ঢাকা, বাংলাদেশ   মঙ্গলবার ২১ মে ২০২৪, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

হাশেম খান ॥ চারুকলার ঋদ্ধ ঋষি

এম. নজরুল ইসলাম

প্রকাশিত: ২০:৩৭, ১৫ এপ্রিল ২০২৪

হাশেম খান ॥ চারুকলার ঋদ্ধ ঋষি

হাশেম খান

হাশেম খান একজন বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী। রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনেও তিনি সক্রিয়। ১৯৭৫ সালের পর যত গণতান্ত্রিক আন্দোলন হয়েছে, সেসবে তিনি সক্রিয় ছিলেন। যুক্ত ছিলেন নাট্য আন্দোলনে। মৌলবাদ-জঙ্গিবাদবিরোধী এবং মানবতাবিরোধী বিচারের দাবিতে সোচ্চার ছিলেন। এখনো আছেন। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তিনি ছিলেন রাস্তায়। বাংলাদেশের চিত্রকলায় শিল্পী হাশেম খানের নিজস্বতা নিয়ে দ্বিমত নেই।

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের খ্যাতিমান এই শিল্পী দীর্ঘ ছয় দশকের বেশি সময় ধরে শিল্পচর্চা ও সংকৃতির বিকাশে নিয়োজিত। ১৯৬৩ সাল থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত চারুকলা অনুষদের সফল শিক্ষক এবং তাঁর ছাত্রছাত্রীরাই বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বে শিল্পচর্চায় সুনাম অর্জন করে চলেছেন। এখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ইমেরিটাস অধ্যাপক। দেশের চারুকলা বিকাশের আন্দোলনসহ মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা ও প্রগতিশীল সংস্কৃতি চর্চার পরিবেশ সৃষ্টিতে তিনি নিবেদিতপ্রাণ। 
তরুণ বয়সে তিনি কচি-কাঁচার মেলার মাধ্যমে রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই এবং শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের উপদেশ ও সহযোগিতায় শিশু চিত্রকলাকে সংস্কৃতিচর্চার বিষয় হিসেবে বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত করেন। বাংলাদেশে শিশু শিক্ষা ও শিশু চিত্রকলার ক্ষেত্রে শিল্পী হাশেম খানের অগ্রণী ও বলিষ্ঠ ভূমিকা রয়েছে। শিশুচিত্রের সংস্কৃতি বাংলাদেশের সমাজে তিনিই প্রতিষ্ঠিত করেছেন এবং এই বিষয়ে গবেষণা করেছেন। শিশু পুস্তকে ছবি এঁকে শিশুপাঠকে শিশুদের কাছে আনন্দের বিষয় হিসেবে তুলে ধরেছেন।

যারা এখন ৬০-৬৫ বছর বয়সী তাঁদের তিনি স্কুল পাঠ্য বইয়ের চিত্রের মাধ্যমে চিনিয়েছেন বাংলাদেশকে। বাংলাদেশের মানুষ ও জীবনধারাকে চিনিয়েছেন। আজ শিশু চিত্রকলা বাংলাদেশে শুদ্ধ সংস্কৃতিচর্চার একটি উল্লেখযোগ্য বিষয়। তিনি এই ধারার পথিকৃৎ।
বাংলাদেশের শিল্পাঙ্গনে অন্যতম দিকপাল তিনি। রং-তুলিতেই ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি তাঁর নিজের পরিচয়। রেখেছেন সৃজনশীলতার অনন্য স্বাক্ষর। শিল্পকলায় নিমগ্ন শিল্পী হাশেম খান ৮২ বছর পূর্ণ করেও সৃষ্টিশীল। তাঁর সৃজনশীল কর্মপ্রবাহে সমৃদ্ধ করে চলছেন চারুকলা। বাংলাদেশের চারুকলা তাঁর ছোঁয়ায় ঋদ্ধ। শিল্পচর্চায় ঋষির মতো নিবেদিত তিনি।  
হাশেম খান ছাত্র জীবন থেকেই বঙ্গবন্ধুর অনুসারী। তিনি ষাটের দশকে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও প্রগতিশীল রাজনীতির প্রায় সব পোস্টার, ফেস্টুন, ছবি, প্রচার-পুস্তিকার প্রচ্ছদ এঁকেছেন। ১৯৬৬ সালে বাঙালির মুক্তিসনদ ঐতিহাসিক ছয়-দফার লোগো, পতাকা নকশা, পোস্টার ও অন্যান্য শিল্পকর্ম করেছেন শিল্পী হাশেম খান। ছয়-দফা সর্বপ্রথম জনগণের সামনে ঘোষণার জন্য তৎকালীন হোটেল ইডেনের সামনে যে মঞ্চ তৈরি হয়েছিল, তার ‘ব্যাকসিন’ ছয়-দফার প্রতীকী নকশা দিয়ে সাজিয়েছিলেন তিনি।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থনৈতিক বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরে যে ঐতিহাসিক পোস্টার ‘সোনার বাংলা শ্মশান কেন’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছিল, তা এঁকেছিলেন শিল্পী হাশেম খান। বাংলাদেশের ‘সংবিধান গ্রন্থে’র প্রতি পৃষ্ঠায় চারদিকজুড়ে রয়েছে নকশা এবং ভেতরে লেখা। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের তত্ত্বাবধানে প্রধান শিল্পী হিসেবে কাজ করেছেন শিল্পী হাশেম খান। নকশা তৈরি করেছেন জুনাবুল ইসলাম, সমরজিৎ রায় চৌধুরী ও আবুল বারক আলভী।

লিপিকার ছিলেন আবদুর রউফ। বঙ্গবন্ধুর জীবনভিত্তিক প্রায় ৩০০ ছবির একটি অ্যালবামের তিনি নির্বাহী সম্পাদক। ওই অ্যালবামের সম্পাদকম-লীর সভাপতি বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা, যা প্রকাশিত হয়েছে ১৯৯৭ সালে। ‘জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শিশু গ্রন্থমালা’ সিরিজের সম্পাদকীয় বোর্ডের তিনি সভাপতি। এই সিরিজে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বিভিন্ন বিষয়ে বই ও ছবির অ্যালবাম মিলে মোট ২৫টি প্রকাশিত হয়েছে ২০১৩ সালে।

ইতিহাসবিদ অধ্যাপক ড. মুনতাসীর মামুনের সঙ্গে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চিত্রের তিনটি অ্যালবাম ও বাংলাদেশ ব্যাংকের শিল্পকলা সংগ্রহ অ্যালবামের তিনি যুগ্ম সম্পাদক এবং ঢাকা জাদুঘর বাস্তবায়ন কমিটির চেয়ারম্যান। ঢাকা নগর জাদুঘরের অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নির্মিত স্বাধীনতা স্তম্ভের জুরিবোর্ড ও বাস্তবায়ন বিশেষজ্ঞ কমিটির সদস্য হিসেবে কাজ করেছেন। ১৯৭১ : গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘরের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং ট্রাস্টি।

শিল্পকর্মে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি ১৯৯২ সালে একুশে পদক লাভ করেন। ২০১১ সালে দেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কার স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত হন। এ ছাড়াও তিনি দেশী এবং আন্তর্জাতিক বহু পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেন। বইয়ের প্রচ্ছদের জন্য ১৬বার জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র কর্তৃক পুরস্কৃত হয়েছেন। ২০০৭ সালে বাংলা একাডেমি তাঁকে সম্মানসূচক ফেলো মনোনীত করে। তিনবার অগ্রণী ব্যাংক শিশুসাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। তিনি একজন সুলেখকও। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ ২০টি।
শিল্পীরা হলেন তেমনই চেতনাঋদ্ধ মানুষ, যারা আঁধারেও স্বপ্ন দেখেন। মুক্তির কথা ভাবেন। সেজন্যই ভেতরের অর্গল খুলে মগ্ন হন সৃজন উল্লাসে। শিল্পী হাশেম খানও এর ব্যতিক্রম নন। তাঁর তুলিতে মানুষ, মানুষের অধিকার, প্রকৃতি এবং দেশের কথা উঠে আসে। শিল্পী হাশেম খানের জন্মদিনে আমাদের সশ্রদ্ধ অভিবাদন।
লেখক : সর্ব ইউরোপীয় আওয়ামী লীগের সভাপতি 

[email protected]

×