ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ২০ এপ্রিল ২০২৪, ৬ বৈশাখ ১৪৩১

দুর্ঘটনা রোধে আধুনিক প্রযুক্তি

ড. এম. মেসবাহউদ্দিন সরকার

প্রকাশিত: ২০:৪৬, ২ এপ্রিল ২০২৪

দুর্ঘটনা রোধে আধুনিক প্রযুক্তি

সড়ক দুর্ঘটনা বাংলাদেশের একটি বহুল আলোচিত বিষয়

একই সঙ্গে কন্ট্রোল রুম থেকে ‘ভেহিকেল ডিটেক্টিভ সিস্টেমের (ভিডিসি)’ মাধ্যমে কোনো গাড়ি নির্ধারিত গতি অতিক্রম করলে সেটিকে চিহ্নিত করবে। অর্থাৎ, কেউ গাড়ি দ্রুত চালিয়ে গেলে সঙ্গে সঙ্গে  ধরা পড়বে, সংশ্লিষ্ট গাড়ির নম্বর চলে আসবে এবং ট্র্যাক করা যাবে। এইভাবে সমস্ত তথ্য সফটওয়্যারের মাধ্যমে ডাটাবেজে সংরক্ষিত হবে।

পরিবহন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে সময় ও জ্বালানি সাশ্রয়, যানজট ও দূষণমুক্ত, সর্বোপরি দুর্ঘটনামুক্ত দক্ষ সড়ক নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে। তবে আজকালকার গাড়িতেও চালককে সহায়তা করতে নানা রকম প্রযুক্তি কাজে লাগানো হচ্ছে। ফলে, নিরাপত্তা ও আরাম দুটোই বাড়ছে। ভবিষ্যতে অটোনমাস বা স্বচালিত যান বাজারে ছড়িয়ে পড়বে বলে বিশেষজ্ঞরা পূর্বাভাস দিচ্ছেন। অটোনমাস ড্রাইভিং ধীরে হলেও বাস্তব হয়ে উঠছে। গাড়ি ও চালক আরও বেশি আধুনিক প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করছেন

সড়ক দুর্ঘটনা বাংলাদেশের একটি বহুল আলোচিত বিষয়। ঈদ এলে দুর্ঘটনা আরও বহুগুণে বেড়ে যায়। অঙ্গহানি এবং মৃত্যুর মিছিল দেখা যায় হাইওয়েগুলোতে। অনিয়ন্ত্রিত ও লক্কর-ঝক্কর যানবাহন এবং অদক্ষ ড্রাইভার দ্বারা গাড়ি চালানোই দুর্ঘটনার মূল কারণ। তবে বর্তমান সময়ে ব্যাটারিচালিত থ্রি হুইলার এবং হোন্ডা সড়ক ও মহাসড়কে বেপরোয়া চলাচলের কারণে দুর্ঘটনা জ্যামিতিক হারে বেড়েছে। আছে রাস্তার সংস্কার, রাস্তার প্রশস্ততার তুলনায় যানবাহনের আধিক্য, ওভারটেকিং, উল্টোপথে গাড়ি চালানো, যত্রতত্র অবৈধ পার্কিং, ফুটপাত দখল, ট্রাফিক আইন ও গতিসীমা না মানা ইত্যাদি নানা কারণ।

অনেকেই মনে করেন, জাতিগতভাবেই আমরা উল্টাপাল্টা গাড়ি চালাই এবং দুর্ঘটনায় পতিত হই। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে দুই হাজার ৬৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় তিন হাজার ৩৫৮ জন প্রাণ হারায়। ২০২১ সালে তিন হাজার ২০৪টি দুর্ঘটনায় তিন হাজার ৭৭৬ জন নিহত হয়। ২০২২ সালে ৬৭৪৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৯ হাজার ৯৫১ জন নিহত হয়। আর ২০২৩ সালে ৬ হাজার ৯১১টি সড়ক দুর্ঘটনায় কমপক্ষে ৬ হাজার ৫২৪ জন নিহত হয়।

এভাবে কি চলতে দেওয়া যায়? নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য, টেকসই, উন্নত এবং সর্বোপরি একটি স্মার্ট সড়ক পরিবহন অবকাঠামো ও অপারেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা খুবই জরুরি। সে লক্ষ্যে ইমপ্রুভিং দ্য রিলায়েবিলিটি অ্যান্ড সেফটি অন ন্যাশন্যাল হাইওয়ে করিডর অব বাংলাদেশ বাই ইন্ট্রোডাকশন অব ইন্টেলিজেন্ট ট্রান্সপোর্টেশন সিস্টেম (আইটিএস) প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। আর্থিক ও কারিগরি সহযোগিতায় আছে ‘কোরিয়ান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (কোইকা)। 
আইটিএস প্রযুক্তিতে মহাসড়কে সব ধরনের যানবাহনের ওপর এমনভাবে নজরদারি করা হবে, যাতে দ্রুত গতি নিয়ন্ত্রণে চালকদের বাধ্য করার পাশাপাশি তাদের নিয়ম ভাঙার বিরুদ্ধে ত্বরিত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং দুর্ঘটনার পর তাৎক্ষণিক সহায়তা কার্যক্রমে বড় ধরনের ভূমিকা রাখবে। আবার চলতি পথে চালকরাও জানতে পারবেন তার বাহনের গতি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রয়েছে কিনা। নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার আগেই সতর্ক হওয়ার সুযোগ পাবেন। একই সঙ্গে কন্ট্রোল রুম থেকে ‘ভেহিকেল ডিটেক্টিভ সিস্টেমের (ভিডিসি)’ মাধ্যমে কোনো গাড়ি নির্ধারিত গতি অতিক্রম করলে সেটিকে চিহ্নিত করবে।

অর্থাৎ, কেউ গাড়ি দ্রুত চালিয়ে গেলে সঙ্গে সঙ্গে  ধরা পড়বে, সংশ্লিষ্ট গাড়ির নম্বর চলে আসবে এবং ট্র্যাক করা যাবে। এইভাবে সমস্ত তথ্য সফটওয়্যারের মাধ্যমে ডাটাবেজে সংরক্ষিত হবে। পরিবহন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে সময় ও জ্বালানি সাশ্রয়, যানজট ও দূষণমুক্ত, সর্বোপরি দুর্ঘটনামুক্ত দক্ষ সড়ক নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে।

তবে আজকালকার গাড়িতেও চালককে সহায়তা করতে নানা রকম প্রযুক্তি কাজে লাগানো হচ্ছে। ফলে, নিরাপত্তা ও আরাম দুটোই বাড়ছে। ভবিষ্যতে অটোনমাস বা স্বচালিত যান বাজারে ছড়িয়ে পড়বে বলে বিশেষজ্ঞরা পূর্বাভাস দিচ্ছেন। অটোনমাস ড্রাইভিং ধীরে হলেও বাস্তব হয়ে উঠছে। গাড়ি ও চালক আরও বেশি আধুনিক প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করছেন। 
লেন কিপিং, সোয়ার্ভিং ও ব্রেকিং অ্যাসিস্টেন্ট আজকাল অনেক গাড়িতেই দেখা যায়। স্বয়ংক্রিয় গতি নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি ‘ইন্টেলিজেন্ট স্পিড অ্যাসিস্ট্যান্ট (আইএসএ)’ নামের ডিভাইস বিল্ট-ইন-ফিচার হিসেবে সংযুক্ত হচ্ছে। গ্রাহক তথা ক্রেতাদের নিরাপদ সড়ক প্রদানে গাড়ি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে বর্তমানে আইএসএ ফিচারটি ব্যাপক চাহিদা সৃষ্টি করেছে। আইএসএ এমন একটি প্রযুক্তি, যা গাড়ির সামনে থাকা ক্যামেরা, জিপিএস বা ডাটা অথবা দুটোই ব্যবহারের মাধ্যমে রাস্তায় নির্ধারিত গতিবিধি ও গাড়ির গতি যাচাই করতে পারে।

আইএসএ  নির্ধারিত মডেল ও চালকের প্রোফাইল অনুযায়ী এ প্রযুক্তি গাড়ির নির্দিষ্ট গতিসীমার বিষয়ে প্রতিক্রিয়া  জানায়। এছাড়া প্রযুক্তিটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে গাড়ির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার মাধ্যমে রাস্তার নির্ধারিত গতিসীমার সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধান করবে অথবা গাড়ির ইঞ্জিনের শক্তি কমিয়ে গতি কমাতে কাজ করে। 
ড্রাইভারবিহীন স্বয়ংচালিত গাড়ি (ভিএসটি) চলছে অনেক উন্নত দেশে। ভিএসটির উল্লেখযোগ্য সুবিধাগুলোর মধ্যে রয়েছে জিও-ফেন্সিং ক্ষমতা, দূরবর্তী গতি সংবেদন, চুরি প্রতিরোধ, ক্ষতি প্রশমন, যানবাহন থেকে যানবাহনে যোগাযোগ এবং গাড়ি থেকে কম্পিউটার ডিভাইস, যা জিপিএস ট্র্যাকিং ব্যবহার। অতিরিক্ত ড্রাইভিং করার সময় তন্দ্রা অনুভব করা  একটি স্বাভাবিক বিষয়। তন্দ্রা থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য ‘নীল আলো’ নিঃসরণ প্রযুক্তি, যা চোখকে চাপ দেয়, গাড়ি চালানোর সময় ঘুমিয়ে পড়া কঠিন করে তোলে এবং অভ্যন্তরীণ আলো, টাচস্ক্রিন, ঘড়ি এবং স্পিডোমিটার এবং গ্যাস মিটারকে আলোকিত করে। 
‘লেন ডিপার্চার সেন্সর’ ঝাঁকুনি লেনের ভিতরে বা বাইরে শনাক্ত করতে সহায়তা করে। ইলেকট্রনিক্স স্থিতিশীলতা নিয়ন্ত্রণ (ইএসসি) হলো এমন একটি  প্রযুক্তি, যা প্রতিকূল আবহাওয়া বা কঠিন রাস্তার অবস্থার সময় গাড়ির ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করে। এই প্রযুক্তি চালকদের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করতে এবং সম্ভাব্য ক্র্যাশ, রোল ওভার এবং ফিশটেল প্রতিরোধ করতে দেয়। ইলেকট্রনিক স্থিতিশীলতা নিয়ন্ত্রণ গাড়ির ট্র্যাকশন দেয় না; বরং এটি ভারসাম্য এবং ক্ষণস্থায়ী স্টিয়ারিং নিয়ন্ত্রণ প্রদান করে।

আরও আধুনিক এবং বৈচিত্র্যময় স্বয়ংক্রিয় এবং জরুরি ব্রেকিং প্রযুক্তি রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে স্বয়ংক্রিয় ইমার্জেন্সি ব্রেকিং (এইবি), ক্র্যাশ ইমিনেট ব্রেকিং, ডায়নামিক ব্রেক সাপোর্ট এবং পেডেস্ট্রিয়ান ইমার্জেন্সি ব্রেকিং। এই প্রযুক্তিগুলো গাড়ির সামনের যানবাহনগুলোকে শনাক্ত করে এবং দুর্ঘটনা শনাক্ত হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্রেক করে। ড্রাইভার যদি সতর্কতা স্বীকার না করে, তাহলে এইবি প্রযুক্তি দুর্ঘটনার তীব্রতা এড়ানো বা কমানোর আশায় ব্রেক প্রয়োগ করে। ‘ডায়নামিক ব্রেক’ এবং ‘ক্র্যাশ ইমিনেট ব্রেকিং’ প্রযুক্তি পথচারীদের শনাক্ত করতে রাডার সেন্সর এবং ক্যামেরা ব্যবহৃত হয়।

‘ব্লাইন্ড স্পট’ প্রযুক্তি হলো গাড়ির বাইরের একটি এলাকা, যা চালকের আসন থেকে চালক দেখতে পায় না। এই প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে চালকদের গাড়ির কাছাকাছি অন্যান্য গাড়ির বিষয়ে সতর্ক করে। অন্যান্য যানবাহন কোন্ দিক থেকে আসছে, তা শনাক্ত করার ক্ষমতাও রয়েছে এই প্রযুক্তিতে। ব্লাইন্ড স্পট পর্যবেক্ষণসহ যানবাহনগুলো বাইরের চারপাশে রাডার সেন্সর এবং ক্যামেরা স্থাপন করে, যা চালকদের চলাচল এবং তাদের আশপাশে অন্যান্য যানবাহনের উপস্থিতি সম্পর্কে সতর্ক করে। 
‘লেন প্রস্থান’ সতর্কীকরণ সিস্টেম হলো একটি চাকা যখন অনিচ্ছাকৃতভাবে একটি টার্ন সিগন্যাল ছাড়াই একটি লেন লাইন অতিক্রম করে, তখন তা শনাক্তকরণে সহায়তা করে। ‘স্পিড ওয়ার্নিং’ সিস্টেম গাড়ির চালককে গতিসীমা সতর্ক করার জন্য ব্যবহৃত হয়। সিস্টেমটি বিল্ট-ইন স্পিড সেন্সর ব্যবহার করে যখন তারা গতি সীমা অতিক্রম করে, তখন ড্রাইভারকে অবহিত করে। এই প্রযুক্তি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল কিংবা কাজের জোনের গতি সীমা স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিবর্তন ও ট্র্যাক করতে পারে।

গাড়িতে অনেক ইলেকট্রনিক্স ইন্সটল করার কারণে, অদূর ভবিষ্যতে হয়তো সাইবার নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় আনতে হবে। কারণ, ড্রাইভার যদি ব্লুটুথের মাধ্যমে তাদের ফোন সংযোগ করে, তাহলে গাড়িটি হ্যাক হতে পারে। আমাদের দেশে এখন চারলেন, আটলেন, ফ্লাইওভার, এক্সপ্রেস হাইওয়ে, পদ্মা সেতু, বঙ্গবন্ধু  টানেল– সবটাতেই আধুনিক প্রযুক্তি সংযুক্তি হয়েছে। অন্যান্য সড়ক ও রেলপথেও ভবিষ্যতে নিত্য নতুন প্রযুক্তি সংযুক্ত হবে। সেইসঙ্গে গাড়ির মডেলও চেঞ্জ হবে, সংযোজিত হবে আধুনিক এসব ডিভাইস। সেজন্য গাড়ির চালকদেরও এসব প্রযুক্তি ব্যবহারে সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। স্মার্ট যোগাযোগ ব্যবস্থা সৃষ্টিতে অবদান রাখতে হবে।

লেখক : অধ্যাপক, তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, আইআইটি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

×