ঢাকা, বাংলাদেশ   সোমবার ২২ এপ্রিল ২০২৪, ৯ বৈশাখ ১৪৩১

সয়াবিন তেলের নতুন দাম কার্যকরে অনীহা মিলারদের

তিনদিনে ২১ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে ৭ রিফাইনারি

এম শাহজাহান

প্রকাশিত: ২৩:৪৭, ৩ মার্চ ২০২৪

তিনদিনে ২১ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে ৭ রিফাইনারি

প্রায় দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও সয়াবিন তেলের দাম কমানোর তথ্য নেই

প্রায় দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও সয়াবিন তেলের দাম কমানোর তথ্য নেই খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে। ঢাকার মুদিপণ্য ব্যবসায়ীরা বোতলজাত কিংবা খোলা সয়াবিন তেল আগের দামে কিনে আগের মতোই বিক্রি করছেন। প্রতি লিটারে ১০ টাকা দাম কমার কোনো নজির নেই বাজারে। এতে তিনদিনে ২১ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে সাত রিফাইনারি প্রতিষ্ঠান। তবে ব্যতিক্রম দেখা যায় মূল্য বাড়ার ক্ষেত্রে। ভোজ্যতেল কিংবা চিনির দাম বাড়ানোর সরকারি ঘোষণা আসার আগে ব্যবসায়ীরা মূল্য বৃদ্ধি করে থাকেন।

কিন্তু কমানোর ক্ষেত্রে তারা হাঁটেন উল্টাপথে। ব্যবসায়ীদের এই দ্বিমুখী আচরণে ক্ষুব্ধ ভোক্তা সমাজ। তাদের মতে, সরকার নির্ধারিত মূল্য কার্যকর না করে যারা বাজার থেকে বাড়তি মুনাফা তুলে নিচ্ছে, সেসব অসাধু ব্যবসায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় রমজান সামনে রেখে আরও বড় ধরনের কারসাজির সুযোগ নেওয়া হতে পারে।  
এদিকে সয়াবিন তেলের দাম না কমায় শুক্র ও শনিবার সারাদেশে অভিযান চালিয়েছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। সরকারি এই সংস্থাটি ভোজ্যতেল উৎপাদনকারী সাতটি রিফাইনারি মিলে অভিযান চালিয়ে দেখতে পায়, সেখানেও নতুন দাম কার্যকর করা হয়নি। কবে নাগাদ এই তেল বাজারে আসবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারেননি মিলমালিকদের প্রতিনিধিরা।

কারণ নতুন তেল বাজারজাতকরণে বোতলগুলো কোনো ধরনের প্যাকেটিং, মোড়কীকরণ এবং লেবেলিং করা হয়নি। এসব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। এ কারণে গত ২০ ফেব্রুয়ারি নতুন মূল্য ঘোষণা করে  তা বাস্তবায়নে দশদিন সময় দিয়ে ১ মার্চ কার্যকরের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। ব্যবসায়ীরাই ওই সময় মূল্য কার্যকরের এই তারিখ ঘোষণা করেন। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ভোক্তা অধিপ্তরের মহাপরিচালক এএইচএম সফিকুজ্জামান জনকণ্ঠকে বলেন, নতুন মূল্য কার্যকরে মিলারদের অনীহা দেখা গেছে। দশদিন সময় পাওয়ার পরও তারা নতুন মূল্যের সয়াবিন তেলের বোতলে লেবেল লাগাতে পারেননি।
মূলত ব্যবসায়ীদের সদিচ্ছার অভাবে নতুন মূল্য কার্যকর হচ্ছে না। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, তার অধিদপ্তরের ক্ষমতা সীমিত। মাত্র ৫০ থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা করা যায়। কিন্তু যারা বাজার থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন, তাদের ঠিক কোটি কোটি টাকা জরিমানা করতে হবে। তবে দুদিনের অভিযান শেষে এ বিষয়ে একটি রিপোর্ট রবিবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে। ওই রিপোর্টের ভিত্তিতে প্রতিযোগিতা কমিশন এবং বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন (বিটিটিসি) প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারে। তিনি বলেনÑ আশা করছি, যারা অসাধু ব্যবসায়ী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জানা গেছে, নতুন দাম ১ মার্চ থেকে কার্যকর হওয়ার কথা থাকলেও তিনদিন পরও বাজারে নতুন দরের সয়াবিন তেলের বোতল কিংবা খোলা তেল পাওয়া যায়নি। ঢাকার কাপ্তান বাজার, ফকিরাপুল বাজার, যাত্রাবাড়ী বাজার, খিলগাঁও সিটি করপোরেশন কাঁচা বাজার, গোড়ান বাজার এবং মালিবাগ রেলগেট বাজার ঘুরে দেখা যায়, নতুন দামের তেল আসেনি বাজারে। ফলে ব্যবসায়ীরা আগের দামে সয়াবিন তেল বিক্রি করছেন।

অনেক মুদিপণ্য ব্যবসায়ী জানালেন- সয়াবিনের দাম যে কমছে, এটা তাদের জানায়নি কোম্পানির ডিলার কিংবা প্রতিনিধিরা। তবে ক্রেতারা দাম কমার কথা বলছেন। ফলে ক্রেতাদের কথায় তারা বিব্রত হচ্ছেন বলে মন্তব্য করেছেন ব্যবসায়ীরা। এ প্রসঙ্গে গোড়ান বাজারের ব্যবসায়ী আবির হোসেন টিটু বলেন,  সয়াবিন তেলের দাম কমানোর বিষয়টি তাদের জানানো হয়নি। আর কম দামের তেল তারা পাইকারদের কাছ থেকে পাচ্ছেন না।

ফলে তাদের আগের দরে সয়াবিন তেল বিক্রি করতে হচ্ছে। ওই বাজারের ভোজ্যতেল ক্রেতা আমির হোসেন বলেন, কোনো দোকানেই নতুন দরের তেল পাওয়া যাচ্ছে না। যারা সরকারি নির্দেশ অমান্য করে ভোক্তা ঠকায়, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত।
ঢাকার পাইকারি বাজার হিসেবে খ্যাত মৌলভীবাজারের ব্যবসায়ীরা বলছেন, সাতটি রিফাইনারি মিলের কোনো একটি প্রতিষ্ঠান থেকেও তারা কম দামের তেল পাননি। দাম কমানোর বিষয়টি তারা অবগত জানিয়ে বলেন, এ নিয়ে মিলমালিকদের তারা ভয়ে কিছু বলতে পারেন না। কারণ বাড়াবাড়ি করা হলে তেলের সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি রয়েছে মিলারদের।
এদিকে দাম কমানোর পর বেশি দামে সয়াবিন তেল বিক্রি করে দিনে সাত কোটি টাকারও বেশি টাকা লুটে নিচ্ছে রিফাইনারি মিলগুলো। এমন তথ্য উঠে এসেছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের তদন্তে। সয়াবিন তেলের দাম কমায়নি- বিষয়টি খতিয়ে দেখতে ঢাকা, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জসহ বেশ কিছু এলাকার সয়াবিন তেল রিফাইনারি মালিকদের মিলে অভিযান চালানো হয়।

লিটারে ১০ টাকা কমানো মূল্যের লেবেল সংবলিত সয়াবিন তেলের বোতল ১ মার্চের আগে মিলগুলোতে প্রস্তুত করার কথা এবং দুই-তিনদিন আগেই নতুন মূল্য সংবলিত তেল খুচরা পর্যায়ে সরবরাহ করার নিয়ম। কিন্তু অভিযান চালিয়ে দেখা যায়, মিলগুলোতে হ্রাসকৃত মূল্যের লেবেল দিয়ে সয়াবিনের বোতল প্রস্তুত করা হয়নি। 
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, প্রতিদিন দেশে ছয় হাজার টন ভোজ্যতেল দরকার হয়।

কেজির হিসাব করলে এক টনে সয়াবিন হবে এক হাজার ৮৫ কেজি। এতে ছয় হাজার টনের হিসাবে প্রতিদিন ৭০ লাখ ৬৩ হাজার ৩৫০ কেজি ভোজ্যতেল লাগে। প্রতিদিন যদি মিলগুলো কেজিতে ১০ টাকা বাড়তি মুনাফা করে, তাহলে দিনে তারা সাত কোটি টাকারও বেশি অর্থ লোপাট করছে বাজার থেকে। ওই হিসেবে তিনদিনে ২১ কোটি টাকা ভোক্তাদের পকেট থেকে হাতিয়ে নিয়েছেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

গত ২০ ফেব্রুয়ারি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে দ্রব্যমূল্য ও বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনা বিষয়ক টাস্কফোর্সের সভায় সয়াবিন তেলের দাম কমানোর সিদ্ধান্ত হয়। সেদিনই জানানো হয়েছিল, ১ মার্চ থেকে সয়াবিন তেলের নতুন এই দর কার্যকর হবে। তাতে প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ১০ টাকা কমিয়ে ১৬৩ টাকা করার সিদ্ধান্ত হয়। পাশাপাশি খোলা তেল ১৪৯ টাকায় বিক্রির কথা থাকলেও সেখানেও নেই দাম কমার প্রভাব।
বাজারে এখনো কোম্পানি ভেদে প্রতি লিটার সয়াবিন তেল ১৭০-১৭৫ টাকা দামেই বিক্রি হচ্ছে। খোলা তেল বিক্রি হচ্ছে ১৫৫ টাকা দরে। তবে পরিশোধন ও বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, নতুন দরের লেবেল লাগানো হচ্ছে। দ্ইু-একদিনের মধ্যে কম দরের তেল কিনতে পারবেন ক্রেতা। ভোজ্যতেল আমদানি ও বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠান মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের (এমজেআই) জ্যেষ্ঠ সহকারী মহাব্যবস্থাপক তাসলিম শাহরিয়ার বলেন, তেলের বোতলে নতুন দরের লেবেল লাগানো হচ্ছে।

শীঘ্রই বাজারে খুচরা পর্যায়ে কম দরের তেল পাওয়া যাবে। অন্যান্য কোম্পানির নতুন দরের তেলও দুই-একদিনের মধ্যে বাজারে চলে আসবে বলে জানান তিনি। তবে কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহ-সভাপতি এসএম নাজের হোসাইন জানান, ১০ দিন আগে ঘোষণা দিলেও বাজারে কম দরের তেল সরবরাহ না করা কোম্পানিগুলোর চরম গাফিলতি। দেরি করলে মুনাফা বেশি হবে, সে জন্যই এমন গড়িমসি। এটি ভোক্তাদের সঙ্গে বড় ধরনের প্রতারণার শামিল। যারা এভাবে ভোক্তাদের ঠকায়, তাদের প্রচলিত আইনে শাস্তির আওতায় নিয়ে আসতে হবে।

×