ঢাকা, বাংলাদেশ   বুধবার ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১৯ মাঘ ১৪২৯

monarchmart
monarchmart

ভাল-খারাপের আমলনামা

অধ্যাপক ডা. মামুন আল মাহতাব (স্বপ্নীল)

প্রকাশিত: ২১:৩৫, ২৭ নভেম্বর ২০২২

ভাল-খারাপের আমলনামা

.

ছুটিতে দেশে বেড়াতে আসা বন্ধুর সঙ্গে আড্ডা হচ্ছিল। বহুদিন দেশের বাইরে কিন্তু বাংলাদেশ সম্বন্ধে জানার আগ্রহ তার বিস্তর। জানতে চাইলেন বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে খারাপ সময় ছিল কোন্্টি? ’৭৫ থেকে ’৮১-নামে-বেনামে, বেশে-ছদ্মবেশে জেনারেল জিয়ার শাসন না তার ঠিক পরপর প্রায় দশকজুড়ে জেনারেল এরশাদের শাসনকাল, প্রশ্নটা শুনে প্রথমে একটু থতমত খেয়ে গেলাম। স্বাধীন বাংলাদেশে পাকিস্তানি ভাবধারার শাসকরা দেশটাকে সরাসরি শাসন করেছেন ’৭৫ থেকে ২০০৯ অবধি। মাঝে ’৯৬ থেকে ২০০১ আওয়ামী লীগের পাঁচটি বছর বাদ দিয়ে।

এ সংক্রান্ত যে কোনো আলোচনাতেই বিষয়গুলো উঠে এলেও এই দুই জেনারেলের মধ্যে কে বেশি খারাপ, তেমন আলোচনায় সচরাচর আমরা যাই না। খারাপ তো খারাপই, খারাপের মধ্যে আবার ‘ভালো খারাপ’ আর ‘খারাপ খারাপ’ আছে কি? দুজনই ছিলেন উর্দি পরা সেনা শাসক। যারা দুজনই গণতন্ত্রকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে গদিতে উড়ে এসে জুড়ে বসেছিলেন আর গণতন্ত্রের লেবাস পরে গণতন্ত্রকে দেশছাড়া করেছিলেন। দুজনের সময়ই দেশটাকে আবারো পাকিস্তান বানানোর সব আয়োজন সম্পন্ন করা হয়েছিল; এ কাজটি করতে গিয়ে  তারা দুজনই মুক্তিযোদ্ধা আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ভাগাড়ে পাঠানোর পাশাপাশি ব্যাপকভাবে রাজাকার তোষণ ও পোষণ করেছেন। তাদের দুজনের কেবিনেটেই রাজাকাররা গাড়িতে জাতীয় পতাকা উড়িয়ে রাজপথ দাপিয়ে বেড়ানোর সুযোগ পেয়েছেন। কাজেই তাদের মধ্যে কে যে বেশি খারাপ আর কে কম সেটা বিচার বিশ্লেষণ করাটা আসলেই দুঃসাধ্য।
ব্যক্তিগত লাভ-ক্ষতি যদি বিবেচনায় আনি, তাহলে দেশকে পাকিস্তানিকরণের এই প্রক্রিয়ায় আমার পরিবারের কোল্যাটারাল ড্যামেজের পরিমাণটা এই দুই আমলেই কমবেশি প্রায় সমান। জেনারেল জিয়া ক্ষমতায় আসার পর আমার চাচাশ্বশুর শহীদ বুদ্ধিজীবী ডা. আবদুল আলিম চৌধুরীর কনিষ্ঠ ভ্রাতা মরহুম ইঞ্জিনিয়ার আবদুল হাফিজ চৌধুরীকে দেশছাড়া হতে হয়েছিল। অন্যদিকে, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে আমার প্রয়াত পিতা ইঞ্জিনিয়ার মাহতাব উদ্দিন আহমেদের প্রমোশনের ফাইলটি প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক জেনারেল এরশাদের টেবিল থেকে ফিরে এসেছিল পিতার চাকরি থেকে বরখাস্তের আদেশ হয়ে। ক্ষমতাশালী এক জেনারেলের ভাতিজার বিরাগভাজন হওয়ার কারণে আমার এসএসসি পরীক্ষার ঠিক আগ মুহূর্তে আমাদের জীবনটা এভাবেই কলমের এক খোঁচায় উল্টে-পাল্টে দিয়েছিল এই জেনারেল। কাজেই ব্যক্তিগত ক্ষয়ক্ষতির হিসাব কষেও যখন কোনো সমাধান পাই না, তখন বিষয়টা সহসাই জলবত তরলং হয়ে গেল।
এরশাদ যে খারাপ ছিলেন সেটি প্রমাণের জন্য কোনো যুক্তিতর্ক উত্থাপনের প্রয়োজন পড়ে না সেটা যেমন সত্যি, তেমনি এটাও তো সত্যি যে, তার হাত অন্তত হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধা, সেনাবাহিনী সদস্য, বিমানসেনা ও বিমান কর্মকর্তার রক্তে রঞ্জিত নয়। এরশাদ যত খারাপই হন না কেন, তিনি তো ব্যাকডেটে আইন করে কর্নেল তাহেরের মতো কোন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে ফাঁসিতে ঝোলাননি। জেনারেল জিয়ার সময়কার একজন প্রভাবশালী মন্ত্রীর মুখে শুনেছি, ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত তার এক সেনা কর্মকর্তা আত্মীয়ের দন্ড মওকুফের জন্য তিনি রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়ার কাছে অনুরোধ জানিয়েছিলেন। আশ্বাসের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতির অনুমোদন নিয়ে তিনি ঢাকা থেকে হেলিকপ্টারে চেপে ঢাকা খুব কাছেই একটি সেনানিবাসে পৌঁছে জানতে পারেন, পৌঁছানোর মাত্র আধা ঘণ্টা আগেই ঐ সেনানিবাসটিতে তার ঐ আত্মীয়ের মৃত্যুদ- কার্যকর করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতি নিজে ফোন করে সকালবেলা মৃত্যুদ-টি কার্যকর হওয়া নিশ্চিত করেছিলেন। মন্ত্রী মহোদয় হেলিকপ্টারে করে আত্মীয়ের লাশ নিয়ে ঢাকায় ফিরেছিলেন। এরশাদের জমানায় কোনো মন্ত্রীর তো অন্তত এমন অভিজ্ঞতা হয়নি।
তবে সবচেয়ে যা গুরুত্বপূর্ণ তা হলো এরশাদের হাত তো জাতির পিতা আর তার পরিবারের রক্তে রঞ্জিত নয়। তিনি তো কারাগারে বন্দী মুক্তিযুদ্ধকালীন স্বাধীন বাংলাদেশের চার মূল স্থপতিকে হত্যা করেননি। কাজেই এই দুই খারাপের ভেতর কে যে বেশি খারাপ তা নিশ্চয়ই আর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের দাবি রাখে না। আমার ঐ প্রবাসী বন্ধুর সঙ্গে আড্ডায় এই আলোচনার সূত্রপাত বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল সাহেবের একটি বক্তব্যের সূত্র ধরে। কদিন আগে তিনি মন্তব্য করেছেন, তারা নাকি পাকিস্তান আমলেই ভালো ছিলেন। তার ঐ বক্তব্যের সূত্র ধরেই আমার প্রবাসী বন্ধু জানতে চাচ্ছিলেন, স্বাধীন বাংলাদেশের কোন্্ সময়টায় আমরা পাকিস্তানের চেয়ে খারাপ ছিলাম, যে কারণে মির্জা ফখরুলের মতো নেতার এমন মন্তব্য। আমি যখন রায়টা দিলাম, আমার ঐ বন্ধুও আমার সঙ্গে একমত হলেন। তবে তিনি তার নিজের একটা উপলব্ধিও জুড়ে দিলেন। পাকিস্তান আমল বাংলাদেশ জেনারেল জিয়ার আমলের চেয়ে ভালো ছিল না বলে বরং বলা ভালো, ঐ সময়টায় আমরা পাকিস্তান আমলের চেয়েও খারাপ ছিলাম। অতএব, মির্জা ফখরুলকে এমন একটি অসাধারণ বাস্তবকে সামনে নিয়ে আসার জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে আলোচনায় যতি টানলাম।    
লেখক : ডিভিশন প্রধান, ইন্টারভেনশনাল হেপাটোলজি ডিভিশন ও সদস্য সচিব, সম্প্রীতি বাংলাদেশ

 

 

monarchmart
monarchmart