ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ২৩ জুন ২০২৪, ৯ আষাঢ় ১৪৩১

জাতির পিতা স্মরণে

সাজ্জাদুল হাসান

প্রকাশিত: ২১:৩২, ১৮ মার্চ ২০২৩

জাতির পিতা স্মরণে

.

হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি, বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। যার হাত ধরে বাঙালি জাতি দীর্ঘ সংগ্রাম পরিক্রমায় পরাধীনতার নাগপাশ ছিন্ন করে পেয়েছে স্বাধীনতা। বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষে এক স্বাধীন-সার্বভৌম ভূখন্ড যিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন তিনি হলেন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

যাঁর জন্ম না হলে বাংলাদেশ নামের একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্ম হতো না। সেই ধন্য পুরুষের চলছে ১০৩তম জন্মবার্ষিকী। কবি শামসুর রাহমানেরধন্য সেই পুরুষকবিতার ভাষায়Ñ

ধন্য সেই পুরুষ যাঁর নামের ওপর পতাকার মতো/দুলতে থাকে স্বাধীনতা,/ধন্য সেই পুরুষ যাঁর নামের ওপর ঝরে/মুক্তিযোদ্ধাদের জয়ধ্বনি।

নিপীড়িত মানুষের নেতা, গণমানুষের নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধুর নাম বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। বিশ্বনেতাদের চোখে তিনি হিমালয়সম। শিশুকাল থেকে শেখ মুজিবুর রহমান গ্রামীণ সমাজের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, আবেগ-অনুভূতি প্রত্যক্ষ করেছেন। শৈশব থেকে তৎকালীন সমাজ জীবনে জমিদার, তালুকদার মহাজনদের অত্যাচার, শোষণ প্রজাপীড়নে চরমভাবে ব্যথিত হতেন।

গ্রামের হিন্দু-মুসলমানদের সম্মিলিত সম্প্রীতির সামাজিক আবহে তিনি দীক্ষা পান অসাম্প্রদায়িক চেতনার। বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির সাধনার মূলে অন্যতম আদর্শ ছিল অসাম্প্রদায়িকতা মানবতাবাদ। আদর্শের ওপর ভিত্তি করেই বঙ্গবন্ধু বাঙালির মুক্তির জন্য সারাজীবন সংগ্রাম করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় জাগরিত হয়ে মুক্তিযুদ্ধে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষ যুদ্ধ করেছিল একটি ক্ষুধা দারিদ্র্যমুক্ত অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। বঙ্গবন্ধু মার্চের ভাষণে বাঙালি জাতির প্রতি সশস্ত্র সংগ্রামের যে আহ্বান জানিয়েছিলেন তা ছিল ধর্ম-বর্ণ, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার প্রতি। তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল স্তরের পেশার মানুষ।

ইংল্যাল্ডে বাংলাদেশ হাইকমিশন এবং লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস (এলএসই) দক্ষিণ এশিয়া কেন্দ্র কর্তৃক আয়োজিত এক বক্তৃতায় নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক অমর্ত্য সেন বলেন, ‘The Indian subcontinent is going through a hard situation due to ideological misleading and we have many reasons to seek help from Bangabandhu aiming to get encouraged and direction to this end. Sheikh Mujibs thoughts and judgements are still relevant. Sheikh Mujib was one of the pioneers of secularism, and many countries, including India, can take lessons from his instance in this regard.

হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্কুলজীবনেই রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়েন। কৈশোরে গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রাবস্থায় ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে যোগদানের কারণে প্রথমবারের মতো গ্রেপ্তার হয়ে কারাবরণ করেন। ম্যাট্রিক পাসের পর কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে অধ্যয়নকালে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী শেরেবাংলা একে ফজলুল হকসহ তৎকালীন প্রথম সারির রাজনৈতিক নেতাদের সান্নিধ্যে আসেন।

ওই সময় থেকে নিজেকে ছাত্র-যুবনেতা হিসেবে রাজনীতির অঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত করেন। দীর্ঘ ২৩ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামের পথপরিক্রমায় ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ৫৪-এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬-এর ছয় দফা আন্দোলন, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান পেরিয়ে ৭০ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।

বঙ্গবন্ধু সারাজীবন এদেশের মাটি মানুষের অধিকার আদায়ে সংগ্রাম করেছেন। বাঙালি জাতির মুক্তির জন্য জীবনের প্রায় ১৪ বছর পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি থেকেছেন। দুইবার ফাঁসির মঞ্চে মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছেন; কিন্তু আত্মমর্যাদা বাঙালি জাতির অধিকারের প্রশ্নে কখনো মাথানত করেননি। বাঙালি জাতির মহানায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মাত্র ৫৫ বছর বেঁচেছিলেন। এই স্বল্প জীবনের বেশিরভাগ সময়ই দেশের মানুষের জন্য কাজ করতে গিয়ে শাসকশ্রেণির রোষানলে পড়ে বারবার কারাবরণ করতে হয়েছে। কারাগারে বসেই কেটেছে জীবনের আটটি জন্মদিন। বঙ্গবন্ধুকে সর্বপ্রথম ১৯৫০ সালে তাঁর ৩১তম জন্মদিন কারাগারে কাটাতে হয়। এরপর ১৯৫১ সালে ৩২তম, ১৯৫৯ সালে ৪০তম, ১৯৬০ সালে ৪১তম, ১৯৬১ সালে ৪২তম, ১৯৬২ সালে ৪৩তম, ১৯৬৭ সালে ৪৮তম এবং ১৯৬৮ সালে ৪৯তম জন্মদিন কাটাতে হয়েছে পাকিস্তানের বন্দিশালায়।

বঙ্গবন্ধু কখনো আনন্দ-উচ্ছ্বাসে নিজের জন্মদিন পালন করতেন না। ১৯৬৭ সালের ১৭ মার্চ ৪৮তম জন্মদিনে তিনি বলেন, ‘আমি একজন মানুষ, আর আমার আবার জন্মদিবস!’ (কারাগারের রোজনামচা, পৃষ্ঠা-২০৯) জন্মবার্ষিকী তিনি কোনোদিনই নিজে পালন করেননি। তিনি লিখেছেন, ‘আমার জন্মবার্ষিকী আমি কোনোদিন নিজে পালন করি নাইÑ বেশি হলে আমার স্ত্রী এই দিনটাতে আমাকে ছোট্ট একটি উপহার দিয়ে থাকত। এই দিনটিতে আমি চেষ্টা করতাম বাড়িতে থাকতে।’ (কারাগারের রোজনামচা, পৃষ্ঠা-২০৯)

১৯৭১ সালের উত্তাল মার্চে ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৫২তম জন্মদিন। ১৬ মার্চ ঢাকায় মুজিব-ইয়াহিয়ার মধ্যে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা শুরু হয়। ১৭ মার্চও সকাল ১০টায় প্রেসিডেন্ট ভবনে (বর্তমান রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন সুগন্ধা) দুই নেতা আবারও বৈঠকে বসেন। ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে আলোচনা শেষে ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বাড়িতে পৌঁছার পর দেশী-বিদেশী সাংবাদিকরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সঙ্গে আলোচনায় মিলিত হন। এক পর্যায়ে একজন বিদেশী সাংবাদিক জানতে চান, ‘আপনার এই জন্মদিনে সবচেয়ে বড় কামনা কী?’ জবাবে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘জনগণের সার্বিক মুক্তি।জনগণের সার্বিক মুক্তির লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধুর মার্চের তেজোদীপ্ত ভাষণ প্রজ্বলিত করেছিল মুক্তিযুদ্ধের সেই দাবানল, যার সামনে টিকতে পারেনি শক্তিশালী পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তাদের এদেশীয় সহযোগীরা। ১৯৭১ সালের মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে বিশাল জনসমুদ্রের সামনে তিনি যে ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন তা ছিল বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ।

বঙ্গবন্ধুর মার্চের ঘোষণা মুক্তিকামী মানুষের কাছে লাল-সবুজ পতাকাকে দৃশ্যমান করে তোলে। আর এরই মাধ্যমে বাঙালির ইতিহাসে এক গৌরবময় অধ্যায়ের সূচনা হয়। বাংলার হাজার বছরের ইতিহাসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হলেন একমাত্র নেতা যিনি রক্তে, বর্ণে, ভাষায়, সংস্কৃতিতে এবং জন্মে একজন পূর্ণাঙ্গ বাঙালি। তাঁর রাজনৈতিক অসীম প্রজ্ঞা, বজ্রকঠিন কণ্ঠ এবং মোহনীয় ব্যক্তিত্বে সহজেই আবিষ্ট হয়ে সাধারণ মানুষ মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে স্বাধীনতা অর্জন করে।

বঙ্গবন্ধু নিজের জন্মদিন উপলক্ষে সরকারি ছুটির বিপরীতে দিনটিকে কঠোর শ্রম বৃহত্তর কল্যাণে আত্মনিয়োগের জন্য বিশেষভাবে পালনের নির্দেশ দিয়েছিলেন। ১৭ মার্চ ১৯৭২ সালে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর জন্মদিন উপলক্ষে যে বাণী দিয়েছেন তার বিবরণ দেয়া হলো।

প্রিয় দেশবাসী, আমার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের আগে বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে আমার সহকর্মীরা আমার জন্মদিন উপলক্ষে ১৭ মার্চকে সরকারি ছুটি হিসেবে ঘোষণা করেছেন। আপনারা জানেন, সময় আমি ফ্যাসিস্ট শাসকের কারাগারে আবদ্ধ ছিলাম। আমার প্রতি ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে যারা সরকারি ছুটি ঘোষণা করেছিলেন আমি তাঁদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি। বর্তমানে আমি আমার জনগণের মধ্যে কাজ করছি ফিরে এসেছি। আমি মনে করি না মার্চ ১৭-কে সরকারি ছুটি হিসেবে চিহ্নিত করার প্রয়োজন আছে। তবে আমি মনে করি দিনটি কঠোর শ্রম ত্যাগের দিন হিসেবে বিবেচনা করা যায়। (সূত্র : সংবাদপত্রে বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন ১৯৭২-১৯৭৫; পৃষ্ঠা-৩০-৩১)

আজকের শিশুরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। তাই শিশুদের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠা পরিশ্রমী জাতি হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন ১৭ মার্চকে জাতীয় শিশু দিবস ঘোষণা করে। ১৯৯৭ সাল থেকেই দিবসটি পালন শুরু হয়। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ চেতনাকে ধারণ করে তাঁর সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শিশুদের পরিশ্রমী হওয়ার মূলমন্ত্রে দীক্ষিত করার পাশাপাশি বাংলাদেশের জনগণকে উদ্বুদ্ধ করে উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।

বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধু এক অবিচ্ছেদ্য নাম। বাংলাদেশ, বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতির অবিভাজ্য সম্পর্কের কোনো পরিসমাপ্তি নেই। তিনি ছড়িয়ে আছেন বাঙালিদের হৃদয়ে। ছড়িয়ে আছেন বিশ্বময়। তিনি আছেন তাঁর বজ্রকণ্ঠ বাণীতে। তিনি আছেন দেশের মানুষের হৃদয়ে, মুজিব অমর। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সুখী-সমৃদ্ধ সোনার বাংলা বাস্তবায়নে আমাদের নতুন প্রজন্মকে দেশপ্রেম, সততা নিষ্ঠাবোধ জাগ্রত করার মাধ্যমে তাদের প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। সকলকে মহান মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস এবং বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে জানতে হবে।

           

লেখক : সাবেক সিনিয়র সচিব

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়

 

×