ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ১৮ এপ্রিল ২০২৪, ৪ বৈশাখ ১৪৩১

নৌকা ও টেবিল ঘড়ির মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে জয়ী স্বতন্ত্র প্রার্থী জায়েদা খাতুন

গাজীপুরে মডেল ভোট

শরীফুল ইসলাম, মোস্তাফিজুর রহমান টিটু ও নুরুল ইসলাম

প্রকাশিত: ০২:১২, ২৬ মে ২০২৩

গাজীপুরে মডেল ভোট

কানাইয়া প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট প্রদানের পর বিজয় চিহ্ন দেখান জায়েদা খাতুন

সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে স্বতন্ত্র প্রার্থী জায়েদা খাতুন গাজীপুর সিটি করপোরেশন (গাসিক) নির্বাচনে মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন। রাত ১টা ৩০ মিনিটে নির্বাচনের ফল ঘোষণা করা হয়। এতে জায়েদা খাতুন প্রতিদ্বন্দ্বী নৌকার প্রার্থী আজমত উল্লা খানকে ১৬ হাজার ১৯৭ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে গাজীপুর সিটির নতুন মেয়র নির্বাচিত হন। টেবিল ঘড়ির প্রার্থী জায়েদা খাতুন পেয়েছেন ২ লাখ ৩৮ হাজার ৯৩৪ ভোট। তার প্রতিদ্বন্দ্বী আজমত উল্লা পেয়েছেন ২ লাখ ২২ হাজার ৭৩৭ ভোট। ফল ঘোষণার প্রতিটি পর্বেই দেখা গেছে বিজয়ী এবং পরাজিত প্রার্থীর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়েছে। শেষ হাসি হেসেছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী জায়েদা খাতুন।
নির্বাচনে অন্য প্রার্থীদের মধ্যে ইসলামী আন্দোলনের আতাউর রহমান ৪৫,৩৫২ ভোট, জাতীয় পার্টির এম এম নিয়াজ উদ্দিন ১৬,৩৬২, মো: রাজু ৭,২০৬, মো: হারুন ২,৪২৬ ও শাহিনুল ইসলাম ২,২৬৫ ভোট পেয়েছেন। প্রদত্ত ভোটের শতকরা হার ৪৮.৭৫।
বৃহস্পতিবার ভোটারদের ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনায় স্মরণকালের সবচেয়ে আনন্দঘন ও উৎসবমুখর পরিবেশে শান্তিপূর্ণভাবে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের (গাসিক) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। দিনভর সুষ্ঠু ভোট অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে গাজীপুরে বর্তমান ইসির অধীনে এক মডেল নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত চলে ভোটগ্রহণ। তীব্র রোদ ও গরম উপেক্ষা করে সকাল থেকেই কেন্দ্রে কেন্দ্রে ভোটাররা স্বতঃস্ফূর্তভাবে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দেন। বেলা যত বাড়ে ভোটারদের উপস্থিতিও তত বাড়তে থাকে। নারী ভোটারদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। আগারগাঁও নির্বাচন ভবনে বসে সিসি ক্যামেরায় সার্বক্ষণিক ভোট পর্যবেক্ষণ করে ইসি। ভোটগ্রহণকালে কোনো ধরনের সহিংস ঘটনা ঘটেনি। সব প্রার্থীই বলেছেন, সুষ্ঠু ভোট হয়েছে। শান্তিপূর্ণ ভোট হওয়ায় স্বস্তি প্রকাশ করেছে গাজীপুরবাসী। এর ফলে সুষ্ঠু নির্বাচনের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করল ইসি। 
এদিকে নির্বাচনের আগে বিভিন্ন মহল থেকে এই ভোট নিয়ে যে আশঙ্কার কথা বলা হয়েছিল তা উড়িয়ে দিয়ে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হওয়ায় সর্বমহলের প্রশংসা অর্জন করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এর ফলে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে নিরপেক্ষ ভোটের উদাহরণ সৃষ্টি করে নিজেদের ইমেজ ও গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধির পাশাপাশি সর্বমহলের কাছে নিরপেক্ষতার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে সক্ষম হয় ইসি। আর এ নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়ায় বর্তমান সরকারেরও ইমেজ বৃদ্ধি পায়। দলীয় সরকারের অধীনেও যে সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারে গাজীপুরের শান্তিপূর্ণ ভোট তা প্রমাণ করেছে বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করছেন। 
সূত্র জানায়, রাজপথের বিরোধী দল বিএনপি গাসিক নির্বাচনে অংশ না নিলেও গোপনে দলের নেতাকর্মীদের কাছে ম্যাসেজ দেয়া হয় আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থীর বিজয় ঠেকাতে সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের মা স্বতন্ত্র প্রার্থী জায়েদা খাতুনকে ভোট দিতে। তাই বিএনপি সমর্থিত ভোটাররা একাট্টা হয়ে জায়েদা খাতুনকে ভোট দেয়। আর এ কারণেই জায়েদা খাতুন প্রতিটি কেন্দ্রেই উল্লেখযোগ্য ভোট পান। 
গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সব কেন্দ্রেই ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোটগ্রহণ করা হয়। তবে নতুন পদ্ধতি হওয়ায় কারও কারও কাছে ইভিএমে ভোটদান প্রক্রিয়া ছিল জটিল। তাই ভোটদানে কিছুটা ধীরগতি ছিল। ইভিএমে ভোট দিতে কম বয়সীদের চেয়ে বয়স্কদের একটু সময় বেশি লেগেছে। এছাড়া কারও কারও আঙ্গুলের ছাপ না মেলায় এবং কেউ কেউ স্মার্ট জাতীয় পরিচয়পত্র সঙ্গে না আনায় ভোট দিতে গিয়ে বিড়ম্বনার শিকার হন। এ নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়ার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতাও ছিল চোখে পড়ার মতো। তাই নির্বাচনের সার্বিক পরিবেশ ছিল শান্তিপূর্ণ। কোনো কোনো কেন্দ্রে ভোটারদের ভিড় থাকায় বিকেল ৪টার পরও ভোটহণ করা হয়। ভোট শেষে কেন্দ্র কেন্দ্রে গণনার পর ফল ঘোষণা করা হয়। পরে সব কেন্দ্রের ভোটের হিসাব যোগ করে রিটার্নিং কর্মকর্তা মেয়র ও কাউন্সিলর পদে চূড়ান্ত ফল ঘোষণা করেন। ভোটগ্রহণ ও ফল ঘোষণার সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। 
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে রাজধানীর অতিনিকটে গাসিক নির্বাচন হওয়ায় ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলসহ বিভিন্ন দল এবং গাজীপুরের সর্বস্তরের মানুষ এবং মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীরা এ নির্বাচনকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে নেন। প্রার্থীদের কর্মী সর্র্মকরা নিজ নিজ এলাকার অলি-গলি ও বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের কেন্দ্রে নিয়ে আসেন। বিশেষ করে নারী ও বয়স্ক ভোটারদের বিশেষ ব্যবস্থায় কেন্দ্রে এনে ভোট দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়। এ কারণে ভোটারদের উপস্থিতি ছিল সন্তোষজনক। 
পর্যবেক্ষক মহলের মতে গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে পরস্পরবিরোধী প্রার্থী ও তাদের কর্মী-সমর্থকরা সৌহার্দপূর্ণ আচরণ করায় সার্বিক পরিবেশ ছিল উৎসবমুখর। এই নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো। ভোটের আগের দিন থেকেই নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা হয় সমগ্র সিটি করপোরেশন এলাকা। র‌্যাব, বিজিবি, সাধারণ পুলিশ, আর্মড পুলিশ, আনসার ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার টিম মাঠে সক্রিয় থাকে। তাই ভোটের দিন শান্তিপূর্ণ পরিবেশ থাকায় অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হয়। অবশ্য নির্বাচন কমিশন থেকে আগেই বলা হয়েছিল গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন উপমহাদেশের সবচেয়ে নির্বাচন হিসেবে উদাহরণ সৃষ্টি করবে। নির্বাচনের পর ইসির কথার সঙ্গে কাজের মিল পাওয়া গেছে বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করছে। 
গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভোটের অনিয়ম প্রতিরোধে কেন্দ্রে কেন্দ্রে স্থাপন করা হয় সিটি ক্যামেরা। প্রতিটি ভোটকেন্দ্রের ভেতরে ও বাইরে একাধিক সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়। মোট ৪ হাজার ৪৩৫টি সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়। এই সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে আগারগাঁও নির্বাচন ভবনে বিশাল স্ক্রিনে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত ভোটের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়ালসহ অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার ও ইসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। সাংবাদিকদেরও স্ক্রিনে ভোটের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ দেয়া হয়।
গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ৫৭টি ওয়ার্ডে ২১ প্লাটুন বিজিবি টহল দেয়। ভোটের অনিয়ম প্রতিরোধে ৭৪ জন ম্যাজিস্ট্রেট নিযোজিত ছিলেন। সঙ্গে ছিলেন জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটও। সেখানে র‌্যাবের ৩০টি টিম এবং স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে পুলিশের ১৯টি এবং মোবাইল টিম হিসেবে ৫৭টি টিম ছিল। এছাড়া গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে ১৭ ও সাধারণ কেন্দ্রে ১৬ জন করে ফোর্স দায়িত্ব পালন করে। বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে ছিল ত্রিস্তর বিশিষ্ট নিরাপত্তা বলয়। নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে দেয়া হয় সমগ্র নির্বাচনী এলাকা। যে কারণে কেউ কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা করার সাহস দেখায়নি। 
এবার গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভোটার ছিল ১১ লাখ ৭৯ হাজার ৪৭৬ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৫ লাখ ৯২ হাজার ৭৬২ জন এবং নারী ভোটার ৫ লাখ ৮৬ হাজার ৬৯৬ জন। এছাড়া তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ১৮ জন। ভোট গ্রহণের দায়িত্বে ছিলেন ৪৮০ জন প্রিসাইডিং অফিসার, ৩ হাজার ৪৯৭ জন সহকারি প্রিসাইডিং অফিসার, ৬ হাজার ৯৯৪ জন পোলিং অফিসারসহ ১০ হাজার ৯৭১ জন ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা। 
গাসিক নির্বাচনে মেয়র পদে প্রার্থী ছিলেন ৮ জন, সাধারণ কাউন্সিলর প্রার্থী ২৪৬ জন এবং সংরক্ষিত কাউন্সিলর প্রার্থী ৭৯ জন। মেয়র পদের প্রার্থীরা ছিলেন, নৌকা প্রতীকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রার্থী অ্যাডভোকেট মো. আজমত উল্লা খান, লাঙ্গল প্রতীকে জাতীয় পার্টির এমএম নিয়াজ উদ্দিন, হাতপাখা প্রতীকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের গাজী আতাউর রহমান, মাছ প্রতীকে গণফ্রন্টের আতিকুল ইসলাম, গোলাপ ফুল প্রতীকে জাকের পার্টির মো. রাজু আহাম্মেদ, স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী টেবিল ঘড়ি প্রতীকে জায়েদা খাতুন, হাতি প্রতীকে সরকার শাহনূর ইসলাম ও ঘোড়া প্রতীকে মো. হারুন-অর-রশীদ। 
এ নির্বাচনে ভোটকেন্দ্র ছিল ৪৮০টি। আর ভোট কক্ষ ছিল ৩ হাজার ৪৯৭টি। এসব কেন্দ্রে ভোটদানের জন্য ব্যবহার করা হয় ৫ হাজার ২৪৬টি ইভিএম মেশিন। প্রতি কেন্দ্রে একজন করে ৪৮০জন ট্রাবল শূটার, প্রতি দুই কেন্দ্রে একজন করে ২৪০ জন (ভ্রাম্যমাণ) টেকনিক্যাল এক্সপার্ট, ১৪ জন সহকারী প্রোগামার এবং ৪ জন প্রোগ্রামার দায়িত্ব পালন করেন। 
ভোটাররা আনন্দের সঙ্গে প্রথমবারের মতো ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোট দিয়েছেন। সকাল আটটায় ভোট শুরু হওয়ার সঙ্গে ভোটারদের দীর্ঘ লাইন পড়ে যায় কেন্দ্রগুলোতে। ভোটারদের চাপে অনেক কেন্দ্রের ভোটগ্রহণের দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের রীতিমতো হিমশিম খেতে হয়েছে। কয়েকটি কেন্দ্রে ভোটারদের চাপ এতটাই বেশি ছিল যে, কর্তৃপক্ষকে থেমে থেমে ভোট নিতে হয়েছে। তবে একাধিক কেন্দ্রের বিভিন্ন বুথে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে ত্রুটি দেখা দেওয়ায় ওইসব বুথের ভোটগ্রহণ সাময়িকভাবে কিছু সময়ের জন্য বন্ধ রাখা হয়। পরে কয়েক মিনিটের মধ্যে মেশিনের ত্রুটি সমাধান করে পুনরায় ভোটগ্রহণ করা হয়। ইভিএম ত্রুটি ও ধীরগতির কারণে ভোট প্রদানে তুলনামূলক ধীরগতি হওয়ায় লম্বা লাইনের সৃষ্টি হয়। এতে ভোটারদের কিছুটা দুর্ভোগ পোহাতে হয়। 
সকালে নারী আর নতুন ভোটাদের উপস্থিতি ছিল সবচেয়ে বেশি। পুরুষ ভোটারদের উপস্থিতি থাকলেও, অতটা ছিল না। দুপুর গড়িয়ে দুপুর দুইটা-আড়াইটা বাজার সঙ্গে সঙ্গে ভোটকেন্দ্রগুলোতে পুরুষ ভোটারদের ঢল নামে। এমন স্বচ্ছ, ঝামেলাহীন এবং আতঙ্ক, উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠাহীন ভোট ইতিপূর্বে গাজীপুরবাসী কোনোদিনই দেখেননি।
৫০ শতাংশের বেশি ভোট পড়েছে- ইসি আলমগীর ॥ গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন প্রসঙ্গে আগারগাঁও নির্বাচন ভবনে সাংবাদিকদের কাছে নির্বাচন কমিশনার আলমগীর জানান, সিসি ক্যামেরায় আমরা ভোট পর্যবেক্ষণ করেছি। আমাদের পর্যবেক্ষণ অনুসারে শৃঙ্খলার সঙ্গে ভালোভাবেই ভোটগ্রহণ হয়েছে। খারাপ কোনো খবর পাওয়া যায়নি। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কোনো কোনো কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা ও ইভিএমে ত্রুটি ধরা পড়ার পর ৫ থেকে ১০ মিনিটে ঠিক হয়ে গেছে। আর ইন্টারনেট না থাকার কারণে কয়েকটি সিসি ক্যামেরায় স্বল্প সময়ের জন্য আমরা ভোটের পরিস্থিতি এখান থেকে দেখতে পাইনি। তবে রেকর্ড হচ্ছিল। আর কোনো কেন্দ্রে এজেন্ট ঢুকতে দেওয়া হয়নি বলে কেউ আমাদের কাছে অভিযোগ দেননি। 
ইসি আলমগীর আরও বলেন, যেভাবে ভোট হয়েছে তাতে আমরা খুবই সন্তুষ্ট। এ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে। নির্বাচন সব প্রার্থীর কাছেই গ্রহণযোগ্য হয়েছে। 
ভোটের পর জায়েদার প্রতিক্রিয়া ॥ সকাল ১০টায় গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের কানাইয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দেন স্বতন্ত্র মেয়রপ্রার্থী সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের মা জায়েদা খাতুন। এরপর সাংবাদিকদের কাছে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে তিনি বলেন, আমি জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী। ইভিএম নিয়ে আমার কোনো অভিযোগ নেই। ভোটকেন্দ্রগুলোর পরিবেশ এখন ভালো। তাই আমার কোনো অভিযোগ নেই। আমরা ভোটের পরিবেশে সন্তুষ্ট। 
জনগণের রায়ের প্রতি আমি শ্রদ্ধাশীল- আজমত উল্লা ॥ সকাল ৯টায় ৫৭ নম্বর ওয়ার্ডের টঙ্গী দারুস সালাম মাদ্রাসা কেন্দ্রে ভোট দেন আওয়ামী লীগের মেয়রপ্রার্থী আজমত উল্লা খান। পরে সাংবাদিকদের কাছে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে তিনি বলেন, জনগণের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে এসেছেন। জনগণ যাকে নির্বাচিত করবে, সেই রায় অবশ্যই মেনে নেব। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জয়-পরাজয় আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত। ফয়সালা আসমান থেকে হয়, এটা আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি। ইংরেজিতে একটি কথা আছে, ‘পিপল ইজ দ্য ভয়েজ অব দ্য গড’। আল্লাহ যা চান, তা জনগণের মাধ্যমে প্রকাশ করিয়ে দেন। 
সরেজমিনে বিভিন্ন কেন্দ্র পরিদর্শন করে দেখা যায়, ভোটগ্রহণকালে কোনো কেন্দ্রেই বড় ধরনের কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। নগরীর ১৯ নং ওয়ার্ডে সালনা নাগা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের বাইরে আওয়ামী লীগ সমর্থিত দু’কাউন্সিলর প্রার্থীর সমর্থকদের মাঝে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এসময় একজন আহত হয়। গাজীপুর সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন ভোটকেন্দ্র ঘুরে মিলেছে এমন চিত্র। সিটি করপোরেশনের ১৮ নং ওয়ার্ডের বাসন থানাধীন বাড়ীয়ালী নলজানী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোট কেন্দ্রে ভোট দিতে আসেন স্থানীয় নলজানী গ্রামের ৯৫ বছর বয়সের হাজী আফসার উদ্দিন। ভাতিজা শফিকুল ইসলাম ও নাতনি সানজিদা আক্তার কনার সঙ্গে নিয়ে একটি অটোরিক্সায় চড়ে তিনি ভোট কেন্দ্রে আসেন। পুলিশের সহায়তায় তিনি প্রচ- রোদ থেকে বাঁচতে অগ্রাধিকারভিত্তিতে আগে ভোট দেন। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে প্রথমবারের মতো ইভিএম-এ ভোট দিতে পেরে বেশ উৎফুল্ল ছিলেন তিনি। ভোট প্রদান শেষে কেন্দ্র থেকে বের হয়ে নিজের অভিব্যক্তি প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘ইভিএম পদ্ধতিটি ব্যালটের চেয়ে ভালো। ভোটার হওয়ার পর এমন সুন্দর ভোট আর দেখিনি, কোনো ঝামেলা নেই। অতীতে এমন সুন্দর ভোট দিতেও পারিনি। কেউ তাকে ভোট কেন্দ্রে আসার জন্য বা না যাওয়ার জন্য চাপও দেয়নি। বাড়ির কাছেই ভোট কেন্দ্র তাই ভোট দিতে এসেছি। আর যদি বেঁচে না থাকি, আর যদি কোনোদিন ভোট দিতে না পারি এজন্য ভোটটি দিয়ে গেলাম। এসময় ভাতিজা শফিকুল ইসলাম জানান, চাচা আফসার উদ্দিনের বয়স ১৯২৮ সালের ২ জানুয়ারি কাগজে লেখা থাকলেও পারিবারিক হিসাবে তার বয়স ১০৫ বছর চলছে। তার চার ছেলে ২ মেয়ে রয়েছেন। এ স্কুল কেন্দ্রটিতে একাধিক লাইনে নারী আর নতুন ভোটারদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। প্রচ- রোদে দাঁড়িয়ে তারা সুশৃঙ্খলভাবে ভোট দিচ্ছেন। কোনো হাঙ্গামা নেই। 
ভোটগ্রহণকালে দেখা যায় বাইরে বিজিবি, পুলিশ, আনসার ও র‌্যাব পাহারা দিচ্ছেন। তারা ভোটারদের ভোট দিতে সব ধরনের সহযোগিতা করছেন। কোনো দাঙ্গা হাঙ্গামার বালাই নেই। ভোটাররা বলছিলেন, এত সুন্দর ভোট আর কোনোদিনই তারা দেখেননি। তারা সরকারের উন্নয়ন কর্মকা-ের প্রশংসা করে বলেন, আমরা যোগ্য লোককে ভোট দিয়েছি। ভোট দেয়ার জন্য কোনো চাপাচাপি নেই।  
সকাল সাড়ে ৮টার দিকে নগরীর ৩০নং ওয়ার্ডের কানাইয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে গিয়েও দেখা গেছে এমন চিত্র। সেখানে লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দেয়ার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন আনুমানিক পঞ্চাশোর্ধ বয়সী নারী মরিয়ম বেগম। কথা হচ্ছিল তার সঙ্গে। তিনি বলছিলেন, অত্যন্ত সুন্দর ভোট হচ্ছে। কোনো ঝামেলা নেই। 
দুপুর ১২টার দিকে জয়দেবপুরের হাড়িনাল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দেন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মো. আনিসুর রহমান। স্ত্রী আমেনা খাতুনের সহায়তায় কেন্দ্রে এসে ভোট দেন। আমেনা খাতুন বলেন, আমার স্বামী দৃষ্টি প্রতিবন্ধী। আমি ভোট আমি দিয়েছি। উনি তার ভোট যে মার্কায় দিতে বলেছেন আমি সেই মার্কায় তার ভোট দিয়েছি। এ প্রসঙ্গে প্রতিবন্ধী আনিসুর রহমান বলেন, ভোট দিতে পেরে আমার ভালো লাগছে। যেহেতু আমি দেখতে পাই না তাই স্ত্রীর সহায়তায় আমি ভোট দিয়েছি। এদিকে সকালে হুইল চেয়ারে চড়ে টঙ্গীর টিএন্ডটি কলোনি স্কুল কেন্দ্রে আসেন ৮০ ঊর্ধ্ব বয়সের বৃদ্ধ। তিনিও একই অভিব্যক্তি প্রকাশ করেন।

×