ঢাকা, বাংলাদেশ   সোমবার ১১ ডিসেম্বর ২০২৩, ২৭ অগ্রাহায়ণ ১৪৩০

আওয়ামী লীগ চায় ধরে রাখতে বিএনপির লক্ষ্য পুনরুদ্ধার

​​​​​​​শরীফুল ইসলাম

প্রকাশিত: ২২:০২, ১ অক্টোবর ২০২৩

আওয়ামী লীগ চায় ধরে রাখতে বিএনপির লক্ষ্য পুনরুদ্ধার

.

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র তিন মাস বাকি। ইতোমধ্যেই সারাদেশে শুরু হয়ে গেছে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচার। ঢাকা-১১ আসনও এর ব্যতিক্রম নয়। আওয়ামী লীগসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা প্রকাশ্যে নির্বাচনী গণসংযোগ করলেও বিএনপিসহ কয়েকটি দল নীরবে নির্বাচনের প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছে। টানা ১৫ বছর আসনটি আওয়ামী লীগের দখলে রয়েছে এবং এবারও ধরে রাখতে চান স্থানীয় নেতাকর্মীরা। তবে এক সময় আসনটি দখলে থাকলেও পরে হাতছাড়া হওয়ায় এবার তা ফিরে পেতে চায় বিএনপি।

২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে শুরু করে টানা তিনবার ঢাকা-১১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের প্রার্থী একেএম রহমতুল্লাহ। এর আগেও তিনি এই এলাকার দুইবার সংসদ সদস্য ছিলেন। ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি একেএম রহমতুল্লাহ এখন দলের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য। তিনি আবারও নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়েছেন। এলাকার সংসদ সদস্য হিসেবে বিভিন্ন উন্নয়ন কাজের তদারকিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক সামাজিক অনুষ্ঠানে নিয়মিত যোগ দিয়ে দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি হিসেবে সর্বস্তরের মানুষের আশীর্বাদ প্রত্যাশা করছেন। ছাড়া নির্বাচন সামনে রেখে এলাকার সর্বত্র নিজের বড় বড় ছবি সংবলিত পোস্টার প্ল্যাকার্ড সাঁটিয়ে নৌকায় ভোট প্রার্থনা করেছেন। এর মাধ্যমে তিনি পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জোরালো প্রার্থী হিসেবে নিজেকে জানান দিয়েছেন।

ঢাকা-১১ আসনের স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এই আসনে আওয়ামী লীগ থেকে বর্তমান সংসদ সদস্য একেএম রহমতুল্লাহ নির্বাচনের প্রস্তুতি নিলেও কোনো কারণে তিনি না করলে নৌকার মনোনয়ন পেতে চান তার ছেলে বিশিষ্ট ব্যবসায়ী (সিআইপি) হেদায়েত উল্লাহ রণ। তাই রণ এবার জোরেশোরে মাঠে নেমেছেন। বাবার মতো সমগ্র নির্বাচনী এলাকায় তিনিও নিজের বড় বড় ছবি সংবলিত পোস্টার প্ল্যাকার্ড সাঁটিয়েছেন। তবে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা মনে করছেন একেএম রহমতুল্লাহ নির্বাচন না করলেও এলাকায় দলের আরও পুরনো ত্যাগী নেতা আছেন। তবে কোনো কারণে যদি রহমতুল্লাহ এবার নির্বাচন না করেন আর অন্য নেতারা রহমতউল্লাহর সঙ্গে একমত পোষণ করেন তবে তার ছেলে হেদায়েত উল্লাহ রণকে আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচনে প্রার্থী করতে চান তা হলে হয়তো রণ সম্ভাবনা আছে। তাই হেদায়েত উল্লাহ রণ পুরো নির্বাচনী এলাকায় এখন থেকেই গণসংযোগ করছেন।

ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি, গুলশান থানার সাবেক সিনিয়র সভাপতি বাড্ডা থানা শাখার প্রথম কমিটির সাধারণ সম্পাদক আলহাজ বশির আহমেদও ঢাকা-১১ আসনে এবার নৌকার টিকিট প্রত্যাশী। এই প্রবীণ নেতা এক সময় অবিভক্ত ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের কার্যকরী কমিটির সদস্য ছিলেন। তিনিও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে এলাকায় নিজের নৌকা প্রতীক সংবলিত ছবিসহ বড় বড় ব্যানার, পোস্টার প্ল্যাকার্ড সাটিয়ে জোরেশোরে প্রচারে নেমেছেন। এর বাইরে বাড্ডা থানা আওয়ামী লীগের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলমসহ আরও কয়েকজন সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বিভিন্নভাবে প্রচার চালাচ্ছেন। তারাও এলাকায় পোস্টার প্ল্যাকার্ড সাঁটিয়ে গণসংযোগ চালাচ্ছেন।

আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের স্থানীয় নেতাকর্মী সমর্থকরা জানিয়েছেন, একেএম রহমতুল্লাহকে মনোনয়ন দেওয়া হলে আসনটি ধরে রাখা সহজ হবে। কিন্তু তার পরিবর্তে ছেলে হেদায়েত উল্লাহ রণ বা অন্য কাউকে দিলে আসনটি ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। তবে বিএনপি নির্বাচনে না এলে আওয়ামী লীগ থেকে যাকে মানোয়ন দেওয়া হবে তিনিই বিপুল ভোটে নির্বাচিত হবেন। কারণ, এলাকায় আওয়ামী লীগের বিশাল ভোট ব্যাংক রয়েছে। 

রাজপথের বিরোধী দল বিএনপি এখনো বলছে আওয়ামী লীগের অধীনে তারা নির্বাচনে যাবে না। তবে তাদের নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি মেনে নিলে তারা নির্বাচনে যাবে। এদিকে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে রাজপথে ধারাবাহিক আন্দোলন চালিয়ে গেলেও ভেতরে ভেতরে নির্বাচনের প্রস্তুতিও নিচ্ছে দলটি। তাই শেষ পর্যন্ত বিএনপি নির্বাচনেও যেতেও পারে। এরই অংশ হিসেবে ঢাকা-১১ আসনের স্থানীয় নেতাকর্মীরা চুপে চুপে নির্বাচনী প্রচার চালাচ্ছে। দেড় দশক পর এবার তারা আসনটি ফিরে পেতে চায়।

আসনে এবার বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন ঢাকা মহানগর বিএনপির সাবেক যুগ্ম সম্পাদক তিনবারের নির্বাচিত ওয়ার্ড কাউন্সিলর এমএ কাইয়ুম। দলের স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকর্মীরা জানিয়েছেন, মামলার কারণে তিনি এখন বিদেশে অবস্থান করছেন, তবে শীঘ্রই দেশে ফিরে আসবেন। তার অনুপস্থিতিতে স্থানীয় নেতাকর্মীরা তার পক্ষে কাজ করছেন। তবে মামলার কারণে এমএ কাইয়ুম নির্বাচন করতে না পারলে তার স্ত্রী শামীম আরা বেগম ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করবেন। ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও  শামীম আরা বেগম ঢাকা-১১ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন। ছাড়া সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আপাতত বিএনপির আর তেমন কারও নাম শোনা যায় না বলে এলাকাবাসী জানিয়েছেন।

জাতীয় পার্টি সূত্রে জানা যায়, ঢাকা-১১ আসন থেকে এবার দলীয় মনোনয়ন পেতে চান আলাউদ্দিন আহমেদ। তবে এলাকায় খোঁজ নিয়ে সম্ভাব্য প্রার্থীর পক্ষে কোনো ধরনের নির্বাচনী প্রচারের তথ্য পাওয়া যায়নি।

ঢাকা-১১ জাতীয় সংসদের ১৮৪ নং আসন। ঢাকা মহানগরের বাড্ডা থানা ভাটারা থানাসাঁতারকুল ইউনিয়ন রামপুরা থানা এলাকাভুক্ত ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২১, ২২ ২৩ নং ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত। এই এলাকা থেকে ১৯৭৩ সালের প্রথম নির্বাচনে শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, ১৯৭৯ সালে দ্বিতীয় নির্বাচনে বিএনপির এম হামিদুল্লাহ খান, ১৯৮৬         সালে জাতীয় পার্টির একেএম রহমতুল্লাহ, ১৯৮৮ সালে জাতীয় পার্টির মোহাম্মদ সিরাজ উদ্দিন আহমেদ, ১৯৯১ সালে বিএনপির খালেদা জিয়া, খালেদা জিয়া আসনটি ছেড়ে দেওয়ার পর উপনির্বাচনে বিএনপির মোহাম্মদ কামরুল ইসলাম, ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের একেএম রহমতুল্লাহ, ২০০১ সালে বিএনপির মোহাম্মদ কামরুল ইসলাম এবং ২০০৮ সাল থেকে পরপর তিনবার আওয়ামী লীগের একেএম রহমতুল্লাহ নির্বাচিত হন।

বনশ্রী আবাসিক এলাকার বাসিন্দা দিলারা বেগম শিক্ষকতা পেশায় ৩০ বছরেরও বেশি সময় অতিক্রম করেছেন। ঢাকা-১১ সংসদীয় আসনের অনেক কিছুই তার জানা। তিনি বলেন, গত দেড় দশকে শিক্ষা-সংস্কৃতিসহ এলাকার অনেক কিছুরই উন্নয়ন হয়েছে। তবে এলাকার কোনো কোনো রাস্তার অবস্থা ভালো না। কোনো স্থানে ভারি বৃষ্টি হলে পানি জমে যায়। যানজটও এলাকার একটি সমস্যা। কারণে মানুষের মধ্যে কিছুটা ক্ষোভ রয়েছে। আর জিনিসপত্রের দাম যেভাবে বেড়েছে, তাতে স্বল্পআয়ের মানুষের বেঁচে থাকাই বড় চ্যালেঞ্জ। বর্তমান সরকার বড় বড় অনেক প্রকল্প সফলভাবে শেষ করলেও দ্রব্যমূল্য যানজট দূর করতে না পারায় সফলতা অনেকাংশে ম্লান হয়ে যাচ্ছে। তার পরও দেশের উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষায় এবারও মানুষ স্বাধীনতার স্বপক্ষ শক্তিকে ভোট দেবে বলে মনে হচ্ছে। তবে যেভাবে বিদেশিদের আনাগোনা শুরু হয়েছে, তাতে ভোটের আগে সার্বিক পরিবেশ কোন দিকে মোড় নেয় সেটা দেখার বিষয়। তবে সচেতন দেশবাসীর আশা অগ্রগতির স্বার্থে সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সঠিক রায় দিতে হবে। 

পূর্ব রামপুরার কামাল সরকার জানান, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে এসেছে। সম্ভাব্য প্রার্থীদের আনাগোনা শুরু হয়ে গেছে। আমরাও ভোট দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি। ভাল প্রার্থী হতে হলে আগে দেশপ্রেমিক হতে হবে। কিন্তু আমরা কী দেখতে পাই? নির্বাচন এলে প্রচুর অর্থ ব্যয় করে ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বিভিন্ন কৌশলে নির্বাচন করে কেউ কেউ জিতে যান। কিন্তু নির্বাচনের পর এলাকার মানুষের খোঁজখবর না রেখে কিভাবে অর্থ উপার্জন করা যায় তা নিয়ে সংসদ সদস্যরা ব্যস্ত থাকেন। তাই এবার ভোট দেবো চিন্তাভাবনা করে।

বাড্ডার শওকত হোসেন জানান, এলাকার বেশিরভাগ মানুষ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে রাজনীতি করে এমন লোকদের বেশি পছন্দ করে। তাই প্রার্থী মুক্তিযোদ্ধা কি না বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়ে থাকে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ক্ষেত্রে সবার আগে দেখা হবে প্রার্থী মুক্তিযোদ্ধা কি না। তার পর দেখা হবে সার্বিক বিবেচনায় তিনি যোগ্য কি না। ছাড়া এলাকার উন্নয়নে তিনি কাজ করতে পারবেন কি না। এসব কিছু বিবেচনা করে ভোটাররা ঠিক করবেন কাকে ভোট দেওয়া যায়। সম্ভাব্য বেশ জন প্রার্থীর গণসংযোগ শুরু হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, প্রতিটি রোডে পোস্টার লাগিয়ে তারা তাদের প্রার্থিতা সম্পর্কে জানান দিয়েছেন। এলাকার মানুষও খোঁজখবর রাখছেন কারা এবার সংসদ সদস্য পদে নির্বাচন করবেন।

নতুন বাজার এলাকার একজন স্থায়ী বাসিন্দা জানান, এই এলাকার ভোটারদের কিছু পছন্দের বিষয় আছে। প্রথমত, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যোগ্যতার মাপকাঠি হিসেবে এলাকার স্থায়ী বান্দিা হতে হবে। এর পর পছন্দের দলের প্রার্থী হতে হবে। তারপর বিবেচনা করা হবে কোন প্রার্থী অতীতে এলাকার জন্য কি করেছেন। সবকিছুর হিসোব মিলিয়ে এলাকার মানুষ ভোট দেবে। তবে ভোটের এখনো তিন মাস বাকি থাকায় এখনো সেভাবে জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে আলাপ-আলোচনা শুরু হয়নি। তবে সম্ভাব্য প্রার্থীরা নিজ নিজ কৌশলে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

ভাটারার সফিকুল ইসলাম বলেন, এলাকা আওয়ামী লীগের ঘাটি। তাই আওয়ামী লীগ থেকে যাকে মনোনয়ন দেওয়া হবে তার পক্ষেই বেশিরভাগ মানুষ কাজ করবে। তবে যারা অন্য এলাকা থেকে এসে এখানে বাড়িঘর করেছেন এমন কিছু লোকজন বিএনপির পক্ষে কাজ করবে। এই দুই দলের বাইরে এলাকায় তেমন কোনো সম্ভাব্য প্রার্থীর কথা শোনা যাচ্ছে না।

আফতাব নগরের সালমা বেগম জানান, সুষ্ঠু নির্বাচন হলে এলাকায় আওয়ামী লীগ বিএনপির মধ্যে কঠিন লড়াই হবে। কারণ, দুই দলেরই ভালো ভোট ব্যাংক আছে। প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের কর্মতৎপরতা বেশি দেখা গেলেও বিএনপির নিরব সমর্থক রয়েছে। মামলাসহ বিভিন্ন কারণে বিএনপি সমর্থকরা প্রকাশ্যে তেমন রাজনৈতিক কার্যক্রমে লিপ্ত হচ্ছে না। তবে রাজনীতি করে না এমন অনেক ভোটারও আছেন। শেষ পর্যন্ত তাদের যারা কাছে টানতে পারবেন তারাই সফল হবেন।