মধ্যপ্রাচ্যের তপ্ত মরুর বুকে ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ও ইসরাইল-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সামরিক যে সংঘাতের স্ফুলিঙ্গ জ্বলে উঠেছে, মাত্র ১০ দিনের ব্যবধানে তা প্রলয়ঙ্করী দাবানলের মতো সমগ্র বিশ্ব অর্থনীতিকে এমন এক অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে, যার সরাসরি আঘাত এসে লেগেছে বাংলাদেশের সংকটগ্রস্ত অর্থনীতির ভঙ্গুর ও রুগ্ণ ব্যাংক খাতে। সামগ্রিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা যায়, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা চরমভাবে ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলারের সীমা অতিক্রম করেছে। এ তেলের মূল্যবৃদ্ধি কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং এটি বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এক ভয়াবহ মূল্যস্ফীতির সংকেত বহন করছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সাম্প্রতিক গবেষণায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, তেলের দাম প্রতি ১০ শতাংশ বৃদ্ধিতে বিশ্ব জিডিপি প্রবৃদ্ধি ০.১৫ শতাংশ হারে হ্রাস পাবে, যা বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট ও খেলাপি ঋণের পাহাড়কে আরও দুর্ভেদ্য করে তুলবে। সত্যিকার অর্থে মধ্যপ্রাচ্যের ওপর বাংলাদেশের অতিনির্ভরশীলতা আজ এক মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। কারণ, দেশের জ্বালানি আমদানি ও রেমিট্যান্স প্রবাহের ৭০ শতাংশের বেশি এই অস্থিতিশীল অঞ্চলের সঙ্গেই যুক্ত। ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের ‘গ্লোবাল ইকোনমিক প্রসপেক্টস’ অনুযায়ী, এই অস্থিরতা দক্ষিণ এশিয়ার প্রবৃদ্ধিকে ৬.২ শতাংশের লক্ষ্যমাত্রা থেকে সরিয়ে চরম মন্দার দিকে ধাবিত করতে পারে। যার ফলে বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোতে পুঞ্জীভূত খেলাপি ঋণ ও তারল্য সংকট এক ভয়াবহ রূপ পরিগ্রহ করবে।
চলমান এই যুদ্ধাবস্থা বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের কাঠামোগত দুর্বলতাগুলোকে প্রকটভাবে উন্মোচিত করেছে, যা মূলত অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনা ও ভূরাজনৈতিক-অর্থনৈতিক আঘাতের এক বিষাক্ত সংমিশ্রণ। ২০২৬ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত বাংলাদেশের খরচযোগ্য বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩০.৩৬ বিলিয়ন ডলারে স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করলেও যুদ্ধের কারণে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি ও রেমিট্যান্স হ্রাসের আশঙ্কায় এটি দ্রুত ক্ষয়িষ্ণু হওয়ার পথে। অভ্যন্তরীণভাবে ব্যাংকিং সেক্টরে নন-পারফর্মিং লোন বা খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২০২৫ সালের শেষে ৩৫.৭৩ শতাংশে পৌঁছে ৬.৪৪ লাখ কোটি টাকার এক বিশাল বোঝা তৈরি করেছিল। যা ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে কিছুটা কমে ৫.৫৭ লাখ কোটি টাকায় এলেও বর্তমানে তা মোট ঋণের ৩০.৬ শতাংশে অবস্থান করছে। ব্যাংকং খাতের এই ভঙ্গুরতার মূলে রয়েছে দীর্ঘদিনের দুর্বল সুশাসন, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও প্রাতিষ্ঠানিক লুটপাট। আন্তর্জাতিকভাবে এসপি গ্লোবালের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার শঙ্কায় বাংলাদেশের ব্যাংকিং সেক্টরে অ্যাসেট কোয়ালিটি বা সম্পদের গুণমান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বর্তমানে ব্যাংকগুলোর ক্যাপিটাল অ্যাডেকোয়েসি রেশিও ৩.০৮ শতাংশে নেমে এসেছে, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য। বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি ২০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন ৬.২৯ শতাংশে নেমে আসায় দেশের শিল্পায়ন ও বিনিয়োগের চাকা প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে, যা ব্যাংকগুলোর মুনাফা অর্জনের সক্ষমতাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
রেমিট্যান্স প্রবাহের সম্ভাব্য ধস বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের জন্য নতুন করে এক অস্তিত্বের সংকট তৈরি করেছে, যা মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রত্যক্ষ প্রভাবে সরাসরি সংকুচিত হওয়ার পথে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত রেকর্ড ১৯.৪ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স প্রবাহ আশার আলো দেখালেও ফেব্রুয়ারির শেষভাগ থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধ সেই আশায় জল ঢেলে দিয়েছে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, কাতার, কুয়েত ও বাহরাইনের মতো দেশগুলোতে কর্মরত প্রায় ৬০ লক্ষ বাংলাদেশি কর্মীর চাকরি এখন গভীর ঝুঁকির মুখে, যা বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহের প্রধান উৎসকে পঙ্গু করে দিতে পারে। আইএমএফের সতর্কবার্তা অনুযায়ী, এই সংকট দীর্ঘায়িত হলে রেমিট্যান্স প্রবাহ ১৫ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেতে পারে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে এক চরম অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দেবে। রেমিট্যান্সের এই সম্ভাব্য হ্রাস কেবল ডলারের সংকটই বাড়াবে না, বরং এটি ব্যাংকগুলোর লিকুইডিটি বা তারল্য ব্যবস্থায় এক বিশাল শূন্যতা তৈরি করবে। রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরশীল বাংলাদেশের ব্যাংকিং সেক্টরে যখন অর্থের জোগান কমে যাবে, তখন বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় তহবিলের সংকট আরও চরম হবে। ইতোমধ্যে ৭৪টির বেশি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় প্রবাসীদের কর্মস্থলে ফেরার পথ রুদ্ধ হয়েছে, যা শ্রমবাজারে যেমন চাপ সৃষ্টি করছে, তেমনি ব্যাংকগুলোর রেমিট্যান্স সংগ্রহের চেইনকেও ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে।
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি ও সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্ন বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের জন্য একটি ‘এক্সটার্নাল শক’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যা দেশের অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতিকে অসহনীয় পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের আঘাত আসার আগেই ৯ মাস পর আবার ৯ শতাংশের ঘরে গিয়ে গত ফেব্রুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে দঁড়িয়েছে ৯.১৩ শতাংশে। অর্থাৎ, গত বছরের এপ্রিলের (৯.১৭ শতাংশ) পর এটিই সর্বোচ্চ এবং গত ১০ মাসের মধ্যে সর্বাধিক। উপরন্তু এখন তেলের দাম ১১০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের বার্ষিক আমদানি বিল কমপক্ষে ৭ বিলিয়ন ডলার বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা সরাসরি ব্যাংকগুলোর ডলারের চাহিদাকে আকাশচুম্বী করে তুলেছে। ওদিকে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটায় বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ ২০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, যার প্রভাবে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে বাধ্য হয়ে তেলের রেশনিং শুরু করতে হয়েছে। তেলের দাম বাড়লে তা কেবল যাতায়াত খরচ বাড়াবে না, বরং এটি উৎপাদন খাতের খরচ ২৫-৩০ শতাংশ বাড়িয়ে দেবে। ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা ব্যাংক ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হবে। নতুন করে ঋণ খেলাপি সৃষ্টি হবে। ব্যাংক খাতে আমদানি ফাইন্যান্সিং বা এলসি খোলার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো ইতোমধ্যে চরম ডলার সংকটে ভুগছে, যার ফলে টাকার মান কমে ১২২.৫৫ থেকে ১২৩ টাকায় নেমে এসেছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুদ্ধ যদি ইরান ও ইসরাইলের গণ্ডি ছাড়িয়ে আরও ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে তেলের দাম ১২০-১৫০ ডলারে পৌঁছাতে পারে, যা বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির ভিত একেবারে নাড়িয়ে দেবে এবং ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের পরিমাণকে ধরাছোঁয়ার বাইরে নিয়ে যাবে।
লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালিতে যুদ্ধের বিস্তৃতি বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যের প্রধান রুটগুলোকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও ব্যয়বহুল করে তুলেছে। শিপিং খরচ ইতিমধ্যে ৪০-৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পের ওপর এক মরণকামড় বসিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে মুদ্রাস্ফীতি ৮-১০ শতাংশে পৌঁছানোর ফলে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির ক্রয়াদেশ ১০ শতাংশ হ্রাস পেতে পারে। রপ্তানি আয়ের এই সম্ভাব্য পতন ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উৎসকে ঝুঁকিতে ফেলবে। বিশ্বব্যাংকের মতে, এই ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে ৪.৮ শতাংশের নিচে নামিয়ে দিতে পারে, যা ব্যাংক খাতের ঋণ পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়াকে আরও ধীর করে দেবে। কারণ, যখন রপ্তানিকারকরা তাদের পণ্য সঠিক সময়ে পাঠাতে পারেন না বা শিপিং খরচের কারণে লোকসানের সম্মুখীন হন, তখন ব্যাংকগুলোর দেওয়া ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল লোনগুলো এনপিএল বা খেলাপি ঋণে রূপান্তরিত হয়। বর্তমানে বড় শিল্পঋণের প্রায় অর্ধেকই খেলাপি হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে, যা ব্যাংকিং সেক্টরের আর্থিক স্থিতিশীলতাকে এক গভীর অতল গহ্বরের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ এবং বাংলাদেশের ভঙ্গুর ব্যাংক খাতের চ্যালেঞ্জগুলোকে যদি আমরা অর্থনীতি, সমাজবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও হিসাববিজ্ঞান শাস্ত্রের পরীক্ষিত তত্ত্বের আলোকে বিশ্লেষণ করি, তাহলে সংকটের এক গভীর তাত্ত্বিক রূপরেখা পরিলক্ষিত হয়। অর্থনীতি শাস্ত্রের ‘সাপ্লাই শক থিওরি’, যা জন মেইনার্ড কেইনসের কেইনসিয়ান ইকোনমিকসের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ, তার নিরিখে দেখা যায় যে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ জ্বালানি তেলের সরবরাহে যে বিঘ্ন ঘটিয়েছে তা একটি নেতিবাচক সাপ্লাই শক। এই শক অ্যাগ্রিগেট সাপ্লাই কার্ভকে বাম দিকে সরিয়ে দেয়, যার ফলে একই সঙ্গে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পায় এবং উৎপাদন হ্রাস পায়- যাকে অর্থনীতিতে ‘স্ট্যাগফ্লেশন’ বলে অভিহিত করা হয়। বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে এটি সরাসরি খেলাপি ঋণের জন্ম দেয়। কারণ, এতে উৎপাদনশীল খাতের আয় কমে যায়। আবার ‘ডাচ ডিজিজ’ তত্ত্বের আলোকে বলা যায়, বাংলাদেশ রেমিট্যান্সের ওপর যে অতিনির্ভরশীলতা তৈরি করেছে, তা অর্থনীতির অন্যান্য উৎপাদনশীল খাতকে দুর্বল করে রেখেছে এবং এখন সেই রেমিট্যান্সের উৎসে আঘাত আসায় পুরো আর্থিক কাঠামো ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।
পরিশেষে বলা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বাংলাদেশের ভঙ্গুর ব্যাংক খাতের জন্য এক অগ্নিপরীক্ষা। এই সংকট থেকে উত্তরণে কেবল মুদ্রানীতি বা সংকোচনমূলক ব্যবস্থাপনাই যথেষ্ট নয়, বরং এর জন্য প্রয়োজন একটি সুসংহত ও সাহসী সংস্কার পরিকল্পনা। জ্বালানি আমদানির উৎস বহুমুখীকরণ, নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান এবং ব্যাংকিং সেক্টরে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা এখন সময়ের দাবি। যদি দ্রুত খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোর ব্যবস্থা ও আমানতকারীদের আস্থা ফেরাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তাহলে চলমান বৈশ্বিক সংঘাতের ঢেউ বাংলাদেশের সমগ্র অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে সমূহঝুঁকিতে ফেলতে পারে। বৈশ্বিক ও জাতীয় এই ক্রান্তিলগ্নে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ সরকারকে একদিকে যেমন ভূরাজনৈতিক কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়াতে হবে, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ ব্যাংক খাতের ক্ষতগুলো সারাতে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও স্বচ্ছ রোডম্যাপ বাস্তবায়ন করতে হবে। কেবল তা হলেই বাংলাদেশ দুর্যোগের মেঘ কাটিয়ে একটি স্থিতিশীল ও শক্তিশালী আর্থিক কাঠামো পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরু করতে সক্ষম হতে পারে।
লেখক : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
প্যানেল/মো.








