ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২ ফাল্গুন ১৪৩০

টরন্টোর চিঠি

মমত্বের শিক্ষায় দীক্ষিত হই

ড. শামীম আহমেদ

প্রকাশিত: ২১:১৫, ২৮ নভেম্বর ২০২৩

মমত্বের শিক্ষায় দীক্ষিত হই

ড. শামীম আহমেদ

নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ট্রান্সজেন্ডার নারী হোচিমিনকে আমন্ত্রণ জানানো  ও শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদে আমন্ত্রণ বাতিল এবং সন্তানকে অভাব অথবা আভিজাত্য শেখানো নিয়ে দেশের শিক্ষিত সমাজ দ্বিধাবিভক্ত। এই দুটি বিষয় আমাদের সমাজ, সংস্কৃতি এবং শিক্ষা ব্যবস্থাকে দিকনির্দেশ করে বিধায় এ বিষয়ে কিছু লেখার তাগিদ অনুভব করছি। নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটিতে এত পরিমাণ শিক্ষার্থী হোচিমিনকে অতিথি হিসেবে মেনে নিতে আপত্তি জানিয়েছে যে, বিষয়টি আমাকে বিস্মিত করেছে। নিজে কখনো নর্থসাউথে পড়িনি। দেশের সেরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং নর্থসাউথের প্রতিদ্বন্দ্বী অন্যতম সেরা প্রাইভেট ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি।

নর্থসাউথে না পড়েও নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি এক ধরনের শ্রদ্ধা কাজ করে। দেশের প্রথম প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে তারা একটি শক্ত অবস্থানে দাঁড়িয়েছে এবং পশ্চিমাবিশ্বে হাতেগোনা দু’চারটি বাংলাদেশী সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একই কাতারে নর্থসাউথ আর ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিকে গণ্য করা হয়। আমার ঢাকা ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির মাস্টার্সকে কানাডায় মাস্টার্সের সমমান গণ্য করা হয়নি, কিন্তু ব্র্যাকের পাবলিক হেলথের মাস্টার্সকে কানাডার মাস্টার্সের সমমান গণ্য করা হয়েছিল। নর্থসাউথের ডিগ্রিকেও পশ্চিমাবিশ্বে যথেষ্ট মূল্যায়ন করা হয়।

এখন হোচিমিনকে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনুষ্ঠানে আসতে না দিতে চাওয়া বিস্ময়কর হলেও তার প্রতিক্রিয়ায় নর্থসাউথের বিরুদ্ধে মানুষের উল্লাস আমাকে বিস্মিত করেছে। অর্ধেক মানুষ হোচিমিনকে মারতে চায়, অর্ধেক মানুষ মারতে চায় নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়কে। খেয়াল করে দেখেছি, জাতি হিসেবে আমরা কোনো কিছু সমাধান করতে চাই না। আমাদের মূল আগ্রহ সব ভেঙেচুরে ধ্বংস করে ফেলায়। লালনের গান ভাল লাগে না, তার ভাস্কর ধ্বংস করে ফেল। সরকার ভাল লাগে না, নিজেদের ট্যাক্সের টাকায় কেনা বাস পুড়িয়ে ফেল। প্রতিবেশীকে ভালো লাগে না, তার পুকুরের মাছ বিষ ছড়িয়ে মেরে ফেল। কর্মক্ষেত্রে কারও মতাদর্শ ভাল লাগে না, তার ক্যারিয়ার ধ্বংস করে ফেল।

নিজেরা খেলতে পার না, অন্যের ব্যর্থতায় উৎসব কর। জীবনে সফলতা আনতে পার না, নিরীহ পশু-পাখির ওপর অত্যাচার কর। চারদিকে কেবল ধ্বংস আর ধ্বংস। হোচিমিনকে কেন্দ্র করে যে বিবাদ, তার প্রতিক্রিয়ায় শত শত পোস্ট দেখলাম, একটাতেও উল্লেখ করতে দেখলাম না, চলুন হোচিমিন আর প্রতিবাদরত শিক্ষার্থীদের নিয়ে বসি। সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করি। চিন্তার উন্মেষ ঘটাই। 
হোচিমিনের সঙ্গে ফেসবুকে সংযুক্ত আছি অনেকদিন। তার জীবনাদর্শন, বিশ্বাসকে সম্মান জানাই। নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়োজকরা যে তাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন, তাদেরও স্বাগত জানাই। কয়টা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, টিভি চ্যানেল, পত্রিকা অফিস, করপোরেট হাউস হোচিমিনকে তাদের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানায়? হতে পারে মুষ্টিমেয় কয়েকটি, কিন্তু সবাই কি? যারা সমালোচনা করছেন নর্থসাউথের, তাদের ক’জন তাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন? যার যার ধর্ম তার তার কাছে- এই যে একটা বিশ্বাস ছিল আমাদের সমাজে, যেটি প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে।

আমার বিশ্বাস নিয়ে আমি থাকি, তোমারটা নিয়ে তুমি থাকো- এর চাইতে সাদাসিধে জীবনদর্শন আর কী হতে পারে? তা না, আমাদের সবাইকে নিজেদের বিশ্বাসে নিয়ে আসতে হবে। না হলে একে অন্যের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। আমার সঙ্গে আরেকজনের দ্বিমত মানেই আমাদের শত্রু হতে হবে? সবাইকেই ব্রাজিলের সাপোর্টার হতে হবে? কেউ আর্জেন্টিনা করবে না? সবাইকেই অস্ট্রেলিয়ার সাপোর্টার হতে হবে? কেউ ওয়েস্ট ইন্ডিজ হবে না? কেউ আস্তিক, কেউ নাস্তিক; কেউ হিন্দু, কেউ খ্রিস্টান - এটাই তো একটা আদর্শ সমাজের চিত্র হওয়ার কথা। অন্যকে আঘাত না করে হোচিমিন কীভাবে তার জীবনকে গোছাবেন, সেটা নিয়ে কেন একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এতটা প্রতিক্রিয়াশীল হবে? তাদের এসব প্রতিক্রিয়া কি চার বছরের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে জন্ম নিতে পারে?

মানুষের মনে একটা বিশ্বাস জন্মাতে, সেটি বেড়ে উঠতে ও গেড়ে বসতে বছরের পর বছর লাগে। সে শিশুকালে কোন্ পরিবেশে বড় হয়, স্কুলে কী শেখে, বাড়িতে কী শেখে, তার বাসায় রাতের খাবারের টেবিলে কী আলোচনা হয়, সেগুলো তার অন্যের প্রতি শ্রদ্ধা, সম্মান কিংবা ঘৃণা, বিতৃষ্ণা জন্মাতে ও বেড়ে তুলতে সাহায্য করে। নর্থসাউথের কিছু শিক্ষার্থীর মধ্যে যে অসহিষ্ণু আচরণ, তা দুর্ভাগ্যজনক। কিন্তু কেবল নর্থসাউথের চিত্র নয়; আপনি দেশের যে কোনো সরকারি-বেসরকারি স্কুল-কলেজ-ইউনিভার্সিটিতে যান, একই চিত্র দেখবেন। মূলত আমাদের সমাজে সর্বক্ষেত্রে যে বিভাজন; হয় এই পক্ষ না হলে ওই পক্ষ, হয় কালো না হলে সাদা- এই যে অবস্থান, এটি আমাদের আজকের যুদ্ধের ময়দানে নিয়ে এসেছে। যারা সরাসরি কারও বিরুদ্ধাচরণ করে না, তাদের বলা হয় সুবিধাবাদী!

ডিপ্লোমেসিকে আমাদের সমাজে বিবেচনা করা হয় কূটিলতা হিসেবে! হোচিমিন, যে অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে আপনি গেছেন, আপনি তার প্রাপ্য নন। একটি পতিত সমাজের প্রতিক্রিয়াশীলতার শিকার আপনি। পশ্চিমাবিশ্বে মানুষের বন্ধু কম থাকে, পরিবার থাকে আরও ছোট, সামাজিক জীবন হয় প্রায় অদৃশ্য। ছোট থাকতে আমাদের শেখানো হয়েছে পশ্চিমারা স্বার্থপর, কিন্তু যতদিন যাচ্ছে, বুঝতে পারছি; এটিই আরাধ্য জীবন। মানুষ অন্যের জীবনে যত নাক গলানো বন্ধ করবে, সমাজ ততই সুন্দর হবে। আমাদের নাক আর আঙুলটা আমরা অন্যের কাছে ইজারা দিয়ে রাখি বলেই এত হানাহানি।
দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, পরিবর্তন আসবে। বড় ধরনের পরিবর্তনের আগে একটা ভাঙচুর হয়। আমাদের সমাজে এখন সেই কাক্সিক্ষত ভাঙচুরটা চলছে। হোচিমিনসহ অনেকেই সেই আরাধ্য পরিবর্তন আনতে সহায়তা করবেন। সেই পথে বাধাও থাকবে অনেক। তবে এক সময় সেসব বাধা কেটে যাবে। অন্যের জীবন থেকে নিজের নাক ও আঙুল মানুষ নিজের ঘরে ফিরিয়ে আনবে। কিছুটা সময় লাগবে, কিন্তু হবে। বিশ্বাস করি, অন্যসব বিশ্ববিদ্যালয় এবং নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয় খুব শীঘ্রই হোচিমিনকে তাদের ক্যাম্পাসে বক্তা হিসেবে নিয়ে আসবে। শুধু হোচিমিনই নন, যে কোনো ধর্মবর্ণ-লিঙ্গে বিশ্বাসী মানুষ তার মতপ্রকাশ করবে দ্বিধাহীনচিত্তে।

এটি স্বাধীনতার জন্য ৩০ লাখ মানুষের জীবন দিয়ে দেওয়া দেশে খুব বড় কোনো স্বপ্ন হওয়ার কথা নয়। তাই এর বাস্তবায়ন সময়ের বিষয় মাত্র। এই চলমান প্রক্রিয়ায় হোচিমিন আরও আত্মবিশ্বাসী হবেন, নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়োজকরা আরও সাহসী হবেন এবং যারা কলম হাতে লিখে যান, তারা সমাজে রক্ত না ঝরিয়ে, বিরোধিতা ও হানাহানি না বাড়িয়ে যুক্তি, ভালোবাসা ও সমাধানের পথ বাতলাবেন, এই কামনা করি। 
সন্তানকে কী শেখাতে হবে আর কী শেখাতে হবে না; সে বিষয়ক তর্ক-বিতর্ক-অভিমত দেখে বিমূঢ় হয়ে যাই। মূল বিতর্ক যেখানে একদল বলছে সন্তানকে অভাব শেখান, আরেক দল বলছে সন্তানকে আভিজাত্য শেখান। দু’দলের বিতর্ক দেখে মনে হচ্ছে, এই বাংলাদেশকে তো চিনি না। তারা নিশ্চয় এমন দেশে বাস করেন, যেই দেশে কখনো বাস করিনি। বাংলাদেশের ৯৯.৯৯% মানুষ জীবনের কোনো না কোনো ধাপে অভাব দেখে বড় হয়েছে। একটি উন্নয়নশীল দেশের অংশ হিসেবে হাতেগোনা কিছু পরিবার ছাড়া সবারই কোনো না কোনো অভাব দেখার কথা।

কিন্তু ‘সন্তানকে অভাব শেখান’ পড়লে মনে হচ্ছে নোবেলজয়ী উদ্যোক্তা ড. মুহম্মদ ইউনূসের দারিদ্র্যকে জাদুঘরে পাঠানোর স্বপ্ন বুঝি ইতোমধ্যে বাস্তবে পরিণত হয়েছে! দেশের কোটি কোটি মানুষকে যেখানে সারাবছর গরুর মাংসের কেজি আর আলুর দাম নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকতে হয়, সেখানে সন্তানকে অভাব আলাদা করে শেখাতে হবে? আমার মাথায় বিষয়টা ঢোকে না। আবার যে অংশ বলছেÑ সন্তানকে আভিজাত্য শেখাতে হবে, একজোড়া জুতা কিনে দিলেও সেটি হতে হবে নামকরা কোম্পানির, সবচেয়ে দামি জুতাÑতখনো আমি হা করে তাকিয়ে থাকি! সন্তানের ‘নজর উঁচা’ করার এই পুঁজিবাদী আস্ফালন কোথা থেকে এলো একসময় শিল্প-সাহিত্যপ্রেমী জাতি হিসেবে পরিচিত বাঙালির জীবনে?

অথচ কেবলই মনে হয় সন্তানকে তো আরও শেখানোর আছে, শেখানোর ছিল। সন্তানকে তো শেখানোর দরকার ছিল জীবনের কোনো পর্যায়ে যাতে মিথ্যা কথা বলতে না হয়। যাতে মানুষের মনে কষ্ট দিতে না হয়। যাতে কর্কশ না হতে হয়। যাতে অসৎ না হতে হয়। আমাদের সমাজে এখন সততা, সত্যবাদিতা, দয়া, নম্রতার আগে অভিভাবকদের মাঝে কাজ করে সন্তানকে অভাব আর আভিজাত্য শেখানোর চিন্তা? সন্তানকে তো শেখানো উচিত, যাতে তারা রাস্তার কুকুর-বিড়ালের প্রতি দয়াবান হয়। বাসার কাজের মানুষটির প্রতি মানবিক হয়, রাস্তায় সিগন্যালের মোড়ে গাড়ির কাঁচে টোকা মারা সমবয়সী শিশুটির প্রতি সমব্যথী হয়।

সন্তানকে তো শেখানো উচিত দেশপ্রেম, মুক্তিযুদ্ধ, সাহিত্য-সংস্কৃতি-সংগীত, বাংলা ভাষার প্রতি মমত্ব। অথচ এসবের আগে সন্তানকে শেখানোর বিতর্ক হয় অভাব আর আভিজাত্য নিয়ে? সন্তানকে শেখাতে হতো যে ধর্মবর্ণ-লিঙ্গভেদে সকল মানুষ সমান। অর্থ-প্রতিপত্তি-শিক্ষার ভিন্নতা সত্ত্বেও সকল মানুষ সমান। শেখাতে হতো অন্যের বিপদে এগিয়ে আসা, অন্যের সাফল্যে আনন্দিত হওয়ার শিক্ষা। শেখাতে হতো নিজের আনন্দ অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া, নিজের বিত্ত অন্যের মাঝে বিলিয়ে দেওয়ার আনন্দের গল্প। সন্তানকে শেখাতে হতো সাফল্যে ও বিজয়ে বিনয়, ব্যর্থ ও বিফলতায় প্রজ্ঞা ও ধৈর্যের শিক্ষা। সেখানে তর্ক করতে হচ্ছে অভাব আর আভিজাত্য শেখানো নিয়ে? 
এই সমাজ তো চিনি না। এই সমাজ কবে, কখন কিভাবে গড়ে উঠল? সেই দায় আমরা কীভাবে এড়াব? কীভাবে আমরা আবার আমাদের বাঙালি সংস্কৃতির মূলে ফিরে যাব? 


টরন্টোর চিঠি
নভেম্বর ২৮, ২০২৩

×