(গত শুক্রবারের পর)
এরপর আমরা গেলাম ‘পপুলার ডায়াগনস্টিকে।’ মা বলল ‘খুব তাড়াতাড়িই ভেইন খুঁজে পেল এখানে। আমেরিকায় আমাদের রগ-ই খুঁজে পায় না।’ কামাল ভাই নিশ্চিন্ত করলেন, ‘এ দেশের লোক এ দেশের মানুষদের ব্লাড সার্কুলার খুঁজে পায়।’ প্রথমে বুঝতে পারিনি। পরে বুঝলাম উনি ব্লাড সার্কুলেশনের কথা বলছেন। তারপর ঢাকার জ্যামে রাস্তায় সার্কুলারভাবে ঘুরে আমরা বাড়ি ফিরে এলাম।
কিন্তু বাড়ি ফিরে দেখি মহাকাণ্ড। শেফালির হৃৎপিণ্ড ওর হাতের ওপর লাফাচ্ছে। প্রেসার কুকারে ভাত বসিয়েছে ও। ভীষণ শব্দ হচ্ছে আর ভাত গলে পড়ছে চারদিকে। আমরা সবাই জড়ো হয়েছি- মা, আমি, পিয়াশ মেসো। টোড়ি মাসি বাড়ি ছিল না। আমি শেফালিকে বললাম, ‘তাড়াতাড়ি চুলা বন্ধ করে রান্নাঘরের বাইরে চলে আস। প্রেসার কুকার বার্স্ট করতে পারে যে কোনো সময়।’ আমরা সবাই রান্নাঘরের বাইরে এসে রান্নাঘরের দরজা বন্ধ করে দাঁড়ালাম। বাকি দিন কী কী দুর্ঘটনা যে ঘটতে পারত তা চিন্তা করেই কাটল।
কিন্তু শেফালি দেখি এক হাতের ভেতর আর এক হাত নিয়ে কিছু ঝেরে ফেলবার মতো করছে। মৃত্যুভয় ঝেরে ফেলবার ভঙ্গি এটা? শেফালি দীক্ষা নিয়েছে।
সকাল হয়েছে। আমি তখনো ঘুমাচ্ছি। আধো ঘুমে শুনতে পেলাম কামাল ভাই আর টোড়ি মাসির কথোপকথন। ‘মাত্র ষাট টাকা বইল্যা দুই কেজি ঝিংগা আনছি’, কামাল ভাই বললেন। টোড়ি মাসির আর্তনাদ, ‘এখন আমি কীভাবে এত ঝিংগা সামাল দেব? খালি মাছের ঝোলে একটু ঝিংগা দিতে চেয়েছিলাম। আমাকে যদি কেউ এক কোটি টাকা দিয়ে এই ঝিংগা দেয়, আমি তো নেব না।’ রান্না হলো ঝিংগা। টোড়িমাসি বলল, ‘এ ঝিংগা তো গা ঘষার খোসার মতো।’ কামাল ভাই তখন দুই হাত দিয়ে কান মলবার মতো ভঙ্গি করে বললেন, ‘আর ঝিংগা আনমু না। এই কান মললাম। এখন থেকে লাগলে স্মল স্মল ঝিংগা আনমু।’ টোড়ি মাসি বলল, ‘কান মলবার তো কোনো প্রয়োজন দেখি না। খালি সস্তা দেখলেই জিনিসপত্র এনে হাজির করো না।’ কথায় যুক্তি আছে বলে আমি বললাম, ‘কামাল ভাই, আপনি ফেঁসে গেছেন।’

এরপর শুরু হলো খবরের কাগজে নাম খোঁজা। খবরের কাগজে নাকি টোড়ি মাসির সাক্ষাৎকার উঠেছে। ‘অধিকার ভোগে পুরুষের অনেক পেছনে নারীরা।’ বিনয় দেখাতে সে খবর টোড়ি মাসি বাড়ির কাউকে বলে নি। অবশেষে আমাদের কাছ থেকে কোনো রকম সাড়া শব্দ না পেয়ে টোড়ি মাসি নিজেই বলল নাম ওঠবার কথা। আসলে আমরা খবরের কাগজ পড়ি কী পড়ি না তা স্পষ্টভাবে জানা যায় না।। সপ্তাহের প্রধান রান্নাটা টোড়ি মাসি করে, শেফালি কেটে বেছে দেয়। তারপর বাটিতে বাটিতে করে সে রান্নার বাটি খবরের কাগজের ওপর রাখা হয়। এরপর ঠাণ্ডা হলে ফ্রিজে ঢোকানো হয় সেই বাটিগুলো কয়েকদিনের মতো হিসাব করে। আমি সেইসব রান্নার বাটির নিচে খবরের কাগজের পাতায় টোড়ি মাসির নাম খুঁজতে থাকলাম...।
আর একটা বিয়ের নিমন্ত্রণ পেয়েছি। বিয়ের লগ্নের দিনগুলো মনে হয় শেষ হতে চলেছে। ফলে গোধূলিলগ্নে বিয়ে হবে বলে স্থির হয়েছে। যে কোনোদিনই নাকি গোধূলিলগ্নে বিয়ে হয়। আমি ভাবলাম এই লগ্নেই সব বিয়ে হওয়া উচিত। তার একটা কারণ হচ্ছে গোধূলিলগ্ন শব্দটা আমার খুব প্রিয়। গোধূলিলগ্নের আলো কন্যার চোখে এসে পড়বে। সে আলোয় মেয়েটি দেখবে সামনের দিনগুলোর ছবি। আলো, শুধু আলো...
এ বিয়ের বর সুইডেনে থাকে। ছেলের নানা খোঁজখবর নেওয়া হয়েছে। যদিও টোড়ি মাসি বলেছে, ‘ম্যারিটাল স্ট্যাটাসের খোঁজ নে ছেলের।’ দুই বিয়ের সম্ভাবনার কথা ভেবে আমার খুব হাসি পেল।
আমি আজও রমনা পার্কে হাঁটতে যাইনি। আসলে নিজের স্বাস্থ্যের দিকে নজর দেওয়া আমার জীবনের নানা কাজের লিস্টে একদম শেষ লাইনে পড়ে। রমনায় হাঁটতে যেতে একদমই ভালো লাগে না আমার। শুধু যাই কুকুরছানাদের দেখতে। তবে শেফালি আর পিয়াশ মেসোর সঙ্গে ছাদে হাঁটতে খুবই ভালো লাগে। জীবনের নানা গল্প করি আমরা। হাঁটার কথা উঠতেই তাই ওদের আমি বললাম, ‘আমার হাড্ডিতে ব্যথা।’ রূপকথার হাড় মুড়মুড়ি রোগ হয়েছে আমার! নিজের শরীরের বেদনার কথা বলতেই মা আর টোড়ি মাসির জীবনের প্রেক্ষাপট এক নিমেষে পাল্টে গেল। এ বাড়িতে পরগাছা স্বর্ণলতার মতো সোনালি জরি দিয়ে পেঁচিয়ে আছি আমি। কিন্তু কোনো কষ্ট হচ্ছে জানলেই মা, টোড়ি মাসি, পিয়াশ মেসো, শেফালি আর কামাল ভাই হাতের সব কাজ ফেলে আমার কী হয়েছে, কেন হয়েছে সে চিন্তায় অস্থির হয়ে পড়ে। মা মাঝরাতে ব্যথা কমানোর জন্য নাপা এক্সটেন্ড দিল। টোড়ি মাসি বলল, ‘ফ্লেক্সি খেতে হবে।’ আমাদের বাসায় ডাক্তারের অভাব নেই। কারো শারীরিক কোনো সমস্যা হলে সঙ্গেসঙ্গে সবাই প্রেসক্রিপশন দিয়ে ফেলে। খালি সার্জারিটা করতে এখনো সাহস পায় না। এখনো মনে পড়ে আমাদের সারা ছেলেবেলা কীভাবে মা’র নির্দেশে ‘ফ্ল্যাজিল’ খেয়ে দিন কেটেছে।
কালকের টেস্টের রিপোর্ট আজ আনতে যাবে কামাল ভাই। উনি বললেন, ‘আমি হাঁইটাই যামু রিপোর্ট আনতে। এক্সারসাইজ হইব।’ টোড়ি মাসি বলল, ‘না, তুমি হেঁটে যেতে চাও, যাও। কিন্তু ফিরবার পথে রিক্সা নিয়ে আসবা। তোমার শরীর ভালো না।’
কয়দিন রমনায় যাওয়া হয়নি। আজ রমনায় কুসুম গাছ আর অশোক গাছ দেখলাম। ফুলে ভরে আছে। অশোক গাছের ফুল অনেকটা রংগনের মতো। বিস্ময়করভাবে অশোক ফুল গাছের শরীর থেকেও ফুটে আছে। জীবন সুন্দর!
কুকুরের বাচ্চাগুলোও দেখলাম অনেক বড় হয়েছে। হঠাৎ দেখি একটা ছেলে এসে সুতা দিয়ে একটা নীল রঙের বেলুন একটা বাচ্চা কুকুরের পায়ে বেঁধে দিল। আমি বললাম, ‘এক্ষুণি খোল। তোমার পায়ে বেলুন বাঁধলে তোমার কেমন লাগবে?’ বেলুনটা খুলল বকাবকিতে, কিন্তু এবার বাচ্চাটার গা বালুতে ঢেকে দিল। ‘স্নান দিতে পারবা এরপর বালু সরিয়ে?’, ভীষণ রাগ হলো আমার। কাউকে কষ্ট দিয়ে এই হা হা হি হি-র পৃথিবী মানুষের পৃথিবী হতে পারে না।
প্রথম রোজার দিন। রমনাতে লোক প্রায় নেই বললেই চলে। যদিও আমার চিন্তা রমনার ঝিলের ধারের পাঁচটি কুকুরছানা আর তাদের মা-বাবাকে নিয়ে। আমিও আজ রুটি আনতে ভুলে গেছি। যখন ওদের খাবার দিতাম, সামনের দুটো পা দিয়ে আমার দেওয়া পাউরুটি ধরে ওরা কী আনন্দে খেত। মনটা ভরে যেত।
তবে চিন্তা নেই। রোজার মাসে লোক কম হলেও অনেক মানুষ নিয়মিতভাবেই এই পথের কুকুরদের খাবার দেয়। একজন ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা হলো। উনি বললেন ওনার বাড়ির কাছে তিনটা হোটেল আছে। উনি সেখান থেকে হাড্ডি-গুড্ডি আর মাছের কাঁটা এনে কুকুরদের দেন। আমার ধারণা ছিল আমিই বুঝি শুধু কুকুর ভালোবাসি! ওনাকে দেখে বড় শান্তি পেলাম।
আর এই তো সেদিন। রমনার পথ-কুকুরদের আমার সামান্য শুকনো পাউরুটি দিতে গিয়ে পরিচয় হলো পথকুকুরপ্রেমী নেলী’র সঙ্গে। ও প্রতিদিন ভোরবেলা উঠে কুকুরদের জন্য খিচুড়ি আর মাংস রান্না করে নিয়ে আসে। ওদের ভালোবাসে সন্তান স্নেহে।
পাঁচটা কুকুরছানাকে পাহারা দেওয়ার জন্য ওদের দলে আছে একটা মা কুকুর আর একটা বাবা কুকুর। মা কুকুর আর বাবা কুকুর সারাদিন বাচ্চাদের পাহারা দিয়ে রাখে। এই দল একটা নির্দিষ্ট জায়গায় থাকে। এরা খুবই টেরিটোরিয়াল।
তাকিয়ে দেখি কুকুরগুলো নেলী’র আনা খিচুড়ি থেকে মাংস বেছে বেছে খেয়ে ফেলেছে। খিচুড়ি পড়ে আছে। আমরা দু’জন খুব হাসলাম কুকুরদের কান্ড দেখে।
নেলী জানাল, ‘একটা কুকুরের বাচ্চা কেউ নিয়ে গেছে হয়তো পুষবে বলে। কিন্তু আর একটা বাচ্চাকে কেউ মেরে ফেলেছে’। ও রমনা পার্কের পাহারা দেওয়া আনসারদের জিজ্ঞাসা করে এটা জেনেছে।
মানুষ বিচিত্র প্রাণী। কেউ পথকুকুরদের মেরে ফেলে, আর কেউ পথকুকুরদের জন্য রান্না করে খাবার নিয়ে আসে!
গাড়িতে ফিরবার পথে কামালভাই জানালেন তিনি নাকি লোকজনকে বলেন, ‘আমি ম্যাডামের ড্রাইভার কাম পি.এস.।’ ভাগ্যিস টোড়ি মাসি ছিল না গাড়িতে। আমি বললাম, ‘কখন আবার পি.এস.হলেন?’ উনি বলেন, ‘বলি আর কী লোকজনকে! আমি তো পি.এস.-এর সবকাজই করি।’ এতদিনে বুঝতে পারলাম কামাল ভাইয়ের এত স্যুট, কোট পরে আসা কেন!
কামাল ভাইকে জানালাম পি.এস.কাকে বলে সে কথা। উনি বলেন কী, আমি তো বলি আমি গানম্যানও।
শুনে তো হাসতে হাসতে মরি। ‘গানম্যান? আপনার বন্দুক কই?’
কামাল ভাই বললেন, ‘গানম্যান হইতে বন্দুক বা পিস্তল লাগে না।’
‘বলেন কী?’
‘না না, আমার এইসব লাগত না, আমি থাকলেই হইত।’ কামাল ভাই জানালেন।
আমার খুবই হাসি পেল। এসব কান্ড সার্কাসের একেবারে!
আর কামালভাই কার্টুন ছাড়া আমাদের একজন শেফালিও তো আছে। কাকে ছেড়ে কাকে দেখি? আমার আর একটা স্মার্ট ফোন আছে। নতুন। আর বেশ বড়। শেফালি ওর মেয়ে আর মা’কে ভালোভাবে দেখতে পারবে। কিন্তু মনে নেই আমেরিকা থেকে আসবার সময় কোথায় যে তাকে গুঁজেছি। ভাবলাম খুঁজে দেখি। খুঁজে পেলে ফোনটা ওকে দিয়ে দেব। শেফালিকে নিয়ে আমার দুটো সুটকেস মা’র আলমারির উপর থেকে নামালাম। আর আমার পার্স। শেফালিকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘সুটকেস আর পার্স ছাড়া আমার আর কি কিছু আছে?’ শেফালি বলে কী, ‘ক্যান, আমি?’ দু’চোখ ভাসিয়ে জল এনে দিতে এইসব মানুষ সেরা। একেবারে ট্রেনিংপ্রাপ্ত।
এবার শিবরাত্রি আর নারী দিবস একসাথে পড়েছে। রোশন ভাই তার চেনা নারীদের নারী দিবসে ফুল উপহার দেন। সাথে খাওয়া-দাওয়াও আছে। তেহারি, ভেজিটেবল আর মিষ্টি। আমি এ ধরণের খাওয়া-দাওয়া খুবই পছন্দ করি। টোড়ি মাসি বলে যে রোশন ভাই রাশিয়াতে পড়াশোনা করেছেন। তাই যত্ন করে নারী দিবস পালন করেন।
এদিকে শেফালি শিবরাত্রি শুনেই বলে যে সে উপাস রাখবে। শিবরাত্রির উপাস ভীষণ কঠিন। তবে টোড়িমাসির বাসায় আগে মালতী নামের যে মেয়েটি রান্না করত, শিব রাত্রি নিয়ে তার কথাও আমি শুনেছিলাম। টোড়ি মাসি মালতীকে বলেছিল, ‘শিবরাত্রির উপাস অবিবাহিত মেয়েরা রাখে শিবের মতো বর পেতে। তুমি কী জন্য রাখবা? তুমি বরং সকালে ফলমূল খাও; দুপুরে রুটি-নিরামিষ তরকারি; আর রাতে আলুসিদ্ধ ভাত।’ মালতী রাজি হয়েছিল কিনা তা আমি ঠিক জানি না।
মালতী বিষয়েও অনেক গল্প আছে। মালতীর আসল নাম আহ্লাদি।
মা-বাবার অতি আদরের মেয়ে আহ্লাদি। কিন্তু মানুষের বাসায় রান্না করতে এসে তা কি আর বলা যায়? তাই ও নিজের নাম নিজেই ঝেড়ে ফেলেছে। যখনই এই বাড়িতে প্রথম এসেছে, সাথে সাথে ও নিজের নাম নিয়েছে মালতী।
আসলে মালতীর জীবন ঠিক কোনো জীবন নয়, মালতীর জীবন জীবনের ভগ্নাংশ! আমি শুনেছিলাম একদিন মেলায় শখ করে কাচের চুড়ি কিনেছিল মালতী। ওর স্বামী ওকে এমন মেরেছিল যে সেই চুড়ি টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে হাতে ঢুকে গিয়েছিল। একটা একটা করে সেই চুড়ির টুকরো বের করেছিল ডাক্তার। মালতীর বর ওকে ছেড়ে চলে গেছে।
অল্পবয়সী মালতী আমাকে বলেছিল, ‘জীবনে একটা ভুলই করছি। সেইটা হইল বিয়া করছি। আমার আর বিয়ার কথা ভাইব্যা কাজ নাই। একবার বিয়া করছি। সেটাই অনেক হইছে। আমার বর গাঁজা খাইত, জুয়া খেলত। অন্য মেয়েদের দিকেও নজর। এখন আমি নিজে রোজগার করতাছি, এতেই আমি খুশি।’
টোড়ি মাসির বাসার মালতীও অনেক যত্ন নিয়ে শিবরাত্রি করত।
সারা জীবন শিবরাত্রি করেও কিছু না পাওয়া নারী দিবসের ‘নারী’ শব্দটি শেফালি আর মালতীদেরই মানায়।
(ধারাবাহিক)
লেখক : সাহিত্যিক, সাবেক সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং স্পেশালিস্ট (যুক্তরাষ্ট্র)
প্যানেল/মো.








