ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১০ ফাল্গুন ১৪৩০

আসন বণ্টন নিয়ে আজ বৈঠক

১৪ দলের শরিকরা দ্রুত ফয়সালা চাইছে

বিকাশ দত্ত

প্রকাশিত: ০০:০৪, ১০ ডিসেম্বর ২০২৩

১৪ দলের শরিকরা দ্রুত ফয়সালা চাইছে

আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১৪ দলীয় জোটের শরিকদের মধ্যে আসন বণ্টন নিয়ে শঙ্কা ও হতাশা

আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১৪ দলীয় জোটের শরিকদের মধ্যে আসন বণ্টন নিয়ে শঙ্কা ও হতাশা কাটছে না। শরিকদের মধ্যে নির্বাচনে আসন ভাগাভাগির সংকট ক্রমশ দানা বেঁধে উঠছে। কাক্সিক্ষত আসন না পাওয়ায় শরিক দলগুলো ক্ষুব্ধ। শরিকরা ক্ষুব্ধ হলেও জোটগতভাবেই নির্বাচন করবে বলে জানা গেছে। এদিকে স্বতন্ত্র প্রার্থী ইস্যুতে আটকে রয়েছে ১৪ দলের আসন সমঝোতা। জাপার মতো কোনো রাখঢাক রাখছে না ১৪  দলের শরিকরা। তারা দ্রুত সময়ের মধ্যে চূড়ান্ত ফয়সালা চাইছে। ভোটের আগেই চাওয়া-পাওয়ার হিসাব মেলাচ্ছে শরিক দলগুলো। এ বিষয় নিয়ে আজ রবিবার রাত ৮টায় জাতীয় সংসদ ভবনের এ ব্লকে ১৪ দলের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। সেখানেই আসন বণ্টনের বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে বলে জানা গেছে। 
যদিও ১৪ দলের সমন্বয়ক আমির হোসেন আমু বলেছেন যে, তাদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা হচ্ছে। তারা একটি সমাধানে আসতে পারবেন। কিন্তু বিভিন্ন দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, ১৪ দলের মধ্যে আসন সমঝোতা নিয়ে কিছু জটিল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ফেনী-১ আসনে শিরীন আখতারকে জোটের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়ার জন্য জাসদ চাপ দিচ্ছে। 
নির্বাচনে প্রায় সবগুলো আসন নিয়ে ১৪ দলের শরিকদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সমন্বয় হয়েছে। রাশেদ খান মেনন বরিশাল থেকে নির্বাচন করতে রাজি হয়েছেন। আওয়ামী লীগ কুষ্টিয়া-২ আসনটি খালি রেখেছে হাসানুল হক ইনুর জন্য। রাজশাহীতে ফজলে হোসেন বাদশার জন্য ছেড়ে দেওয়া হবে বলে নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়াও আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, তরিকত ফেডারেশনের নজিবুল বশর মাইজভান্ডারীর জন্যও আওয়ামী লীগ আসন ছেড়ে দিতে রাজি হয়েছে। 
সবকিছুই যখন ঠিকঠাক তখন বাদ সাধেন জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু। তিনি জানিয়ে দেন যে, শিরীন আখতারকে ফেনী-১ আসনে দিতে হবে।

কিন্তু আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বিভিন্ন জরিপ, তথ্য-উপাত্ত দেখিয়ে বলা হয় যে, সেখানে আলাউদ্দিন নাসিম চৌধুরী অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং এই আসন ছেড়ে দেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব হবে না। এরপরই বেঁকে বসেন হাসানুল হক ইনু। তিনি এখনো চাপ দিয়ে যাচ্ছেন, যেন শিরীন আখতারকে ফেনী-১ আসনে মনোনয়ন দেওয়া হয়।
এ প্রসঙ্গে জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু জনকণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা জোটে আছি। জোটের প্রার্থী যেখানে থাকবে, সেখানে আওয়ামী লীগের প্রার্থী থাকবে না। জোটের বাইরে আওয়ামী লীগও থাকবে, জাসদও থাকবে, স্বাভাবিক প্রতিযোগিতা হবে। ১৪ দলীয় জোটের শরিকদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের আসন ভাগাভাগি যেন সম্মানজনক হয়। আমরা সংখ্যা নিয়ে আলোচনা করছি। এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত মতামত পাওয়া যায়নি। ফেনী-১ আসনে শিরিন আখতারকে ১৪ দল থেকে মনোনয়ন দেওয়া হচ্ছে না। তাকে না কি মহিলা কোটায় এমপি বানানো হবে সে বিষয়ে ইনু বলেন, এটা গুজব। আজ জাতীয় সংসদ ভবনের এ ব্লকে ১৪ দলের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে বিষয়গুলো নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হবে।  
তরিকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান নজিবুল বশর মাইজভান্ডারী জনকণ্ঠকে বলেন, ১৪ দলের সমন্বয়ক ও আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা তার নির্বাচনী এলাকায় অবস্থান করছেন। আজ রবিবার তিনি ঢাকায় আসবেন। আজ তিনি শরিকদের নিয়ে আবার বসবেন। সেখানেই আসন বণ্টনের বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। ১৪  দলের শরিকরা বলছে, সেসব আসনে আমাদের প্রার্থীরা নৌকায় নির্বাচন করবেন। কিন্তু ওইসব আসনে আওয়ামী লীগের নেতারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে আছেন। এক্ষেত্রে আমাদের ছাড় দিলেও তাদের কর্মী-সমর্থকেরা দলীয় নেতার পক্ষে কাজ করবেন। এতে আমাদের তো কোনো ফায়দা হবে না।’
ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, ছেড়ে দেওয়া আসনে আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থী থাকলেও তা শরিকদের জন্য ঝুঁকি থাকবে। আওয়ামী লীগ বলছে, তাদের দলীয় প্রার্থীর বাইরেও স্বতন্ত্র প্রার্থী থাকবে। কিন্তু সেখানে তো একই দলের প্রার্থীরাই পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়ছেন। যিনিই জিতবেন তিনিই আওয়ামী লীগের। শরিকদের বেলায় সেটা তো হচ্ছে না। 
এর  আগে তিনটি নির্বাচনেই শরিকদের সঙ্গে আসন ভাগাভাগি করে প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করেছিল আওয়ামী লীগ। এখন পর্যন্ত ৬-৭টি আসনে আওয়ামী লীগ আমাদের ছাড় দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনু, ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন ও সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা, জাতীয় পার্টি জেপি চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, তরিকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান নজিবুল বশর মাইজভান্ডারী। 
গণতন্ত্রী পার্টির সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ১৪ দলীয় জোট একটি আদর্শিক জোট। তাই নির্বাচন এখানে মূল বিষয় নয়। এই জোট জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াই-সংগ্রামের জোট। আমি ঢাকা-৮ আসনে মনোনয়নপত্র কিনেছি। ফলে আমাকে নৌকা না দিলে নির্বাচনে থাকা আমার পক্ষে সম্ভব হবে না। কারণ নৌকার বিরুদ্ধে আমি দাঁড়াব না। রাজনৈতিক কারণে হয়তো ১৪ দলীয় জোটের শরিকরা এখন কোনো কথা বলবে না। তবে নির্বাচনের পরে কিন্তু রাজনৈতিক সমীকরণ হতে পারে।
গত সোমবার গণভবনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয়  জোটের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন জোটপ্রধান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেখানে রাশেদ খান মেনন আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থীদের নির্বাচন থেকে সরানোর অনুরোধ করেন। শেখ হাসিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ  নির্বাচনের জন্য দলীয় স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মাঠ থেকে না ওঠানোর গুরুত্ব তুলে ধরেন। 
শরিক দলগুলোর একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জনকণ্ঠকে  বলেন, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট ২০০৮ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়। ওই নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে মহাজোট।

পরে ২০১৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মহাজোট থেকে বেরিয়ে এসে কেন্দ্রীয় ১৪ দলের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন-সংগ্রামসহ নির্বাচনে অংশ নেয়। এরপর ২০১৮ সালের নির্বাচনেও ১৪ দলীয় জোটকে নিয়ে নির্বাচন করে দলটি। এ নির্বাচনে আটটি আসনে শরিকদের এমপি থাকলেও তাদের কাউকেই মন্ত্রিত্ব দেওয়া হয়নি। ১৪ দলীয় জোটের শরিক দলগুলোর মধ্যে আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে যাচ্ছে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ), বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, জাতীয় পার্টি (জেপি), তরিকত ফেডারেশন, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), গণতন্ত্রী পার্টি, সাম্যবাদী দল (এমএল)। সাম্যবাদী দল একটি আসন চেয়েছে। বাকিদের দাবি দুটি করে আসন। এর বাইরে গণআজাদী লীগ, কমিউনিস্ট কেন্দ্র, গণতান্ত্রিক মজদুর পার্টি, ন্যাপ (মোজাফ্ফর) ও ন্যাপ (এনামুল হক) নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না।

আর সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়া জানান, আওয়ামী লীগের কাছ থেকে অন্তত একটি আসন পাওয়ার ব্যাপারে তিনি আশাবাদী। সেক্ষেত্রে তিনি নিজে চট্টগ্রাম-১ আসন থেকে নির্বাচন করতে চান।
একটি সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ আমাদের আত্মসম্মানবোধ নিয়ে  খেলছে। এটি তারা ঠিক করছে না। তারা যদি ১৪ দলের শরিক দলগুলোকে নৌকার প্রতীক না দিতে পারে, সেটিও স্পষ্ট করতে পারে। কিন্তু এভাবে ঝুলিয়ে রাখার কোনো মানেই হয় না।  প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের লক্ষ্যে দলের স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বিষয়ে নমনীয় আওয়ামী লীগ। এতে প্রায় প্রতি আসনেই আওয়ামী লীগেরই এক বা একাধিক স্বতন্ত্র প্রার্থী মাঠে রয়েছেন। কিন্তু অন্ধকারে শরিকরা। নিজেদের মতো মনোনয়নপত্র জমা দিলেও তাদের কতটি বা কোন কোন আসন ছাড়া হবে তা এখনো চূড়ান্ত  হয়নি।

দফায় দফায় বৈঠক করে এ বিষয়ে তাগাদা দিলেও ফয়সালা আসেনি। ফলে বিষয়গুলো নিয়ে অসন্তুষ্টি রয়েছে ক্ষমতাসীন দলের শরিকদের মধ্যে। তাদের প্রত্যাশা, যত দ্রুত সম্ভব সম্মানজনকভাবে আসন সমঝোতা হোক। এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের কাছে গত নির্বাচনের চেয়ে দ্বিগুণ আসনে ছাড়ের দাবিও রেখেছে জোট শরিকরা। তবে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা বলছেন, শরিক ও জোট নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করেই আসনবিন্যাস চূড়ান্ত করা হবে। 
এদিকে শরিক দলের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে ও দলীয় সূত্রে জানা গেছে, আমির হোসেন আমুর কাছে জাসদ নেতারা ১০টি আসনে ছাড় চেয়েছেন। বর্তমানে দলটির সংসদ সদস্য আছেন তিনজন।

আর ওয়ার্কার্স পার্টির প্রত্যাশা সাতটি আসন। এ সংসদে তাদেরও সংসদ সদস্য আছেন তিনজন। তরিকত ফেডারেশনের বর্তমানে একজন সংসদ সদস্য থাকলেও এবার তারা পাঁচটি আসন আশা করছেন। জাতীয় পার্টি (জেপি) পাঁচটি আসন দাবি করলেও বর্তমানে দলটির একজন সংসদ সদস্য আছেন। সাম্যবাদী দলের কোনো সংসদ সদস্য না থাকলেও এবার তারা একটি আসন চান। জোটের বাকি শরিক দলের বর্তমান সংসদে প্রতিনিধিত্ব নেই, তবে দুই-একটি আসনে হলেও ছাড়ের প্রত্যাশা আছে তাদেরও।

×