ঢাকা, বাংলাদেশ   মঙ্গলবার ০৪ অক্টোবর ২০২২, ১৯ আশ্বিন ১৪২৯

এত মৃত্যুর পরেও টনক নড়ছে না কেন

মোঃ সাখাওয়াত হোসেন

প্রকাশিত: ২৩:০৪, ১৮ আগস্ট ২০২২

এত মৃত্যুর পরেও টনক নড়ছে না কেন

.

রাষ্ট্রীয় নির্মাণাধীন স্থাপনাগুলোর (ফ্লাইওভার, উড়াল সেতু, বিআরটি ইত্যাদি) অব্যবস্থাপনার কারণে যত্রতত্র দুর্ঘটনা ঘটেই চলছেসেখানে জবাবদিহির বালাই নেইএকে অন্যের ওপর দোষ চাপিয়ে দেয়ার একটি অপচেষ্টা লক্ষ্য করা যায় সবসময়ইসমস্যা সমাধানে পদক্ষেপ গ্রহণ কিংবা পুনরায় এ ধরনের দুর্ঘটনা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয়ে কারোর কোন ভ্রুক্ষেপ নেইএকে অন্যকে দোষারোপ করার ক্ষেত্রে আমাদের জুড়িমেলা ভারকিন্তু সম্মিলিতভাবে কার্যাদেশ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যে বা যারাই সংশ্লিষ্ট তাদের প্রত্যেকের দায় রয়েছে দুর্ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রেআরও একটি বিষয় হচ্ছে, এ ধরনের ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হওয়া সাধারণ মানুষ সহজে ক্ষতিপূরণ পায় না।  ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে ভিক্টিমের স্বার্থে দেশব্যাপী সহমর্মিতা, প্রতিবাদ ও বিক্ষোভের ঘটনা ঘটলেও দুতিনদিন পরেই সব কেমন ঠান্ডা হয়ে যায় অর্থা স্থবির হয়ে পড়েসে কারণেই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে দায়ী পক্ষদের বাধ্য করা সম্ভব হয়ে ওঠে নাদোষীরাও ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে

সম্প্রতি উত্তরার জসীমউদ্দিন এলাকার প্যারাডাইস টাওয়ারের কাছে বিআরটি প্রকল্পের গার্ডার ভেঙ্গে দুমড়ে মুচড়ে যায় একটি গাড়িগার্ডারটি ক্রেন দিয়ে ওঠানোর চেষ্টার সময় প্রাইভেট গাড়িটির ওপর সেটি পড়ে যায় এবং সঙ্গে সঙ্গে গাড়ির ভেতর থাকা শিশুসহ পাঁচযাত্রীর মৃত্যু হয়চট্টগ্রামে ফ্লাইওভার ধসে মানুষের মৃত্যুর ঘটনাও আমাদের অজানা নয়এদিকে চকবাজারে পলিথিন কারখানায় অগ্নিকা-ের ঘটনায় ৬ শ্রমিক মারা যায়এ ধরনের অসংখ্য মৃত্যুর ঘটনা পত্রিকার পাতায় নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছেআবার অনেক ঘটনা ঘটনার আড়ালেই থেকে যাচ্ছেযেগুলো সামনে আসছে, সেগুলোর সুষ্ঠু বিচার ও ভুক্তভোগীদের সুবিধা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গাফিলতি পরিলক্ষিত হচ্ছেযেগুলো অপ্রকাশিত ঘটনা, লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে যাচ্ছে সেসবের হিসাব কষতে গেলে হতাহতের সংখ্যা এবং এ বিষয়ে ভুক্তভোগীদের দীর্ঘ লাইন হয়ে যাবেতবে আমরা চাই প্রকাশিত-অপ্রকাশিত সব ঘটনার প্রকৃত তদন্ত হোক

ইদানীং আমরা কেমন যেন সহনশীল হয়ে পড়েছি! কোনকিছুতেই আমাদের তেমন তাড়া নেই! একটা সময়ে পত্রিকার সংবাদে মৃত্যুর সংবাদ দেখলেই ভয়ে গা শিউরে উঠতকোন অনাকাক্সিক্ষত মৃত্যুর সংবাদ থাকলে সাধারণ জনগণের ব্যাপক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যেতএসব কিন্তু ইতিবাচক বিষয় ছিলকিন্তু বর্তমান সময়ে প্রায় প্রতিদিন সংবাদপত্র জুড়ে মৃত্যুর অগণিত সংবাদ চোখের সামনে আসে এবং বিষয়গুলোকে আমরা স্বাভাবিক হিসেবেই ধরে নিয়েছিএসবের প্রতিকার ও প্রতিরোধে আমাদের তেমন ভ্রুক্ষেপ নেইনেই কোন উদ্বেগএ বিষয়টিই আমাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছেফলে, বিষয়গুলো দায়িত্বশীলদের দায়িত্বহীনতার সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছেমোদ্দা কথা হচ্ছে, এসব সম্মিলিত বিষয়সম্মিলিত প্রতিরোধ ব্যতীত স্বাভাবিকভাবে কোন সমাধান আসবে না, এটা নিশ্চিত

এ ধরনের হৃদয়বিদারক ঘটনার পরপরই রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে শোকবার্তা প্রদান করা হয় এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি জ্ঞাপন করা হয় সমবেদনারাষ্ট্রীয়ভাবে সাহায্য ঘোষণা করা হয়বেসরকারীভাবেও অনেকেই সহযোগিতার হাত প্রসারিত করে থাকেএ সব কিন্তু ভিক্টিমের পরিবারের সান্ত¡নার জন্য যথেষ্ট নয়কেননা, আপনজন হারানোর ব্যথা কোনকিছু দিয়েই পরিমাপ করা যায় নাকথায় আছে, যার যায় সেই কেবল বোঝেবাকিরা এখানে যত কিছুই বলুক কিংবা যত কিছুই করুক না কেন, কোনভাবেই তা স্বজন হারানোর সঙ্গে তুলনীয় নয়তথাপি ঘোষিত অনুদান কিংবা সাহায্য ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার সঠিকভাবে পাচ্ছে কিনা, সেটিও আলোচনার বিষয় হতে পারেকাজেই, ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার আগেই কেন আমরা সচেতন হই না কিংবা সতর্ক হচ্ছি না- এ বিষয়েও জোরালো আলোচনা করার প্রয়োজন রয়েছেউত্তরার ঘটনার পরে বিআরটিএ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ঘটনার জন্য দোষী বলে ঘোষণা দেয়া হলোবিআরটিএর কর্তৃপক্ষের কি কোন দায় নেই? যে সকল প্রতিষ্ঠান কার্যাদেশ ঠিক সময়ে শেষ করতে পারছে না, তাদের কেন শোকজ দেয়া হচ্ছে না কিংবা কার্যাদেশ বাতিল করে নতুন করে বিজ্ঞাপন প্রদান করে ঠিকাদার নিয়োগ করা হচ্ছে না? আলোচনা হয় কিংবা হচ্ছে, কিন্তু একটি পর্যায়ে যেয়ে অলৌকিকভাবে স্থিমিত হয়ে পড়ছে

একবিংশ শতাব্দীর ডিজিটাল যুগে দায়সারা বক্তব্য মানুষজন ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করছে নাএসব ক্ষেত্রে জনসাধারণকে একীভূত করার বিধান নিশ্চিত করতে হবেযে কোন সরকারী কাজ চলমান থাকাকালীন রাষ্ট্রের মালিক হিসেবে জনগণ কার্যাদেশ মোতাবেক কাজ সঠিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে কিনা, সেটির জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নিকট জবাবদিহি চাইতে পারবে এমন মর্মে বিজ্ঞাপন দিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করা উচিতসেটি হলে অনেক দিক দিয়েই আমরা লাভবান হবোযেমন- কার্যাদেশে উল্লিখিত নিয়মানুযায়ী কাজ পরিচালিত হচ্ছে কিনা, সে বিষয়ে সাধারণ জনগণ নজর দিলে কাজের গুণাগুণ নিশ্চিত করা এবং সময়মতো কাজ শেষ হওয়ার নিশ্চয়তা থাকবেজনগণের মধ্যে এ বিশ্বাসটুকু তৈরি করতে হবে যে, আমাদের টাকায় কাজ হচ্ছেকাজেই এটির তদারকিও আমাদের করতে হবেঅর্থা জনসাধারণকে রাষ্ট্রীয় সকল সম্পদের মধ্যে কোন না কোনভাবে সম্পৃক্ত করা অত্যাবশ্যক হয়ে পড়েছেতা না হলে অস্বাভাবিক ও অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতির যে মর্মান্তিক চিত্র আমরা প্রতিনিয়ত দেখছি, তা থেকে বের হওয়ার তেমন বিকল্প রাস্তা এখনও আমরা তৈরি করতে পারিনি

অন্যদিকে যে বিষয়টি অত্যন্ত জরুরী তা হচ্ছে, ঘটনার পৃষ্ঠপোষকতা কিংবা যে কোনভাবে ঘটনার সম্পৃক্ততায় যে বা যারাই দায়ী থাকুক না কেন, তাদের দ্রুত আইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবেবিভিন্ন সময়ে আমরা দেখি যে, কয়েকটি ঘটনার বিচার  হলেও হর্তাকর্তারা বিচারের বাইরে থেকে যায়যারা সরাসরি ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে, তাদের আইনের আওতায় আনা হয়, অন্যরা থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরেউত্তরার ঘটনায় র‌্যাবের অভিযানে অভিযুক্তদের গ্রেফতার করা হয়েছেকিন্তু তাদের শাস্তি দিলেই কি ঘটনার সুরাহা হয়ে যাবে? আমাদের মনে হচ্ছে, হবে নাকেননা, প্রকল্পটি বহু আগেই শেষ হওয়ার কথাসুতরাং এ প্রকল্প বিলম্বিত করার জন্য যে বা যারাই দায়ী হোক না কেন, তাদের দ্রুত বিচারের মুখোমুখি করতে হবেযদি আমরা রাঘব-বোয়ালদের বিচার নিশ্চিত করতে পারি, তা হলে ভবিষ্যতে সরকারী প্রকল্পে বিভিন্ন অজুহাতে সময় বর্ধিত করার অপচেষ্টা করবে না কার্যাদেশ পাওয়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোপ্রকল্পের সময় ও ব্যয় বৃদ্ধি করার একটি অপচেষ্টা রাষ্ট্রীয় সকল পর্যায়ের কাজেই লক্ষ্য করা যায়সময় বৃদ্ধি করে প্রাক্কলিত ব্যয় বৃদ্ধিরও একটি তালিকা কর্তৃপক্ষের কাছে প্রেরণ করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এবং তারা তাদের উদ্দেশ্যকে যে কোন প্রক্রিয়ায় সফলও করে থাকেএ ধরনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে সজাগ ও সচেতন হতে হবেনিতে হবে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থারাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষায় সকলকে যেমন ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে, ঠিক তেমনিভাবে অনাকাক্সিক্ষত যে কোন ধরনের ঘটনাকে প্রতিহত করার সক্ষমতা তৈরি করতে হবে রাষ্ট্রকেই

লেখক : সহকারী অধ্যাপক ও সভাপতি, ক্রিমিনোলজি এ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগ

চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়