফিল্ডিং করেছে। সেই অতিরিক্ত খাতে আজ ৫ রান যোগ হলে ব্যাটিংয়ে নামার আগেই ২১০ রানে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ। কারণ বিষয়টি চতুর্থ আম্পায়ারের কাছে জানিয়েছে বাংলাদেশের টিম ম্যানেজমেন্ট। কিন্তু এ বিষয়ে মুমিনুল বলেছেন, ‘এটা বড় ইস্যু নয়!’ কিন্তু বিষয়টি জানাতেই তিনি আবার বলেছেন, ‘যদি এমনই হয়, তাহলে অবশ্যই বড় ইস্যু।’ দেখা যাক আজকের দিনটায় কি হয় সিলেট টেস্টে।

×