ঢাকা, বাংলাদেশ   বুধবার ১৭ এপ্রিল ২০২৪, ৪ বৈশাখ ১৪৩১

প্রত্যক্ষদর্শীর চোখে

মেরীনা চৌধুরী

প্রকাশিত: ২২:৫৬, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

প্রত্যক্ষদর্শীর চোখে

প্রতিটি মানুষের জীবনে আছে এমন এক স্মরণীয় দিন

হঠাৎ দরজায় ঠক ঠক মৃদু আওয়াজে চমকে ভয়ে ও আতঙ্কে সারা শরীর হিম হয়ে আসে। মনে হচ্ছে দরজার বাইরে নরখাদক পুলিশ, দরজা খুললেই গুলি চালাবে। এমন এক পরিবেশে আমার বেড়ে ওঠা, বাস্তবতা সম্পর্কে কোনো স্বচ্ছ ধারণা ছিল না। কী করব বুঝতে পারছি না। ডা. চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করব তার কোনো উপায় নেই। সে সময় ফোনের ব্যবহার খুব একটা ছিল না বললেই চলে

প্রতিটি মানুষের জীবনে আছে এমন এক স্মরণীয় দিন বা Red Letter Day যে দিনটির স্মৃতি তার চলার পথের পাথেয় আর আগামী দিনের চলার অনুপ্রেরণা। আমার জীবনেও আছে তেমনই এক স্মরণীয় দিন যা আমাকে উজ্জীবিত করেছে, দিক্ষিত করেছে নতুন মন্ত্রে, নতুন চেতনায়-সেই শ্রেষ্ঠতম স্মৃতি ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি।
১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠীর অবদমননীতি ও বাংলাদেশকে নব্য-কলোনিতে পরিণত করার অপচেষ্টা চক্রান্ত ও রাষ্ট্রভাষা বাংলা প্রসঙ্গে যে গভীর ষড়যন্ত্র ও বিতর্ক উত্থাপিত হয় তার ফলস্বরূপ সংঘটিত হয়-১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি এদেশের তরুণরা বুকের তপ্ত রক্তে রঞ্জিত করে রাজপথ। ভঙ্গ করেছিল ১৪৪ ধারা।

তাদের স্বদেশ প্রেম, ভাষাপ্রেম, ত্যাগ, নিষ্ঠা, এবং বীরত্বের প্রমাণ দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করেছিল স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশ। ভাষার জন্য এতবড় আন্দোলন। জীবনদান ও ত্যাগের মধ্য দিয়ে এক স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম বিশ্বের ইতিহাসে বিরল ঘটনা। তাদের আত্মদানের মহিমায় বিশ্বে পরিচিতি পায় ‘বাঙালি জাতি’। তবে ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে কেবল ভাষা বাঙালির রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের গভীরে।
২০২৪ থেকে ১৯৫২ সাল কয়েকে যুগ পেরিয়ে গেছে যেমন তরুণী মেয়েটি জীবন সায়াহ্নে উপনীত। ’৫২-এর ফেব্রুয়ারিতে যে ঘটনা প্রত্যক্ষ করার সৌভাগ্য হয়েছিল সেই একুশের চেতনা আজ যেমন আরও বেশি সমুজ্জ্বল, আরো বেশি দীপ্ত হয়ে আমাদের মনে জাগ্রত তেমনি একুশের চেতনার পরিপ্রেক্ষিতে ইতিহাসের অনেক গভীরে প্রোথিত। আর আমি ২১-এর সঙ্গে জড়িত ছিলাম এই ভেবে গর্বিত।
১৯৫২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি আমি স্বামী ডা. এম এ হালিম চৌধুরীর সঙ্গে ঢাকায় আসি। তিনি ছিলেন মিডফোর্ড মেডিক্যাল স্কুলের সার্জারি বিভাগের রেসিডেন্ট মেডিক্যাল অফিসার (জগঙ)। ডাক্তারদের কোয়ার্টারগুলো ছিল মেডিক্যাল স্কুলের চত্বরে প্রধান ফটকের পাচিল ঘোষ। জানালার ধারে দাঁড়ালে বড় রাস্তা দেখা যায়।
২১ ফেব্রুয়ারি ডা. চৌধুরী হাসপাতালে গেলে বাসায় একা খুব মন খারাপ হয়। একান্নবর্তী পরিবারে বেড়ে ওঠা আমি-মা-বাবা, ভাইবোন, বন্ধু-বান্ধব ছেড়ে সম্পূর্ণ অচেনা, অজানা জায়গা, নতুন পরিবেশে-ভারাক্রান্ত মন নিয়ে জানালার পাশে দাঁড়াই। চোখে পড়ে বড় রাস্তায় পথচারীদের আনাগোনা সাইকেল রিকশা, ঘোড়াটানা টমটম গাড়ির চলাচল।

এসবই আমার চোখে নতুন। আমার শৈশব, কৈশোর স্কুল সবই কলকাতায়। কলকাতার সঙ্গে কোনো মিল খুঁজে পাই না। হঠাৎ পথচারী, যানবাহন সবার মধ্য একটা চাঞ্চল্য লক্ষ্য করি। পথচারীরা দিশাহীনভাবে ছুটছে। রিকশা ও টমটম গাড়ি নিরাপদ জায়গায় নেওয়ার চেষ্টা করছে। মুহূর্তে একটা হৈহৈ শব্দে চমকে দেখি রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই লেখা ব্যানার হাতে সেøাগান দিতে দিতে একটি মিছিল রাস্তা অতিক্রম করছে। কি  হচ্ছে বুঝতে পাচ্ছি না, ডা. চৌধুরীর জন্য অপেক্ষা করি।

তিনি হাসপাতাল থেকে এসে বলেন- রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবির মিছিলে পুলিশ, লাঠিচার্জ করে কাঁদনে গ্যাস ছুড়ে মিছিল ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে কিন্তু মিছিল ছত্রভঙ্গ করতে ব্যর্থ হলে গুলি চালায় এতে কয়েকজন মারা যায় আর চারদিকে গুজব মেডিক্যাল কলেজের সামনে নাকি রক্তের বন্যা বইছে। জারি করা হয় কারফিউ।
২২ ফেব্রুয়ারি ডা. চৌধুরী হাসপাতাল যাওয়ার আগে, দরজা বন্ধ করতে বলেন আর দরজা না খোলার জন্য সতর্ক করেন। তিনি যাওয়ার পর দরজা বন্ধ করে চেয়ারে বসি। একটা সুপ্ত কান্নার শব্দ আমায় আপ্লুত করে চোখে আনে অশ্রুর বন্যা। কতক্ষণ বসেছিলাম জানি না। হঠাৎ দরজায় ঠক ঠক মৃদু আওয়াজে চমকে ভয়ে ও আতঙ্কে সারা শরীর হিম হয়ে আসে। মনে হচ্ছে দরজার বাইরে নরখাদক পুলিশ, দরজা খুললেই গুলি চালাবে।

এমন এক পরিবেশে আমার বেড়ে ওঠা, বাস্তবতা সম্পর্কে কোনো স্বচ্ছ ধারণা ছিল না। কী করব বুঝতে পারছি না। ডা. চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করব তার কোনো উপায় নেই। সে সময় ফোনের ব্যবহার খুব একটা ছিল না বললেই চলে। এমন সময় কানে আসে মিষ্টি সুরেলা কণ্ঠের আওয়াজ ‘ভাবি দরজা খুলুন’। কযেকবার কথাটার পুনরাবৃত্তি হলে সাহস করে দরজা খুলে আমি বিস্ময়ে হতবাক। দরজায় দাঁড়িয়ে পাঁচ ছয়জন তরুণ-তরুণী।

আমায় দেখে সহজ অন্তরঙ্গ সুরে বলে- ‘ভেতরে আসব’? আমি যে দরজা আটকিয়ে দাঁড়িয়ে আছি খেয়াল নেই। লজ্জিত মুখে দরজা ছেড়ে দাঁড়াই। তারা ঘরে এলে লক্ষ্য করি মেয়েদের পরনে কালো পার সাদা শাড়ি ও ছেলেদের পায়জামা-পাঞ্জাবি।  ওদের কাঁধে কালো ব্যাজ, একজনের হাতে কালো রিবন। ওরা নিজেদের পরিচয় দেয়। সবাই মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র-ছাত্রী। সবার নাম মনে নেই কেবল নূরী, রুবি, নমিতা, রায়হান ও আতিকের নাম মনে আছে।

নমিতা নামের তরুণীটি এগিয়ে এসে বলে-গতকালের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে আমরা কালোব্যাজ পরেছি, আপনাকে পরাতে চাই। আমি তাদের চোখে দেখতে পাই বাংলা ভাষার জন্য ওদের চোখে মহৎ স্বপ্নের দৃপ্ত অঙ্গীকার। আমি নমিতার কাছে দাঁড়াই-সে এসে আমার কাঁধে কালোব্যাজ পরিয়ে দিল। মুহূর্তে আমার তন্ত্রীতে তন্ত্রীতে নতুন চেতনার ঘা পড়ে। হৃদয়ের বন্ধ দুয়ার খুলে নতুন আলোর অভিশিক্ত হলাম।

একটা আবেগের তিরতিরে স্রোত বয়ে যায় দেহ মনে। ওরা যাচ্ছিল মিছিলে। আবেগজড়িত কণ্ঠে বলে উঠি- আমাকে সঙ্গে নেবেন? মুহূর্ত মাত্র। ওদের মুখে আলো ঝলমল হাসি জড়িয়ে পড়ে বলে-চলুন।
১৯৫২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি বাংলাকে প্রতিষ্ঠার অগ্নিঝরা মিছিলে অগ্নিকণ্ঠে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ ¯েœাগান দিতে দিতে সংগ্রামে প্রত্যয়ী জনতার মিছিল আমিও এগিয়ে চলি। হাইকোর্টের মোড়ে পুলিশ মিছিলে লাঠিচার্জ করলে মিছিলটি দুইভাগ হয়ে কার্জন হলের ভেতরে গিয়ে একত্র হয়ে চলে নবাবপুর রোড ধরে। মানসী সিনেমা হলের সামনে আবার গুলি চালায় পুলিশ। কয়েকজন আহত হয়ে রাস্তায় পড়ে যায়। তবুও মিছিল এগিয়ে চলে।

সদরঘাটের মোড়ে, মর্নিং নিউজ পত্রিকা অফিসের সামনে, বাংলাবাজার মোড়ে গুলি চালায় পুলিশ। কিন্তু অদম্য, আত্মপ্রত্যয়ী, নিজ লক্ষ্যে অবিচল, প্রতিবাদী জনতার মিছিল সব বাদা উপেক্ষা করে এগিয় চলে। সেদিন স্বৈরশাসকের পাপের শক্তি হার মেনেছিল জনতার অপ্রতিরোধী শক্তির কাছে। আর আমি জনতার মিছিলে শরিক হয়ে অবাক বিষয়ে দেখেছি অযুত প্রাণের এক মহাশক্তি। ২১ ফেব্রুয়ারির আন্দোলন আজ উত্তর-দক্ষিণ, পূর্ব-পশ্চিম এর মূল ধারার একাকার হয়ে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের সম্মানে সম্মানিত।

হাজার ভাষার মধ্যে পৃথিবীতে বাংলা ভাষার প্রসার লক্ষ্য করা যাচ্ছে, ঠিক তখনই একটি প্রশ্ন জাগে আমাদের মনে, বাংলা ভাষার আবাসভূমি বাংলাদেশে চলছে এই ভাষার চরম অবমূল্যায়ন। অনেক পত্র-পত্রিকায় ভাষার বিশুদ্ধ চর্চা হচ্ছে না। উচ্চ আদালতে আজও বাংলা ব্যবহার করা হয় না। বাংলা ভাষার চলমান দুরবস্থা সম্পর্কে সম্যক ধারণা আশা করি আমাদের অনেকের আছে। এক্ষেত্রে দুঃখভাবে প্রথমেই বলতে হয়, নতুন প্রজন্মের কথা। মাতৃভাষা বাংলার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও মর্যাদা সম্পর্কে অনেকটাই তারা অজ্ঞ।

অথবা এ সম্পর্কে যা জানে তা যথেষ্ট নয়। অথচ তারাই বাংলা ভাষার ধারক ও বাহক। তাদের একনিষ্ঠ ভাষা প্রীতি পাবে বাংলাভাষাকে বিকশিত করতে। এক্ষেত্রে প্রয়োজন শিশুর মুখে বোল ফোটার সময় থেকেই মাতৃভাষার প্রতি আগ্রহ বা ভালোবাসা সৃষ্টি করার দায়িত্ব একজন মায়ের। কারণ মাতৃক্রোড় হচ্ছে শিশুর শিক্ষার প্রথম বিদ্যালয় বা সোপান। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় মা-বাবা শিশুকে বাংলার পরিবর্তে ইংরেজি শেখার প্রতি প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। তাই দেশে গড়ে উঠেছে শত শত ইংলিশ মিডিয়া ও ইংলিশ ভার্সন স্কুল।

এ কথা সত্য যে ইংরেজি এখন আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে বিশ্বে স্থান করে নিয়েছে। তাই নিজ দেশের উন্নতি ব্যবসা বাণিজ্য, উচ্চতর শিক্ষার জন্য ইংরেজি শেখ জরুরি। সেই সঙ্গে আমাদের উপলব্ধি করা দরকার যে রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশের অস্তিত্ব ও উন্নতির জন্য রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার অস্তিত্ব ও উন্নতি অপরিহার্য। বর্তমানে আর একটি বিষয় লন্ডনীয় যে কেবল ফেব্রুয়ারি মাসকে বেছে নেন বাংলা বই প্রকাশ, মাতৃভাষা চর্চা ও আলোচনার জন্য এভাবে মাতৃভাষার প্রসার অব্যাহত রাখা সম্ভব নয়।
মাতৃভাষা একটি নিরবচ্ছিন্ন, জীবনব্যাপী এবং নিরঞ্জন চর্চার অনুষঙ্গ। সুতরাং বাংলা ভাষার পরিশুদ্ধ, উজ্জ্বল সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য আছে তাকে বিশ্ব সাহিত্য গগনে প্রতিষ্ঠিত করতে আমাদের সম্মিলিত প্রয়াস জরুরি। এতে মাতৃভাষার চর্চার ক্ষেত্র উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাবে এর স্বকীয়তা সুদৃঢ় হবে। ভাষার মাসে সকল ভাষা সৈনিকদের জানাই বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।

×