ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ১২ মার্চ ২০২৬, ২৮ ফাল্গুন ১৪৩২

জঙ্গল সলিমপুরে অভিযান

প্রকাশিত: ১৯:২৯, ১২ মার্চ ২০২৬

জঙ্গল সলিমপুরে অভিযান

দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম মহানগরীর মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে যৌথ বাহিনীর সাম্প্রতিক অভিযান দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও রাষ্ট্রের কর্তৃত্বের প্রশ্নে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। প্রায় চার দশক ধরে একটি এলাকা কার্যত সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রণে থাকা নিঃসন্দেহে রাষ্ট্রের জন্য লজ্জাজনক। সেখানে প্রবেশ করতে সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও অনুমতি নিতে হতো। এ ধরনের পরিস্থিতি কোনোভাবেই একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্য সম্মানজনক হতে পারে না। ফলে জঙ্গল সলিমপুরে পরিচালিত এই সাঁড়াশি অভিযান সরকারের সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। প্রশ্ন হলো, এই সাঁড়াশি অভিযান চালাতে চার দশক অপেক্ষা করতে হলো কেন? কোন সুতোর টানে এত বছর ধরে চলতে পেরেছে সন্ত্রাসী, মাদকসেবীসহ ভূমিদস্যুদের অবৈধ কার্যক্রম? 
বিগত সময়ে যতগুলো রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় ছিল, তাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সমর্থনে এই সন্ত্রাসীরা নির্বিঘ্নে তাদের অপরাধ কার্যক্রম চালিয়েছে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী প্রায় দুই দশক ধরে জঙ্গল সলিমপুর সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য হয়ে উঠেছিল। পাহাড় কেটে, বন উজাড় করে এবং সরকারি জমি দখল করে সেখানে অবৈধ বসতি ও প্লট-বাণিজ্যের বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে, যার ক্রেতা স্বল্প আয়ের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক দলের পৃষ্ঠপোষকতা ও স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের সহায়তায় এই অপরাধ সাম্রাজ্য বিস্তার লাভ করেছে। ফলে রাষ্ট্রের আইন ও প্রশাসনিক কাঠামো সেখানে প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়া শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়; এটি দীর্ঘদিনের সরকারি উদাসীনতা এবং স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর দৌরাত্ম্যের ফল। দুর্বৃত্তরা সলিমপুরের পাহাড় ও বন ধ্বংস করে, কয়েক হাজার পরিবারের কাছে প্লট আকারে জমি বিক্রি করেছে। যার বাজারমূল্য প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। গত চার দশকে সেখানে বিপুলসংখ্যক মানুষের বসতি গড়ে উঠেছে। জমি কিনে সন্ত্রাসীদের কাছে এই পরিবারগুলো শুধু প্রতারিত হয়নি, তাদের জিম্মি করে রাখাও হয়েছিল। 
অভিযানে ব্যবহার করা হয়েছে হেলিকপ্টার, ড্রোন, সাঁজোয়া যান ও ডগ স্কোয়াড। এত বড় প্রস্তুতির পরও যদি চিহ্নিত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার করা না যায়, তবে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে অভিযানের পরিকল্পনা ও গোপনীয়তা নিয়ে। অভিযান শুরুর আগেই তথ্য ফাঁস হয়ে যাওয়ায় সন্ত্রাসীরা নিরাপদে পালিয়ে যায় এবং রাস্তায় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা অভিযানের তথ্য ফাঁস হওয়া মানে প্রশাসনের ভেতরেই কোথাও রয়েছে গুরুতর দুর্বলতা। যদি সত্যিই এমনটি ঘটে থাকে, তবে এ তথ্য কারা ফাঁস করল- সরকারকে খুঁজে বের করতে হবে। তবে শুধু অভিযান চালিয়ে অস্ত্র উদ্ধার করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো এই অপরাধ সাম্রাজ্যের মূল হোতাদের গ্রেপ্তার করা এবং তাদের পৃষ্ঠপোষকদের আইনের আওতায় আনা।

প্যানেল/মো.

×