ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৬ ফাল্গুন ১৪৩০

চারটি আসনেই নৌকার প্রার্থী অনেকটা নির্ভার

​​​​​​​সৈয়দ হুমায়েদ শাহীন, মৌলভীবাজার

প্রকাশিত: ২২:২৫, ১০ ডিসেম্বর ২০২৩

চারটি আসনেই নৌকার  প্রার্থী অনেকটা নির্ভার

.

পীর আউলিয়ার পুণ্যভূমি, পাহাড়, টিলা, হাওড় সমতলভূমির অপরূপ সমন্বয় দুটি পাতা একটি কুঁড়ির দেশ, প্রবাসী পর্যটন জেলা হিসেবে পরিচিত মৌলভীবাজার। আওয়ামী লীগের দুর্গ হিসেবে পরিচিত জেলার প্রতিটি আসনে স্বাধীনতা পরবর্তী প্রায় সব নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা ভালো করেছেন। এবারের নির্বাচনেও তার ব্যতিক্রম হবে না। আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পর হতে চায়ের টেবিল, হোটেল রেস্তোরাঁ, হাটবাজারের সর্বত্রই একটি কথা নির্বাচনে কে বিজয়ী হবেন। নির্বাচন নিয়ে নানা গুঞ্জন চলছে ভোটারদের মধ্যে। জেলার চারটি আসনের মধ্যে দুটিতে আওয়ামী লীগের পুরনো প্রার্থী এবং দুটিতে নতুন প্রার্থী দেওয়া হয়েছে। পুরাতন এবং নতুনের সংমিশ্রণে এবারের নির্বাচন বেশ জমে উঠবে। নির্বাচনে অনেক হিসাব নিকাশ থাকলেও নৌকার প্রার্থীরা রয়েছেন অনেকটা নির্ভার।

মৌলভীবাজার- আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী গত তিনবারের সংসদ সদস্য বন, পরিবেশ জলবায়ু বিষয়ক মন্ত্রী মো. শাহাবুদ্দিনমৌলভীবাজার- আসনে ছয়বারের সংসদ সদস্য সাবেক হুইপ বীর মুক্তিযোদ্ধা উপাধ্যক্ষ . আব্দুস শহীদ, মৌলভীবাজার- আসনে সিলেট জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল, মৌলভীবাজার- আসনে বিশিষ্ট ব্যবসায়ী শিল্পপতি অলিলা গ্রুপের চেয়ারম্যান জিল্লুর রহমান। মৌলভীবাজার- মৌলভীবাজার- আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর বিপরীতে কোনো বিদ্রোহী প্রার্থী বা অন্য কোনো দলের শক্ত প্রার্থী নেই। কারণে দুটি আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর বিজয় প্রায় নিশ্চিত।

মৌলভীবাজার- আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি কুলাউড়া উপজেলা চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ একেএম সফি আহমদ সলমান, সাবেক সংসদ সদস্য মো. আব্দুল মতিন, সাবেক দুইবারের সংসদ সদস্য তৃণমূল বিএনপি থেকে এমএম শাহীন। মৌলভীবাজার- থেকে আওয়ামী লীগ নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী লন্ডন আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি সিআইপি এমএ রহিম শহিদ। যদিও মৌলভীবাজার জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা জেলা প্রশাসক প্রাথমিকভাবে রহিম শহিদের মনোনয়ন বাতিল বলে ঘোষণা করেন। এই মনোনয়ন  বাতিলের বিরুদ্ধে তিনি আপিল করেন। আপিলে রহিম শহিদের মনোনয়ন বৈধ হলে নৌকার মাঝি জিল্লুর রহমানের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে।

মৌলভীবাজার- (বড়লেখা জুড়ী) বড়লেখা-জুড়ির উন্নয়ন বলতে গেলে তিনবারের সংসদ সদস্য বন, পরিবেশ জলবায়ু বিষয়ক মন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিনের হাত ধরেই হয়েছে। ২০০৮ সালে নির্বাচিত হয়ে প্রথমেই তিনি গ্রামীণ অবকাঠামোর উন্নয়নে হাত দেন। তারই ধারাবাহিকতায় গত প্রায় ১৫ বছরে বড়লেখা-জুড়ীর প্রায় সকল রাস্তাই পর্যায়ক্রমে পাকা হয়েছে।

এই আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মো. শাহাবুদ্দিন, জাতীয় পার্টির (জাপা) আহমেদ রিয়াজ উদ্দিন তৃণমূল বিএনপির মো. আনোয়ার হোসেনের প্রার্থিতা  বৈধ বলে ঘোষণা করা হয়।

একটি পৌরসভা বড়লেখা উপজেলার ১০টি এবং জুড়ী উপজেলার ছয়টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত মৌলভীবাজার- আসন। আসনে মোট ভোটার দুই লাখ ৬৫ হাজার ৮০৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার এক লাখ ৩২ হাজার ৭৩৬ জন। নারী ভোটার এক লাখ ৩৩ হাজার ৭৩ জন।

আসনে আওয়ামী লীগের একক প্রার্থী হিসেবে শক্ত অবস্থানে আছেন পরিবেশমন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন।

মৌলভীবাজার- (কুলাউড়া) বিগত ১৫ বছর আসনের জনগণ উন্নয়ন থেকে অনেকটা বঞ্চিত হয়েছেন। কারণ গত ২০ বছর ধরে আওয়ামী লীগের কেউ আসন থেকে নির্বাচিত হতে পারেননি। একটি পৌরসভা কুলাউড়া উপজেলার ১৩ ইউনিয়ন কমলগঞ্জ উপজেলার চারটি ইউনিয়ন নিয়ে সংসদীয় আসন। আসনে মোট ভোটার দুই লাখ ৪১ হাজার ১৬১ জন। এরই মধ্যে পুরুষ ভোটার এক লাখ ২২ হাজার ৪২২ জন। নারী ভোটার এক লাখ ১৮ হাজার ৭৩৯ জন।

আসন্ন নির্বাচনে আসনে ১০ প্রার্থীর মধ্যে বিকল্পধারার প্রার্থী মো. কামরুজ্জামান সিমুর মনোনয়নপত্র স্থগিত করা হয়েছে। আসনের  বৈধ প্রার্থীরা হলেনÑ আওয়ামী লীগের শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল, স্বতন্ত্র প্রার্থী একেএম সফি আহমদ সলমান, স্বতন্ত্র মো. আব্দুল মতিন, তৃণমূল বিএনপি থেকে এমএম শাহীন, জাসদ থেকে মো. বদরুল হোসেন ইকবাল, জাপা থেকে মাহবুবুল আলম আব্দুল মালিক, ইসলামী ঐক্যজোটের মাওলানা আছলাম হোসাইন রাহমানী, ইসলামী ফ্রন্টের আব্দুল মোস্তাকিম তামিম এবং ইসলামি ফ্রন্টের এনামুল হক মাহতাব।

জেলার মধ্যে কুলাউড়ার জনসাধারণ অনেকটা রাজনীতি সচেতন। গত ২০ বছর ধরে আসনে আওয়ামী লীগের মনোনীত কোনো প্রার্থী বিজয়ী হতে পারেননি। আসনটি আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। কিন্তু অনেক শক্ত প্রার্থী থাকার পরও প্রার্থী নির্বাচনে কেন্দ্রের ভুল সিদ্ধান্তের কারণে আওয়ামী লীগের প্রার্থী বিজয়ী হতে পারেননি। অনুরূপভাবে গত কয়েকটি নির্বাচনে বিএনপি জাপা সঠিক সিদ্ধান্ত না নেওয়ায় নির্বাচনী ফলও হয়েছে তার বিপরীত।

আসনে সিলেট জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল নৌকা প্রতীক পেয়েছেন। নাদেল এই অঞ্চলের বিশিষ্ট পীরে কামেল অত্যন্ত সৎ ধর্মভীরু নিজাম উদ্দিন চৌধুরী ওরফে বিস্কুটি পীর সাহেবের নাতি। নাদেলের এলাকায় গ্রহণযোগ্যতাও রয়েছে। তিনি যদি দল, পরিবার নানার ইমেজ নির্বাচনী মাঠে কাজে লাগাতে পারেন তা হলে তার বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি কুলাউড়া উপজেলা চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ একেএম সফি আহমদ সলমানও একজন শক্ত প্রার্থী। সফি আহমদ সলমান কুলাউড়া কলেজ জাসদ ছাত্রলীগের রাজনীতির মাধ্যমে রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন।

জনপ্রতিনিধি হিসেবে প্রথমে ইউনিয়ন চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে বর্তমানে উপজেলা চেয়ারম্যান। উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি রাস্তাঘাট, হাট-বাজার, ব্রিজ কালভার্ট নির্মাণ, টিউবওয়েল স্থাপন, খেলাধুলার উন্নয়নসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকা- করেন। তৃণমূল রাজনীতির মাধ্যমে সফি আহমদ সলমান সাধারণ মানুষের মন জয় করেন। গরিব অসহায় মানুষ তাকে বেশি পছন্দ করেন। তৃণমূল রাজনৈতিক কর্মীদের কাজে লাগাতে পারলে তারও বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সম্প্রতি তৃণমূল বিএনপির মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করে সবার সামনেই আবার ছিঁড়ে ফেলেন সাবেক এমপি এমএম শাহীন। মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করা আবার ছিঁড়ে ফেলা এবং আবার তৃণমূল বিএনপির মনোনয়নপত্র জমা দেওয়াটাকে সাধারণ ভোটার ভালোভাবে দেখছেন না। তিনি যদি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ এবং ছিঁড়ে ফেলার ঘটনা ভোটারদের বোঝাতে পারেন, তা হলে নির্বাচনী ফল তার পক্ষে আসতেও পারে।

এর আগে তিনি সংসদ সদস্য থাকাকালীন কুলাউড়া রেল জংশন, ৫০ শয্যার হাসপাতাল, উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র নির্মাণ, চাতলা, কন্টিনালা, কটারকোনা, জুড়ী, কামিনিগঞ্জ বাজার সহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ করেন।

মৌলভীবাজার- (সদর-রাজনগর) মৌলভীবাজার পৌরসভা, রাজনগর উপজেলার আটটি ইউনিয়ন সদর উপজেলার ১২ ইউনিয়ন নিয়ে আসনটি। আসনে মোট ভোটার তিন লাখ ৯১ হাজার ২৬৮ জন। এরই মধ্যে পুরুষ ভোটার এক লাখ ৯৭ হাজার ১২২ জন। নারী ভোটার এক লাখ ৯৪ হাজার ১৪৬ জন।

আওয়ামী লীগের দুর্গ হিসেবে পরিচিত আসনে স্বাধীনতা পরবর্তী প্রায় সব নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা ভালো করেছেন। তবে আসনে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দল দীর্ঘদিন থেকে। নির্বাচনেও তার ব্যতিক্রম হবে না।

এবারের নির্বাচনে ১১ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। তার মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী লন্ডন আওয়ামী লীগের সহসভাপত সিআইপি এমএ রহিম শহিদ, ইসলামি ফ্রন্টের মো. আব্দুর রউফ, জাকের পার্টির মো. আব্দুল কাইয়ুম, সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের মো. ফাহাদ আলম, স্বতন্ত্র প্রার্থী সাদিকুর রহমানের মনোনয়ন বাতিল করা হয়। মনোনয়ন  বৈধ হয়েছে আওয়ামী লীগের জিল্লুর রহমান, জাসদের আব্দুল মোসাব্বির, ওয়ার্কার্স পার্টির তাপস কুমার ঘোষ, জাপার রুহুল আমিন মো. আলতাফুর রহমান এবং এনপিপির মো. আবু বকরের।

বিশিষ্ট শিল্পপতি জিল্লুর রহমান এবার নৌকার মনোনয়ন নিয়ে আসার পর জেলা আওয়ামী লীগ দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পরেন। নৌকার মাঝি জিল্লুর রহমানের বাড়ি রাজনগরে। দীর্ঘদিন ধরে রাজনগরবাসী বড় দুই দলের প্রতি দাবি করে আসছিল সদস্যের মনোনয়ন রাজনগর থেকে দেওয়ার জন্য। রাজনগর থেকে আওয়ামী লীগ প্রার্থী দেওয়ায় মানুষ খুশি হয়। স্বতন্ত্র প্রার্থী এমএ রহিম শহিদ জানান, যে কারনে আমার মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে, এটা ঠিক হয়নি। আপিল করেছি এবং আপিলের রায় আমার পক্ষে আসবে।

সূত্র জানায়, আপিলের রায় রহিম শহিদের পক্ষে এলে নির্বাচনের প্রেক্ষাপট বদলে যাবে। রহিম শহিদের বাড়ি জেলা সদরে আর নৌকার মাঝি জিল্লুর রহমানের বাড়ি রাজনগরে। আসনের ২০ ইউনিয়নের মধ্যে ১২টি সদরে এবং আটটি রাজনগরে। রাজনগর থেকে সদর উপজেলায় ৮৭ হাজার ৪৬৭ ভোট বেশি রয়েছে। সবদিক বিচার করলে ভোটে নৌকার মাঝি জিল্লুর রহমান স্বতন্ত্র প্রার্থী রহিম শহিদের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে।

কারন নৌকার মাঝি জিল্লুর রহমানের সঙ্গে রয়েছেন প্রয়াত সমাজ কল্যাণমন্ত্রী, দুইবারের সাবেক সংসদ সদস্য সৈয়দ মহসীন আলীর গ্রুপ তার পরিবার। জিল্লুর রহমান যদি সৈয়দ মহসীন আলীর ইমেজ কাজে লাগাতে পারেন এবং মৌলভীবাজার সদর থেকে ভোট টানতে পারেন তাহলে তিনি বিজয়ী হতে পারেন।

অপরদিকে রহিম শহিদের সঙ্গে জেলা আওয়ামী লীগ তার অঙ্গ সংগঠনের বেশীর ভাগ নেতাকর্মী রয়েছেন। এছাড়াও এলাকাতে তার ব্যক্তিগত ইমেজ রয়েছে। ব্যক্তিগত ইমেজ দলীয় নেতাকর্মীদের যদি কাজে লাগাতে পারেন তাহলে তিনি বিজয়ী হলে আশ্চর্য হওয়ার কিছুই থাকবে না।

মৌলভীবাজার- (শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ) দুটি পৌরসভা ১৪ ইউনিয়ন নিয়ে আসনটি গঠিত। মোট ভোটার তিন লাখ ৯৮ হাজার ৮৩০ জন। তার মধ্যে পুরুষ ভোটার এক লাখ ৯৯ হাজার ৭৪২ জন। নারী ভোটার এক লাখ ৯৯ হাজার ৮৮ জন। আসনে ছয়জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। তার মধ্যে জাকের পার্টির মুহিবুর রহমান আজাদের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়। মনোনয়ন  বৈধ হয়েছে আওয়ামী লীগের সাবেক হুইপ বীর মুক্তিযোদ্ধা উপাধ্যক্ষ . আব্দুস শহীদ, জাপার মো. মস্তান মিয়া, ইসলামি ঐক্যজোটের মো. আনোয়ার হোসাইন, ইসলামি ফ্রন্টের আব্দুল মুহিদ হাসানী স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. নজরুল ইসলামের। আসনে আওয়ামী লীগ থেকে ছয় বারের সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা উপাধ্যক্ষ আব্দুস শহীদের বিজয় নিশ্চিত। আগামী জানুয়ারির নির্বাচন শুধু আনুষ্ঠানিকতা ছাড়া আর কিছুই না।

 

×