ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ১৬ জুন ২০২৪, ২ আষাঢ় ১৪৩১

স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে চাই আইটি খাতে সাহসী সিদ্ধান্তের বাজেট

গাজী আলিম আল রাজী

প্রকাশিত: ১৪:২৪, ১৮ মে ২০২৪

স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে চাই আইটি খাতে সাহসী সিদ্ধান্তের বাজেট

গাজী আলিম আল রাজী

বিশ্ব অর্থনৈতিক অস্থিরতা, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের মধ্যে ইরান-ইসরায়েল অস্ত্রের ঝনঝনানি ও নানা ভূ-রাজনৈতিক সংকটকের মধ্যেই আরও একটি বাজেট সমাগত। বাজেটকে কেন্দ্র করে সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারগন তাদের মতামত পেশ করছেন, নিজেদের ব্যবসায়ীক খাতের উন্নয়নে দাবিদাওয়া উত্থাপন করছেন । আমার অর্থনৈতিক জ্ঞান সীমিত হওয়ায় অনেককিছু মাথার উপর দিয়ে গেলেও আইটি ইন্ডাস্ট্রির মানুষ হিসাবে এই খাতের আলোচনা, পর্যালোচনা, কথন, অতিকথন আমায় টানে। 

তথ্য প্রযুক্তির অনেক ট্রেডবডি এবং কিছু প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ মনে করছেন আইটি  খাতে কর অব্যবহিত বা প্রণোদনা সুবিধা প্রত্যাহার গাছে তুলে মই কেড়ে নেয়ার শামিল বা সম্ভাবনার অপমৃত্যু হিসাবে সরকারকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে চাইছে। ডিজিটাল থেকে স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে টেকসই অর্থনীতির ভিত্তি গড়তে আসলেই কি কর অব্যবহিত বা প্রণোদনা সুবিধা আরো কিছুদিন রাখা উচিত? আসুন আমাদের বিগত দুই দশকের কিছু উন্নয়ণ অগ্রগতির সুচক এবং বৈশ্বিক কালচার বিশ্লেষণ করে দেখি।

১৯৯৩ সালে দেশে বিনামূল্যে সাবমেরিন ক্যাবল স্থাপনের সু্যোগ এলেও তৎকালীন বিএনপি সরকারের  অদূরদর্শী নেতৃত্বের কারণে বাস্তবে রূপ না নেয়ার দুঃখজনক কাহিনী আমাদের সবারই জানা। বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ সরকারই  সাবমেরিন ক্যাবলের সাথে যুক্ত করে ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের পদক্ষেপ গ্রহন করে। আইটি ইনফ্রাস্ট্রাকচার গড়ে তুলে ইন্টারনেট সহজলভ্য করে সরকারের ধারাবাহিক পলিসি সাপোর্টের মাধ্যমে আজ ডিজিটাল বাংলাদেশের ব্রান্ডিং ছড়িয়েছে বিশ্বব্যাপী। এই পথ চলায় আইটি প্রোডাক্ট আমদানী কর মুক্ত রাখা, তথ্যপ্রযুক্তি খাতের ওপর কর অব্যাহতি,  সফটওয়্যারের উৎপাদন পর্যায়ে ভ্যাট মওকুফ, আইটি/আইটিইএস রপ্তানীতে ক্যাশ ইন্সেটিভ সহ নানা যুগান্তকারী সাহসী সিদ্ধান্ত ছিল। বিনিময়ে দেশ আজ ডিজিটাল হয়েছে কিন্তু দীর্ঘ এই পথ চলায় সরকারকে কখনো নির্মম ট্রলের শিকার হতে হয়েছে, কখনো অপপ্রচারের নিষ্ঠুর বলি হতে হয়েছে। তাই আজ আমাদের কতিপয় তথ্য প্রযুক্তিবিদের কর অব্যবহিত বা প্রণোদনা সুবিধা প্রত্যাহার প্রশ্নে উদ্বেগ, মায়াকান্না ও সরকারের প্রতি তির্যক মন্তব্য “মায়ের চেয়ে মাসির দরদ বেশি” প্রবাদটিকেই মনে করিয়ে দেয়। 

ওই তথাকথিত প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা গুঞ্জন ছড়িয়েছে, সরকার আইএমএফ এর প্রেসক্রিপশন বাস্তবায়নে তৎপর। এনবিআর বলছে আমাদের আইটি ইন্ডাস্ট্রির বাৎসরিক প্রফিট ৫ হাজার কোটি টাকা। এই খাত করের আওতায় আনলে সরকারের অনেক রাজস্ব আদায় হবে। আইটিতে সর্বোচ্চ করদাতা প্রতিষ্ঠানে কাজ করার সুবাদে এই তথ্যটিতে গলদ আছে সেটা আমি নির্দ্বিধায় বলতে পারি। এখানে দরকার স্টেকহোল্ডার, এনবিআর ও আইএমএফ এর এক সাথে বসে সঠিক তথ্য বিশ্লেষণ, যাতে সরকার এই শিল্পের রাজস্ব এবং মুনাফা সঠিকভাবে নির্ধারণ করতে পারে। সঠিক তথ্য বিশ্লেষণে সরকার সিদ্ধান্ত নিতে পারবে জুন ২০২৪ এর পর আইটি  খাতে কর অব্যবহিত বা প্রণোদনা সুবিধা উঠিয়ে দিয়ে বা অব্যাহত রেখে কতটা কল্যাণকর হবে দেশীয় আইটি ইন্ডাস্ট্রি।  

আমার মনে হয় আমাদের ভাবনার গোড়াতেই গলদ আছে। তথ্য প্রযুক্তি কে একটি নির্দিষ্ট খাত হিসাবে বিবেচনা করাই আমাদের ভুল। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, কৃষি ব্যবস্থা, ভূমিব্যবস্থাপনা, কর ব্যবস্থাপনা, ট্রাফিক সিস্টেম, সিটিজেন সার্ভিস সব কিছুতেই আছে তথ্য প্রযুক্তির মেলবন্ধন। সবগুলো খাতকে আধুনিক ও ব্যবহার উপযোগী করতে তথ্য প্রযুক্তির সংযুক্তি নিশ্চিত করতে হচ্ছে। তাই তথ্য প্রযুক্তি স্বকীয় একটি খাত হিসাবে বিবেচনা না করে সবগুলো খাতের সংমিশ্রণ মনে করাই শ্রেয়। আইসিটি ইন্ডাস্ট্রির সুবিধাদি সংকুচিত করলে তার আল্টিমেট প্রভাব পড়বে প্রত্যেকটা শিল্পের উন্নয়নে, সামগ্রিক আগ্রগতিতে। সরকারের দৃষ্টিভঙ্গির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণ, তাই দেশের সামগ্রিক অগ্রগতিতে তথ্য প্রযুক্তির সুবিধা অব্যাহত রাখতেই হবে। এই খাত যে কর অব্যাহতি সুবিধা পেয়ে আসছে ১০ বছর ধরে, ২০২৪ সালের জুন মাসে তার মেয়াদ শেষ হচ্ছে। এই দশ বছরে আমাদের যে অগ্রগতি সেখানে সন্তুষ্টির ঢেকুর তোলার সুযোগ নেই।  ৫ বিলিয়ন ডলার আইটি এক্সপোর্ট এর লক্ষ্যমাত্রা নির্দিষ্ট সময়ে অর্জনে ব্যর্থ হয়ে আবার নতুন সময় নির্ধারণ করেছি। তাই সময় এসেছে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় দেশের আইটি খাতের সহায়ক পরিবেশ আরো সুদৃঢ় ও জোরদার করা, যাতে করে আমাদের আইটি খাত একটি শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড়াতে পারে।  

একটি শিশুকে হাতে ধরে পথচলা শিখাতে হয়, মুখে তুলে খাওয়াতে হয় কিন্তু একটা সময়ে তার হাত ছেড়ে দিয়ে চলা বা খাওয়া শিখতে দিতে হয়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে সেই সময়টা কখন? আমাদের আইটি খাতকে দৃঢ় অর্থনৈতিক ভিত্তিতে দাঁড় করাতে বিগত দিনে দেয়া কর সুবিধা যথেষ্ট কিনা? পাশের দেশ ইন্ডিয়া বা আইটিতে দ্রুত বিকশিত ফিলিপিন্স ও ভিয়েতনামের ইন্ডাস্ট্রি বিশ্লেষণ করতে পারি।  সেখানেও সরকারের দেয়া সাপোর্ট ছিল নিদিষ্ট সময়ের জন্য। ইন্ডিয়া আইটি স্টার্টআপকে ৩ বছর,  ফিলিপিন্স ২ বছর এবং ভিয়েতনাম ৫ বছর করের আওতামুক্ত রেখেছে।  কর অব্যবহিত, ভর্তুকি বা প্রণোদনা কখনো গতিশীল অর্থনীতির স্থায়ী বৈশিষ্ট্য হতে পারে না। 

তাই আমাদের দেশেও সরকারি সাপোর্ট একটা সময়ে প্রত্যাহার করতেই হবে। সরকার যদি মনে করে টেকসই অর্থনীতির ভিত্তি গড়তে নতুন করে আইটি  খাতে কর অব্যবহিত বা প্রণোদনা সুবিধা অব্যহত রাখবে না তাহলে কি হতে পারে। এই শিল্পে নতুন বিনিয়োগ হওয়ার সুযোগ কমে আসবে, বর্তমান দেশীয় প্রতিষ্ঠানের বিকাশ বাধাগ্রস্থ হবে , সরাকারী প্রসেস অটোমেশন বা শিল্প অটোমেশনের খরচ খরচ বাড়বে। মাঝারি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানগুলো অগ্রগতি বাধাগ্রস্থ হবে। তাই সরকারকে দূরদর্শিতার সাথে হিসাব করে  সাহসিকতার সাথে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
 
কোন স্বার্থান্বেষী কুচক্রী মহলের মায়া কান্নায় প্রলুব্ধ হয়ে বা আইএমএফ এর শর্তের বেড়াজালে পড়ে আইটি খাতের সিদ্ধান্ত নিবে না বর্তমান সরকার। আমার বিশ্বাস, সকল চাপ-উত্তাপ সামলে দেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে, দেশীয় আইটি খাতকে দৃঢ় অর্থনৈতিক ভিত্তিতে দাঁড় করাতে সাহসী যুগান্তকারী সিদ্ধান্তই আসছে আমাদের জন্য।

অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার্থে গত দুই দশকের প্রবৃদ্ধির গতি থামিয়ে কিছু ক্ষেত্রে একটু ছাড় দিয়ে হলেও বাস্তবতার নিরিখে যুগোপযোগী বাজেটের দিকেই সরকারকে হাঁটতে হবে। বাস্তবতায় রপ্তানিমুখী শিল্পগুলোর জন্য দেওয়া প্রণোদনাগুলো সরিয়ে নেওয়ার চিন্তা করলে অন্যায় কিছু হবে না। আমাদের গত বাজেটের ভতুর্কি ছিল ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা যেখানে রফতানি খাতে প্রণোদনায় ছিল ৭ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা। আর আইটি রফতানি প্রণোদনা ছিল আরও সামান্য। এই সামান্য প্রণোদনা আরও কিছুদিন অব্যাহত থাকলে আমাদের ইন্ডাস্ট্রির অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্ত করতে সুবিধা হবে। 

কর আহরণ প্রক্রিয়ার ডিজিটাইজেশনের মাধ্যমে দেশের রাজস্ব কয়েকগুণ বাড়ানো সম্ভাব। আর সেই ডিজিটাইজেশনের পথকে রুদ্ধ না করে প্রসারিত করতে সিদ্ধান্ত নিতে সাহসী হতে হবে। কোন স্বার্থান্বেষী কুচক্রী মহলের মায়া কান্নায় প্রলুব্ধ হয়ে বা আইএমএফ এর শর্তের বেড়াজালে পড়ে আইটি খাতের সিদ্ধান্ত নিবে না বর্তমান সরকার। আমার বিশ্বাস, সকল চাপ-উত্তাপ সামলে দেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে, দেশীয় আইটি খাতকে দৃঢ় অর্থনৈতিক ভিত্তিতে দাঁড় করাতে সাহসী যুগান্তকারী সিদ্ধান্তই আসছে আমাদের জন্য। আস্থা আমাদের শতভাগ, ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপকার এবং স্মার্ট বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা বর্তমান সরকার প্রধান এবং আমাদের ডায়নামিক মন্ত্রণালয় আইটি খাতের চলমান প্রশ্নে যুগোপযোগী সিদ্ধান্তই নিবেন। 

লেখক: সদস্য, অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপকমিটি, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ   [email protected]
 

 এসআর

×