ছবি: সংগৃহীত।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের বাঁক বদলের প্রতিটি অধ্যায়ে এমন কিছু প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিত্বের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়, যারা ক্ষমতার মোহকে তুচ্ছ জ্ঞান করে আজীবন লড়াই করেছেন সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার আর ন্যায়বিচারের পক্ষে। বর্তমান তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত জহির উদ্দিন স্বপন তেমনই এক আপোষহীন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, যার জীবন আবর্তিত হয়েছে ছাত্র রাজনীতি থেকে শুরু করে জাতীয় রাজনীতির নীতিনির্ধারণী পর্যায় পর্যন্ত। আশির দশকে যখন এ দেশে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে, তখন থেকেই তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞার সার্থক প্রকাশ ঘটে। মেধাবী ছাত্র হিসেবে তার পরিচিতি যতটা উজ্জ্বল ছিল, তার চেয়েও প্রখর ছিল একজন তুখোড় বক্তা এবং দক্ষ সংগঠক হিসেবে তার চারিত্রিক দৃঢ়তা। রাজপথের উত্তাল লড়াই থেকে শুরু করে আইনসভার উচ্চকক্ষ পর্যন্ত তার প্রতিটি পদচারণা ছিল অত্যন্ত যৌক্তিক এবং দেশপ্রেমের চেতনায় উজ্জীবিত।
জহির উদ্দিন স্বপনের রাজনৈতিক জীবনের ভিত্তি রচিত হয়েছিল ছাত্র আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোতে।
বরিশালের গৌরনদী উপজেলার সরিকল গ্রামে জন্মগ্রহণ করা জহির উদ্দিন স্বপন ১৯৭৫ সালে খুলনার সেন্ট জোসেফ্স উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। তিনি সরকারি ব্রজলাল কলেজের ভিপি ছিলেন এবং পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা জহির উদ্দিন স্বপন নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে ‘সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের’ অন্যতম শীর্ষ নেতা হিসেবে রাজপথে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তৎকালীন বাম ঘরানার ছাত্র রাজনীতি থেকে উঠে আসা এই নেতা পরবর্তীতে ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে (বিএনপি) যোগ দেন। তার রাজনৈতিক জীবনের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো তাত্ত্বিক গভীরতা ও মাঠপর্যায়ের সাংগঠনিক দক্ষতার সমন্বয়। তিনি বিএনপি মিডিয়া সেলের প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং দলের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক হিসেবে দীর্ঘ সময় কাজ করেছেন। বরিশাল-১ (গৌরনদী-আগৈলঝাড়া) আসন থেকে তিনি ১৯৯৬ সালে প্রথমবার এবং ২০০১ সালে দ্বিতীয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সম্প্রতি ২০২৬ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি একই আসন থেকে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়ে তৃতীয়বারের মতো সংসদে প্রতিনিধিত্ব করছেন।
বিগত প্রায় দুই দশকের রাজনৈতিক পথপরিক্রমায় জহির উদ্দিন স্বপনকে চরম বৈরী পরিবেশের মুখোমুখি হতে হয়েছে। বিশেষ করে এক এগারোর পরবর্তী সময়ে এবং বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে তাকে নজিরবিহীন রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হতে হয়েছে। বিরোধী দলের একজন সক্রিয় এবং বুদ্ধিদীপ্ত কণ্ঠস্বর হওয়ার কারণে তাকে বারবার কারাবরণ করতে হয়েছে। রাজনৈতিক মিথ্যা মামলায় তাকে হয়রানি করা হয়েছে এবং শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। কিন্তু এই চরম প্রতিকূলতা এবং রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন তাকে তার রাজনৈতিক আদর্শ থেকে তিল পরিমাণ বিচ্যুত করতে পারেনি। বরং প্রতিটি আঘাত তাকে আরও বেশি পোক্ত ও পরিণত করে গড়ে তুলেছে। তিনি এমন একজন বিরল রাজনীতিবিদ যিনি বিশ্বাস করেন যে রাজনীতি মানে কেবল ক্ষমতার ভোগদখল নয়, বরং এটি ত্যাগের এক সুমহান ব্রত।
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়ার পর জহির উদ্দিন স্বপন যে ইতিবাচক পরিবর্তনের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন, তা মূলত তার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দর্শনেরই এক স্বচ্ছ প্রতিফলন। তিনি দায়িত্ব নিয়েই স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, সরকারের মূল লক্ষ্য হলো জনগণকে শাসন করা নয়, বরং তাদের ক্ষমতায়ন করা। তিনি বিশ্বাস করেন, একটি দেশের গণতন্ত্র তখনই প্রকৃত অর্থে সচল থাকে যখন তথ্যের অবাধ ও নিরপেক্ষ প্রবাহ নিশ্চিত হয়। রাষ্ট্রীয় সকল গণমাধ্যমকে কোনো নির্দিষ্ট দলের প্রভাবমুক্ত করে জনগণের অকৃত্রিম মুখপত্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা তিনি গ্রহণ করেছেন। তার সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডে দেখা গেছে যে, তিনি গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছেন। তিনি মনে করেন, গণমাধ্যম যত বেশি স্বাধীন হবে, রাষ্ট্র তত বেশি জবাবদিহিতার আওতায় আসবে।
তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে তার মন্ত্রণালয়ের সামনে চ্যালেঞ্জও কম নয়। বিশেষ করে বিগত সরকারগুলোর রেখে যাওয়া পুরনো আইনি কাঠামো এবং গণমাধ্যমের দলীয়করণের সংস্কৃতি ভেঙে ফেলা একটি বিশাল কাজ। মন্ত্রী নিজেই স্বীকার করেছেন যে, প্রচলিত গণমাধ্যম থেকে ‘নিউ মিডিয়া’ বা ডিজিটাল যুগে প্রবেশের জন্য একটি কাঠামোগত রূপান্তর প্রক্রিয়া প্রয়োজন। তিনি ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের মতো বিতর্কিত আইনের সংস্কার এবং গণমাধ্যমের জন্য একটি ভয়হীন পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তার মতে, সাংবাদিকদের জন্য একটি আধুনিক ‘মিডিয়া ইকোসিস্টেম’ গড়ে তোলা জরুরি যেখানে সংবাদপত্র শিল্পের মালিকদের পাশাপাশি সংবাদকর্মীদেরও ন্যায্য মজুরি ও সম্মানজনক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত হবে।
জহির উদ্দিন স্বপন কেবল দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে ভূমিকা রেখেছেন। তিনি দুইবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে অংশ নিয়েছেন। এছাড়া ‘পার্লামেন্টারিয়ানস ফর গ্লোবাল অ্যাকশন’ (পিজিএ)-এর এশিয়া অঞ্চলের সহসভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে মানবাধিকার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় বৈশ্বিক পর্যায়ে কাজ করেছেন। তার এই বিশাল অভিজ্ঞতা তাকে বর্তমানের সংকটময় মুহূর্তে একটি ভারসাম্যপূর্ণ নেতৃত্ব দিতে সাহায্য করছে। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব এবং সাংবাদিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দের সাথে সাম্প্রতিক মতবিনিময় সভায় তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, সরকার সাংবাদিকদের সাথে পরামর্শ করেই গণমাধ্যম খাতের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদী পথনকশা প্রণয়ন করতে চায়।
ভবিষ্যতে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সাফল্যের জন্য তাকে তথ্যের সঠিকতা ও বস্তুনিষ্ঠতা বজায় রাখার দিকে কড়া নজর দিতে হবে। বর্তমান ডিজিটাল যুগে ভুয়া সংবাদ এবং গুজব সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি। এটি প্রতিরোধের জন্য প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরির ক্ষেত্রে তার নেতৃত্ব এখন অপরিহার্য। পাশাপাশি সংবাদপত্র শিল্পে যে অস্থিরতা বিরাজ করছে, তা দূর করতে মালিক ও সাংবাদিক উভয় পক্ষের স্বার্থ রক্ষা হয় এমন নীতিমালা প্রণয়ন করা জরুরি। তিনি জানিয়েছেন যে, তথ্যের সংজ্ঞা আধুনিক বিশ্বে পরিবর্তিত হয়েছে এবং একে কেবল প্রচারের মাধ্যম হিসেবে না দেখে একটি শক্তিশালী সামাজিক উপাদান হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
দেশের জন্য জহির উদ্দিন স্বপনের যে নিরন্তর ত্যাগের ইতিহাস, তা তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক কর্মীদের জন্য এক বিশাল অনুপ্রেরণা। তার রাজনৈতিক ‘ম্যাচিউরিটি’ এবং শান্ত কিন্তু দৃঢ় আচরণ তাকে একজন সফল রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। আজ যখন চারদিকে রাষ্ট্র সংস্কারের কথা জোরেশোরে উচ্চারিত হচ্ছে, তখন তথ্য মন্ত্রণালয়ের মতো সংবেদনশীল একটি বিভাগে তার মতো একজন বিদগ্ধ মানুষের উপস্থিতি সাধারণ মানুষের মনে ব্যাপক প্রত্যাশা তৈরি করেছে। তিনি দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় জানেন কীভাবে জনগণের পুঞ্জীভূত দাবিগুলোকে সুনির্দিষ্ট নীতিতে রূপান্তর করতে হয়। অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা তাকে বর্তমানে সাধারণ মানুষের মনের কথা বুঝতে সাহায্য করছে।
জহির উদ্দিন স্বপন প্রমাণ করেছেন যে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা নয়, বরং জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়ে সব পক্ষকে সাথে নিয়ে একটি সুস্থ ও রুচিশীল তথ্য সংস্কৃতি গড়ে তোলা সম্ভব। তার আগামী দিনের পরিকল্পনাগুলো যদি সততার সাথে বাস্তবায়িত হয়, তবে বাংলাদেশের গণমাধ্যম জগৎ আমূল বদলে যাবে এবং তা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উন্নীত হবে। জহির উদ্দিন স্বপন কেবল একজন মন্ত্রী নন, তিনি একটি পরিবর্তনের নাম, যিনি অন্ধকারের দেয়াল ভেঙে তথ্যের আলো দিয়ে সমাজকে আলোকিত করতে বদ্ধপরিকর। তার এই চলার পথ যেন বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়, সেটাই এখন জনগণের প্রার্থনা।
লেখক:
রাজু আলীম
কবি, সাংবাদিক, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব
এম.কে








